সহকারী শিক্ষক
১৯ অক্টোবর, ২০২৩ ১০:০১ অপরাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
‘ঊনিশ শতকের বাংলার গ্রন্থাগার’
ঊনবিংশ শতাব্দী বাংলা তথা ভারতবর্ষের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ শতাব্দী ছিল। সেই শতাব্দী বহু বছরের লালিত জীর্ণ পুরনো সংস্কারকে ঝেড়ে ফেলে দিয়ে বাংলা তথা ভারতের মানুষকে নতুন প্রগতিশীল চিন্তাধারাকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার পথ দেখিয়েছিল। তাই বাংলা তথা ভারতবর্ষের ইতিহাসে সেই শতাব্দীর আরেক নাম হল নব-জাগরণের শতাব্দী। সেই সময়েই সাহিত্য, কলা, শিক্ষা, বিজ্ঞান, শিল্প প্রভৃতি বিষয়ে জনমানসে নবচেতনার উন্মেষ ঘটেছিল। এমনকি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন ও জাতীয়তাবোধও সেই সময়েই নবরূপ ধারণ করেছিল। সেই নবজাগরণের মূলে ছিল শিক্ষার জাগরণ। আর শিক্ষার জাগরণের সাথে সাথে গ্রন্থাগারের প্রসঙ্গটিও অনিবার্যভাবে এসে পড়ে। ওই ঊনবিংশ শতাব্দীতে গ্রন্থাগার আন্দোলন কিভাবে বাংলা তথা ভারতবর্ষের ইতিহাসে নিজের জায়গা করে নিয়েছিল, সেটাই এই প্রবন্ধের মুখ্য বিষয়।
প্রাচীন ও মধ্যযুগের ভারতবর্ষে গ্রন্থাগার ব্যবস্থা চালু থাকলেও তাতে সাধারণের (Public Library) ব্যবস্থার কোন সন্ধান ইতিহাস থেকে পাওয়া যায় না। মুখ্যতঃ বৌদ্ধ মঠ ও বিহারগুলিতে প্রাচীন যুগে গ্রন্থাগার ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল বলে ইতিহাস থেকে জানতে পারা যায়। এছাড়া সেই সময়ে হিন্দু রাজাদের প্রাসাদে এবং মন্দিরগুলিতেও পুঁথিভাণ্ডার ছিল। কিন্তু সেসবের কোনোটাই তখন সাধারণের জন্য ছিল না। মধ্যযুগের ভারতেও প্রধানতঃ রাজা-বাদশাহদের প্রাসাদে, মন্দিরে ও মসজিদে গ্রন্থাগার ব্যবস্থা চালু ছিল। কিন্তু সেই সমস্ত গ্রন্থাগারগুলি সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত ছিল না। বিদেশীরা, বিশেষতঃ ইংরেজরা ভারতে পদার্পন করবার পরেই সাধারণের জন্য গ্রন্থাগার ভাবনাটির জন্ম হয়েছিল। এরপরে ক্রমাগত শিক্ষার বিস্তার ঘটবার সঙ্গে সঙ্গে একদিকে যেমন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক গ্রন্থাগারগুলি গড়ে উঠতে শুরু করেছিল, অন্যদিকে তেমনি সাধারণ গ্রন্থাগারও প্রতিষ্ঠিত হতে শুরু করেছিল। সেই সাধারণ গ্রন্থাগারগুলি একদিকে যেমন সাধারণ মানুষের জ্ঞানান্বেষণের পথ খুলে দিয়েছিল, অন্যদিকে তেমনি সেই গ্রন্থাগারগুলিকে কেন্দ্র করে - ব্যায়ামাগার, অনুশীলন সমিতি, যুগান্তর দল প্রভৃতি গড়ে উঠেছিল। উদাহরণস্বরূপ নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগরের সাধনা লাইব্রেরির কথা বলা যেতে পারে। অতীতে সেই গ্রন্থাগারকে কেন্দ্র করে একটি বিপ্লবী দল ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য কাজ করছিলো। তাঁদের মধ্যে বিপ্লবী গোবিন্দপদ দত্ত উল্লেখযোগ্য ছিলেন।
