Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৩ নভেম্বর, ২০২৩ ১২:০৮ অপরাহ্ণ

বিভূতিভূষণের জীবনের শেষের দিকের কোনো কোনো লেখার মধ্যে শিশু একটা বড়ো জায়গা নিয়ে রয়েছে বলে দেখতে পাওয়া যায়।

‘বেলা শেষের বিভূতিভূষণ’

                                        

বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়ের প্রথম স্ত্রী গৌরী দেবী ১৩২৪ বঙ্গাব্দে গত হয়েছিলেন। এর প্রায় তেইশ বছর পরে ১৩৪৭ বঙ্গাব্দের ১৭ই অগ্রহায়ণ (১৯৪০ সালের ৩রা ডিসেম্বর) তারিখে তিনি রমা দেবীকে বিবাহ করেছিলেন। রমা দেবী তাঁর ডাক নাম অনুসারে কল্যাণী দেবী বলেও সকলের কাছে পরিচিত ছিলেন, বিভূতিভূষণের দিনলিপি বা চিঠিপত্রেও সেই নামই দেখতে পাওয়া যায়। কল্যাণী দেবীর পিতা ষোড়শীকান্ত চট্টোপাধ্যায়ের জন্মভূমি ছিল ফরিদপুর, বিভূতিভূষণ-কল্যাণীর বিবাহের সময়ে তিনি বনগাঁয় আবগারী বিভাগের কর্মচারী ছিলেন। ওই বিবাহের বছরখানেক আগেই কল্যাণী দেবীর সঙ্গে বিভূতিভূষণের পরিচয় হয়েছিল, এবং তাঁর পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতাও হয়েছিল। বিভূতিভূষণের ‘আমার লেখা’ গ্রন্থে বিবাহের আগে কল্যাণী দেবীকে লেখা তাঁর একটি চিঠিও সংকলিত করা হয়েছিল। বিভূতিভূষণ-কল্যাণীর বিবাহকে ঠিক প্রেম করে বিবাহ বলা চলে না। তবে সেই বিবাহটি অফুরন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে এক অন্তহীন স্নেহের সার্থক পরিণয় ছিল। বিভূতিভূষণের জীবনকথা লিখতে গিয়ে ‘শনিবারের চিঠি’ পত্রিকার সম্পাদক সজনীকান্ত দাস বলেছিলেন, “প্রথমা পত্নী গৌরী দেবীর মৃত্যুর পর দীর্ঘ একুশ বৎসরকাল তিনি প্রায় সন্ন্যাসীর জীবন যাপন করেছিলেন।” একজন প্রকৃত সন্ন্যাসীর মতোই বিভূতিভূষণ যে কিছুটা উদাসীন প্রকৃতির ছিলেন, সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই; কিন্তু তাই বলে স্নেহ-প্রেমভরা সংসারকে তিনি কোনোদিনই উপেক্ষা করতে চাননি। নিজের শৈশব থেকেই তিনি মায়ের অপরিসীম স্নেহ আর সেবা পেয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে আত্মীয়-অনাত্মীয় অনেক নারীর স্নেহ-মিশ্র সেবা পেয়ে তিনি নারীর কল্যাণ মূর্তির প্রতি নিজের অনুরাগ বা শ্রদ্ধা পোষণ করেছিলেন। কল্যাণী দেবীর সাথে বিবাহের আগে তিনি নিজে একজন উদাসীন সন্ন্যাসীর মত মেসে জীবন কাটালেও, গৃহজীবনের প্রতি তাঁর আকর্ষণ বরাবরই ছিল। খুব সম্ভবতঃ ভ্রাতৃ-বধূর হাতের সেবা পাওয়ার আগ্রহেই তিনি তাঁর ভাই নুটবিহারীর বিবাহ দিয়েছিলেন। তাঁর মত সংসার সম্পর্কে উদাসীন আত্মনিমগ্ন মানুষের পক্ষে গৃহের নিশ্চিন্ত আশ্রয়েরই প্রয়োজন ছিল।

