সহকারী শিক্ষক
১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৩ ১০:১৯ অপরাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
‘সূফী, সূফী সাহিত্য ও সমকালীন ইতিহাস’
ঐতিহাসিকদের মতে তুর্ক-আফগান মধ্যযুগের শাসনব্যবস্থা স্থাপিত হওয়ার সময় থেকেই অনেক সূফী সন্তুরা ভারতে এসেছিলেন। তাঁদের মধ্যে অনেকেই সূফী ধর্মের বিভিন্ন শাখার ছিলেন, যেমন - চিস্তি, কাদরি, সুহারবর্দী, সুরতারী, মাদারি, ফিরদৌসি, নস্কবন্দী ইত্যাদি। সূফীরা অতি সাধারণভাবে তাঁদের জীবনযাপন করতেন। তখনকার কিছু কিছু সূফী সন্তুরা, যেমন সুহারবর্দী গোষ্ঠীর সূফীরা, সম্রাট তথা অন্যান্য শাসকদের সঙ্গে ভাল সম্পর্ক রক্ষা করে চলতেন, তেমনি অন্যান্য সূফীরা সম্রাট তথা অন্যান্য শাসকদের সঙ্গে কোন ধরণের সম্পর্ক রক্ষা করা পচ্ছন্দ করতেন না। সম্রাট কিছু অন্যায় করলে সেটাও সূফীরা পচ্ছন্দ করতেন না। অতীতে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে জনসাধারণ সূফীদের কাছে তাঁদের বিভিন্ন সমস্যার সমাধান করবার জন্য যেতেন। চিস্তি সম্প্রদায়ের সূফীরা জনসাধারণের সঙ্গে খুবই ঘনিষ্টভাবে মেলামেশা করতেন। মধ্যযুগের ভারতবর্ষে সূফীদের সম্পর্কে অনেক লিখিত সাহিত্যিক উপাদান পাওয়া যায়। সেই সমস্ত সাহিত্যিক উপাদানগুলির মধ্যে এমন অনেক সংকলনই রয়েছে, যেখানে সূফীদের কথা, তাঁদের বাণী, তাঁদের জীবনাদর্শের কথা, তৎকালীন সম্রাটদের কথা, এবং সমকালীন বহু ঘটনার কথা জানা যায়। সেকালের বেশ কিছু সূফী সাহিত্য, যথা - সিয়ার-উল-ওয়ালিয়া, ফুয়ায়েদ-উল-ফুয়াদ, খোয়ারুল-মজালিস, সকিনা-তুল-ওয়ালিয়া, তস্করাতুল-ওয়ালিয়া, খালেহ-পুর্ণেমত, মত্তুবাতে-সদী, তথা মত্তুবাতে দোসদী ইত্যাদি এই প্রসঙ্গে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এই প্রবন্ধে তৎকালীন কিছু উল্লেখযোগ্য সূফীদের জীবন তথা তাঁদের বানী ও সূফীদের নিয়ে সমকালীন যে সমস্ত ঐতিহাসিক তথ্য পাওয়া যায়, সেগুলি সম্পর্কে আলোচনা করবার চেষ্টা করা হল।
মুসলিমদের দুটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হল কোরাণ এবং হাদিস। সেখানে মুহম্মদের বাণী ও মুসলিমদের দৈনন্দিন কার্যকলাপের কথা লিপিবদ্ধ রয়েছে। তাঁরা মুহম্মদের বাণী বা কথা অনুযায়ী সাধারণভাবে নিজেদের জীবনযাপন করতে ভালবাসেন। তাঁরা তাঁদের ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানকে নিজের ব্যবহারিক জীবনে ব্যবহার করতে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠাবোধ করেন না। কিন্তু হিজিরার প্রায় একশো বছর পরে কোরাণ এবং হাদিসের বাহ্যিক ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট না থেকে, এবং অর্থনৈতিক দিক থেকে বীতশ্রদ্ধ হয়ে কিছু মুসলিম নিজেদের আরো গূঢ়, রহস্যমূলক চিন্তাভাবনায় নিয়োজিত করেছিলেন। সেই আভ্যন্তরীণ গূঢ় রহস্যের মাধ্যমে তাঁরা আল্লাহর সঙ্গে নিজেদের এক করতে চেয়েছিল। কিন্তু সেটার জন্য ইসলাম ধর্মের বাহ্যিক দিকটিই তাঁদের কাছে যথেষ্ট বলে মনে হয় নি। তাঁরা প্রকৃত সত্য উপলব্ধি করতে চেয়েছিল, এবং তাঁদের সেই প্রচেষ্টার পথ ধরেই ইতিহাসে সূফীবাদের উদ্ভব ঘটেছিল, যেটা ইতিহাসে নিজের প্রভাব রেখে যেতে সক্ষম হয়েছিল। ইসলামের উদ্ভবের প্রায় সমসাময়িক সময় থেকেই সূফীবাদের উদ্ভব হয়েছিল বলে ঐতিহাসিকেরা মনে করে থাকেন। এমনকি স্বয়ং হজরত মুহম্মদের মধ্যেও সূফীবাদের