Loading..

ব্লগ

রিসেট

৩০ অক্টোবর, ২০২৩ ০৭:২৭ অপরাহ্ণ

১৯৯৯ ক্রিকেট বিশ্বকাপ বাংরাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের শুরু যেখানে

ক্রিকেট বিশ্বকাপ (আনুষ্ঠানিকভাবে আইসিসি পুরুষদের ক্রিকেট বিশ্বকাপ নামে পরিচিত) একদিনের আন্তর্জাতিক (ওয়ানডে) ক্রিকেটের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ প্রতিযোগিতা। প্রতি চার বছর পরপর খেলাটির নিয়ন্ত্রক সংস্থা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) এই প্রতিযোগিতার আয়োজন করে থাকে। প্রাথমিক বাছাইপর্ব শেষে দলগুলো চূড়ান্ত পর্বে অংশ নেয়। টুর্নামেন্টটি বিশ্বের সবচেয়ে বেশি দেখা ক্রীড়া প্রতিযোগিতাগুলোর মধ্যে অন্যতম। এটি আইসিসির ক্রিকেট ক্যালেন্ডারে "আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ক্যালেন্ডারের সেরা প্রতিযোগিতা" হিসাবে বিবেচিত হয়।

বিশ্বকাপ ক্রিকেটের প্রথম ছয়টি আসর পেড়িয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল প্রথম বারের মত বিশ্বকাপ ক্রিকেটে অংশগ্রহণের সুযোগ করে নেয় ১৯৯৯ সালের ইংল্যান্ড বিশ্বকাপে। বিশ্বকাপ ক্রিকেটের সপ্তম আসরের এই আয়োজনে আইসিসির পূর্ণ সদস্যভুক্ত ১০টি টেস্ট খেলুড়ে দেশ এবং সহযোগী ২ দেশ নিয়ে বিশ্বমঞ্চের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয় ১৯৯৯ সালের ১৪ই মে। যদিও বাংলাদেশ টেস্ট খেলুড়ে দল ছিল নাহ, তবে পূর্ণ সদস্য হিসেবেই বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করার সুযোগ পায়।

স্বাধীনতার পরের বছর ১৯৭২ সালেই বাংলাদেশ ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড গঠিত হলেও বিশ্বকাপের জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হয়েছিল একটা দীর্ঘ সময়। ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশ ক্রিকেট সহযোগী দেশ হিসেবে আইসিসির সদস্যভুক্ত হয়। ১৯৭৯ সালের আইসিসি ট্রপিতে অংশগ্রহণ করার  মাধ্যমেই বাংলাদেশ ক্রিকেট দল আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রথমবারের মত অংশগ্রহণ করার সুযোগ পায়। নিজেদের চার ম্যাচের সেই টুর্নামেন্টে রাকিবুল হাসানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ দল দুইটিতে জয়লাভ করে বিশ্ব ক্রিকেটের সামনে যেন নিজেদের এক বার্তা রেখে যায়!

১৯৮৮ সালে এশিয়া কাপ আয়োজক হওয়ার এক অকল্পনীয় সুযোগ পেয়ে বসে বাংলাদেশ। গাজী আশরাফ হোসেন লিপুর নেতৃত্বে আয়োজক দেশ হিসেবে এশিয়া কাপ ক্রিকেটে প্রথমবারের মত অভিষেক হয় বাংলাদেশের। ৩১শে মার্চ, বাঙ্গালী জাতির গৌরবময় এই মাসের সর্বশেষ দিনে এশিয়া কাপে পাকিস্তানের বিপক্ষে সর্বপ্রথম একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে বাংলাদেশ। ১৯৮৮ সালের প্রলয়ঙ্কারী বন্যার ভেতরেই সফলভাবে এশিয়া কাপ আয়োজন করে দেশ বিদেশে সুনাম অর্জন করে নেয় বাংলাদেশ। দীর্ঘ হারের ক্লান্তিতে বাংলাদেশ ক্রিকেট যখনই চৈতন্য হারাতে বসবে ঠিক তখনই কেনিয়ার বিপক্ষে দেশের প্রথম জয় এবং ১৯৯৭ সালের ষষ্ঠ আইসিসি ট্রপি জিতে ইতিহাস সৃষ্টি করে নেয় বাংলাদেশ। দেশের ক্রিকেটে যুক্ত হয় এক নতুন মাত্রা। উচ্ছাসের সাথে বিশ্বকাপ খেলার যাত্রাও এখান থেকেই।