১৭৮৪ সালে স্যার উইলিয়াম জোনস কর্তৃক এশিয়াটিক সোসাইটি, এবং গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরে বঙ্গদেশে গ্রন্থাগারের ক্ষেত্রে নবদিগন্তের সূচনা ঘটেছিল। এরপর ১৮০০ সালে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ লাইব্রেরির প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। ভারতে আগত ইংরেজদের ভারতীয় ভাষা শিক্ষা দেওয়াই সেই কলেজের উদ্দেশ্য ছিল। কালে কালে সেখানে একটি গ্রন্থাগারও গড়ে উঠেছিল। অতীতের একটা সময়ে সেখানে বিভিন্ন বিষয়ের উপরে পুস্তক, ভারততত্ত্বের উপরে পত্র-পত্রিকা এবং পুঁথি রক্ষিত ছিল। ওই সমৃদ্ধ পুস্তকালয়ের অবলুপ্তির পরে সেখানকার সেই সংগ্রহগুলিকে লণ্ডনের বিভিন্ন গ্রন্থাগারে, এশিয়াটিক সোসাইটি লাইব্রেরিতে, এবং কলকাতা পাবলিক লাইব্রেরিতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।
১৮১৯ সালে কিছু বাঙালি ভদ্রমহোদয় দ্বারা ‘কলিকাতা গ্রন্থাগার সমিতি’ গঠিত হয়েছিল। সেটি মূলতঃ একটি মালিকানা ভিত্তিক গ্রন্থাগার ছিল; অর্থাৎ, তখনকার বিশেষ কিছু উচ্চ সম্প্রদায়ের স্বচ্ছল ব্যক্তিই ওই গ্রন্থাগারটি ব্যবহার করতে পারতেন। কিন্তু তবুও, সেই সমিতির মধ্যে দিয়েই বাংলার ইতিহাসে সাধারণের জন্য গ্রন্থাগার গড়ে ওঠবার একটি সংকেত পাওয়া যায়। সেদিক থেকে বিচার করলে ওই সমিতিটির অবশ্যই ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে, এবং তৎকালীন যুগে সেটিকে সাধারণের গ্রন্থাগার হিসেবেই আখ্যা দেওয়া হয়েছিল। কলিকাতা গ্রন্থাগার সমিতি প্রায় তেরো বছর ধরে চালু ছিল। সেখানে প্রায় ছ’হাজার সাতশো পুস্তক সংগৃহিত ছিল বলে জানা যায়। ওই সমিতির প্রয়াসকে বাংলায় সম্মিলিত উপায়ে গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠার প্রথম প্রয়াস বলা যেতে পারে।
১৮২১ সালে ‘কলিকাতা বিদ্যালয় পুস্তক সমিতি’ (Calcutta School Book Society) গড়ে উঠেছিল। সেই সমিতি একটি গ্রন্থাগারও গড়ে তুলেছিল। ওই সমিতির সাথে রাজা রামমোহন রায়ের প্রত্যক্ষ যোগাযোগ ছিল। রাজা রামমোহন রায় গ্রন্থাগার বিষয়ে বিশেষ উৎসাহী ছিলেন। তাঁর লেখা বিভিন্ন পত্রাবলী থেকে তাঁর সেই উৎসাহের পরিচয় পাওয়া যোয়। যেমন, ১৮২৩ সালের ১১ই অক্টোবর তারিখে লর্ড আমহার্স্টকে পাশ্চাত্ত্য শিক্ষা বিষয়ে লেখা একটি পত্রে তিনি লিখেছিলেন, “... and providing a college furnished