বীজ লুকিয়ে ছিল বলে বলা হয়ে থাকে, এবং সেটাই পরবর্তীকালে মুসলিম ধর্মের মধ্যে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রবাহিত হয়েছিল বলা চলে। ‘ইল্ম-ই-সিনা’ নামক হজরতের রহস্য উদ্ঘাটনের, বা কোন বিষয় ব্যক্ত করবার একটি বিশেষ পদ্ধতি থেকেই সূফীবাদের ধারণা এসেছিল বলে মনে করা হয়। কারণ, সেই ইল্ম-ই-সিনা আসলে রহস্যময় বা অতীন্দ্রিয়বাদের আলোচনা ছিল, যেটা সূফীদের শিক্ষা করতে হত। সূফীবাদ সত্যের পথ, এবং সঠিক পথ - এই ধারনার উপরে প্রতিষ্ঠিত ছিল। সূফীবাদ আল্লাহর কাছে প্রার্থনা, আল্লাহর কাছে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে নিয়োজন, পার্থিব জগতের মিথ্যা চাকচিক্য থেকে সম্পূর্ণ বিমুখতা বা ঔদাসীন্যতা, সুখ ও সম্পদ পরিহার, অধিকার পরিহার, দুঃখ বেদনা গ্রহণ, অপরের দুঃখে দুঃখী হওয়া, মানুষকে সেবা করা, জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকলের দুঃখ মেটানো ইত্যাদি সুক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম নিয়ম নীতির উপরে প্রতিষ্ঠিত ছিল।
ইসলামের অনেক ব্যাখ্যা থেকেই ইসলাম ধর্মে সূফীবাদের যে অস্তিত্ত্ব ছিল সেটার প্রমাণ পাওয়া যায়। সেই সমস্ত ব্যাখ্যায় অনেক ক্ষেত্রেই পাপের প্রতি সতকর্তা, চূড়ান্ত বিচারের সময়, নরক যন্ত্রনা ভোগ, কবরে যন্ত্রনা পাওয়ার মতো অনেক কথাই বলা হয়েছিল, যেগুলো মুসলিমদের ভীত করে তুলেছিল, এবং তাঁরা নিজেদের পার্থিব সুখ স্বাচ্ছন্দ্য ছেড়ে দিয়ে, তাঁদের সম্পত্তি ধর্মীয় সংস্থাগুলিকে দান করে দিয়ে, সর্বস্ব হারিয়ে দুঃখ-দারিদ্র ইত্যাদি গ্রহণের মধ্য দিয়ে গর্ব অনুভব করেছিলেন। এক কথায় তাঁদেরই ইসলামে সূফীবাদের আদিম বাহক বলা চলে। হজরতের শিষ্যরা খুবই সাধারণভাবে তাঁদের জীবনযাপন করতেন, এবং তাঁরা আল্লাহ ও তাঁর বিচারকে ভয় পেতেন। মুহম্মদের সঙ্গী তথা ‘আহুলস্-সূফা’-এর সদস্য আবুদারদা প্রভৃতির কথায় তখনকার মুসলিমদের বিলাসবর্জিত জীবনধারার পরিচয় পাওয়া যায়। তবে শুধুমাত্র ঈশ্বর ভীতি ও শান্তির ভয়েই সেকালের অনেক মুসলিম বা সূফী তপস্বীররা যোগীরূপ গ্রহণ করতেন বা পার্থিব জগতের প্রতি ঔদাসীন্যতা দেখাতেন তা কিন্তু নয়, সেটার পিছনে অর্থনৈতিক অবস্থাও দায়ী ছিল। উম্মায়িদ বংশের বংশানুক্রমিক শাসনে অতিষ্ঠ হয়ে কিছু ধর্মীয় ও শান্তিপ্রিয় ব্যক্তি নিজেদের আল্লাহর কাছে সঁপে দেওয়ার, এবং নিঃসঙ্গতা বা নির্জনতায় বসবাস করবার নীতি নিয়েছিলেন। ওই ভাবেই একধরনের যোগী বা তপস্বী, এবং পার্থিব জগতের সুখ আহ্লাদ থেকে বিরত জীবন ধারার সূত্রপাত ঘটেছিল, যা সূফীবাদ নাম পরিচিত হয়েছিল, এবং যেটার কিছু উল্লেখযোগ্য সদস্য - আবুল হাসান-অলবাসির, আবুজর অল গিফারী এবং হুজাইফাকে - ইসলামে সূফীবাদের প্রকৃত পূর্বপুরুষ বলা যেতে পারে। এছাড়াও সেই সময়ে ইব্রাহিম-বিন আদম, ফুজাইল-বিন আয়াজ, বসরার রাবিয়া ইত্যাদি সূফীরাও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিলেন।
