সহকারী অধ্যাপক
১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৩ ১২:৫০ অপরাহ্ণ
সহকারী অধ্যাপক
রাজা দিনাজ ও হাজী দানেশ এর স্মৃতি বিজরিত জনপদ দিনাজপুর
ডক্টর মোহাম্মদ ইদ্রিস
রংপুর বিভাগের অন্তর্গত দিনাজপুর জেলাটি আবহমানকাল ধরে ধারণ করে আছে অনন্য ইতিহাস ও সংস্কৃতি। রাজধানী থেকে উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত এ জেলার প্রধান নদী পুনর্ভবা। এই জেলার পূর্বে রংপুর ও নীলফামারী, পশ্চিমে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, উত্তরে ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড় এবং দক্ষিণে রয়েছে জয়পুরহাট ও গাইবান্ধা জেলা। দিনাজপুর জেলা ১৭৮৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। জনশ্রুতি আছে, জনৈক দিনাজ অথবা দিনারাজ দিনাজপুর রাজপরিবারের প্রতিষ্ঠাতা। তার নামানুসারেই রাজবাড়িতে অবস্থিত মৌজার নাম হয় দিনাজপুর। পরবর্তীতে ব্রিটিশ শাসকরা ঘোড়াঘাট সরকার বাতিল করে নতুন জেলা গঠন করে এবং রাজা দিনাজের সম্মানে জেলার নামকরণ করে দিনাজপুর।
অনেক বড় জনপদ দিনাজপুর জেলায় রয়েছে ১৩টি উপজেলা এগুলো হলো-দিনাজপুর জেলা সদরের পশ্চিমে বিরল ও বোচাগঞ্জ। দক্ষিণে কাহারোল, বীরগঞ্জ ও খানসামা। পূর্বে চিরিরন্দর, ফুলবাড়ী, পার্বতীপুর, বিরামপুর, নবাবগঞ্জ, হাকিমপুর ও ঘোড়াঘাট উপজেলা। দিনাজপুরের ইতিহাস অত্যন্ত প্রাচীন ও সমৃদ্ধ। সাহিত্য ও সংস্কৃতির ঐতিহ্যমন্ডিত দিনাজপুর জেলা চাল, লিচু ও আম উৎপাদনের জন্যে বিখ্যাত। উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থান ও ঐতিহাসিক স্থাপনার মধ্যে জেলা সদরে রয়েছে গোর-এ-শহীদ ঈদগাহ বড় মাঠ, রামসাগর দীঘি, সুখসাগর দীঘি, দিনাজপুর রাজবাড়ী, হাজী দানেশ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, কান্তজীর মন্দির, নয়াবাদ মসজিদ, বিরল উপজেলায় দীপশিখা মেটি স্কুল, ফুলবাড়ী উপজেলায় স্বপ্নপুরী পিকনিক স্পট, নবাবগঞ্জ উপজেলায় নবাবগঞ্জ জাতীয় উদ্যান, সিংড়া জাতীয় উদ্যান, লিচু বাগান ইত্যাদি।
যাবেন যেভাবে: সড়ক পথে ঢাকা হতে দিনাজপুর জেলার দূরত্ব ৩৮৩ কিলোমিটার এবং রেলপথে ঢাকা হতে দিনাজপুর রেল স্টেশনের দূরত্ব ৪৮০ কিলোমিটার। জেলাটি বিভাগীয় শহর রংপুর হতে ৪০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। ঢাকা থেকে দিনাজপুর আসতে হলে মহাসড়ক পথে টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া জেলা হয়ে আসতে হয়। বিভিন্ন বিলাসবহুল পরিবহন কোম্পানির গাড়ি ঢাকা-দিনাজপুর রুটে চলাচল করে। ঢাকার কমলাপুর রেল স্টেশন থেকে দ্রুতযান এক্সপ্রেস রাত ০৮ টায়, একতা এক্সপ্রেস সকাল ১০ টায় দিনাজপুরের উদ্দ্যেশে ছেড়ে যায়। এখানে সাধারণভাবে দৈনন্দিন খাওয়া-দাওয়ার জন্য স্থানীয় হোটেল ও রেস্টুরেন্টগুলোতে সুস্বাদু খাবার পাওয়া যায়। মিষ্টি জাতীয় খাবারের মধ্যে বিখ্যাত হলো রাজমোহন। এছাড়াও পুনর্ভবা নদীর বাইম মাছ দিনাজপুর জেলার অন্যতম জনপ্রিয় খাবার।
