সহকারী শিক্ষক
২৯ অক্টোবর, ২০২৩ ১২:৩২ অপরাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
একদিন তাঁর দেড় বছরের কন্যা মাথার তেলের শিশি ভেঙে ফেলল, তাঁকে বকতে গিয়ে লিখে ফেলেছিলেন
"তেলের শিশি ভাঙল বলে খুকুর পরে রাগ করো
তোমরা যে সব বুড়ো খোকা ভারত ভেঙে ভাগ করো!তার বেলা"?
বিদ্যুতের উদভাসে লেখা এক বিস্ময়কর ছড়া,কার্যত অচিরেই উন্নীত হয় এক প্রবাদে। নিজেই লিখেছেন ঔপন্যাসিক হতে চাননি কবি হতে চেয়েছিলেন।
আই সি এস হওয়ার পরেও তাঁর একমাত্র লক্ষ ছিল বাংলা ভাষায় সাহিত্য চর্চা করবেন সেই কারণে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন মাত্র পাঁচ বছরের জন্য চাকরি করবেন,বাংলা প্রদেশ কে চাকরির ক্ষেত্র হিসেবে বেছেও নিলেন,তিনি প্রথিতযশা সাহিত্যিক,কবি,অন্নদাশঙ্কর রায়।
ছাত্র হিসেবে ছোটবেলা থেকেই অসম্ভব মেধাবী,আই এ পরীক্ষায় প্রথম স্থান,বি এ অনার্সেও প্রথম,আবার আই সি এসে তিনি ফার্স্ট হলেন। যেতে হবে ইংল্যান্ডে কিন্তু পথের খরচ জাহাজের খরচ কে জোগাবেন!এত অর্থ জোগান দেওয়ার সামর্থ অন্নদাশঙ্করের পরিবারের ছিল না,ব্রিটিশ সরকার সব খরচ বহন করবে তবে তিন মাস পরে। টাকা কিভাবে আসবে ভেবে অন্নদাশঙ্কর পুরীর সমুদ্রতীরে অস্থির ভাবে পায়চারি করছিলেন,দেখা হল লক্ষ্মীনারায়ণ পট্টনায়কের সঙ্গে তিনি ধনী ব্যক্তি তেমন উৎকল সাহিত্যর একজন লেখক।সব কথা জেনে লক্ষ্মীনারায়ণ বিশেষ ব্যবস্থা করে তাঁকে লন্ডন পাঠানোর ব্যবস্থা করেন।
মজার বিষয় হল আই সি এসের শিক্ষানবিশ হিসেবে অন্নদাশঙ্কর রায়ের পাঠ নেওয়ার কথা অক্সফোর্ডের ক্রাইস্ট চার্চ কলেজ, কিন্তু তিনি সেখানে যেতে রাজি হলেন না বরং চাইলেন লন্ডনে থাকবেন। ভেবেছিলেন বিশ্বনাগরিকের জন্য লন্ডন উপযুক্ত, তখনও সিদ্ধান্ত পাঁচ বছর চাকরি করবেন, অতএব অক্সফোর্ডের লাইব্রেরিতে জীবন কাটানোর থেকে লন্ডনে যৌবনপাত অনেক শ্রেয়। জীবন কে এইসময় উপভোগ করেছেন, ঘুরেছেন ইউরোপের অনেক দেশে। দ্বিতীয় বছরের ইস্টারের ছুটিতে বন্ধু ভবানী ভট্টাচার্যের সঙ্গে পথে বেরিয়ে পড়লেন, সামনে যে বাস পান,সেই বাসে চড়েন। এভাবেই ব্রিস্টলে এসে দেখেছিলেন রাজা রামমোহন রায়ের সমাধি, পরদিন একটা অন্য বাসে কার্ডিফ। প্রতিদিন সামনে যে বাস পাওয়া গেছে তাতে উঠে পড়ে নতুন নতুন জায়গায় নেমে পড়ার রোমাঞ্চ। দেশে ফিরে এই ভ্রমনের ভিত্তিতে লিখেছেন উপন্যাস।
চাকরিতে অন্নদাশঙ্করের প্রথম পোস্টিং বহরমপুরের অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যাজিস্ট্রেট। বড়দিনের ছুটিতে শান্তিনিকেতনে গেলেন, সঙ্গে অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত। রবীন্দ্রনাথ তাদের সমাদারের সঙ্গে গ্ৰহন করলেন। সর্বোচ্চ শ্রেণীর আধিকারিক হয়েও চুটিয়ে লিখতে শুরু করলেন। তাঁর নিজের ভয় ছিল 'সত্যাসত্য'র মত বড়মাপের গুরুগম্ভীর উপন্যাস কে ছাপাবেন!প্রকাশক বন্ধু গোপালদাস মজুমদার অভয় দিয়ে বললেন তিনি প্রকাশ করবেন। ওদিকে সেইসময় লন্ডন থেকে হাজির মার্কিন কন্যা অ্যালিস ভার্জিনিয়া অর্নডর্ফ। পুজোর ছুটিতে বন্ধু শরৎচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে রাঁচিতে বেড়াতে গিয়ে বুঝলেন অ্যালিস ভার্জিনিয়ার প্রেমে পড়েছেন। 'আগুন নিয়ে খেলা'র প্রকাশকের থেকে পাওয়া টাকায় শাড়ি,আংটি,দুই বন্ধুর সাথে আবার রাঁচিতে এসে বিয়ে করলেন অ্যালিসকে। বিয়ের পর তাঁর নতুন নাম হল লীলা। মার্কিন নাগরিক থেকে তিনি ভারতীয় নাগরিক হলেন। তবে পিতৃগৃহে নিজের বিয়ের খবর জানাতে গিয়ে কার্যত তিরস্কৃত হয়ে লীলা ভারতে চলে এলেন পাকাপাকি ভাবে। শুরু হল অন্নদাশঙ্কর -লীলার সংসারজীবন।