সূফীবাদ মুলতঃ ভালোবাসার নীতির উপরে প্রতিষ্ঠিত ছিল। সূফীবাদ ভালোবাসার মাধ্যমে আল্লাহর সঙ্গে মানুষকে এক করতে চেয়েছিল, এবং সেখান থেকেই সুফীবাদের ভালোবাসার নীতি স্থান পেয়েছিল, যা পরবর্তীকালের সূফীদের মধ্যে প্রবাহিত হয়েছিল, এবং সুফী আন্দোলনের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছিল। সূফীরা ও তাঁদের শিষ্যরাও বহু সাহিত্য রচনা করেছিলেন, যেগুলো থেকে তৎকালীন ইতিহাসের একাধিক কথা জানতে পারা যায়। কিন্তু ভারতীয় উপমহাদেশে সূফীবাদের ইতিহাস রচনা করবার কাজ খুবই দুরহ ব্যাপার। কারণ, অনেক ক্ষেত্রেই দেখতে পাওয়া যায় যে, অনেক গুরুত্বপূর্ণ সূফী সাহিত্যিক উপাদান কালের প্রভাবে নষ্ট হয়ে গিয়েছে, অথবা অনেক সময়ে সমকালীন ঐতিহাসিকেরা ইচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে, তথা তাঁদের দূরদৃষ্টির অভাবের জন্য সূফীদের রচিত সাহিত্যিক উপাদানগুলির গুরুত্ব বুঝতে অসমর্থ হয়েছিলেন। তাই ভারতে সূফীদের ও তাঁদের সমকালীন ইতিহাস নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে অনেক বিতর্কও চালু রয়েছে। কালের অনিবার্য কষাঘাতে সেই সমস্ত লেখাগুলিতেও অনেক পরিবর্তন সাধন বা সংযোজন করা হয়েছিল, অথবা অনেক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান নষ্ট হয়ে যাওয়ার জন্য সূফীদের তথা তাঁদের সমকালীন ইতিহাসের সম্যক ধারণা অনেক সময়েই এখন আর পাওয়া যায় না। তাই তাঁদের প্রকৃত মূল্যায়ন, এবং ঐতিহাসিক তথ্যের যথার্থতা নির্ণয়ের কাজে ঐতিহাসিক তথ্যের অপ্রতুলতা মাঝে মধ্যেই ভারতে সূফী ও তাঁদের সমকালীন ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকস্বরূপ হয়ে দাঁড়ায়। তৎকালীন সূফী সাহিত্যিক উপাদানগুলির মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হল -
(১) সৈয়দ মুহম্মদ বিন মুবারক কিরমানি, এবং আমীর খুর্দ-এর লেখা আত্মজীবনীমূলক সাহিত্য ‘সিয়ার-উল-ওয়ালিয়া’।
(২) মৌলনা-আব্দুল-হক-দেহলভী লিখিত ‘আখবারুল-আখিয়ার’ - যা থেকে সূফীবাদের কাদিরিয়া নীতির কথা জানতে পারা যায়।
(৩) আব্দুল হাসিম এবং পীর ইমামুদ্দিন রাজগিরির লেখা ‘মানাহিজ-উস্-সুত্তার’।
(৪) আব্দুর-রহমান-চিস্তির লেখা দুটি সাহিত্যিক গ্রন্থ - (ক) ‘মিরাত-উল-তসরার’, এবং (খ) ‘মিরাতে মাদারী’।
(৫) মুহম্মদ গেউতি-বিন-হাসান-বিন-মুসা-সত্তারি লিখিত ‘তজকিরাহ’। এই গ্রন্থটি আকবরের দাক্ষিণাত্য অভিযানকালে তাঁর অনুরোধে লেখা, এবং জাহাঙ্গীরের নামে উৎসর্গীকৃত করা হয়েছিল। গ্রন্থটি ৫টি চমনে বা অধ্যায়ে বিভক্ত। এটির প্রথম চমন থেকে হিজিরার পরবর্তী সপ্তম শতকের সূফীদের কথা জানা যায়। দ্বিতীয় চমন থেকে অষ্টম শতকের সূফীদের কথা, তৃতীয় চমন থেকে নবম শতকের সূফীদের কথা, চতুর্থ চমন থেকে দশম শতকের এবং পঞ্চম চমন থেকে সূফীদের সাত্তারিয়া নীতির কথা জানতে পারা যায়। উক্ত গ্রন্থটি থেকে গুজরাটের ইতিহাস ও ভারতের তৎকালীন ইতিহাস সম্বন্ধেও জানতে পারা যায়। এছাড়াও সেখান থেকে মুহম্মদীয় ভারতের আধ্যাত্মিক জীবনের কথাও জানা যায়।
(৬) শাহজাদা দারাশিকোহর লেখা গ্রন্থ ‘সফিনা-তুল-ওয়ালিয়া’।
উপরোক্ত আত্মজীবনীমূলক রচনা ছাড়াও সেকালের বেশ কিছু মালফুজাত থেকেও ভারতে তৎকালীন সূফীদের, এবং তাঁদের সমসাময়িক ইতিহাসের কথা জানতে পারা যায়। সেগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল -
(১) কবি আমীর হাসান সিজ্জির লেখা ‘ফুয়ায়েদ-উল-ফুয়াদ’।
(২) হামিদ কালান্দার-এর লেখা ‘খোয়ারুল মজালিস’।
(৩) মুহম্মদ কাশিম-বিন-হিন্দুখানের লেখা ‘গুলসন-ই-ইব্রাহিমি’ বা ‘তারিখ-ই-ফরিস্তা’।
(৪) ‘মালফুজাত-এ-রুখনি’।
(৫) আবুল ফজলের আইনী আকবরী ইত্যাদি রচনা থেকেও ভারতে সূফীদের কথা ও সমকালীন ইতিহাস সম্বন্ধে জানতে পারা যায়।