যাত্রা শুরু যেভাবে: দিনাজপুর যাওয়ার ইচ্ছা থাকলেও নানা ব্যস্ততার কারণে কয়েক বার পরিকল্পনা নিয়েও যেতে পারিনি। কারণ কর্মস্থল পরিবার-পরিজন ম্যানেজ করে বের হওয়া সহজ নয়। গত ৪ জুলাই কুড়িগ্রাম ভ্রমণ শেষে পরদিন ৫ জুলাই আলমগীর ভাইয়ের সাথে রংপুর থেকে সকাল দশটায় আমরা দিনাজপুর জেলা শহরে পৌঁছালাম। পথে রাবির বন্ধু মতিউল ভাইয়ের সাথে মেডিকেল মোড়ে দেখা হয়েছিল। প্রথমে রামসাগর দীঘি এরপর বড় মাঠ, সুখসাগর দীঘি, দিনাজপুর রাজবাড়ীসহ সারাদিন বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান ভ্রমণ শেষে রাতে পার্বতীপুর রেলষ্টেশন হতে আন্তনগর ‘সীমান্ত’ ট্রেনে গন্তব্যে ফিরে এলাম।
গোর-এ-শহীদ ঈদগাহ: দিনাজপুরের গোর-এ-শহীদ ঈদগাহ ময়দানটি উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় ঈদগাহ। দৃষ্টিনন্দন ও নান্দনিক বিশাল মিনার নির্মাণ করা হয়েছে দিনাজপুরের ঐতিহাসিক গোর-এ-শহীদ ময়দানে। উইকিপিডিয়া তথ্যমতে এ মাঠে চেহেলগাজীর সমসাময়িক ইসলাম প্রচারক শাহ আমির উদ্দীন ঘুরী (র:) এর সমাধী রয়েছে, যিনি ঘোড়ায় চড়ে দিনাজপুরে ইসলাম প্রচার করেন এবং এখানে তাকে শহীদ করা হয়। সেজন্য এ মাঠের নামকরণ হয় গোর এ শহীদ ময়দান। গোরে-এ-শহীদ ময়দান আঞ্চলিকভাবে ‘দিনাজপুর বড় মাঠ’ নামে পরিচিত। এর আয়তন ৭৮ একর। দিনাজপুর গোরে-এ-শহীদ ময়দানের পূর্ব পার্শ্বে দিনাজপুর শহরের জিরো পয়েন্ট অবস্থিত।
দিনাজপুর বড় মাঠে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর উত্তর ফ্রন্টের বৃহৎ সমাবেশ ঘটেছিল বলে সি এস রেকর্ডে জানা যায়। ব্রিটিশ-ভারত রাজ্যের পক্ষ হতে মিলিটারি ডির্পাটমেন্ট এর নামে প্রায় ৬২ একর জমি দান করে। অতিরিক্ত ১৬ একর ভারত সাম্রাজ্য সরাসরি প্রদান করে। ইংরেজ আমলে এ মাঠে ঘৌড় দৌড় অনুষ্ঠিত হত এবং পাকিস্তান আমলে ফুটবল প্রতিযোগিতা হত। ১৯৬২ সালে এ মাঠে হেলিপোর্ট নির্মিত হয়। দেশ স্বাধীনের পর ২০ ডিসেম্বর এ মাঠে দিনাজপুরে প্রথম পতাকা উত্তোলন করা হয়। বড় মাঠের এক পাশে জেলার কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ নির্মিত হয়েছে। ১৯৮৬ সালে এ মসজিদের পাশে তেভাগা আন্দোলনের নেতা দিনাজপুরের কৃতি সন্তান হাজী মোহাম্মদ দানেশ সমাহিত হন।