বিভূতিভূষণের সাহিত্যজীবনে তাঁর সেই বিবাহ একটি বিভাজিকা রেখা না হয়ে দাঁড়ালেও, তাঁর বিয়ের আগের আর পরের লেখার মধ্যে কিছু কিছু পার্থক্য অবশ্যই অনুভব করা যেতে পারে। এর আগে বিভূতিভূষণ যে সব গল্প-উপন্যাস লিখেছিলেন, সেগুলোর মধ্যে প্রেমের ছবি প্রায় নেই বললেই চলে। তাঁর সৃষ্ট অপু-অপর্ণা, জিতু-মালতী বা জিতু-হিরণ্ময়ীর ছবির মধ্যে প্রেমের তীব্রতা দেখতে পাওয়া যায় না। বরং সেগুলি স্মৃতির রসে জারিত বলে বোধ হয়। কিন্তু বিবাহের পর থেকে তাঁর গল্প-উপন্যাসে প্রেম একটা বিশিষ্ট ভূমিকা নিতে শুরু করেছিল। বিভূতিভূষণের ‘বিপিনের সংসার’ (ভাদ্র, ১৩৪৮ বঙ্গাব্দ) উপন্যাসে প্রেমের বিভিন্ন ছবি দেখতে পাওয়া যায়, প্রেমের বিচিত্র রূপই সেই উপন্যাসের প্রধান বিষয়বস্তু। তাঁর লেখা ‘দুই বাড়ী’ (ভাদ্র, ১৩৪৮ বঙ্গাব্দ) উপন্যাসেও প্রথম প্রেমের রোম্যান্টিক ছবি পাওয়া যায়, অবশ্য রোম্যান্স সেখানে বাস্তবকে কখনো ছাড়িয়ে যায় নি। বস্তুতঃ, প্রেম বা নর-নারীর সম্পর্ক বিষয়ে বিভূতিভূষণের বরাবরই যেন একটা সংকোচ ছিল। তাই কল্যাণী দেবীর সঙ্গে বিবাহের আগের লেখাগুলিতে তিনি সেই বিষয়টি যেন সন্তর্পণে পরিহার করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পরের লেখাগুলিতে তাঁর স্বভাবগত সেই সংকোচ অনেকটা দূর হয়ে গিয়েছিল বলে দেখতে পাওয়া যায়। অবশ্য নর-নারীর সম্পর্ক তিনি কোথাও অতিশয়িত বা বিকৃত আকারে প্রকাশ করেন নি; তিনি সেই সম্পর্কের শোভন-রূপই এঁকেছিলেন, এবং তাঁর লেখা কোথাও শালীনতা অতিক্রম করেনি। তিনি তাঁর লেখায় সহজভাবে প্রেমের ছবি এঁকেছিলেন। এই প্রসঙ্গে তাঁর ‘স্বপ্ন-বাসুদেব’, ‘বাক্স বদল’, ‘মূলো-র‍্যাডিশ-হর্স র‍্যাডিশ’, ‘সুলোচনার কাহিনী’, মরফোলজি’ - ইত্যাদি গল্পের কথা মনে করা যেতে পারে।  এই প্রসঙ্গে তাঁর ‘অথৈ জল’ উপন্যাসটির কথাও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সেই উপন্যাসে রূপাশ্রিত প্রেমের যে ছবি রয়েছে, সেটা ‘পথের পাঁচালী’র লেখকের রচনা বলে মনেই হয় না। অবশ্য বিভূতিভূষণ সেখানেও অশোভনকে কোনভাবে প্রশ্রয় দেন নি। তবে সহজাত সংকোচ দূর না হলে তিনি ওই উপন্যাসটি লিখতে পারতেন না। পরিণত বয়সে বিবাহের যে ছবি তাঁর ‘ইছামতী’ উপন্যাসে পাওয়া যায়, সেটা তিনি তাঁর নিজের জীবন থেকেই নিয়েছিলেন। বিভূতিভূষণ সেখানে অবশ্য পুরোদস্তুর আত্মকথা লেখেন নি, কিন্তু ওই উপন্যাসে ভবানী বাঁড়ুজ্যের চরিত্র বা ভাবনায় সচেতনভাবে বা অচেতনভাবে তাঁর নিজের চরিত্রই অনেকটা ফুটে উঠেছিল। বিভূতিভূষণকে বোঝবার জন্য সেই চরিত্রটি আজও সাহিত্য সমালোচকদের কাছে অনেকটা বড়ো সহায়। তবে উক্ত উপন্যাসে ভিলুর চরিত্র কল্পনায় কল্যাণী দেবীর কোন প্রভাব ছিল কিনা, সেকথা বলা সম্ভব নয়। তবে তাঁকে নিয়ে ইছামতীতে স্নান করতে যাওয়ার যে বর্ণনা বিভূতিভূষণের দিনলিপিতে পাওয়া যায়, সেটা তাঁর ‘ইছামতী’ উপন্যাসের কথাই মনে করিয়ে দেয়। ভিলুর ইছামতীতে ডুবে যাওয়ার ঘটনাটিরও একটি বাস্তব ভিত্তি ছিল, অবশ্য বিভূতিভূষণ সেখানে নিজস্ব কল্পনার রং চড়িয়েছিলেন।