উপরোক্ত সমস্ত গ্রন্থ থেকেই জানা যায় যে, খৃষ্টীয় অষ্টম শতক থেকে দ্বাদশ শতকের মধ্যে ভারতে অনেক সুফীসন্ত এসেছিলেন। তাঁদের মধ্যে বেশ কিছু সূফী বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিলেন। যেমন - সেখ হুসেন জঞ্জানি, সেখ আবু তোরাব, সেখ মুহম্মদ, সেখ ইসমাইল প্রমুখ।
সময়ের বিবর্তনের সাথে সাথে সূফী ধর্মেও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের উদ্ভব ঘটেছিল, যথা - চিস্তি, সুহারবর্দী, কাদরি, ফিরদৌসী, নস্কবন্দী ইত্যাদি। এখানে চিস্তি এবং সুহারবর্দী গোষ্ঠীর সূফীদের ও তাঁদের সমকালীন ইতিহাস নিয়ে কিছু আলোচনা করা হল।
(ক) চিস্তি সম্প্রদায়:
(১) খাজা মৈনুদ্দিন চিস্তি - মধ্যযুগের ভারতের চিস্তি সূফীদের মধ্যে খাজা মৈনুদ্দিন চিস্তি সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য ছিলেন। জীবনের বিভিন্ন ঘাত প্রতিঘাতে এবং ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণে তিনি ভারতে এসে উপস্থিত হয়েছিলেন। সেই সময়ে অর্থাৎ খৃষ্টীয় দ্বাদশ শতকের শেষার্ধে মুহম্মদ ঘুরী উত্তর ভারতে তাঁর সাম্রাজ্য স্থাপনে উদ্যোগী হয়েছিলেন। ‘ফুয়ায়েদ-উল-ফুয়াদ’, ‘সিয়ারুল-ওয়ালিয়া’ প্রভৃতি মালফুজাত ও সাহিত্যিক উপাদান থেকে জানা যায় যে, মুহম্মদ ঘুরী উত্তর ভারতে তাঁর সাম্রাজ্য বিস্তারের চেষ্টা করলে সেটা চৌহান বংশীয় শাসক পৃথ্বীরাজ চৌহানকে যথেষ্ট ভীত ও শঙ্কিত করে তুলে ছিল। তবে শুধু তাঁর কাছেই নয়, ওই ঘটনাটি দিল্লী ও আজমীরের শাসকদের কাছেও অত্যন্ত শঙ্কার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। যদিও তরাইনের প্রথম যুদ্ধে (১১৯১) মুহম্মদ ঘুরী পৃথ্বীরাজের হাতে পরাজিত হয়েছিলেন, কিন্তু ১১৯২ খৃষ্টাব্দে তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধে ঘুরী পৃথ্বীরাজকে পরাজিত করেছিলেন। সেই সময়ে খাজা মৈনুদ্দিন মুহম্মদ ঘুরীর সঙ্গে ভারতে এসেছিলেন বলে অনেকে মনে করে থাকেন, যদিও বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। মীরখুর্দ-এর লেখা ‘সিয়ারুল-ওয়ালিয়া’ থেকে জানা যায় যে, পৃথ্বীরাজের রাজত্বকালে হিন্দুরা মুসলিমদের ঘৃণার চোখে দেখতেন। এমনকি খাজা মৈনুদ্দিন পৃথ্বীরাজ চৌহানের রাজত্বকালে আজমীরে গেলে তাঁকে খেতে পর্যন্ত নিষেধ করা হয়েছিল, এবং উচ্চ বর্ণের হিন্দু পুরোহিতরা তাঁকে আজমীর থেকে বিতাড়িত করতে চেয়েছিলেন। এটা থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় যে, সেই সময়ে মুসলিমদের সঙ্গে হিন্দুদের যে কোন ধরণের সম্পর্ক স্থাপনকে অপবিত্র বলে মনে করা হত। যদি ‘সিয়ারুল-ওয়ালিয়া’র লিখিত এই তথ্য সত্যি হয়, তাহলে একথা নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে যে, খাজা মৈনুদ্দিন পৃথ্বীরাজ চৌহানের জীবিতাবস্থায় ভারতে এসেছিলেন। এছাড়াও আব্দুল হকের লেখা ‘আখবারুল-আখিয়ার’ থেকেও তরাইনের যুদ্ধের সময়ে খাজা মৈনুদ্দিনের ভারতে আগমনের তথ্য সমর্থিত হয়। শুধু সেটাই নয়, ওই সময়ে খাজা মৈনুদ্দিনের ব্যক্তিত্ব এবং তাঁর বাণীতে আকর্ষিত হয়ে অনেক হিন্দু জনগণই ইসলাম ধর্ম পর্যন্ত গ্রহণ করেছিলেন বলে জানা যায়। খাজা মৈনুদ্দিন সেকালের জনসাধারণের কাছে খুবই প্রিয় ছিলেন। তিনি শান্তি, একতা ও জনগণের মধ্যে মৈত্রী ও সৌহার্দমূলক সম্পর্ক স্থাপনের উপরে জোর দিয়েছিলেন। তিনি প্রত্যেক ধর্মের মানুষকে সহানুভূতির চোখে দেখতেন। তিনি তাঁর সমগ্র জীবন মনুষ্যত্বের সেবায় নিয়োজিত করেছিলেন। ধর্ম সম্বন্ধে তিনি বলতেন যে, ধর্ম হল গরীব দুঃখীদের সেবা করা, তাঁদের চাওয়া পাওয়ার কথা, তাঁদের ক্ষুধাকে অনুভব করা; অর্থাৎ মানুষকে সেবা করাই হল প্রকৃত ধর্ম। তিনি তাঁর শিষ্যদের ‘দিল-দরিয়া’ হতে, অর্থাৎ নদীর মত বিশাল মনের অধিকারী হতে পরামর্শ দিয়েছিলেন। তাঁর কাছে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে জনসাধারণ আশীবার্দ গ্রহণ করতেন।
