Loading..

ব্লগ

রিসেট

৩০ অক্টোবর, ২০২৩ ০৯:৪৩ পূর্বাহ্ণ

অন্নদাশঙ্কর রায় এর ভাষ্যে "খুকু খোকা" ছড়ার নেপথ্য কাহিনী।।।।।।।


“ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে (১৯৪৭) বেশ শীত। উনি (অন্নদাশঙ্কর) সকালে স্নানের আগে নারকেল তেল গায়ে মেখে স্নান করেন। সকালে রোদ ছিলো। নারকেলের তেলের শিশি বারান্দায় দিয়েছিলাম, একটু গরমে যেন গলে যায়। আমি তখন রান্নাঘরে, ব্রেকফার্স্ট তৈরি করছিলাম। তোমার দাদু হাঁক ছাড়লেন, ‘তেলের শিশি দাও’। কাজের মেয়েটি তখন বাইরে, অন্যকাজে। বারান্দায় খেলছিল তৃপ্তি (ডাকনাম খুকু), ওর বয়স দেড় কি দুই, ওকে বলি তেলের শিশি বাবাকে দিতে। খেলতে খেলতে তেলের শিশি হাতে নিয়ে খেলাচ্ছলে হয়তো তৃপ্তির হাত থেকে পড়ে যায়, ভেঙে যায়। আমি খুব রাগারাগি করলাম, বকাঝকাও। তোমার দাদু মৃদু কণ্ঠে বললেন, ‘সামান্য একটি তেলের শিশি ভাঙল রাগ করছো, এদিকে দেশ ভাঙছে’। বলেই স্নানের ঘরে না গিয়ে, টেবিলে গিয়ে কাগজে কী যেন লিখলেন। পড়িনি। লিখেছেন মিনিট দুয়েক।”

দিদু আরও বললেন, “ব্রেকফার্স্টের সময় তোমার দাদু বিড়বিড় করে কীসব বলছিলেন, শুনতে পাইনি, হয়তো আমার বা তৃপ্তির ওপর রাগ।”

তৃপ্তি রায়ের কথা, “অনেকপরে বাবার মুখে শুনেছি : তুমি তেলের শিশি ভেঙেছিলে বলেই তুমিই ‘খুকু ও খোকা’ ছড়ার উৎস"।


অন্নদাশঙ্কর রায়ের ‘খুকু ও খোকা’ পাকিস্তান আমলে, পূর্ব পাকিস্তানে নিষিদ্ধ ছিলো সম্পূর্ণ, রাঙা ধানের খৈ’ ছড়া গ্রন্থও।


বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরে নিষেধাজ্ঞা উঠে যায়, ‘খুকু ও খোকা’ ব্যাপক প্রচারিত, পঠিত। নানা আবৃত্তিকারের কণ্ঠে সিডিও হয়েছে।


অন্নদাশঙ্কর রায় বলতেন, “সব কৃতিত্ব তৃপ্তির, আমি নিমিত্ত।”


খুকু ও খোকা

               ----অন্নদাশঙ্কর রায়।


তেলের শিশি ভাঙল বলে

খুকুর পরে রাগ করো।

তোমরা যে সব বুড়ো খোকা

ভারত ভেঙে ভাগ করো!

তার বেলা?


ভাঙছ প্রদেশ ভাঙছ জেলা

জমিজমা ঘরবাড়ী

পাটের আড়ৎ ধানের গোলা

কারখানা আর রেলগাড়ী!

তার বেলা?


চায়ের বাগান কয়লাখনি

কলেজ থানা আপিস-ঘর

চেয়ার টেবিল দেয়ালঘড়ি

পিয়ন পুলিশ প্রোফেসর!

তার বেলা?


যুদ্ধ-জাহাজ জঙ্গী মোটর

কামান বিমান অশ্ব উট

ভাগাভাগির ভাঙাভাঙির

চলছে যেন হরির -লুট!

তার বেলা?


তেলের শিশি ভাঙল বলে

খুকুর পরে রাগ করো

তোমরা যে সব ধেড়ে খোকা

বাঙলা ভেঙে ভাগ করো!

তার বেলা?


আজ অন্নদাশঙ্কর রায় এর প্রয়াণ দিবসে শ্রদ্ধা জানাই। ?