বিবাহের পরে কল্যণী দেবী প্রথমে পর পর দু’টি কন্যা সন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন, এবং সেই দুটি সন্তানই শৈশবেই মারা গিয়েছিল। এরপরে ১৩৫৪ বঙ্গাব্দের ২৮শে আশ্বিন তারিখে (বুধবার ১৯৪৭ সাল) তাঁর একটি পুত্রসন্তান হয়েছিল। সেই ছেলের ডাক নাম ছিল বাবলু, এবং ভালো নাম ছিল তারাদাস। বাবলুর জন্ম বিভূতিভূষণের ব্যক্তিজীবনেও যেমন, সাহিত্যজীবনেও তেমনি একটা বড়ো ঘটনা ছিল। বৈরাগী না হলেও বিভূতিভূষণ কোনোদিনই সংসারের প্রতি আসক্ত ছিলেন না। সংসারের সকলকেই ভালোবাসলেও কারও প্রতি তাঁর তীব্র অনুরাগ ছিল না। কিন্তু বাবলু জন্মাবার পরেই তিনি সেই শিশুটির প্রতি একান্তভাবে আকৃষ্ট হয়েছিলেন। নিজের জীবনের শেষের দিকে তিনি বাবলু-অন্তঃ প্রাণ হয়ে উঠেছিলেন বললেও কিছু বাড়িয়ে বলা হয় না। বাবলুর প্রতি তাঁর একান্ত অনুরক্তির কিছুটা বর্ণনা সমকালীন কয়েকজনের স্মৃতিকথা থেকে এখানে উদ্ধৃত করা যেতে পারে।

এই প্রসঙ্গে প্রমথনাথ বিশী লিখেছিলেন, “বিভূতিবাবুর বাড়িতে গিয়ে দেখলাম যে, তাঁর পরিবারটি ছোট - বিভূতিবাবু, তাঁর স্ত্রী আর ছোট একটি ছেলে, তাঁর বয়স বছর দেড়, নাম বাবলু। বিভূতিবাবু নামের সঙ্গে একটা আদরের ‘সু’ যোগ করে দেওয়ায় পুরো নামটা দাঁড়িয়েছিল বাবলুসু। ... বিকেল বেলা বিভূতিবাবু পাড়ার প্রান্তে রেল লাইনের ধারে বাবলুসুকে নিয়ে এসে বসতেন। ঘণ্টাখানেক ব’সে ছেলেকে রেল গাড়ি যাতায়াত দেখাতেন। আমরাও অনেকে জুটতাম। সময়টার নাম দিয়েছিলাম বাবলুসুর আসর। আসরের প্রধান আলোচ্য বিষয় ছিল বাবলুসুর কীর্তি।” (শনিবারের চিঠি, অগ্রহায়ণ, ১৩৫৭ বঙ্গাব্দ)