(২) খাজা কুতুবউদ্দিন বখতিয়ার কাকী - ইনি সূফী ধর্মের চিস্তি সম্প্রদায়ের অপর এক উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তিনি দিল্লীতে বাস করতেন, এবং সেখানকার জনসাধারণের কাছে অসম্ভব প্রিয় হয়ে উঠেছিলেন। তিনি উপনিষদীয় দর্শনে, তথা মুহম্মদের চিন্তা ভাবনার দ্বারা যথেষ্ট প্রভাবিত হয়েছিলেন। বখতিয়ার কাকী যদিও প্রচন্ড জাঁকজমকের মধ্যে থাকতেন, কিন্তু তিনি কখনই সরকারী কাজ বা সম্রাটের কাছ থেকে কোন ধরণের উপহার গ্রহণ করাকে পছন্দ করতেন না। তিনি সুলতান ইলতুৎমিসের সমসাময়িক ছিলেন। ইলতুৎমিস তাঁকে তাঁর সাম্রাজ্যের প্রধান আধ্যাত্মিক গুরু বলে স্বীকার করতে চাইলেও খাজা কুতুবউদ্দিন সেই পদ গ্রহণ করতেসি রাজি হন নি। বরং উল্টে সুলতানকে তিনি গরীব দুঃখী জনসাধারণের সেবা করতে পরামর্শ দিয়েছিলেন বলে ‘ফুয়ায়েদ-উল-ফুয়াদ’ প্রভৃতি মালফুজাত থেকে জানতে পারা যায়। সেই সমস্ত মালফুজাত থেকে এটাও জানা যায় যে, একবার কোনো কারণবশতঃ খাজা কুতুবউদ্দিন দিল্লী থেকে চলে যেতে উদ্যোগী হলে, সেখানকার জনসাধারণ তাঁকে বাধা দান করেছিলেন, স্বয়ং সুলতান ইলতুৎমিস তাঁদের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ১২৩৫ খৃষ্টাব্দে খাজা কুতুবউদ্দিন দিল্লীর মেহেররৌলী নামক স্থানে দেহত্যাগ করেছিলেন, এবং সেখানেই তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়েছিল। অনেকে মনে করেন যে, পরে সুলতান ইলতুৎমিস তাঁর উদ্দেশ্যেই কুতুবমিনার নির্মাণে হাত দিয়েছিলেন।
(৩) বাবা ফরিদউদ্দিনগঞ্জে সকার - অতীতের ভারতবর্ষের চিস্তি সূফীদের মধ্যে ইনি একটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য স্থান অধিকার করে রয়েছেন। ভারতের সূফী ধর্মকে একটি চিরস্থায়ী শক্ত ও বলিষ্ঠ আসন দানের পিছনে তাঁর অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে রয়েছে। বাবা ফরিদ কুতুবউদ্দিন বফতিয়ার কাকীর বানীতে বিষেশভাবে আকৃষ্ট হয়েছিলেন। বাবা ফরিদউদ্দিন তাঁর শিষ্যদের বলতেন যে, আল্লাহ সর্বত্রই এবং সবার মধ্যে বিরাজমান। তিনি প্রকৃতই জ্ঞানী ছিলেন, এবং তাঁর বাণী শুনবার জন্য তখনকার জ্ঞানী ব্যক্তি থেকে শুরু করে রাজনীতিজ্ঞ পর্যন্ত ইত্যাদি শ্রেণীর প্রচুর মানুষ তাঁর কাছে উপস্থিত হতেন। তিনি সহজ পাঞ্জাবী ভাষায় তাঁর দোঁহা রচনা করেছিলেন, যেগুলো শিখদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ আদি গ্রন্থতে পাওয়া যায়। তাঁর প্রায় ১১২টি, মতান্তরে ১৩৪টি দোঁহা সেখানে স্থান পেয়েছে বলে মনে করা হয়; যা থেকে বোঝা যায় যে, তিনি হিন্দুদের কাছেও অত্যন্ত প্রিয় ছিলেন। বাবা ফরিদ বলতেন যে সুফীবাদের মূল পথ হল মনোনিবেশ এবং আল্লাহকে আরাধনা করা। দিল্লীর সুলতানীর দুই বিখ্যাত শাসক - সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবন, এবং সুলতান আলাউদ্দিন খলজী - তাঁর প্রতি খুবই শ্রদ্ধাশীল ছিলেন বলে