সহকারী শিক্ষক
০৮ অক্টোবর, ২০২৩ ১০:৪৫ অপরাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
‘বর্ধমানে বর্গী হাঙ্গামা’ (দ্বিতীয় পর্ব)
নিগম সরাইয়ের যুদ্ধে নবাবের অন্যতম সৈন্যধ্যক্ষ মীরহাবিব (ইনি উড়িষ্যার নায়েব নাজিম রুস্তম জঙ্গের অনুগামী ছিলেন) ঘোড়া থেকে পড়ে গিয়ে মারাঠাদের হতে বন্দী হয়েছিলেন, এবং আলিবর্দীর প্রতি আগেকার কোন দ্বেষবশতঃ মারাঠাদের সঙ্গে যোগদান করেছিলেন। ২৪শে এপ্রিল রাত্রিবেলা বর্ধমানের জমিদার রাজা চিত্রসেনের দেওয়ান মানিকচাঁদ (ইনি ১৭৫৬ খৃষ্টাব্দে নবাব সিরাজদৌল্লার অধীনে কলকাতার ফৌজদার নিযুক্ত হয়েছিলেন) নবাবের অনুগামী হয়েও তাঁর দূরাবস্থার সময়ে সসৈন্যে ওই জায়গা ত্যাগ করে বর্ধমানে পলায়ন করেছিলেন। (The Seir Mutaqherin, Vol. I, p- 387) কাটোয়ায় পৌঁছে নবাব জানতে পেরেছিলেন যে, ইতিপূর্বেই মারাঠারা কাটোয়ার শস্যভাণ্ডারে অগ্নিসংযোগ করে সেটিকে ধ্বংস করে দিয়েছিল। ক্ষুধার্ত নবাব সৈন্যরা তখন সেই পোড়া-চাল খেয়েই নিজেদের ক্ষুন্নিবৃত্তি নিবারণ করেছিলেন। আলিবর্দী কাটোয়ায় তাঁর শিবির স্থাপন করে খাদ্য ও প্রয়োজনীয় সামগ্রীর জন্য মুর্শিদাবাদে হাজী আহম্মদের কাছে জরুরি সংবাদ পাঠিয়েছিলেন, এবং ভাস্কররামও তখন বর্ষা আগত দেখে নাগপুরে প্রত্যাবর্তন করতে মনস্থির করেছিলেন। কিন্তু পরলোকগত নবাব সরফরাজের হত্যার প্রতিশোধ নিতে চাওয়ার জন্য মীরহাবিব ভাস্করের পক্ষে যোগদান করে মুর্শিদাবাদ আক্রমণ ও লণ্ঠনের জন্য তাঁকে প্ররোচিত ও বাধ্য করেছিলেন। ৬ই মে গোপনে রাতের অন্ধকারে সাতশো জন বাছাই করা মারাঠা অশ্বারোহী সৈন্যসহ অজয়নদ অতিক্রম করে দ্রুত ডাহাপাড়ায় উপস্থিত হয়ে সেই জায়গার ‘গঞ্জ মহম্মদ খান’ নামক বাজারটি লুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগ করবার পরে হাজীগঞ্জের ঘাটে (মহিমাপুরের কাছে) গঙ্গা অতিক্রম করে বিদ্যুৎবেগে মহিমাপুরে থাকা জগৎশেঠের গদি থেকে দু’কোটি আর্কট মুদ্রা ও প্রচুর মল্যবান দ্রব্য লণ্ঠন করে মুর্শিদাবাদে অবস্থানরত নিজের আত্মীয়-স্বজনকে সঙ্গে নিয়ে মীরহাবিব নদীর পশ্চিমতীরে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন। (History of Bengal, Vol. II, p- 456; The Seir Mutaqherin, Vol. I, p- 393) কাটোয়া শিবিরে বসেই মুদর্শিদাবাদ লুণ্ঠনের সংবাদ পেয়ে আলিবর্দী ৭ই মে তারিখে তৎকালীন বাংলার রাজধানীর দিকে এগিয়ে গিয়েছিলেন, এবং তাঁর আগমনের সংবাদ পেয়ে ভাস্কররাম ও মীরহাবিব ওই জায়গা ত্যাগ করে বর্ধমান জেলার কাটোয়া ও কেতুগ্রাম থানাসহ বীরভূম ও মর্শিদাবাদ জেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে লুণ্ঠন ও অগ্নিদাহ পর্ব সমাধা করে বর্ষার আগে কাটোয়ায় নিজেদের শিবির স্থাপন করেছিলেন। তবে প্রকৃতপক্ষে মারাঠাদের মালশিবির কিন্তু কাটোয়ায় ছিল না, বা প্রতিরক্ষার দিক থেকে বিচার করলে ওই জায়গায় শিবির স্থাপন করাও তাঁদের পক্ষে নিরাপদ ছিল না। সেই কারণে ভাস্কররাম তখন দেওয়ানগঞ্জে (বর্তমান দাঁইহাট) নিজেদের শিবির স্থাপন করেছিলেন, এবং সেখানে বর্ধমানের তৎকালীন জমিদার কীর্তিচাঁদের প্রাসাদতুল্য রাজবাড়ীটি দখল করে নিয়ে অবস্থান করতে শুরু করেছিলেন। সেই বাড়ির ধ্বংসপ্রায় একটি বিশাল প্রাচীরের অস্তিত্ব এখনও দেখতে পাওয়া যায়, এবং সেখানকার স্থানীয় মানুষেরা ভাস্কররামের দশেরা-পুজোর জায়গা হিসাবে রাজবাড়ীর ঘাটটিকে দেখিয়ে থাকেন। কাটোয়া থেকে দাঁইহাট পর্যন্ত প্রায় ৬ কিলোমিটার বিস্তৃত জায়গা জুড়ে মারাঠারা তখন তাঁদের শিবির স্থাপন করেছিলেন, এবং তাঁদের অত্যাচারের ভয়ে গ্রামবাসীরা দলে দলে সেই জায়গা ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। মারাঠাদের সেই অত্যাচারের ফলে বিকিহাট-সহ (খৃষ্টীয় সপ্তদশ শতকের বর্ধমানের প্রসিদ্ধ বাজার) ইন্দ্রানী পরগণার বিখ্যাত বাজারগুলি তখন ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছিল, এবং পরবর্তী প্রায় দশ বছর ধরে কাটোয়া ও দাঁইহাটের মধ্যবর্তী অঞ্চলটি জনবসতিশূন্য হয়ে পড়ে ছিল। আলোচ্য সময়ে মারাঠাদের দাঁইহাটে নিজেদের প্রধান শিবির স্থাপনের অন্যতম একটি কারণ ছিল যে, নদী পারাপারের জন্য ভাগীরথীর উপরে থাকা মাটির সেতুটি তখন দাঁইহাটের ঘাটের পাশেই ছিল। মারাঠাদের মালশিবির দাঁইহাটে স্থাপিত হওয়ার পরে তাঁরা সেখানেই দশেরা উৎসব পালন করেছিলেন। অনেকেই বলে থাকেন যে, কাটোয়ায় নাকি মারাঠাদের মূল শিবিরটি ছিল। কিন্তু, কাটোয়ায় মূল শিবিরের অবস্থান থাকলে ১১৪৯ বঙ্গাব্দের আশ্বিন মাসে দশেরা উৎসবের সময়ে মারাঠারা সহজেই সেখানে হাজার হাজার নবাব সৈন্যের আগমনের সংবাদ পেয়ে যেতেন।
মারাঠারা তাঁদের প্রথম অভিযানে বিশেষভাবে সফল হতে পারেন নি। রণক্লান্ত ভাস্কর তাঁর বাহিনী সমেত নাগপুরে ফিরে যেতে মনস্থির করায় মীরহাবিব বঙ্গদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের উপরে আক্রমণ ও লুণ্ঠনের জন্য মারাঠাদের উৎসাহিত করেছিলেন। ফলতঃ সেই ঘরের-শত্রু বিভীষণ না থাকলে বাংলায় বর্গীহাঙ্গামা কখনোই অতটা ভীষণ আকার ধারণ করতে পারত না, এবং আলিবর্দী সহজেই স্থায়ীভাবে মারাঠাদের বাৎসরিক আক্রমণ বন্ধ করতে সক্ষম হতেন। কিন্তু শুধুমাত্র মীরহাবিবের তীক্ষ্ণ বুদ্ধি, কর্মকুশলতা, অক্লান্ত শ্রমশক্তি এবং নবাবের প্রতি তাঁর অজেয় প্রতিহিংসা ও শত্রুতাই মারাঠাদের বাংলা অভিযানকে অতটা সফল ও দীর্ঘস্থায়ী করেছিল। মীরহাবিব পারস্যের সিরাজ নগরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। সামান্য ব্যবসায়ী থেকে বাকচাটুতা ও নিজের কর্মকুশলতার গুণে নবাব সুজাউদ্দিনের জামাতা রুস্তম জঙ্গের অধীনে তিনি উড়িষ্যার নায়েবের পদ গ্রহণ করেছিলেন। রস্তম জঙ্গের পরাজয় ও পলায়নের পরে তিনি আলিবর্দীর অধীনে চাকরি গ্রহণ করলেও, তাঁর প্রতি অন্তরে বিদ্বেষভাব পোষণ করে গিয়েছিলেন। তাই মারাঠাদের হাতে বন্দী হওয়ার পরে মীরহাবিব পূর্ণ ইচ্ছা ও উৎসাহে তাঁদের সঙ্গে যোগদান করেছিলেন; এমনকি বঙ্গদেশে তিনি মারাঠাদের প্রধান মন্ত্রণাদাতা ও কার্যকারণরূপে ছিলেন। (প্রবাসী, বৈশাখ সংখ্যা, ১৩৩৮ বঙ্গাব্দ, পৃ: ১২৫-২৬; Riaz-us-Salatin, p: 342-44) ১৭৪২ খৃষ্টাব্দের মে মাসে নবাব মুর্শিদাবাদে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন, এবং ভাস্কর তখন বীরভূমের পথে স্বদেশে ফিরে যেতে মনস্থ করায় মীরহাবিব তাঁকে ভয় ও প্রলোভন দেখিয়ে জুন মাসে পুনরায় কাটোয়ায় ফিরিয়ে এনেছিলেন। সেবারে মীরহাবিবের পরামর্শে ভাস্কর বাংলার নতুন নতুন অঞ্চলে লণ্ঠন ও অগ্নিদাহ করে জুলাই মাসে হুগলীতে উপস্থিত হয়ে কূট-কৌশলের দ্বারা হুগলীর অপদার্থ ও মদ্যপ ফৌজদার মহম্মদ রেজা খানকে বন্দী করেছিলেন। প্রকৃতপক্ষে ভাগীরথীর প্রায় সমগ্র পশ্চিমাঞ্চলে তখন শয়তানের অভিশাপ নেমে এসেছিল, এবং বর্ধমান, বীরভূম, হুগলী ও মেদিনীপুরের আপামর জনসাধারণ বর্গীদের নামে এতটাই আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন যে, ওই ঘটনার বহুকাল পরেও সেই অত্যাচারের কথা তাঁদের মনে ছিল। সেবারে বর্গীদের ভয়ে দলে দলে সাধারণ মানুষ ভাগীরথীর পূর্ব পাড়ে পলায়ন করেছিলেন। শিবাজীর উত্তরসূরীদের হাতে স্ত্রীজাতির প্রতি ওই ধরণের দলবদ্ধ অত্যাচার মুসলমান সুলতানদের আমলেও সংঘটিত হয়নি। সেসব ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনায় পাওয়া যায় -
“ভাল২ স্ত্রীলোক জত ধইরা লইয়া জাএ।
আঙ্গুলে দড়ি বাঁধি দেয় তার গলাএ॥
একজনে ছাড়ে তারে আর জনা ধরে।
রমনের ভরে ত্রাহি শব্দ করে।
এই মতে বরগি কত পাপ কৰ্ম্ম কইরা।
সেই সব স্ত্রীলোকে জত দেয় সব ছাইড়া॥”
(মহারাষ্ট্রপুরাণ, গঙ্গারাম দত্ত)