with the necessary books, instruments and other apparatus.” অর্থাৎ, ইতিহাস থেকে এটাই দেখা যাচ্ছে যে, যুগোপযোগী শিক্ষা প্রবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষাকেন্দ্রগুলির উপযুক্ত গ্রন্থাগার ব্যবস্থারও যে প্রয়োজন রয়েছে - এই চেতনা ভারত পথিক সেই সময়েই উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। শুধু তাই নয়, তাঁর সাহায্য ধন্য প্রতিষ্ঠান ‘Unitarian Society’-র গ্রন্থাগারে সেই সময়েই বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে গ্রন্থাগার পরিচালনার ব্যবস্থা ছিল। ‘Mr. Adam’ সেই গ্রন্থাগারটির দেখাশুনা করতেন। তিনিই সেই গ্রন্থাগারে আসা পুস্তকগুলিকে ‘Catalogue’ বা সূচীকৃত করতেন। এই প্রসঙ্গে রাজা রামমোহন রায় ১৮২৭ সালের ৭ই ফেব্রুয়ারি তারিখে ইংল্যাণ্ডের ব্রিস্টলের ‘J. B. Estleen’-কে লিখেছিলেন, “... I am happy to inform you that the books which you kindly presented me with, were deservedly placed in our library, under the care of Rev. Mr. Adam.” গ্রন্থাগার সম্পর্কে রাজা রামমোহন রায়ের সেই প্রগতিশীল চিন্তা, বাংলা তথা ভারতবর্ষের গ্রন্থাগার আন্দোলনকে তরান্বিত করতে সাহায্য করেছিল।
সেই সময়কার বাংলার গ্রন্থাগার ব্যবস্থার উন্নয়নে বাংলার আরেক কৃতি সন্তান বিশেষ অবদান রেখে গিয়েছিলেন। তিনি হলেন পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। যদিও সাধারণের গ্রন্থাগার স্থাপনের জন্য তাঁর প্রয়াসের কোন বিবরণ ইতিহাস থেকে পাওয়া যায় না, কিন্তু তবুও তাঁর পুস্তক প্রীতি ও গ্রন্থাগার পরিচর্যা সেই যুগের গ্রন্থাগার ভাবনাকে নব পথ নির্দেশ করতে পেরেছিল।
ঊনবিংশ শতাব্দীতে শিক্ষায় পাশ্চাত্য প্রভাব আসবার সঙ্গে সঙ্গে বঙ্গদেশে বিভিন্ন কলেজ গড়ে উঠতে শুরু করেছিল, এবং কলেজগুলির সঙ্গে সেগুলির প্রাতিষ্ঠানিক গ্রন্থাগারও যুক্ত হতে শুরু করেছিল। যেমন - হিন্দু কলেজ (Presidency College, ১৮১৭), শ্রীরামপুর কলেজ (১৮১৮), সংস্কৃত কলেজ (১৮২৩), সেইন্ট জেভিয়ার্স কলেজ (১৮৩৫), হুগলী মহসিন কলেজ (১৮৩৬), কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ (১৮৩৫), বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ (১৮৫৬) ইত্যাদি। এছাড়া আলোচ্য সময়ে বঙ্গদেশে দুটি গবেষণা কেন্দ্র ও সেগুলির সাথে সংশ্লিষ্ট গ্রন্থাগারও গড়ে উঠেছিল, যথা - বোটানিক্যাল গার্ডেন ও সেটির গ্রন্থাগার, এবং জিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইণ্ডিয়া ও সেটির গ্রন্থাগার (১৮৫১)। ওই কলেজ গ্রন্থাগারগুলি সেই সময় থেকেই বিভিন্ন