জানা গেছে, একসঙ্গে এত লোক নামাজ আদায় করার মতো ঈদগাহ মাঠ উপমহাদেশে আর একটিও নেই। ঈদগাহটি তৈরি করা হয়েছে মোগল স্থাপত্যরীতির অনুসরণে। মেহরাবের উচ্চতা ৫৫ ফুট। ৫২ গম্বুজবিশিষ্ট এই ঈদগাহে রয়েছে দুটি মিনার, যার প্রতিটির উচ্চতা ৬০ ফুট। মাঝের গেট দুটি ৪৭ ফুট করে চওড়া। দেশের সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক গোর-এ-শহীদ ময়দানের পশ্চিম দিকের প্রায় অর্ধেক জায়গাজুড়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এই ঈদগাহ মিনারটি। দৃষ্টিনন্দন হিসেবে উপস্থাপন করতে প্রতিটি গম্বুজে আছে বৈদ্যুতিক সংযোগ। সন্ধ্যার পর থেকেই মিনারে আলো ঝলমল করে ওঠে। এ ছাড়া ৫১৬ ফুট লম্বায় ৩২টি খিলান নির্মাণ করা হয়েছে। সুবিশাল মাঠ, নির্মল বাতাসের কারণে এটি দিনাজপুর শহরের অন্যতম বিনোদন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। মাঠের দক্ষিণ দিকে রয়েছে শিশুপার্ক।
দিনাজপুর রাজবাড়ী: শহরের উত্তর-পূর্বে রাজারামপুর গ্রামের কাছে রাজ বাটিকা এলাকায় অবস্থিত এই দর্শনীয় স্থানটি। রাজবাড়ী বলা হলেও ঐতিহাসিক পটভূমি অনুসারে এটি আসলে একটি জমিদার বাড়ি। দিনাজপুর জেলার ঐতিহ্য ও সমৃদ্ধির প্রতিনিধি বলতেই বোঝা হয় এই রাজবাড়ীকে। তাই সর্বসাকূল্যে ভবনের অবস্থা বেশ নাজুক থাকা সত্ত্বেও ইতিহাসপ্রেমিরা বেশ আগ্রহ নিয়ে ঘুরতে আসেন রাজবাড়ী। এখানকার ইতিহাস সমৃদ্ধ ভবন ও জায়গাগুলোর মধ্যে রয়েছে কুমার মহল, আয়না মহল, রানী মহল, আটচালা ঘর, ঠাকুর ঘর, মন্দির, আতুর ঘর, রাণী পুকুর ও চম্পা তলা দীঘি। শহর থেকে যেকোনো স্থানীয় গাড়িতে করে ঘুরে আসা যায় রাজবাড়ী।
হাজী দানেশ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস: এটি রংপুর বিভাগের প্রথম বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। তেভাগা আন্দোলনের জনক হাজী মোহাম্মদ দানেশের নাম নিয়ে ১৯৭৬ সালে শুরু হয় এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির যাত্রা। তবে শুরুতে এটি কলেজ হলেও ২০০২ সালের ৮ এপ্রিল এটি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে স্বীকৃতি পায়। ১৩০ একর আয়তনের এই বিশ্ববিদ্যালয়ে আছে জিমন্যাশিয়াম, মসজিদ, পোস্ট অফিস, ব্যাংকের শাখা, অ্যাকাডেমিক ভবন, মেডিকেল সেন্টার, প্রশাসনিক ভবন, হোস্টেল, সেমিনার কক্ষ ও ২টি অডিটরিয়াম। এ ছাড়া আরও আছে লাল-সাদা ইটের সমন্বয়ে তৈরি দৃষ্টিনন্দন ভবন, শিশুপার্ক, খেলার মাঠ, ডি-বক্স চত্বর, বোটানিক্যাল গার্ডেন, টিএসসি, লাইব্রেরি, শহীদ মিনার ও ক্যান্টিন। বিশ্ববিদ্যালয়টি ঢাকা-দিনাজপুর মহাসড়কের পাশেই অবস্থিত। দিনাজপুর শহর ও দশমাইল মোড় থেকে মাত্র দশ টাকায় অটোরিকশায় করে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে যাওয়া যায়।