সমকালীন সলিমুল্লার বিবরণেও সেই একই চিত্র পাওয়া যায়, “All rich and respectable people abandoned their homes and migrated to the eastern side of the ganges in order to save the honour of their women.” (History of Bengal, Vol. II, p. 456) গঙ্গারাম, সলিমুল্লা ও ইউসুফ আলির মত সেকালের অন্য একজন প্রত্যক্ষদ্রষ্টা ব্যক্তি বর্গীদের সেই নৃশংস অত্যাচার ও লুণ্ঠনের কাহিনী বর্ণনা করেছিলেন। সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিত ও সুকবি বাণেশ্বর বিদ্যালঙ্কার সেই সময়ে বর্ধমানের রাজা চিত্রসেন রায়ের সভাকবি ছিলেন। বাণেশ্বর তখনকার অন্যান্যদের মত নিজে বর্গীদের সেইসব অত্যাচার প্রত্যক্ষ করে তাঁর ‘চিত্রচম্পূ’ কাব্যে বর্ণিত করেছিলেন। বাণেশ্বরের বর্ণনায় পাওয়া যায় -
“যান্ত্যেকেন দিনেন যোজনশতং হীনাস্ত্রদীনান স্ত্রিয়ো
বালান ঘ্নন্তি হরন্তি বিত্তমখিলং সাধ্বীশ্চ সীমন্তিনঃ।
সংগ্রামে সমুপস্থিতে সুনিভৃতং দেশান্তরে সুদ্রতং
ধাবন্ত্যদ্ভূতবেগবাজিনিবহো যেষাং প্রধানং বলম॥” (৩৪)
(চিত্রচম্পূ)
অর্থাৎ, অদ্ভুত বেগসম্পন্ন অশ্বের দল যাঁদের প্রধান বল, সেই সৈন্যেরা সংগ্রামে উপস্থিত হয়ে দেশান্তরে নিভৃতে দ্রুত ধাবিত হচ্ছে। তাঁরা একদিনে শতযোজন পথ অতিক্রম করে; অস্ত্রহীন দীনদরিদ্র, মহিলা ও শিশুদের হত্যা করে; সকল সম্পদ, সাধ্বী স্ত্রীলোক ও গর্ভবর্তী নারীকেও অপহরণ করে।
বর্গীদের আক্রমণ ও অত্যাচারের ফলে তখনকার বাংলার যেসব গ্রাম ছারখার হয়ে গিয়েছিল, সমকালীন প্রত্যক্ষদ্রষ্টা কবি গঙ্গারাম দত্তের বিবরণে সেগুলির পরিচয় জানতে পারা যায় -
“বাঙ্গালা চৌআরি জত বিষ্ণু মোণ্ডব।
ছোট বড় ঘর আদি পোড়াইল সব॥
এই মতে জত সব গ্রাম পোড়াইয়া।
চতুর্দ্দিগে বরগি বেড়াএ লুটিয়া॥
…
তবে কোন কোন গ্রাম বরগি দিলা পোড়াইয়া।
সে সব গ্রামের নাম শুন মন দিয়া॥
চন্দ্রকোনা মেদিনীপুর আর দিগনপুর।
খিরপাই পোড়ায় আর বর্দ্ধমান শহর॥
নিমগাছি সেড়গা আর সিমাইল।
চণ্ডিপুর শ্যামপুর গ্রাম আনাইল॥
এই মতে বৰ্দ্ধমান পোড়াএ চাইর ভিতে।
পুনরপি আইলা বরগি বন্দর হগলিতে॥
সেরখাঁ ফৌজদার তবে হুগলিতে ছিল।
তাহার কারণে বরগী টিতে নারিল॥
সাতসইকা রাজবাটী আর চাঁদপুর।
কাখরা সরাই ডামদ্বৈ যদুপুর॥
ভাটছালা পোড়াএ আর মেরজাপুর চান্দাড়া।
কুড়বন পলাসি আর বউচি বেড়ড়া॥
সমৃর্দ্ধরগড় জার্ন্নগড় আর, নদিয়া।
মাহাতাপুর সূনণ্টপুর থইল পোড়াএ গিয়া॥
পরাণপুর ভাটরা পোড়াএ আর মান্দড়া।
সরভাঙ্গা ধিতপুর আর গ্রাম চান্দড়া॥
সাতসইকা জাগিরাবাদ সকল পোড়াইঞ।
কুমিরা বউলতলি নিমদা পোড়াএ গিঞ॥
কড়ই বৈথন (কৈথন) পোড়াএ আর চাড়াইল।
সিঙ্গি বাক্সা ঘোড়ানাস মস্তইল॥
গোটপাড়া চাঁদপাড়া আর য়াগদিয়া।
রাতারাতি পাটলি দিল পোড়াইয়া॥
আতাইহাট পাতাইহাট আর দাঞিহাট।
বেড়া - ভাওসিংহ পোড়াএ আর বিকিহাট॥
এইরূপে ইন্দ্রাইন পরগণা বরগি লুটি।
কাগা মোগাএ লুটে ওলন্দেজের কুটি॥
এইরূপে কাগা মোগা পোড়াইঞ।
রাতারাতি পহছিলা জাউমাকান্দি গিয়া॥
তবে বিরভুই পরগণা বরগি দিল পোড়াইয়া।
আমডহরা মহসেরপুর থানা কৈল গিঞা॥
গোয়ালাভুঞি সেনভুঞি সব পোড়াইলা।
চতুদিগ পোড়াইয়া বিষ্ণুপর আইলা॥
তবে বোনবিষ্ণুপর গোপাল রক্ষা করে।
য়সাদ্য বরগির তবে কি করিতে পারে॥
সহর লুটিতে বর্গী তবে আইল ধাইয়া।
নৈহাটী উত্থানপুর কাটোয়া ডাইনে থুইয়া॥
বাবলা নদী বরগি তবে পার হইল।
মাঙ্গনপাড়া সাটই কামনগর আইল॥
মাহুলা চৌরিগাছা আর কাঠালিয়া।
আধারমানিক আইলা বরগী রাঙ্গমাইটা দিয়া॥
গোয়ালজান বুধইপাড়া আর নেয়ালিসপাড়া।
সিঘ্রগতি আসিয়া পহচিলা দাহাপাড়া॥”