পুস্তক সংগ্রহ ও সংরক্ষণের ব্যাপারে বিশেষ মনোযোগী হয়েছিল। পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর একটি বিশেষ পুস্তকের সন্ধানের বিষয়ে লিখতে গিয়ে ‘সবদর্শন সংগ্রহে’র বিজ্ঞাপনে লিখেছিলেন, “There were two manuscripts in Calcutta, one in the library of Sanskrit College and the other in that of the Asiatic Society.” এই বিজ্ঞাপনটি থেকে একদিকে যেমন বিদ্যাসাগর মহাশয়ের গ্রন্থাগার ব্যবহারের প্রবলতর পরিচয় পাওয়া যায়, অন্যদিকে তেমনি তখনকার সংস্কৃত কলেজ গ্রন্থাগারের সংগ্রহের গভীরতার কথাও জানতে পারা যায়।
১৮৩৫ সালে বাংলার ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ঘটনা ঘটেছিল। সেই বছর স্যার চালর্স মেটকাফে তৎকালীন কলকাতার বিশিষ্ট ভদ্রমহোদয়গণকে নিয়ে একটি বৈঠক ডেকেছিলেন। সংবাদ মাধ্যমের শৃঙ্খলমোচনের বিষয়ে জনমত যাচাই সেই বৈঠকের মূল উদ্দেশ্য ছিল। ওই বৈঠকে জনমত কতটা প্রতিফলিত হয়েছিল সেটা এই প্রবন্ধের আলোচ্য বিষয় নয়। কিন্তু ওই বৈঠকেই সমকালীন কলকাতার বিদগ্ধ মানুষেরা সাধারণ মানুষের জ্ঞানান্বেষণ ও সাহিত্য চর্চার জন্য একটি সাধারণ গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা করবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বলে ইতিহাস থেকে জানতে পারা যায়। সেই সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, “... That it is expedient and necessary to establish in Calcutta a public library of reference and circulation that shall be opened to all ranks and classes without distinction and sufficiently extensive to supply the wants of the entire Community in every depts of Literature.” সেই বৈঠকে প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রসন্নকুমার ঠাকুর, রামগোপাল ঘোষ, রুস্তমজী কোয়াসজী, রাজা সত্যচন্দ্র ঘোষাল, নিত্যলাল শীল, প্রতাপচন্দ্র সিং, রাধানাথ শিকদার, প্যারীচাঁদ মিত্র, রসময় দত্ত, রসিক কৃষ্ণ মল্লিক, শশীচন্দ্র দত্ত, কিশোরীচাঁদ মিত্র, শম্ভুনাথ পণ্ডিত, ডঃ মহেন্দ্রলাল সরকার প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা ছাড়াও তৎকালীন বঙ্গদেশে বসবাসকারী শিক্ষানুরাগী ইংরেজরা, যেমন - টি. বি. ম্যাকুলে, জে. সি. মার্শম্যান, এবং অবশ্যই লর্ড মেটকাফেও ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। এরপরে ১৮৩৬ সালের ২১শে মার্চ তারিখে সেই সভার ফলশ্রুতি দেখতে পাওয়া গিয়েছিল। সেদিনই কলকাতা পাবলিক লাইব্রেরির প্রতিষ্ঠা হয়েছিল। প্রথমে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের ৪,৬৭৫টি পুস্তক নিয়ে সেই গ্রন্থাগারটি চালু হয়েছিল। তখনকার অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তিরা ওই গ্রন্থাগারটি স্থাপনের পিছনে থাকলেও, সে বিষয়ে যাঁর ঐতিহাসিক অবদান অনস্বীকার্য, তিনি ছিলেন ‘দি ইংলিশম্যান’ পত্রিকার প্রাক্তন সম্পাদক - জে. এইচ. সিডন। তাঁর নিরলস পরিশ্রমেই ওই গ্রন্থাগারটি বাস্তব রূপ পেয়েছিল। প্রথমে গ্রন্থাগারটি চব্বিশ পরগণা জেলার সিভিল সার্জেনের বাসস্থানের নীচতলায় স্থাপিত হয়েছিল, পরে ১৮৪১ সালে সেটিকে স্ট্র্যান্ড রোডের মেটকাফে হলে স্থানান্তরিত করা হয়েছিল।
কলকাতায় পাবলিক লাইব্রেরির ইতিহাস অনুসন্ধান করতে গিয়ে রাজ্য লেখ্যাগারের নথিপত্র পর্যালোচনা করলে দেখতে পাওয়া যায় যে, ১৮৩৬ সালের ২০শে জুলাই (General Dept. No. 12) তারিখে প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর, এবং রসময় দত্ত মেটকাফে লাইব্রেরির জন্য সরকার বাহাদুরের কাছে জমি প্রার্থনা করেছিলেন। এর থেকে বুঝতে পারা যায় যে, লর্ড মেটকাফের মৃত্যুর পরে কলকাতা পাবলিক লাইব্রেরির নাম পরিবর্তনের কথা ভাবা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে সেটা রূপায়িত হয় নি; কারণ, ১৮৩৭ সালের ১লা মার্চ তারিখে সরকার কর্তৃক কলকাতা পাবলিক লাইব্রেরির জন্য জমি নির্ধারিত করে দেওয়া হয়েছিল। (General dept Nos 49-50) আবার একই সাথে এটাও দেখা যায় যে, তৎকালীন ট্যাঙ্ক স্কোয়ারে অর্থাৎ ডালহৌসী স্কোয়ারের গ্রন্থাগার ভবনটির নাম তখন লর্ড মেটকাফের স্মরণে রাখা হয়েছিল। (General Dept May 27, 1840. Nos 18-20) এরপরে কলকাতা পাবলিক লাইব্রেরি পাকাপাকিভাবে মেটকাফে বিল্ডিং-এ উঠে গিয়েছিল। কিন্তু ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে সেই গ্রন্থাগারের অবস্থা অত্যন্ত সঙ্গীন হয়ে পড়েছিল। কারণ, ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের পরে ইংরেজ সরকার গ্রন্থাগার উন্নয়নে আর তেমন কোন আগ্রহ দেখাননি। তাই সরকারের আনুকূল্য না পেয়ে ওই গ্রন্থাগারটি তখন দুরাবস্থার মধ্যে পড়েছিল। এর পরের ইতিহাস বিংশ শতাব্দীর, যা এই প্রবন্ধের আলোচ্য বিষয় নয়।
ঊনিশ শতকের বঙ্গদেশে গ্রন্থাগার ভাবনা চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করলেও, সেই ভাবনার প্রসার অত্যন্ত ধীর গতিতে ঘটেছিল। ইতিহাস থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীতে কলকাতা পাবলিক লাইব্রেরি ছাড়া গোটা পশ্চিমবঙ্গ এলাকায় আরো মাত্র তিপান্নটি সাধারণ গ্রন্থাগারের কথা জানতে পারা যায়। ১৮৩৫ সালের পরে দীর্ঘ পঁয়ষট্টি বছর ধরে মাত্র