রামসাগর দিঘি: বাংলাদেশের বৃহত্তম দিঘি হিসেবে পরিচিত এই জলাশয়টি মূলত একটি কৃত্রিম দিঘি। পলাশী বিপ্লবের কিছু পূর্বে রাজা রামনাথ রাজ্যের পানির চাহিদা মেটাতে খনন করেছিলেন এই দিঘি। রাজার নামানুসারেই দিঘিটি পরবর্তীতে পরিচিতি পায়। বর্তমানে এটি দিনাজপুর পর্যটন বিভাগের দায়িত্বে আছে। প্রায় ৪ লাখ ৩৭ হাজার ৪৯২ বর্গমিটার ক্ষেত্রফল এবং ১০ মিটার গভীরতার এই দিঘির আশপাশে বিকেলে ঘুরে বেড়ানোর জন্য দারুণ জায়গা। এখানে সাঁতার কাটারও ব্যবস্থা আছে। পূর্ণিমার সময় ক্যাম্পিং করার জন্য রামসাগর বেশ জনপ্রিয় একটি স্থান। শহরের প্রাণকেন্দ্র থেকে অটোরিকশা ভাড়া নিয়ে রামসাগর জাতীয় উদ্যানে যেতে ৩০ থেকে ৪০ মিনিট সময় লাগতে পারে।
সুখ সাগর ইকোপার্ক: দিনাজপুর শহর হতে উত্তর পূর্ব দিকে ২ কিলোমিটার দূরে রাজবাটী এলাকায় সুখ সাগর ইকোপার্ক অবস্থিত। শহর থেকে অটোরিকশা করে এখানে যাওয়া যায়। এই ইকোপার্কটি একটি পুকুরকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে। গ্রামীণ পরিবেশে এটি অবস্থিত। দিনাজপুর সদরসহ পার্শ্ববর্তী এলাকার জনসাধারণের জন্য পিকনিক ও ট্যুরিস্ট স্থান হিসাবে তৈরি করা হয়েছে। এছাড়া সুখসাগর ইকোপার্কটিতে পাখির অভয়াশ্রম তৈরি করা হয়েছে যা জীবৈচিত্র্য সংরক্ষণ তথা পরিবেশ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করছে।
দিনাজপুর জাদুঘর: দিনাজপুর জেলার সদরের মুন্সিপাড়ায় অবস্থিত। জাদুঘরের ছুটির দিন বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার। বিকাল ৪ টা থেকে সন্ধ্যা ৮ পর্যন্ত খোলা থাকে। প্রখ্যাত প্রত্নতত্ত্ববিদ আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া দিনাজপুরে সীতাকোট বিহার আবিষ্কারের পর প্রাচীন প্রত্নসম্পদ খোঁজার কাজে পূর্ণ মনোনিবেশ করেন। বৃহত্তম দিনাজপুরের আনাচে-কানাচে থেকে এগুলো সংগ্রহ করে ১৯৬৮ খ্রিষ্টাব্দে স্থানীয় কয়েকজনের সহায়তায় তিনি প্রতিষ্ঠা করেন দিনাজপুর মিউজিয়াম।
কান্তজিউ মন্দির: বাংলাদেশের এই বিখ্যাত স্থাপনাটি নির্মিত হয়েছিল ১৮ শতকে, যার আরও একটি নাম নবরত্ন মন্দির। ঢেপা নদীর তীরে কান্তনগর গ্রামের অবস্থান। মন্দিরের শিলালিপি অনুসারে মহারাজা প্রাণনাথ রায় মন্দিরের কাজ শুরু করেছিলেন। ১৭২২ সালে তিনি মারা যাওয়ার পর তার পুত্র মহারাজা রামনাথ রায় ১৭৫২ সালে এর নির্মাণকাজ শেষ করেন। প্রথমে মন্দিরটির উচ্চতা ছিল ৭০ ফুট। ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে ক্ষতির কারণে এটি এখন ৫০ ফুট লম্বা। মহাভারত, রামায়ণ ও অন্যান্য পৌরাণিক কাহিনিগুলো মন্দিরের বাইরের দেয়ালে প্রায় ১৫ হাজার টি বর্গাকার পোড়ামাটির ফলকে চিত্রিত করা আছে। শহর থেকে বা দশ মাইল মোড় থেকে অটোরিকশায় করেই পৌঁছানো যায় কান্তজির মন্দিরে।