জানা যায়। শোনা যায় যে, একবার সুলতান গিয়াসউদ্দিন বলবন বাবা ফরিদকে চারটি গ্রামের ইকতা দিতে চাইলেও তিনি সেটা গ্রহণ করেন নি। কারণ, বাবা ফরিদ বলতেন যে, সরকারী কাজ ও জায়গীর মানুষের মনকে সঙ্কীর্ণমনা এবং আত্মাকে অপবিত্র করে তোলে। বাবা ফরিদ রাষ্ট্রীয় ব্যাপারে কোন ধরণের হস্তক্ষেপ করাকে পছন্দ করতেন না। তিনি বলতেন যে, তাঁরা হলেন সাধুসঙ্গ মানুষ এবং তাঁদের মূল সাধনাই হল অমর আত্মার উপাসনা ও তাঁর জগতে বিচরণ; কোনো পার্থিব জগৎ তাঁদের জন্য নয়। ধর্মীয় ব্যাপারে তিনি যথেষ্ট উদার ছিলেন, এবং উচ্চ-নীচ, সাদা-কালো ভেদে প্রত্যেকেই আল্লাহর সন্তান বলে তিনি মনে করতেন। তৎকালীন ভক্তি আন্দোলনকারীরাও তাঁর আদর্শের দ্বারা অনেকাংশে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। ‘আসরাউল-ওয়ালিয়া’ নামক একটি গ্রন্থ থেকে জানা যায় যে, বাবা ফরিদ বাগদাদ, বুখারা, কান্দাহার, গজনী ইত্যাদি জায়গা পরিভ্রমণ করেছিলেন, এবং একই সাথে এটাও মনে করা হয় যে, বাবা ফরিদ বঙ্গদেশের ফরিদপুর নামক জায়গায় গিয়েছিলেন, এবং ‘ফরিদপুর’ নামকরণটিও তাঁর নামানুসারে হয়েছিল। যদিও ‘ফুয়ায়েদ-উল-ফুয়াদ’, ‘খোয়ারুল-মজালিস’ প্রভৃতি সূফী সাহিত্যিক উপাদান এই ব্যাপারে কোনো সঠিক তথ্য প্রদান করতে না পারবার জন্য ঐতিহাসিক মহলে যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে।
(৪) সেখ নিজামুদ্দিন-আউলিয়া - ইনি ভারতের চিস্তি সম্প্রদায়ের সর্বশেষ্ঠ বিখ্যাত সূফী ছিলেন। আজুধানে তাঁর সঙ্গে সেখ ফরিদের দেখা হয়েছিল, যাঁর কথা ও বাণীতে আকৃষ্ঠ হয়ে তিনি চিস্তি সম্প্রদায়ে যোগদান করেছিলেন, এবং খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি একজন উল্লেখযোগ্য সূফী হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন বলে ‘সিয়ারুল-ওয়ালিস’, ‘ফুয়ায়েদ-উল-ফুয়াদ’ প্রভৃতি সূফী সাহিত্য থেকে জানতে পারা যায়। ‘সিয়ারুল-ওয়ালিয়া’ থেকে জানা যায় যে, সেখ নিজামুদ্দিন তাঁর জীবনকালে দিল্লীর তখতে সাতজন সুলতানের রাজত্বকাল দেখেছিলেন। তবে ‘সিয়ারুল-ওয়ালিয়া’ থেকে এটাও জানা যায় যে, তিনি কখনো কোনো সুলতানের দরবারে যান নি। সুলতান গিয়াসুদ্দিন বলবনের বংশধর কাইকোবাদ কিলুঘেরীতে তাঁর প্রাসাদ নির্মাণ করবার জন্য সেখানে লোক সমাগম ঘটতে থাকায়, সেখ নিজামুদ্দিন ওই জায়গা ছেড়ে গিয়াতপুর চলে যেতে মনস্থির করেছিলেন। কিন্তু পরে তাঁর মতের পরিবর্তন ঘটেছিল। সুলতান জালালউদ্দিন খলজী সেখ নিজামুদ্দিনের ব্যক্তিত্বের দ্বারা বিশেষভাবে আকর্ষিত হয়ে তাঁর ‘জমায়েতখানা’ (আশ্রম) চালাবার জন্য তাঁকে একটি আস্ত গ্রাম দান করতে চাইলেও সেখ নিজামুদ্দিন সেটা নিতে অস্বীকার করেছিলেন। এছাড়া সুলতান আলাউদ্দিন খলজীর সময়ে কিছু উলেমা সেখ নিজামুদ্দিনের জনপ্রিয়তায় হিংসাবোধ করে আলাউদ্দিনের কানভারী করলে তিনি তাঁর পুত্র খিদির খানকে দিয়ে সেখ নিজামুদ্দিনর বিরুদ্ধে একটি পত্র পাঠালে, সেখ তাঁকে জানিয়েছিলেন যে, তিনি ফকির এবং রাষ্ট্রীয় কাজে হস্তক্ষেপ করবার তাঁর কোন ইচ্ছাই তাঁর নেই। ‘ফুয়ায়েদ-উল-ফুয়াদ’, ‘সিয়ারুল-ওয়ালিয়া’ প্রভৃতি গ্রন্থ থেকে আরো জানা যায় যে, সুলতান কুতুবউদ্দিন-মুবারক-খলজী তাঁকে সুলতান আলাউদ্দিন খলজীর পুত্র খিদির খানকে সাহায্য করবার অপরাধে তাঁর উপরে ক্ষিপ্ত হয়েছিলেন। এছাড়াও সেই সময়ে সুলতান মুবারক-খলজী সেখের