প্রথম বিশ্বকাপ; আইসিসি ট্রপি জেতায় আইসিসির পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ীই বিশ্বকাপ ক্রিকেটের সপ্তম আসরের বি গ্রুপে পাকিস্তান, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ওয়েষ্ট ইন্ডিজের মত পরাশক্তি এবং নবাগত স্কটল্যান্ডের সাথে অন্তর্ভুক্ত হয় বাংলাদেশ। এই গ্রুপটি ছিল অপেক্ষাকৃত কঠিনতর গ্রুপ। দেশব্যাপী প্রথম বিশ্বকাপ খেলার এক চরম উন্মাদনা। গর্ডন গ্রিনিজকে কোচ এবং আমিনুল ইসলাম বুলবুলকে অধিনায়ক করে ১৫ সদস্যের স্কোয়াড গঠন করে বাংলাদেশ। আকরাম খান, আতাহার আলী, মিনহাজুল আবেদিন নান্নু, মোহাম্মদ রফিক এবং নাঈমুর রহমান দুর্জয়ের মত তৎকালীন আলোচিত ক্রিকেটাররা ছিলেন স্কোয়াডের সদস্য।

বিশ্বকাপে বাংলাদেশের প্রথম ম্যাচ, প্রতিপক্ষ ছিল শক্তিশালী নিউজিল্যান্ড। নিজেদের অভিষেক ম্যাচেই বড় হার মেনে নিতে হয়েছিল বুলবুলদের। প্রথমে ব্যাট করে ৩৭.৪ ওভারে সবকয়টি উইকেট হারিয়ে ১১৬ রান তোলে বাংলাদেশ। সর্বোচ্চ ১৯ রান আসে এনামুলের ব্যাট থেকে। জবাবে ৩৩ ওভারেই ৬ উইকেটের জয় পায় কিউইরা। দ্বিতীয় ম্যাচেও পরাশক্তি ওয়েষ্ট ইন্ডিজের কাছে বাংলাদেশ হেরে যায়। এইম্যাচে ১৮২ রানে অলআউট হয়ে ৭ উইকেটের হার হজম করে বাংলাদেশ। তবে জয়ে পৌছাতে ক্যারিবিয়ানদের খেলতে হয়েছিলো ৪৭ ওভার পর্যন্ত! তৃতীয় ম্যাচেই এসে বাংলাদেশ পেয়ে যায় চিরকাঙ্খিত সেই বিশ্বকাপের প্রথম জয়। তৃতীয় ম্যাচেও প্রথমে ব্যাট করে নির্ধারিত ৫০ ওভারে ১৮৫ রান করে নান্নুরা। টাইগারদের ব্যাটিংতে সর্বোচ্চ অবদান রাখেন মিনহাজুল আবেদিন নান্নু। খেলেন ৬৮ রানের বীরোচিত এক ইনিংস। জবাবে ১৬৩ রানে অলআউট হয় স্কটল্যান্ড। ২২ রানের এই জয়ে টাইগার শিবিরে উদ্দীপনার ঢেউ খেলে যায়। নিজেদের চতুর্থ ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে চরম ভাবে নাস্তানাবুদ হয় বাংলাদেশ। প্রথমে ব্যাট করে ১৭৮ রান তোলে বিশ্বকাপের নবাগত এই দলটি৷ আগের সর্বোচ্চ স্কোরার নান্নু এই ম্যাচেও করেন ৫৩ রান। জবাবে অজিরা মাত্র ১৯.৫ ওভারেই জয়ের ভিত গড়ে নেয়।