উপরোক্ত বিবরণে বর্গীদের দ্বারা আক্রান্ত সেকালের বাংলার প্রধান গ্রামগুলির নাম পাওয়া যায়। বর্গীদের অত্যাচারে ওই সব জায়গার সাধারণ মানুষের নিজেদের ঘরবাড়ী ছেড়ে পালানোর সময়ে যে অশেষ ক্লেশ ভোগ করতে হয়েছিল, সেটার বিবরণ চিত্রচম্পূ কব্যে পাওয়া যায়। বর্গী হাঙ্গামার ঠেলায় তখনকার সাধারণ মানুষ ছাড়াও তৎকালীন বর্ধমানের রাজা চিত্রসেন রায় তাঁর আত্মীয়স্বজন ও ধনসম্পদসহ ভাগীরথীর পূর্বপারে মূলাজোরের কাউগাছিতে পালিয়ে গিয়েছিলেন। সে বিষয়ে বাণেশ্বরের বর্ণনায় পাওয়া যায়, “এইভাবে মহারাজাধিরাজ (চিত্রসেন) প্রজাবৃন্দকে অনুরঞ্জিত করে অতিশয় আনন্দে বিরাজিত থাকাকালীন ১৬৬৬ শকাব্দে ভগবান সূর্য প্রথম রাশিমধ্যে সঞ্চারণশীল হলে অকালে মহাপ্রলয়কালীন মেঘসমূহের ন্যায় প্রচণ্ড বেগে প্রবর্তিত ঝড়ঝঞ্ঝাদি সঞ্চারিত করে মধ্যদিনের সূর্য ও জ্যোৎস্নাকালীন চন্দ্রকেও এইরূপে অন্ধকারে রেখে, তমোময়ের ন্যায়, তমালতরুসমূহের ন্যায়, রজোময়ের ন্যায়, নিশাচরে সৈন্যচক্রসমূহের ন্যায়; কলিকালে বর্ণিত কঠোর পাপসমূহের ন্যায় মহারাষ্ট্রাধিপতি সাহুরাজ্যের স্বভাবচণ্ড সৈন্যসমহ অকস্মাৎ যেন আংশিক প্রলয়বিধান করবার মানসে গৌড়জনপদের জনগণকে উন্মূলিত করবার জন্য মহাধমকেতুর ন্যায় উপস্থিত হল। এই সৈন্যসমূহ কৃপাবিতরণে অতীব কৃপন, হাতে তাঁদের কৃপান। গর্ভবতী নারী, শিশু, দেবপ্রতিমা, ব্রাহ্মণপুত্র এবং দীনদরিদ্রকে বিদারণ করতে তাঁরা কঠোর প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। সকলের সর্বস্ব অপহরণ, যথেচ্ছভাবে বিচরণ এবং সর্বপ্রকার প্রতিষিদ্ধ আচরণে তাঁরা অতীব নিপুন। এই প্রবল সৈন্যসমূহের কোলাহল, অশ্বের হ্রেষা, হস্তীর বংহিত, ভেরীরব, ঘণ্টার টঙ্কার, খড়্গের ঝঙ্কার, বীরহুঙ্কার, সিংহনাদ তথা ভুরি ভুরি ভৈরব রবসমূহের দ্বারা ভূমণ্ডল একেবারে পরিপূর্ণ হয়ে গিয়েছিল॥১২॥” … “যাঁদের স্বরূপ এবং চরিত্র পূর্বেই বিশ্রুত হয়েছে এইরূপ নিসর্গদুর্গম বর্গীবর্গের সৈন্যসাগর সমুপস্থিত হতে দেখে স্বভাবতঃই ভীরু এবং কোমল স্বভাব গৌড়জনপদের প্রজাবৃন্দের মধ্যে অতীব কোলাহল সঞ্চারিত হল - ‘আমরা কী করি, কোথায় যাই, কোথায় থাকি, কী উপায়ে, কে আমাদের সহায় হবে? হে ভগবান, কি এই অতি নিষ্ঠুর ঘটনা সংঘটিত হল!’ এই কোলাহল অকস্মাৎ প্রচণ্ড বজ্রাবিঘাতে খণ্ডিত শৈলমণ্ডলে জাত প্রচণ্ড শব্দের ন্যায় কিংবা মন্দার পর্বতের উদ্দাম মন্থনে আন্দোলিত সমদ্রের উত্তাল জলকল্লোলজনিত শব্দের ন্যায়। এই কোলাহলে দিঙমণ্ডল পরিপূরি, ধরণীর অন্দর-কন্দরে সঞ্চারিত; এই কোলাহলের জন্য অপরাপর শব্দশ্রবণের অবসর দূরীভূত হয়েছে॥১৩॥” … “তারপর তাঁরা (গৌড়বাসী) শকটে, শিবিকায়, হস্তীতে, অশ্বে, নৌকায় এবং পদব্রজে দিকে দিকে পলায়ন করতে আরম্ভ করে। এর মধ্যে ধনশালীরা ধনজনের ভারে মন্থর গতিতে অতিবিস্তৃতভাবে সঞ্চরণ করছে। কেহ বা নিজেদের সারবস্তু, বস্ত্রাদি এবং অলঙ্কারাদি নিয়ে পলায়ন করছে। কারো ক্রোড়ে দীর্ঘকেশ বিশিষ্ট চঞ্চল বালক সমাশ্রিত। পলায়মান ব্রাহ্মণগণের গলদেশে শালগ্রামশিলা আশ্রিত। দুর্বহ এবং অতিশয় ভারী বিবিধ শাস্ত্রপুস্তকসমূহের বিনাশের আশঙ্কায় তাঁদের চিত্ত সন্তাপ-জর্জরিত। কোন কোন রমণী দুর্বহ গর্ভভারে মন্থরগতি। কেহবা নিতম্বদেশ এবং কুচকলসযুগলের (স্তনদ্বয়) ভারে অলসগমনা। কখনো বা তাঁরা পঞ্চসংকটের সম্মুখীন, কখনো বা কুশকণ্টকাদি দ্বারা কণ্টকিত হওয়ার আশঙ্কায় আতঙ্কিতা। গ্রীষ্মকালে জাজ্জ্বল্যমান মধ্যস্থ সূর্যের তীব্র তাপসমূহের প্রতাপ তাঁরা সহ্য করতে পারছে না। সময়মত পানাহার না পাওয়ার জন্য ক্ষুধাতৃষ্ণায় আকুল শিশদের আর্ত চিৎকারে তাঁদের হৃদয় অতিশয় কাতর ও ব্যাকুল। অতিশয় করুণ আর্তনাদ, অসহ্য বেদনা এবং রোদনহেতু ব্যাকুল রমণীরা সমস্ত পৃথিবীকে বর্গীময় বলে অনুভব করছে। তাঁদের বিবিধ আর্তনাদে এবং পরস্পর বলাবলিতে ভূমণ্ডল ক্ষুভিত বলে প্ৰতিভাত হল॥১৪॥” … “এই অবসরেই বিশাল সৈন্যদল দ্বারা বর্ধমান নগর রক্ষার ভার সচিবগণের উপর ন্যস্ত করে মহারাজ (চিত্রসেন) সমস্ত দিঙমণ্ডলব্যাপী, মহাবিক্রমশালী, বিপুল সৈন্যবাহিনীর দ্বারা ভূমিবলয়কে আচ্ছাদিত করে অনন্যপরায়ণ, শরণাগত, করুণাস্পদ, দরিদ্র এবং ব্রাহ্মণবহুল প্রজাবৃন্দের মন হতে ভয় দূর করবার উদ্দেশ্যে অভিনব এবং নিজ অধিকারস্থিত দক্ষিণপ্রয়াগ এবং গঙ্গাসাগর এই তীর্থদ্বয়ের মধ্যবর্তী, জগতের সৌন্দর্য বর্ধক ‘বিশাল’ নামক বিশাল নগরীতে উপস্থিত হন॥১৫॥”