জনপ্রিয়তা নষ্ট করবার জন্য মুলতান থেকে সেখ রুকনুদ্দিনকে নিয়ে আসলেও রুকনুদ্দিন সেখের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে উঠেছিলেন। সুলতানি যুগের অপর এক শাসক গিয়াসউদ্দিন তুঘলকের সঙ্গে সেখ নিজামুদ্দিনের সম্পর্ক ভালো ছিল না। সেখ কর্তৃক অবাধে গরীবদের মধ্যে ধন বিতরণ, এবং ‘সমা’ নামক এক সুফী গানবাজনা শুনবার ব্যাপার সহ আরো কিছু বিষয়ে সেখ নিজামুদ্দিনের সঙ্গে গিয়াসউদ্দিন তুঘলকের সম্পর্ক খারাপ হয়েছিল বলে জানা যায়। যদিও এই তথ্যের কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি পাওয়া যায় না। সেখ নিজামুদ্দিনের ব্যক্তিত্ত্বের ফলেই সমগ্র ভারতে সূফীবাদ বিকাশিত হয়েছিল বলা চলে। তিনি ‘রাহাতুল-কুলুব’ নামক একটি সাহিত্য রচনা করেছিলেন। সেখ নিজামুদ্দিনের সঙ্গে তখনকার জনসাধারণের ভাল সম্পর্ক ছিল। তাঁর খানকা সেকালের বিদ্যাচর্চার একটি বড় কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। তৎকালীন বহু বিদগ্ধ পণ্ডিত তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছিলেন, যাঁদের মধ্যে ‘চিরাগ-ই-দিল্লী’ নামে পরিচিত নাসিরউদ্দিন মামুদ, বাংলার আখী সিরাজুদ্দিন উমান, দক্ষিণাত্যের বুরহানুদ্দিন গহরিব, ‘ফুয়ায়েদ-উল-ফুয়াদ’ এর লেখক আমীর হাসান সিজ্জী বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিলেন। ১৩২৫ খৃষ্টাব্দে সেখ নিজামুদ্দিনের মৃত্যু হয়েছিল, এবং ‘সিয়ারুল-ওয়ালিয়া’, ‘ফুয়ায়েদ-উল-ফুয়াদ’ প্রভৃতি সুফী সাহিত্য থেকে জানা যায় যে, স্বয়ং সুলতান মুহম্মদ বিন তুঘলক সেখের কফিন বহন করেছিলেন।
(খ) সুহারবর্দী সম্প্রদায়:
সেখ বাহাউদ্দিন জাকারিয়া মূলতানি - সূফী ধর্মের চিস্তি শাখার মত সুহারবর্দী শাখাও ভারতে সূফী ধর্ম ও সাহিত্যের উপরে নিজের গভীর প্রভাব বিস্তার করতে সমর্থ হয়েছিল। পারস্যের সেখ শিহাবুদ্দিন সুহারবর্দী, সুহারবর্দী ভাবধারার প্রবর্তক ছিলেন। তাঁরই এক উল্লেখযোগ্য শিষ্য সেখ বাহাউদ্দিন জাকারিয়া মূলতানি ভারতে সুহারবর্দী ভাবধারা বহন করে নিয়ে এসেছিলেন। ‘ফুয়ায়েদ-উল-ফুয়াদ’ নামক গ্রন্থ থেকে জানা যায় যে, বাহাউদ্দিন জাকারিয়া বাগদাদে সেখ শিহাবুদ্দিন সুহারবর্দীর সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলেন, এবং সেখ শিহাবুদ্দিন বাহাউদ্দিনের উপরে সন্তুষ্ট হয়ে তাঁকে ‘খিরকা-এ-খিলাফত’ বা আল্লাহর হয়ে ধর্ম প্রচারকের ভূমিকা গ্রহণের দায়িত্ব নিয়ে মূলতান ও ভারতে সুহারবর্দী ভাবধারা প্রচারের জন্য প্রেরণ করেছিলেন। ‘আখবারুল-আখিয়ার’ নামক সূফী সাহিত্য থেকে জানা যায় যে, ভারতের সূফীরা প্রথমে সেখ বাহাউদ্দিনের বিরুদ্ধে নানা ধরণের চক্রান্ত করলেও পরে তাঁর নেতৃত্বকে তাঁরা স্বীকার করে নিয়েছিলেন। তাঁর খানকায় তাঁর আশীর্বাদ লাভের জন্য প্রচুর লোক সমাগম ঘটত, এবং তাঁদের মধ্যে অনেকেই তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছিলেন। ‘ফুয়ায়েদ-উল-ফুয়াদ’ নামক গ্রন্থ থেকে আরো জানা যায় যে, তাঁর বানী খুব শীঘ্রই সিন্ধু, মুলতান, বালুচিস্তান ও পাঞ্জাবের দক্ষিণ পশ্চিম অংশে ছড়িয়ে পড়েছিল। সেখ বাহাউদ্দিন ভারতে পর পর আটজন মামলুক সুলতানের রাজত্বকাল দেখবার সৌভাগ্য লাভ করেছিলেন, এবং তিনি অনেক সুলতানের ও সরকারী কাজের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন। সুলতান ইলতুৎমিসের রাজত্বকালে মূলতান