Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৫ অক্টোবর, ২০২৩ ০৯:২৫ অপরাহ্ণ

জন্মদিনে স্মরনে শেষ মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর ***********************************************
জন্মদিনে স্মরনে শেষ মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর
***********************************************
মুঘল সাম্রাজ্যের ১৯ তম এবং শেষ সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের( মির্জা আবু জাফর সিরাজ-উদ-দীন মুহাম্মদ হিসাবে) আজ জন্মদিন।তিঁনি ২৪ অক্টোবর ১৭৭৫ এ জন্মগ্রহণ করেন এবং ৭ নভেম্বর ১৮৬২ সালে ইয়াঙ্গুনে মৃত্যু বরন করেন।ছিলেন মুঘল সাম্রাজ্যের ১৯তম এবং শেষ সম্রাট। তার বাবা মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় আকবরের ২য় সন্তান।সিপাহী বিপ্লবের শেষে ১৮৫৮ খ্রিষ্টাব্দে ব্রিটিশ শাসকেরা তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে ও রেঙ্গুনে নির্বাসনে পাঠায়, এবং সেখানেই তার মৃত্যু হয়।মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ্ জাফর নিজে একজন সুফি সাধক ছিলেন এবং ছিলেন ঊর্দু ভাষার প্রথিতযশা একজন কবি।
১৮৫৮ খ্রিষ্টাব্দের ৭ অক্টোবর ৮৩ বছরের বৃদ্ধ সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর, সম্রাজ্ঞী জিনাত মহল, দুই শাহজাদা, শাহজাদী এবং অন্য আত্মীয় ও ভৃত্যদের নিয়ে ইংরেজ গোলন্দাজ ও অশ্বারোহী বাহিনী দিল্লি ত্যাগ করে। ৯ ডিসেম্বর জাহাজ রেঙ্গুনে পৌঁছে। ব্রিটিশ বাহিনীর ক্যাপ্টেন নেলসন ডেভিসের বাসভবনের ছোট গ্যারেজে সম্রাট ও তার পরিবার-পরিজনের বন্দিজীবন শুরু হয়। সম্রাটকে শুতে দেয়া হয় একটা পাটের দড়ির খাটিয়ায়। ভারতের প্রিয় মাতৃভূমি থেকে বহু দূরে রেঙ্গুনের মাটিতে সম্রাটের জীবনের বাকি দিনগুলো চরম দু:খ ও অভাব অনটনের মধ্যে কেটেছিল। সম্রাট পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হলেন। এমন বিড়ম্বনাপূর্ণ জীবনের অবসান হয় ১৮৬২ খ্রিষ্টাব্দের ৭ নভেম্বর, শুক্রবার ভোর ৫টায়। তবে সম্রাটকে অত্যন্ত গোপনীয়তার সাথে দাফন করা হয়। কবরটি বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘিরে দেয়া হয়েছিল। উদ্দেশ্য, যা একসময় নষ্ট হয়ে যাবে, ঘাসগুলো গোটা জায়গা আচ্ছাদিত করে ফেলবে। কোথায় সর্বশেষ মুঘল সম্রাট শায়িত আছেন, তার চিহ্নও কেউ খুঁজে পাবে না। ইংরেজরা খুব ভালোভাবে জানত ভারতবর্ষের জনসাধারণের মনে এই সম্রাটের প্রভাব কতখানি। ভারতবর্ষের মানুষ সম্রাটের কবরে ফাতেহা পাঠ করতে রেঙ্গুন যান ১৯০৩ খ্রিষ্টাব্দে। কিন্তু প্রথম প্রচেষ্টা সফল হয়নি। পরে তার আসল কবর আবিষ্কৃত ও সমাধিসৌধ নির্মিত হয়।