গ্রুপ পর্বে এবং বিশ্বকাপে নিজেদের শেষ ম্যাচ খেলার জন্য ৩১মে নর্দাম্পটনের মাঠে মুখোমুখি হয় সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন পাকিস্তানের। অলিভ সবুজের মাঝে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের ওপর কালো ডোরাকাটা জার্সিতে নিজেদের শেষ ম্যাচে সেরা চমক দেখাবে বলেই হয়তো সব নাটকীয়তা ধরে রেখে দিয়েছিল বাংলাদেশ। ম্যাচ শুরুর কয়েক ঘন্টা আগেই টাইগার শিবিরে চলে এসেছিলো বিদায়ের চিঠি। পুরো টুর্নামেন্টেই প্রথমে ব্যাট করা বাংলাদেশ শেষ ম্যাচেও প্রথমে ব্যাট করতে নামে পাকিস্তানের শোয়েব আক্তার, ওয়াকার ইউনুসদের মত বিশ্বসেরা পেসারদের সামনে। সর্বকালের সর্বসেরা ব্যাটসম্যানদের একজন বুকবুলদের গুরু গ্রিনিজ সাজঘরে বসে যেন নিজের অভিজ্ঞতা, অনুপ্রেরণা আর নির্দেশনা দেওয়ার জোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। প্রথম বারের মত বাংলাদেশ দল বিশ্বকাপে দুইশো পেরোয়। আকরাম খানের ৪২, শাহরিয়ারের ৩৯, খালেদ মাহমুদের ২৭ রানের পুজি করেই ৯ উইকেটে ২২৩ রান তোলে বাংলাদেশ। লক্ষতাড়া করতে নেমে শুরুতেই ধাক্কা খায় পাকিস্তান। দলীয় ৫ রানের মাথায় প্রথমেই আঘাত হানেন খালেদ মাহমুদ সুজন। পাকিস্তানের স্কোরবোর্ডে ৭ রানের সময় দ্বিতীয় স্ট্রাইকে যান বোলার শফিউদ্দিন। নিজেদের ৪২ রানের মাথায় ৫ উইকেট হারিয়ে ওয়াসিম আকরামরা তখন পুরোপুরি দিশেহারা। নিয়মিত উইকেট বিরতিতে পাকিস্তান যখন ১৬১ রান তোলে তখন উইকেটরক্ষক পাইলট পাকিস্তানের শেষ ব্যাটসম্যান সাকলায়েন মুস্তাকের উইকেট ভেঙ্গে দিয়ে নিশ্চিত করেন বাংলাদেশের বিশ্বকাপের সবচেয়ে মূল্যবান এবং প্রথম বিশ্বকাপের দ্বিতীয় জয়। ম্যাচ সেরা হোন খালেদ মাহমুদ সুজন। পাকিস্তানের বিপক্ষে জয় যেন সব কিছুকেই ছাপিয়ে। নর্দাম্পটনের দর্শকদের সেদিনের বাধভাঙ্গা উল্লাস নজর কেড়েছিল ক্রীড়াপ্রেমীদের। দর্শকরা যেভাবে মাঠের ভেতর দৌড়ে চলে গিয়েছিল তা পিলে চমকে উঠার মতই ইতিহাসে স্বরণীয় হয়ে থাকবে আজীবন। শেষ উইকেট পড়তেই পুরো দেশে আনন্দের দোল খেলে গিয়েছিলো সেদিন। বিশ্বকাপ নিয়ে বাংলাদেশের স্বপ্ন ছিল শুরু থেকেই, ১৯৯৯ সালের বিশ্বকাপেই সেই স্বপ্নের কিছুটা বাস্তব রুপে পেয়েছিলো এদেশের ক্রিকেটপ্রেমীরা।

একটি দেশের ক্রিকেটের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতি হলো টেষ্ট স্ট্যাটাস পাওয়া। বিশ্বকাপের এই জয়ই বাংলাদেশকে টেস্ট স্ট্যাটাসের মর্যাদাপূর্ণ সদস্য হতে সবচেয়ে বেশি সহায়তা করেছিল। এই জয়ই দেশের ক্রিকেটকে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে নিয়মিত করে তুলেছিল। এই জয়ই বাংলাদেশ ক্রিকেট ইতিহাসের ভিত রচনা করেছিল। এই জয়ই বাংলাদেশের বিশ্বকাপ ক্রিকেটের জন্য দারুণ এক অধ্যায় হয়ে থাকবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের ক্রিকেটারদের জন্য।

মন্তব্য করুন

ব্লগ