জীবনী:


স্বনামধন্য কবি , লেখক ও ছড়াকার অন্নদাশঙ্কর রায় এর  জন্ম হয় ১৯০৪ সালের ১৫ মে  উড়িষ্যার ঢেঙ্কানলে । তাঁর পিতা ছিলেন ঢেঙ্কানল রাজস্টেটের কর্মী নিমাইচরণ রায় এবং তাঁর মাতা ছিলেন কটকের প্রসিদ্ধ পালিত বংশের কন্যা হেমনলিনী । ছোটবেলায় ঢেঙ্কানলে তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু হয় । ১৯২১ খ্রিস্টাব্দে পাটনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি ম্যাট্রিক পাশ করেন । এরপর সংবাদপত্রের সম্পাদনা শিখতে কলকাতায় বসুমতী পত্রিকার সম্পাদক হেমেন্দ্রপ্রসাদ ঘোষের কাছে যান । তিনি শর্টহ্যান্ড, টাইপরাইটিং এবং প্রুফরিডিং    ও শেখেন । কিন্তু এই কাজ তাঁর ভালো লাগেনি ।


   এরপর তিনি কটকের র‌্যাভেনশ কলেজ থেকে আই.এ পরীক্ষা দেন এবং তাতে পাটনা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম স্থান অধিকার করেন । ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে বি.এ পরীক্ষাতেও তিনি পাটনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে প্রথম স্থানাধিকারী হন । ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে এম.এ পড়তে পড়তে আই.সি.এস পরীক্ষায় তিনি দ্বিতীয়বারে পূর্ববর্তী রেকর্ড ভেঙে প্রথম স্থান অধিকার করেন । তিনিই প্রথম ভারতীয় হিসেবে এ গৌরব লাভ করেন। সেই বছরেই তিনি সরকারি খরচে আই.সি.এস হতে ইংল্যান্ড যান । সেখানে তিনি দুই বছর ছিলেন । এই সময়ে তাঁর ধারাবাহিক ভ্রমণ কাহিনী পথে প্রবাসে বিচিত্রায় প্রকাশিত হয় ।


১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে মার্কিন কন্যা অ্যালিস ভার্জিনিয়া অনফোর্ডকে বিবাহ করে তিনি তাঁর নাম দেন লীলা রায় । লীলা রায় বহু বই বাংলা থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন । অন্নদাশঙ্করের অনেক লেখা লীলাময় ছদ্মনামে প্রকাশিত হয়েছিল । ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি প্রথম নদীয়া জেলার ম্যাজিস্ট্রেট হিসাবে কাজে যোগ দেন । তিনি বহুবছর এই পদে থেকে বিভিন্ন জেলায় কাজ করে কুমিল্লা জেলায় জজ হিসাবে নিযুক্ত হন । ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯৪৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তিনি সরকারী কাজে নিযুক্ত থেকে ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে তিনি পশ্চিমবঙ্গের বিচার বিভাগের সেক্রেটারি হন । ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দে তিনি স্বেচ্ছায় সরকারী চাকরি থেকে অবসর নেন ।


অন্নদাশঙ্কর গদ্য ও পদ্য উভয় ক্ষেত্রেই ভুমিকা রেখেছেন। তার সাহিত্যকর্ম বাংলাদেশে বিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। তার উল্লেখযোগ্য উপন্যাস  --সত্যাসত্য , যার যেথা দেশ , অজ্ঞাতবাস , কলঙ্কবতী , দুঃখমোচন , মর্ত্যের স্বর্গ , অপসারন , আগুন নিয়ে খেলা , অসমাপিকা , পুতুল নিয়ে খেলা , না , কন্যা ৷

প্রবন্ধ --- তারুন্য , আমরা , জীবনশিল্পী , একহারা , জীয়নকাঠি , দেশকালপাত্র ,

প্রত্যয় , নতুন করে বাঁচা , আধুনিকতা ৷ তার আত্মজীবনী ---বিনুর বই ও পথে প্রবাসে ৷

ছোটগল্প -- প্রকৃতির পরিহাস , দু কান কাটা , হাসন সখী , মন পাহন , যৌবন জ্বালা , কামিনি কাঞ্চন , রুপের দায় ৷ তার বিখ্যাত ছড়ার বই --- বিন্নি ধানের খই ৷ ২০০২ সালের ২৮ অক্টোবর অন্নদাশঙ্কর রায় পরলোকগমন করেন।


(গুগল সহায়তায় সম্পাদিত)

মন্তব্য করুন