সম্রাটের প্রিয়তমা স্ত্রী জিনাত মহল মারা যান ১৮৮৬ খ্রিষ্টাব্দের জুলাই মাসে। সম্রাটের পাশেই রয়েছে তার সমাধি। সম্রাট ও তার প্রিয়জনদের সমাধি হয়ে উঠেছে যুগ যুগ ধরে দেশপ্রেমিকদের তীর্থস্থানের মতো। সম্রাটের ইচ্ছা ছিল স্বদেশের মাটিতে সমাহিত হওয়া। জন্মভূমির প্রতি ছিল প্রচণ্ড অনুরাগ। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন জীবনের শেষ সময় ঘনিয়ে আসছে। স্বদেশের মাটিতে শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ কিংবা সমাহিত হওয়ার সাধ কোনোটাই পূরণ হবে না। নিদারুণ দু:খে তিনি লিখেছেন একের পর এক কালোত্তীর্ণ কবিতা।
তারই একটি­ নিম্নরূপঃ
মরনেকে বাদ ইশ্ক্ব মেরা বা আসর হুয়া উড়নে লাগি হ্যায় খাক মেরি ক্যোয়ি ইয়ার মে; কিৎনা বদনসিব জাফর দাফনকে লিয়ে দোগজ জামিন ভি মিলানা চুকি ক্যোয়ি ইয়ার মে
১৮৬২ সালে তদানীন্তন রেঙ্গুনে (আজকের ইয়াঙ্গন) একটা জরাজীর্ণ কাঠের বাড়িতে তিনি যখন শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন, তখন তাঁর পাশে ছিলেন পরিবারের গুটিকয় সদস্য।
যে ব্রিটিশদের হাতে তিনি বন্দী ছিলেন, তাঁর মৃত্যুর দিনই তারা বিখ্যাত শোয়েডাগন প্যাগোডার কাছে এক চত্বরে অজ্ঞাত এক কবরে তাঁকে দাফন করে।
পরাজিত, অপমানিত ও হতোদ্যম দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ্ জাফরের জন্য সেটা ছিল ৩০০ বছরের গৌরবোজ্জ্বল মুঘল সাম্রাজ্যের গৌরবহীন পতনের এক অধ্যায়।
তাঁর মুঘল পূর্বপুরুষরা ৩০০ বছর ধরে রাজত্ব করেছিলেন বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে- যার মধ্যে ছিল বর্তমানের ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তানের বিস্তীর্ণ এলাকা এবং বাংলাদেশ।
তাঁর পূর্বপুরুষ আকবর বা ঔরঙ্গজেবের বর্ণময় শাসনকালের মত দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ্ জাফরের শাসনকাল হয়ত তেমন গৌরবোজ্জ্বল ছিল না কিন্তু তাঁর ক্ষমতাকাল জড়িয়ে গিয়েছিল 'সিপাহী বিদ্রোহের' সঙ্গে। ১৮৫৭ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে ভারতীয় সেনা বাহিনীতে বিশাল অভ্যুত্থান সংগঠিত হয়।
ওই অভ্যুত্থান শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হওয়ার পর সম্রাট বাহাদুর শাহ্ জাফরের বিরুদ্ধে দেশদ্রোহিতার দায়ে মামলা করা হয়, তাঁকে বন্দী করা হয় ও ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণাধীন বর্তমানের মিয়ানমারে (সাবেক বার্মায়) তাঁকে নির্বাসন দেওয়া হয়।
বন্দী অবস্থায় ১৮৬২ সালের ৭ই নভেম্বর ৮৭ বছর বয়সে তিনি শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন।
অন্যান্য মুঘল সম্রাটদের মত তিনিও মঙ্গোলীয় শাসক চেঙ্গিস খান এবং তৈমুর লংএর প্রত্যক্ষ বংশধর ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে বিশ্বের অন্যতম সবচেয়ে ক্ষমতাধর একটি শাসককুলের অবসান ঘটেছিল।
সমর্থকদের তাঁর কাছ থেকে দূরে রাখতে ব্রিটিশরা তাঁর কবর নাম-পরিচয়হীন রেখে দেয়।তাঁর মুত্যুর খবর ভারতে পৌঁছয় দু সপ্তাহ পরে এবং সে খবর প্রায় লোকচক্ষুর অগোচরে।