মীরহাবিব হুগলী থেকে সুলুপ আনিয়ে দাঁইহাটে মারাঠাদের ভাগীরথী পারাপারের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন, এবং সেই পথ ব্যবহার করে মারাঠারা তখন ভাগীরথীর পূর্বপাড়ে অবস্থিত পলাশী ও দাউদপুর পর্যন্ত পৌঁছে গৃহদাহ ও লুটতরাজ চালিয়েছিলেন। এরপরে নবাব সসৈন্যে তারকপুর পর্যন্ত চলে আসবার ফলে মারাঠারা কাটোয়ায় পলায়ন করেছিলেন। ইতিমধ্যে ভাস্কররাম বঙ্গদেশে আরও অশ্বারোহী মারাঠা সৈন্য পাঠানোর জন্য নাগপুরে রঘুজী ভোঁসলের কাছে দূত পাঠালেও সেখান থেকে কোন ধরণের সাহায্য এসে পৌঁছায় নি। বর্ষার মধ্যেই নবাব পাটনা ও পূর্ণিয়া থেকে ফৌজ, এবং জাহাঙ্গীরনগর থেকে প্রচুর বড় ও মাঝারি নৌকা আনিয়েছিলেন। মীরহাবিব কর্তৃক হুগলী থেকে আনা সুলুপটি কাটোয়ায় নদীর উপরে ভাসমান থাকায় সেই জায়গায় নদী পার হওয়া অসম্ভব বলে মনে করে নবাব প্রথমে মুর্শিদাবাদ জেলার পশ্চিমাংশ থেকে মারাঠাদের বিতাড়িত করেছিলেন, এবং কাটোয়ার সম্মুখে (নদীর পূর্বে পাড়ে) রহনপুরে মুর্চা বেঁধে কাটোয়ার শত্রু শিবিরের উপরে ক্রমাগত কামানের গোলা বর্ষণ করবার ফলে মারাঠারা সেই জায়গা থেকে দাঁইহাটের দিকে সরে গিয়েছিলেন। ইতিমধ্যে প্রবল বর্ষার ফলে দু’কূল প্লাবিত নদীকে নিজেদের প্রতিরক্ষার উৎকৃষ্ট উপায় বলে মনে করে ভাস্কর নিশ্চিন্তে দাঁইহাটে দশেরা উৎসবে মত্ত হয়েছিলেন। তৎকালীন পশ্চিমবঙ্গের জমিদারদের কাছ থেকে জোরজবরদস্তি অর্থ আদায় করে মহাসমারোহে সেই পূজার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। গুপ্তচরের মুখে সেই সংবাদ পেয়ে নবাব মোস্তাফা খান, শামসের খান, উমর খান, রহিম খান, জৈনুদ্দিন ও জাফর খানের অধীনে বাছাই করা সৈন্যবাহিনীসহ স্বয়ং উদ্ধারণপুরের বিপরীত তীরে উপস্থিত হয়েছিলেন। এরপরে নৌকা দিয়ে নির্মিত সেতুর সাহায্যে ভাগীরথী অতিক্রম করে পুনরায় রাতের অন্ধকারে তাঁরা শাঁকাই-এ অজয় নদ পার করেছিলেন। ২৭শে সেপ্টেম্বর তারিখে অষ্টমী তিথির শেষে ভোর রাত্রে উৎসবে মত্ত মারাঠা সৈন্যদের উপরে নবাব তাঁর সর্বশক্তি প্রয়োগ করে কাটোয়া ও দাঁইহাটের মারাঠা শিবির আক্রমণ করবার ফলে ভীত-বিহ্বল মারাঠারা তাঁদের শিবির ও প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি ফেলে রেখে বর্ধমান জেলা পরিত্যাগ করে পঞ্চকোটের পথে পলায়ন করেছিলেন। তখন নবাবও সসৈন্যে তাঁদের পশ্চাৎধাবন করেছিলেন। এরপরে ভাস্কর পুনরায় পঞ্চকোট থেকে বিষ্ণুপুরের জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে মেদিনীপুর জেলায় চলে গিয়েছিলেন। (Alivardi and His Times, K. K. Datta, p: 60-62) কিন্তু নবাবী সৈন্য পিছনে লেগে থাকবার ফলে মারাঠারা সেবারে বিষ্ণুপুর লণ্ঠন করতে সক্ষম হননি। অথচ মহারাষ্ট্রপুরাণে বলা হয়েছিল -
“তবে বোনবিষ্ণুপুর গোপাল রক্ষা করে।
য়সাদ্য বরগির তবে কি করতে পারে॥”
আজও বিষ্ণুপুরে প্রবাদ প্রচলিত রয়েছে যে, মারাঠারা রাত্রে বিষ্ণুপুর শহর আক্রমণ করবার ফলে অসহায় বিষ্ণুপুর রাজ গোপাল সিংহ ও সেখানকার নগরবাসীকে রক্ষা করবার জন্য নগরদেবতা স্বয়ং মদনমোহন ‘দলমাদল’ নামক সুবহৎ কামানের সাহায্যে শত্রুদের বিধ্বস্ত করে দিয়েছিলেন! যদিও এই বিষয়ে বাস্তব ইতিহাস হল যে, সেই সময়কার বিষ্ণুপুর শহরটি গড় ও প্রাকার দিয়ে বেষ্টিত থাকবার ফলে রাত্রে মারাঠারা ওই নগরে প্রবেশ করতে সক্ষম হননি, এবং পরেরদিন সেখানে সসৈন্যে আলিবর্দীর আগমনের সংবাদ পেয়ে তাঁরা অতিদ্রুত বিষ্ণুপুর শহর পরিত্যাগ করে মেদিনীপুরে পালিয়ে গিয়েছিলেন। পথে রাধানগর ও নারায়ণগড় লুণ্ঠন করে মারাঠারা উড়িষ্যার দিকে রওনা দিলে নবাব স্বয়ং তাঁদের আক্রমণ করেছিলেন। সেই বছরের ডিসেম্বর মাসে নবাব মারাঠাদের চিল্কা হ্রদের তীর পর্যন্ত বিতাড়িত করে দিয়ে, পরের বছর, অর্থাৎ ১৭৪৩ খৃষ্টাব্দের ৯ই ফেব্রুয়ারি তারিখে মুর্শিদাবাদে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন।