নয়াবাদ মসজিদ: দিনাজপুর জেলার এই অনন্য প্রত্নতাত্ত্বিক ভান্ডারটি নির্মিত হয়েছে ১৭৯৩ সালে সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের শাসনামলে। সে সময় বেশ অনেকগুলো টেরাকোটায় কারুকার্য মণ্ডিত করে বানালেও এখন তার মাত্র ১০৪টি অবশিষ্ট রয়েছে। এগুলোর অধিকাংশই আবার সম্পূর্ণ অক্ষত নয়। স্থানীয়দের মতে, ১৮ শতকের মাঝামাঝিতে কান্তজির মন্দির নির্মাণের সময় পশ্চিমের কোনো এক দেশ থেকে আগত মুসলমান স্থপতিরা বসবাস করতে শুরু করেন এই নয়াবাদ গ্রামে। তারাই পরবর্তীতে নিজেদের ব্যবহারের জন্য গড়ে তুলেছেন এই মসজিদটি। কান্তজিউ মন্দির আর এই নয়াবাদ মসজিদ পরস্পর থেকে মাত্র কয়েক মিনিটের দূরত্বে অবস্থিত। তাই একসঙ্গে দুটো জায়গাই ঘুরে আসা যেতে পারে।
নবাবগঞ্জ জাতীয় উদ্যান: দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলার ৫১৮ হেক্টরের পঞ্চবটীর বনটি জাতীয় উদ্যান হিসেবে স্বীকৃতি পায় ২০১০ সালের ২৪ অক্টোবর। বর্তমানে এই বিশাল শালবনটি শেখ রাসেল জাতীয় উদ্যান নামে পরিচিত। বনের মাঝখানে প্রায় ৬০০ একরের আশুরার বিল দেশীয় মাছের অভয়াশ্রম। এই বিলের ওপরে নির্মাণ করা হয়েছে উত্তরবঙ্গের সব থেকে বড় কাঠের ব্রিজ। স্থানীয়দের মতে সিদ্ধিলাভের পর দস্যু রত্নাকর এই বনেই বাল্মীকি মুনিরূপে খ্যাতিলাভ করেন। এখানেই রয়েছে সীতার কোট বৌদ্ধবিহার, যাকে কেন্দ্র করে রচিত হয়েছিলো কিংবদন্তির শিবের কৈলাশবাস আর সীতার বনবাসের গল্প। দিনাজপুর থেকে নবাবগঞ্জের পথে বাস আছে। নবাবগঞ্জে পৌঁছার পর কাঠের ব্রিজের কথা জিজ্ঞেস করলেই যে কেউ পঞ্চবটী বনের রাস্তা দেখিয়ে দেবে।
সিংড়া জাতীয় উদ্যান: দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার ভগনগরে অবস্থিত এই বনাঞ্চলটি সিংড়া মৌজার অন্তর্গত বলে এর নাম হয়েছে সিংড়া ফরেস্ট। প্রায় ৮৫৬ একর বনাঞ্চলটির প্রায় ৭৫৬ একর জায়গাকে জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণা করা হয় ২০১০ সালে। এরপর থেকে এটি পিকনিক স্পটে পরিণত হয়েছে। বনের মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীটি খনন করে ২ ভাগে বিভক্ত হওয়া বনকে একসঙ্গে মেলাতে তৈরি করা হয়েছে সেতু। শিশুদের জন্য বিভিন্ন ধরনের রাইডসসহ সরকারি উদ্যোগে বিনোদনের বিভিন্ন কার্যক্রম চালু হয়েছে। প্রতি শীতেই এখানে পিকনিক করার ধুম পড়ে যায়। দিনাজপুর শহর থেকে বীরগঞ্জ হয়ে সড়ক পথেই পৌঁছা যায় সিংড়া জাতীয় উদ্যানে।