শেতাঙ্গ পুলিশ অফিসারের সাথে বিরোধে জড়িয়ে পড়েছেন,বদলি হয়েছেন শাসন বিভাগ থেকে আইন বিভাগে। চট্টগ্রামে কিছুদিন চাকরির পরে আবার বদলি ঢাকায়। এক বছরের মধ্যে বাঁকুড়া, শেষে ১৯৩৫সালে কুষ্টিয়ার মহকুমা শাসক। বারবার চাকরি জীবনে বদলি হয়েছেন রাজশাহী জেলায় চাকরি করেছেন, প্রশাসনিক দিক থেকে বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এইসময় চাকরিতে উন্নতির চেষ্টা করেছেন অবহেলিত হয়েছে সাহিত্য সাধনা। প্রথম সন্তান জয়ার জন্ম হয়। দক্ষিণ ও পশ্চিম ভারত সহ শ্রীলঙ্কা ভ্রমণ শেষে আদিবাস ঢেঙ্কানালে গেলে সেখানে মধ্যমপুত্র চিত্রকাপ গুরুতর অসুস্থ হয়ে কটক হাসপাতালে মারা যায়।এরপর অন্নদাশঙ্করের মনে প্রশ্ন জাগে চাকরিটা হল জীবিকা, তাঁর সাধনা সাহিত্য। ভেবেছিলেন পাঁচ বছর চাকরি করবেন, কিন্তু পরিবর্তিত পরিস্থিতি চাকরির ইস্তফা দেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে বিরত রাখে।
স্বাধীনতা আসন্ন ওদিকে সাহিত্য চর্চার জন্য বাংলাকে বেছে নিয়েছিলেন মন ভাঙছে বাংলা ভাগ হবে,ন'বছর পদ্মার এপার ন'বছর ওপারে চাকরি করে আরও একবার ভারতের পশ্চিমবঙ্গে কর্মক্ষেত্র বেছেনিলেন।আশা করেছিলেন অনেক লিখবেন, কিন্তু সেভাবে পারলেন কী! এই পর্বে লিখেছেন নারী,যৌবনজ্বালা সহ তিনটে ছোটগল্প, কিছু প্রবন্ধ,আর না নামের একটি পরীক্ষামূলক উপন্যাসের শুরু। সংখ্যা হিসেব করলে লিখেছেন আঠারোটি উপন্যাস। পাঠক সহমত হবেন হয়ত এরমধ্যে সবচেয়ে আলোচিত তথা বিতর্কিত সত্যাসত্য, ছয়টি খণ্ড ভিন্ন ভিন্ন নাম। আবার অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত অন্নদাশঙ্কর কে পরামর্শ দিয়েছিলেন ছোট গল্প লিখতে,কারণ পাঠকের কাছে পৌঁছাতে পারার অন্যতম সেরা পথ। তাঁর অনেক গল্পে মধ্যবিত্ত শিক্ষিত সম্ভ্রান্ত প্রভাবশালী সমাজ ছিল সেই সমাজের চমৎকার ছবি চোখে পড়ে। ভ্রমণ সাহিত্য অন্নদাশঙ্কর কলমে অনবদ্য। তবে সবচেয়ে আশ্চর্যের তিনি নিজেই লিখেছেন ঔপন্যাসিক হতে চাননি কবি হতে চেয়েছিলেন। তাঁর অনেক ছড়ার আড়ালে থাকত নিজের বক্তব্য। সমকালীন ঘটনাবলীর উপরে লিখেছেন - "সব পেয়েছির দেশে নয়
হচ্ছে হবের দেশে
কাঁঠাল গাছে আম ধরেছে
খাবে সবাই শেষে"।
বাংলা সাহিত্যের সমালোচকরা বলেন অন্নদাশঙ্কর একজন সৃষ্টিশীল সাহিত্যিক যার সাহিত্যকৃতির বৃহত্তর অংশ প্রবন্ধ সাহিত্য। পরিশেষে আমরা নিশ্চিত ভাবে এই সিদ্ধান্ত আসতে পারি তিনি ছিলেন সৃষ্টিশীল সাহিত্যিক,মানবিক ও নৈতিক দায়বদ্ধতার প্রাবন্ধিক। তাঁর লেখনী, চিন্তার স্বচ্ছতা প্রাঞ্জলতা, নৈতিকতা ও যুক্তিশীলতাকে শৈলীতে,শিল্পিত্বে আমাদের সম্পদ,তাই অনেকেই বলেন রবীন্দ্রোত্তর বাংলার বিবেক ছিলেন অন্নদাশঙ্কর রায়। চলে গেল তাঁর প্রয়াণ দিবস, আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।
সংকলনে ✍? অরুণাভ সেন।।
গ্ৰন্থঋণ ও কৃতজ্ঞতা স্বীকার, অন্নদাশঙ্কর রায়,সুরজিৎ দাশগুপ্ত
৫
৫ মন্তব্য