এরপরে নবাব আলিবর্দীর আবেদনে মোঘল সম্রাট মোহাম্মদ শাহ পেশোয়া বালাজী রাওকে নাগপুরের মারাঠাদের হাত থেকে সুবা বাংলাকে রক্ষা করবার জন্য অনুরোধ করায় বালাজী রাও তাঁর চিরশত্রু রঘুজী ভোঁসলেকে দমন করবার জন্য একটি বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে ১৭৪৩ খৃষ্টাব্দের ফেব্রয়ারি মাসে বিহারে উপস্থিত হয়েছিলেন। অন্যদিকে রাজা শাহু তখন প্রচুর অর্থের বিনিময়ে রঘুজীকে বাংলা ও উড়িষ্যার চৌথ আদায়ের ভার অর্পণ করবার ফলে তিনি ও ভাস্কররাম বিপুল সৈন্যবাহিনী নিয়ে বর্ধমান জেলা দখল করে কাটোয়ায় গিয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন। বালাজী তখন বিহার অতিক্রম করে বীরভূম ও মুর্শিদাবাদ জেলার মধ্যে দিয়ে তৎকালীন বাংলার রাজধানীর কাছাকাছি পৌঁছানোর পরে নবাব বহরমপুর থেকে ১১ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত লাউদা নামক একটি জায়গায় গিয়ে পেশোয়ার সঙ্গে মিলিত হয়েছিলেন। প্রথমে নবাবের পক্ষ থেকে পেশোয়াকে চারটি হাতি, দশটি মহিষ ও পাঁচটি অশ্ব উপহার দেওয়া হয়েছিল। ১৭৪৩ খৃষ্টাব্দের ৩১শে মার্চ তারিখে নবাব ও পেশোয়ার মধ্যে একটি চুক্তি সম্পাদিত হয়েছিল। সেই চুক্তি অনুসারে নবাব রাজা শাহুকে বাৎসরিক চৌথ এবং পেশোয়ার সৈন্যবাহিনীর খরচের জন্য ২২ লক্ষ টাকা দিতে স্বীকৃত হয়েছিলেন। তারপরে নবাব ও পেশোয়ার সম্মিলিত বাহিনী কাটোয়ার পথে এগিয়ে গেলে রঘুজী কাটোয়া ও বর্ধমানের শিবির পরিত্যাগ করে বীরভূমে পালিয়ে গিয়েছিলেন। ১০ই এপ্রিল তারিখে পেশোয়া রঘুজীর সৈন্যবাহিনীকে প্রচণ্ড আক্রমণ করে বিধ্বস্ত করে দেওয়ার ফলে তিনি নাগপুরে পালিয়ে গিয়েছিলেন, এবং নবাব দিগনগর হতে ২৪শে এপ্রিল তারিখে কাটোয়ায় প্রত্যাবর্তন করেছিলেন। কিন্তু সেবারেও দু’দল মারাঠা সৈন্যের অত্যাচারে বীরভূম, বর্ধমান ও মেদিনীপুর জেলার জনজীবন অতিষ্ঠ ও বিধ্বস্ত হয়ে গিয়েছিল। (Fall of the Mughal Empire, Vol. I, p: 58-63) তারপরে ১৭৪৩ খৃষ্টাব্দের এপ্রিল মাস থেকে ১৭৪৪ খৃষ্টাব্দের জুন মাস পর্যন্ত বঙ্গদেশে বর্গীদের কোন উপদ্রব দেখা দেয় নি।
১৭৪৩ খৃষ্টাব্দের ৩১শে আগস্ট তারিখে রাজা শাহু পেশোয়া ও রঘুজীর মধ্যে মীমাংসা করে দিয়েছিলেন যে, বিহার রাজ্যের চৌথ বালাজীর, এবং বাংলা ও উড়িষ্যা রাজ্যের চৌথ রঘুজীর প্রাপ্য। সেই বণ্টনের দ্বারা তাঁরা নিজেদের অধিকৃত স্থানগুলির উপরে নির্বিচারে লুণ্ঠন ও অত্যাচার করবার অধিকারও প্রাপ্ত হয়েছিলেন। (History of Bengal, Vol. II, p- 460) শিবাজীর উত্তরসূরীদের রাজ্যশাসন ও কর আদায়ের ওই ধরণের অমানবিক ব্যবস্থার ফলে সুবা বাংলা ছারখার হয়ে গিয়েছিল। সেবারে রাজা শাহুর ছাড়পত্র পেয়ে নবাব বাহিনীর হাতে আগের বছরের পরাজয়ের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য ভাস্কররাম ১৭৪৪ খৃষ্টাব্দের প্রথমভাগে মেদিনীপরে এসে উপস্থিত হয়েছিলেন। ইতিমধ্যে প্রচুর অর্থ ও উপঢৌকন দিয়েও নবাব পেশোয়ার কাছ থেকে বঙ্গদেশবাসীর জান ও মালের নিরাপত্তার জন্য কোন প্রতিশ্রুতি পান নি, উপরন্তু দু’টি রক্তপিপাসু মারাঠা বাহিনী কর্তৃক বঙ্গদেশ পুনরায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল। (Fall of the Mughal Empire, Vol. I, p: 64-65) একে তো তখন বর্গী হাঙ্গমার ফলে রাজকোষ প্রায় শূন্য হয়ে গিয়েছিল; অন্যদিকে নবাব গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়বার ফলে মারাঠারা মেদিনীপুর, বর্ধমান ও বীরভূমের জনগণের উপরে অবর্ণনীয় অত্যাচার শুরু করেছিলেন। আগের মতোই সেবারেও তাঁরা শিশু, স্ত্রীলোক, গর্ভবর্তী নারী, ব্রাহ্মণ, বণিক, কৃষক ও দরিদ্রদের তলোয়ার দিয়ে হত্যা করতে কুণ্ঠিত হননি, এবং সমস্ত নিষিদ্ধ আচরণে নিপুন ছিলেন। সেবারেও