ও উচের শাসনকর্তা নাসিরুদ্দিন কুবাচা তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেলেও, শেষপর্যন্ত সেটা থেকে তিনি রক্ষা পেয়ে গিয়েছিলেন, এবং ইলতুৎমিস তাঁকে ‘সেখ-উল-ইসলাম’ নামক পদ দান করেছিলেন। সুলতান নাসিরুদ্দিন মামুদের সময়ে মোঙ্গলরা মূলতান অঞ্চল আক্রমণের মাধ্যমে প্রচুর ধনসম্পদ লুণ্ঠন করেছিলেন, এবং দ্বিতীয়বার তাঁদের মূলতান অভিযানকালে সেখ বাহাউদ্দিন স্বয়ং মোঙ্গলদের কাছে গিয়েছিলেন, এবং সেবারে ১ লক্ষ দিরহাম অর্থদানের মাধ্যমে তিনি মোঙ্গলদের মূলতান আক্রমণ করা থেকে বিরত করেছিলেন। ‘ফুয়ায়েদ-উল-ফুয়াদ’ নামক গ্রন্থ থেকে জানা যায় য়ে, সেখ বাহাউদ্দিন তখনকার নিম্ন শ্রেণীর লোকদের সঙ্গে ওঠাবসা না করলেও, নিম্ন শ্রেণীর তথা সাধারণ লোকের দুঃখ দারিদ্রে প্রচুর অর্থ দিয়ে, এবং কখনো কখনো তাঁদের কাছে সশরীরে উপস্থিত হয়ে সাহায্য করতেন। এছাড়াও মুলতানে একবার দুর্ভিক্ষ হলে তিনি প্রচুর অর্থ দিয়ে সেখানকার দরিদ্র জনসাধারণের জন্য অন্নবস্ত্রের ব্যবস্থা করেছিলেন। সেখ বাহাউদ্দিন শ্রমের উপরে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন; এবং চাষবাস, শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারকে তিনি রাষ্ট্রের পক্ষে মঙ্গলকর বলে মনে করতেন। তিনি কৃষিকার্যের উন্নতির জন্য জঙ্গল জমি কেটে উর্বর ক্ষেত্র তৈরী, এবং মুলতানের জলধারা, কুয়ো ও নদনদীগুলির সংস্কারের উপরেও জোর দিয়েছিলেন, যা থেকে তাঁর সামাজিক চিন্তাভাবনার পরিচয় পাওয়া যায়। যাই হোক, তৈমুর লঙের ভারত আক্রমণের ফলে যে প্রচুর পরিমাণে সূফীদের জীবন হানি হয়েছিল, তার ফলে ভারতে সুহারবর্দী গোষ্ঠীর সূফীদের প্রভাব কমে গিয়েছিল; যদিও জালালউদ্দিন-তাব্রেজী বাংলায় সুহারবর্দী ভাবধারার প্রচার করেছিলেন।
উপসংহারে বলা যেতে পারে যে, ভারতবর্ষে যত সূফী সাহিত্য রয়েছে, যথা - ফুয়ায়েদ-উল-ফুয়াদ, খোয়ারুল মজালিস ইত্যাদি থেকে, খৃষ্টীয় দ্বাদশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে শুরু করে খৃষ্টীয় অষ্টাদশ শতক পর্যন্ত বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য সূফী তথা তাঁদের কার্যকলাপের, এবং সমকালীন ইতিহাসের একটি চিত্র পাওয়া যায়। এর থেকে দেখা যায় যে, সেই সমস্ত সূফী সাহিত্যগুলি শুধুমাত্র প্রার্থনা, বিশ্বাস এবং অন্যান্য ধর্মীয় গুণাবলীর ইতিহাসই নয় - সেগুলোর থেকে তৎকালীন রাষ্ট্র, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা, সমাজ, সংস্কৃতি ইত্যাদির কথাও জানতে পারা যায়। সুতরাং যদি সেই সমস্ত উপাদানগুলি খুব সচেতনভাবে অনুধাবন করা হয়, তাহলে দেখা যাবে যে, ওই সমস্ত উপেক্ষিত সাহিত্যিক উপাদানগুলি থেকেও তৎকালীন যুগের বিভিন্ন ঐতাহাসিক তথ্য পাওয়া যাবে, যেগুলো মানুষকে পুনরায় ভাবিয়ে তুলবে, এবং এটাই প্রমাণ করে দেবে যে, ওই সমস্ত উপাদানগুলিকে পুনরায় ইতিহাসের একটি নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখবার প্রয়োজন রয়েছে।
তথ্যসহায়ক গ্রন্থাবলী:
১- ভারতের সূফী, মোবারক করীম জওহর।
২- ভারতে মুসলিম সংস্কৃতির ক্রমবিকাশ, মোবারক করীম জওহর।
৩- Sufism in India, Amit Dey.
৪- Sufism: A Global History, Nile Green.
৫- Essential Sufism, Robert Frager.
৬- Sufism: An Introduction to the Mystical Tradition of Islam, Carl W. Ernst.
৫৩
৯১ মন্তব্য