তিপান্নটি গ্রন্থাগার নিশ্চই উৎসাহব্যঞ্জক ছিল না। তখনকার সেই গ্রন্থাগারগুলির বেশিরভাগই কলকাতা এবং তার আশেপাশে হাওড়া, হুগলী ও চব্বিশ পরগণা জেলায় স্থাপিত হয়েছিল। অর্থাৎ, পশ্চিমবঙ্গ এলাকার বেশিরভাগ অংশ ও পূর্ববঙ্গের বেশিরভাগ অংশই গ্রন্থাগার আন্দোলনের আগে ঊনবিংশ শতাব্দীতে গ্রন্থাগার দেখতে পায়নি। ইতিহাস থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীতে কলকাতার ২০টি, হাওড়ার ৯টি, হুগলীর ৯টি, অবিভক্ত চব্বিশ পরগণা জেলার ১০টি, মেদিনীপুরের ২টি, নদীয়ার ২টি, বর্ধমানের ১টি এবং মুর্শিদাবাদের ১টি গ্রন্থাগারের পরিচয় জানতে পারা যায়। সমকালীন পশ্চিমবঙ্গের বাকি জেলাগুলিতে তখন সাধারণ গ্রন্থাগারের কোন অস্তিত্ব ছিল বলে জানা যায় না। সেটার কারণ হিসেবে কয়েকটি বিষয়কে ভাবা যেতে পারে - (ক) শিক্ষার ধীর প্রসার, (খ) মুদ্রিত পুস্তকের অপ্রতুলতা, (গ) যোগাযোগ ব্যবস্থার দুরবস্থা, (ঘ) দারিদ্র, (ঙ) সাধারণ মানুষের গৃহকেন্দ্রিকতা ও অন্তর্মুখিনতা, (চ) সরকারী অনীহা, (ছ) সামাজিক কুসংস্কার ইত্যাদি। ওই সময়ে বঙ্গদেশে গ্রন্থাগার ছড়িয়ে না পড়বার ফলে স্ত্রী-শিক্ষার অভ্যন্তরীণ অগ্রগতিও দীর্ঘায়িত হয়ে গিয়েছিল। তৎকালীন বাংলার সাক্ষর গৃহবধূরা যদি তাঁদের নাগালের ভিতরে সেই সময় থেকে বই পেয়ে যেতেন, তাহলে বর্তমান কালে বাঙালি নারীজাতির আরও উন্নতি ঘটা সম্ভব ছিল।
যাইহোক, এই প্রবন্ধের উপসংহারে একথাই বলা যেতে পারে যে, গোটা ঊনবিংশ শতাব্দী, বাংলা তথা ভারতবর্ষের গ্রন্থাগার ব্যবস্থার নব-জাগরণের শতাব্দী ছিল। গ্রন্থাগার চেতনা যেটা বাঙালী তথা ভারতবাসীর মনের মধ্যে জাগ্রত হওয়ার প্রয়োজন ছিল, এবং সেটার কিছু যুগান্তকারী ঐতিহাসিক উদাহরণ সেই শতাব্দী থেকে পাওয়া যায়। ঊনবিংশ শতাব্দী-র সূত্র ধরেই বিংশ শতাব্দীতে বঙ্গদেশে গ্রন্থাগার ব্যবস্থা একটা সম্মানজনক রূপ পেয়েছিল।
তথ্যসহায়ক গ্রন্থাবলী:
১- হিস্ট্রি অব ইণ্ডিয়ান লিটারেচার, ২য় খণ্ড, এম. উইনটারনিটস।
২- কেমব্রিজ হিস্ট্রি অব ইণ্ডিয়া, ই. জে. র্যাপসান।
৩- অর্থশাস্ত্ৰ অব কৌটিল্য, আর. শর্মা শাস্ত্রী সম্পাদিত।
৪- শাহজাহান-নামা, ২য় খণ্ড, সাদিক মহম্মদ।
৫- সংসদ বাঙালী চরিতাভিধান, ২য় সংস্করণ, ১৯৮৮ সাল।
৬- পাবলিক লাইব্রেরি মুভমেন্ট ইন ওয়েস্ট বেঙ্গল: এ রিভিউ, লাইব্রেরি মুভমেন্ট ইন ইণ্ডিয়া, প্রবীর রায়চৌধুরী।
৭- লাইব্রেরি মুভমেন্ট ইন ইণ্ডিয়া, অরুণ রায়।
৮- দি লাইফ এণ্ড লেটার্স অফ রাজা রামমোহন রায়, এস. ডি. কোলেট, ডি. কে. বিশ্বাস এবং পি. সি. গাঙ্গুলী সম্পাদিত।
৯- ইণ্ডিয়ান ন্যাশনাল লাইব্রেরি, বি. এস. কেশবন।
৭১
১৪৫ মন্তব্য