তাঁরা বাংলার জনপদের সমস্ত ধন ও সাধ্বী স্ত্রীলোকেদের হরণ করেছিলেন। অসহ্য গরমের মধ্যে ক্ষুধার্ত ও পিপাসার্ত হলেও দলে দলে সাধারণ মানুষ তখন বর্ধমান ও মেদিনীপুর পরিত্যাগ করে পলায়ন করতে শুরু করেছিলেন। নবাবের রণক্লান্ত সৈন্যদলও সেই প্রখর গ্রীষ্মে যুদ্ধযাত্রায় অনিচ্ছুক ছিল। তাই নবাব তাঁর প্রধান সেনাপতি মুস্তাফাখানের সঙ্গে পরামর্শ করে ঠিক করেছিলেন যে, বছর বছর সেই উৎপাতের হাত থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য মারাঠা সর্দারদের গুপ্তহত্যা করা ছাড়া অন্য কোন পথ খোলা নেই। হলওয়েল সাহেবের মতে, নবাব সেবারে বর্গীদের দমন করবার জন্য বেগম শরফ-উন-নিসার পরামর্শ গ্রহণ করে ভাস্করকে চিরতরে নিরস্ত করবার জন্য সেই চক্রান্তের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। (মুর্শিদাবাদ কাহিনী, নিখিলনাথ রায়, পৃ- ৭১) সেই পরামর্শের পরে নবাবের পক্ষ থেকে মুস্তাফাখান ও রাজা জানকীরাম, মারাঠা শিবিরের আলি ভাই করাওওল নামের একজন দক্ষিণ দেশীয় মুসলমান মারাঠা সেনাপতির মধ্যস্থতা প্রার্থনা করেছিলেন। আলিভাই নবাবকে সম্পূর্ণ বিশ্বাস করে ভাস্করকে তাঁর সঙ্গে সন্ধি করে নেওয়ার জন্য প্ররোচিত করেছিলেন। কিন্তু মীরহাবিব সেই সন্ধির বিপক্ষে ছিলেন। সন্ধির প্রাথমিক শর্তগুলি আলোচনার জন্য আলিভাই আমানিগঞ্জে উপস্থিত হয়ে নবাবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সন্তুষ্টচিত্তে দিগনগরে (থানা আউসগ্রাম) মারাঠা শিবিরে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন। এরপরে নবাবের প্রতিনিধিরূপে মুস্তাফাখান ও রাজা জানকীরাম প্রচুর উপঢৌকনসহ দিগনগরে ভাস্করের কাছে উপস্থিত হয়েছিলেন। (Alivardi and His Times, K. K. Datta, p- 71) ভাস্কর তখন তাঁদের কাছে নিরাপত্তার আশ্বাসবাণী চাওয়ায় নবাবের সেনাপতি ও দেওয়ান উভয়েই মারাঠা শিবিরে গিয়ে কোরাণ, গঙ্গাজল ও তুলসীপাতা ছুঁয়ে শপথ করেছিলেন যে, নবাবের সঙ্গে সাক্ষাতের সময়ে মারাঠাদের প্রতি কোন ধরণের বিশ্বাসঘাতকতা করা হবে না। তবে সলিমুল্লার বিবরণে পাওয়া যায় যে, মুস্তাফা খান কোরাণের বদলে কাপড়ে জড়ানো একটা ইঁটের উপরে নিজের হাত রেখেছিলেন। কিন্তু স্যার যদুনাথ সরকারের মতে এই কাহিনীটি অন্য একটি ঘটনা থেকে সংগ্রহ করে সলিমুল্লা তাঁর গ্রন্থে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন। (প্রবাসী, ২য় সংখ্যা, ১৩৩৮ বঙ্গাব্দ, পৃ: ২৬২-৬৩) যাই হোক, বহরমপুর ক্যান্টনমেন্ট থেকে ৬ কিলোমিটার দক্ষিণে গঙ্গার পূর্বতীরে অবস্থিত ‘মানকরা’ (থানা বহরমপুর) নামক জায়গাটিকে নবাব ও ভাস্করের মধ্যেকার সাক্ষাতস্থল হিসেবে নির্বাচিত করা হয়েছিল। নবাব আমানিগঞ্জ থেকে মানকরায় গিয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন, এবং ভাস্কর দিগনগর থেকে কাটোয়ায় পৌঁছে সেখানে নিজের প্রধান শিবির স্থাপন করে, সেখান থেকেই গঙ্গা পার করে সাক্ষাতের জন্য নির্দিষ্ট স্থানে উপস্থিত হয়েছিলেন। মানকরায় নবাব প্রকাশ্যে যুদ্ধের সব উদ্যোগ ও সতকর্তা ত্যাগ করে মারাঠা সর্দারদের উপহার দেওয়ার জন্য হাতী, ঘোড়া, বহুমূল্য রত্নদ্রব্য ও খেলাৎ একত্রে প্রদর্শনের ব্যবস্থা করেছিলেন। ফলে ভাস্করের মন থেকে সব ধরণের সন্দেহ দূর হয়ে গিয়েছিল, এবং তিনি মীরহাবিব ও রঘুজী গাইকোয়াড়ের নিষেধকে গ্রাহ্যের মধ্যে আনেন নি।