স্বপ্নপুরী পিকনিক স্পট: দিনাজপুরের সবচেয়ে আকর্ষণীয় জায়গাটির অবস্থান এর ফুলবাড়ী উপজেলার আফতাবগঞ্জে। প্রায় ৪০০ একর জমির ওপর গড়ে তোলা হয়েছে এই সুন্দর নকশাকৃত বিনোদন পার্কটি। কৃত্রিম হ্রদ, পাহাড়, বাগান, গাছ-গাছালি, ফুলের বাগান, প্রতিকৃতি, চিড়িয়াখানা, কৃত্রিম ফোয়ারা, ইটভাটা, ঘোড়ার রথ, শাল, হংসরাজ সাম্পান, খেলাধূলার জায়গা; সব মিলিয়ে এক সমৃদ্ধ পিকনিক স্পট এই স্বপ্নপুরী। এ ছাড়াও আছে মাটির কুঁড়েঘর, ডাকবাংলো ও বাংলাদেশের ভূমি মানচিত্র। এখানে রাত্রি যাপনের জন্য রয়েছে ৫টি কটেজ। সবকিছু উপভোগ করতে হলে জনপ্রতি ৭০ টাকা খরচ করে পার্কে প্রবেশ করতে হবে। দিনাজপুর থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশা বা বাসে করে স্বপ্নপুরী যাওয়া যায়। প্রধান শহর থেকে প্রায় ১ ঘণ্টার রাস্তা। তাই ঢাকা থেকে গেলে এই যাত্রায় সারাদিন লেগে যেতে পারে।
লিচু বাগান: দিনাজপুরের দেশব্যাপী সুখ্যাতি মূলত এর লিচুর জন্যে। এখানকার ১৩টি উপজেলাতেই চাষ হয় লিচুর। ছোট-বড় সব মিলিয়ে গোটা দিনাজপুর জেলায় মোট ৩ হাজার ১২৮টিরও বেশি লিচু বাগান আছে, যেখানে লিচু গাছের সংখ্যা প্রায় ২ লাখ ২০ হাজারের মতো। দিনাজপুরের প্রসিদ্ধ লিচুর বাজার এলাকার নাম পৌরসভা নিউমার্কেট। সকাল থেকে দুপুর অব্দি চলে লিচুর বেচা-কেনা। চিরির বন্দরে কম করে হলেও আছে প্রায় ১ হাজার ২০০ লিচু বাগান। এ ছাড়া শহরে রামসাগর দিঘির পথে মাশিমপুর এলাকাটি লিচুর জন্য অনন্য এক জায়গা। এ ছাড়া কাহারোল উপজেলার কান্ত নগরের নয়াবাদ গ্রামে দেখা যাবে প্রচুর লিচু বাগান। কান্তজীর মন্দির ও নয়াবাদ মসজিদ যাওয়ার পথেই অটোরিকশা থেকে চোখে পড়বে এই বাগানগুলো।
দীপশিখা মেটি স্কুল: দিনাজপুরের বিরল উপজেলার মোঙ্গলপুর ইউনিয়নের অন্তর্গত রুদ্রপুর গ্রামের এক ব্যতিক্রম স্কুল দীপশিখা মেটি স্কুল। ১৯৯৯ সালের দীপশিখা নামক একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেছিল স্কুলটি। তবে ভিন্নধর্মী শৈল্পিক স্থাপনার কাজ শুরু হয় ২০০৫ সালের সেপ্টেম্বরে। অপূর্ব এই শিল্পকর্মের মূল উপাদান হচ্ছে মাটি, খড়, বালি ও বাঁশ, দড়ি, খড় ও কাঠ। শুধুমাত্র ভিত ছাড়া আর কোথাও ইট ব্যবহার করা হয়নি। পুরো স্কুলটি ৬ কক্ষ বিশিষ্ট একটি দোতলা ভবন, যার আয়তন ৮ হাজার বর্গফুট। পরিবেশবান্ধব শ্রেণিকক্ষগুলোতে শিক্ষার্থীরা গরম-শীতের তীব্রতা অনুভব করে না। দিনাজপুর শহরের টেকনিক্যাল মোড় থেকে বোচাগঞ্জগামী বাসে উঠে নেমে যেতে হবে মঙ্গলপুর। সেখান থেকে অটোরিকশায় করে মেটি স্কুল পৌঁছানো যাবে।
সমাপনী: বিদায় বেলা: সারা দিনের ভ্রমণ শেষে এবার বিদায়ের পালা। বড় মাঠ, রামসাগর দীঘি, সুখসাগর দীঘি, দিনাজপুর রাজবাড়ী ইত্যাদী ভ্রমণ শেষে পার্বতীপুর রেলষ্টেশন হতে রাতের সীমান্তে গন্তব্যে পৌঁছালাম। স্মৃতির পাতায় জমা হলো দিনাজপুরের পথে-প্রান্তরের অনেক কিছু।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, সাঁথিয়া মহিলা ডিগ্রি কলেজ, সাঁথিয়া, পাবনা।
৫
৫ মন্তব্য