১৯০৩ সাল আকস্মিকভাবে তাঁর কবর উদ্ধার হয়।
১৯৮০র দশকে ভারতের একটি টেলিভিশনে ধারাবাহিক তৈরি হয় তাঁর জীবন ও কর্ম নিয়ে। দিল্লি এবং করাচিতে তাঁর নামে রাস্তা আছে, ঢাকায় একটি পার্কের নামকরণ হয় তাঁর নামে।
ঐতিহাসিক উইলিয়াম ডালরিম্পিল, যিনি 'লাস্ট মুঘল' বইটির লেখক, তিনি বিবিসিকে বলেছেন ''জাফর একজন অসাধারণ ব্যক্তি ছিলেন।''
''ইসলামী শিল্পরীতিতে পারদর্শী, তুখোড় কবি, এবং সুফি পীর জাফর হিন্দু-মুসলমান ঐক্যকে গভীর গুরুত্ব দিতেন।''
''জাফর কখনও নিজেকে বীর বা বিপ্লবী নেতা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাননি, তাঁর ব্যক্তিত্বও সেধরনের ছিল না, কিন্তু তাঁর পূর্বপুরুষ সম্রাট আকবরের মত তিনিও ইসলামী সভ্যতার একজন আদর্শ প্রতীক ছিলেন, যে সময় ইসলামী সভ্যতা তার উৎকর্ষে পৌঁছেছিল এবং সেখানে পরমতসহিষ্ণুতা ছিল সর্বোচ্চ পর্যায়ে,'' মি: ডালরিম্পিল লিখেছেন তার বইতে।
জাফরের ধর্মীয় সহিষ্ণুতার পেছনে অনেক ঐতিহাসিক বলেন বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল তাঁর মিশ্র ধর্মের পরিবারে বড় হয়ে ওঠা। তাঁর বাবা ছিলেন দ্বিতীয় আকবর শাহ্ আর মা ছিলেন হিন্দু রাজপুত রাজকুমারী লাল বাঈ।
মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা সম্রাট জহিরুদ্দীন বাবরের ১৯তম উত্তরসূরী শেষ মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর মৃত্যুর আগে সূদুর রেঙ্গুনে নির্বাসিত অবস্থায় বেদনার্ত হয়ে লিখলেন,
"কিৎনা বদনসিব হ্যাঁয় জাফর...দাফনকে লিয়ে দোগজ জামিন ভি মিলানা চুকি ক্যোয়ি ইয়ার মে।"
অর্থাৎ,
“কী দুর্ভাগ্য জাফরের, স্বজনদের ভূমিতে তার দাফনের জন্য দু'গজ মাটি, তাও মিলল না”।
শত বছর পর ভারতের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী মায়ানমার সফরে গিয়ে তার সমাধি সৌধ পরিদর্শন করে পরিদর্শক বইতে লিখলেন,
"হিন্দুস্তানে হয়তো তুমি দু' গজ মাটি পাওনি। কিন্তু তোমার আত্মত্যাগ থেকেই আমাদের স্বাধীনতার আওয়াজ উঠেছিল। দুর্ভাগ্য তোমার নয় জাফর, স্বাধীনতার বার্তার মধ্যে দিয়ে ভারতবর্ষের সুনাম ও গৌরবের সঙ্গে তোমার নাম চিরস্মরণীয় হয়ে রয়েছে"।
রাজীব গান্ধীর মন্তব্যে এক বিন্দুও অতিরঞ্জন ছিল না। মুঘলরা যেখান থেকে যেভাবেই আসুক, ইতিহাসের এক যুগসন্ধিক্ষণে মানুষের জেগে উঠার, আশা-আকাঙ্ক্ষা আর মুক্তির প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন শেষ মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর। মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের সাথে জড়িয়ে আছে বাহাদুর শাহ জাফরের ব্যক্তিগত হাহাকার ও বেদনার ইতিহাস।
তথ্যসুত্রঃ ইন্টারনেট, গুগল সার্চ,বাংলাপিডিয়া, মুঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাস।
মন্তব্য করুন