ভাস্কররাম ১৭৪৪ খৃষ্টাব্দের ৩০শে মার্চ তারিখে (১লা বৈশাখ, ১১৫০ বঙ্গাব্দ) পলাশীতে নিজের শিবির স্থাপন করেছিলেন। পরদিন, অর্থাৎ ২রা বৈশাখ শনিবার নিজের বাইশজন সেনাপতি ও ১০ হাজার অশ্বারোহী সৈন্যসহ তিনি মানকরায় উপস্থিত হয়েছিলেন। এরপরে ভাস্কররাম কোলহাতকর, যশোবন্ত রাও গুজর, নীলকন্ঠ রাও মোহিতে, দাজিবা ভোঁসলে, বাবুজী মহাডীক, মানাজী ভোঁসলে, নারায়ণ ভোঁসলে, সম্ভাজী ভোঁসলে, কৃষ্ণরাও নিম্বালকর, বাপুজী কদম, শ্রীপৎ রাও মেহেকর, ব্যঙ্কট রাও ভাউ, দাজিবা পাঠনকর, বলবন্ত রাও শিকে, গোবিন্দ রাও শেলুকর, সধবাজী যাদব, শিবাজী জমাদার, সুভানজী রাও, নানা বপশি, জোতিবা কারভারী, আলিভাই করাওওল, সর্দার শাহ আহমদ খাঁ প্রমুখ মারাঠা সেনাপতিদের মধ্যে ক্রমে ক্রমে কুড়িজন নবাবের তৈরী শিবিরে প্রবেশ করলেও রঘুজী গাইকোয়াড় কিন্তু শিবিরের ভিতরে প্রবেশ করেন নি। (প্রবাসী, ২য় সংখ্যা, ১৩৩৮ বঙ্গাব্দ, পৃ- ২৬২) সবশেষে ডান হাতে মুস্তাফাখান ও বাঁ হাতে রাজা জানকীরামের ধরে ভাস্কররাম শিবিরে প্রবেশ করবার সঙ্গে সঙ্গে আলিবর্দীর আদেশে বাছাই নবাব বাহিনীর বাছাই করা যোদ্ধারা আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে সমস্ত মারাঠা সেনাপতিদের শিবিরের মধ্যেই হত্যা করেছিলেন। সিয়র-উস-মুতাক্ষরিণে বলা হয়েছে, “Mir-Cezen-khan, being the foremost of all, closed with Bhasukar, and at one stroke felled him to the ground.” (The Seir Mutaqherin, Vol. I, p- 435) মারাঠা সেনাপতিদের হত্যার পরে নবাব বাহিনীর আক্রমণ আরম্ভ হওয়া মাত্রই শিবিরের অদূরে অবস্থানরত রঘুজী গাইকোয়াড় তাঁর দশ হাজার অশ্বরোহী মারাঠা সৈন্যসহ দ্রুতবেগে পলাশী ও কাটোয়ার মারাঠা শিবিরে পৌঁছে, সেখানে রক্ষিত তাঁর নিজের ও ভাস্করের সব সম্পত্তিসহ নাগপুরে পালিয়ে গিয়েছিলেন। এরপরে সেই সংবাদ পেয়ে বর্ধমান, বীরভূম ও মেদিনীপুরে অবস্থান করা মারাঠারাও নিজেদের প্রাণের ভয়ে অতি কষ্টে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেছিলেন। সেবারে ফিরতি পথে নবাব সৈন্যবাহিনীর হাতে প্রচুর মারাঠা সৈন্য মারা পড়েছিলেন। বিজয়ী আলিবর্দী তাঁর নিজের সৈন্যদলের মধ্যে দশ লক্ষ টাকা বিতরণ করেছিলেন, এবং নবাবের অনুরোধে মোঘল বাদশাহ মুস্তফা খানকে ‘বাবর জঙ্গ’ উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। (The Seir Mutaqherin, Vol. I, p: 430-37; Riaz-us-Salatin, p: 347-49; Tarikh-i-Bangla-i-Mahabatjangi, p. 46-49; প্রবাসী, ২য় সংখ্যা, ১৩৩৮ বঙ্গাব্দ, পৃ: ২৬২-৬৪) করম আলি রচিত মজফরনামায় বলা হয়েছে যে, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন হাজি আহম্মদ নবাবকে সেই গর্হিত কার্যের জন্য তিরস্কার করেছিলেন - “You have to day created enemies for yourself till Doomsday.” (Bengal Nawabs, Sir Jadunath Sarkar, p- 31) ভাস্কর নিহত হওয়ার পরে প্রায় পনেরো মাস নিরপদ্রবে কেটে গিয়েছিল, তবে সেই সময়ে যুদ্ধ ও দুশ্চিন্তা থেকে অবকাশ পেলেও নবাব ভীষণ অর্থকষ্টে পড়েছিলেন। গঙ্গার পশ্চিম পাড়ের অধিকাংশ গ্রামই তখন মারাঠাদের অত্যাচার ও লুণ্ঠনের ফলে জনমানবশূন্য হয়ে গিয়েছিল; কৃষিকার্য ও শিল্প-বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে রাজকোষে অর্থের অভাব দেখা দিয়েছিল। এমনকি অর্থাভাবের জন্য নবাবকে সৈন্যদলের বেতন দেওয়া বন্ধ করতে হয়েছিল। রাজকোষে সেই অর্থের ঘাটতি মেটাবার জন্য নবাব ইংরেজ, ওলন্দাজ ও ফরাসী বণিকদের অর্থ দিতে বাধ্য করেছিলেন; এমনকি তৎকালীন বাংলার জমিদাররাও নবাবের সেই চাপের হাত থেকে নিষ্কৃতি পাননি।
তথ্যসহায়ক গ্রন্থাবলী:
১- প্রবাসী, ২য় সংখ্যা, ১৩৩৮ বঙ্গাব্দ।
২- Indian Council of Historical Research, The Maratha Supremacy, Vol. VIII.
৩- Riaz-us-Salatin, Ghulam Husain Salim.
৪- Journal of the Asiatic Society of Bengal, 1971, No. 3.
৫- মহারাষ্ট্রপুরাণ, গঙ্গারাম দত্ত।
৬- The Fall of the Mughal Empire, Sir Jadunath Sarkar, Vol. I
৭- The Seir Mutaqherin, Sayed Gholam Hossein Khan, Vol. I
৮- Tarikh-i-Bangla-i-Mahabatjangi, Yusuf Ali Khan.
৯- History of Bengal, Sir Jadunath Sarkar, Vol. II
১০- চিত্রচম্পূ, বাণেশ্বর ভট্টাচার্য্য।
১১- Alivardi and His Times, K. K. Datta.
১২- Bengal Nawabs, Sir Jadunath Sarkar.
৪
৪ মন্তব্য