সুমথনাথ ঘোষ জানিয়েছিলেন, “বাস্তবিক, বাবলু ছিল যেন তাঁর ধ্যান, জ্ঞান ও কল্পনা। এই তিন বছরের শিশুটির তিনি ছিলেন একমাত্র সাথী - খেলা-ধূলায়, আহারে-বিহারে - সকল সময়। তিনি তাঁর সঙ্গে সর্বদা খেলা করতেন শিশু হয়ে। কতদিন দেখেছি, তিনি ঘোড়া হয়েছেন আর বাবলু তাঁর পিঠের উপর ব’সে হেট-হেট করছে। কখনও বা ছেলেকে একটা কাঠের গাড়িতে চাপিয়ে তার দড়ি ধরে টেনে নিয়ে যেতে দেখেছি। আবার কখনও দেখেছি, ছেলেকে কাঁধের উপর বসিয়ে মাইলের পর মাইল হেঁটে চলেছেন। আর সবচেয়ে বড়ো কথা, এর জন্যে কখনও তাঁর মনে এতটুকু সঙ্কোচ বা লজ্জা দেখিনি। জজ-ব্যারিস্টার আসুন বা রাজা-মহারাজা আসুন, ছেলের সঙ্গে আচরণের কোনো রকম লুকোচুরি কখনও দেখিনি। বরং কেউ সে দিকে কটাক্ষ করলে তিনি পুত্রস্নেহে আরও গদগদ হয়ে উঠতেন।” (শনিবারের চিঠি, অগ্রহায়ণ, ১৩৫৭ বঙ্গাব্দ)

কালিদাস রায় বলেছিলেন, “বিভূতি বলত, ‘আমি বনে-জঙ্গলে একা একা ঘুরি, বনে-জঙ্গলে গেলে ভগবানের মহিমা উপলব্ধি করতে পারি।’ একদিন সে বলল, ‘বাবলুর (শিশু পুত্র) মধ্য দিয়ে যেন ভগবানের মহিমার আস্বাদ পাচ্ছি।’ কথাটাকে হেসে উড়িয়ে দিতে পারিনি, কথাটা বৈষ্ণব রসতত্ত্বের একটা স্তরের কথা বলে। তবে পরিহাস করতেও ছাড়িনি। বাবলুর প্রতি স্নেহান্ধতা নিয়ে অনেক পরিহাস করেছি তাঁর সঙ্গে।” (কথা সাহিত্য, অগ্রহায়ণ, ১৩৫৭ বঙ্গাব্দ)

বিভূতিভূষণের জীবনের শেষের দিকের কোনো কোনো লেখার মধ্যে শিশু একটা বড়ো জায়গা নিয়ে রয়েছে বলে দেখতে পাওয়া যায়। এই প্রসঙ্গে তাঁর ‘কুশল পাহাড়ী’ গ্রন্থের ‘সীতানাথের বাড়ী ফেরা’ এবং ‘খেলা’ গল্পটির কথা উল্লেখ্য। এই দুটি গল্পে দুটি শিশুর ছবি, এবং সেই সঙ্গে তাঁদের প্রতি তাঁদের পিতার ভালবাসার ছবি দেখতে পাওয়া যায়। কালিদাস রায় বিভূতিভূষণ-বাবলু প্রসঙ্গে বৈষ্ণব ধর্মের বাৎসল্য রসের কথা স্মরণ করেছিলেন। বিভূতিভূষণের পূর্বোক্ত দুটি গল্পে সেই বাৎসল্যের যে ছবি রয়েছে, ঊনিশ শতকের পরে লেখা বাংলা সাহিত্যে সেটার জুড়ি, বিভূতিভূষণেরই ‘ইছামতী’ ছাড়া অন্য কোথাও আছে বলে মনে হয় না। বাৎসল্যের অতি গভীর রসবোধের দৃষ্টান্ত হিসাবে বিভূতিভূষণের ‘খেলা’ গল্পে মতিলালের মনোভাবের বর্ণনা থেকে কয়েকটি ছত্র এখানে তুলে ধরা যেতে পারে - “এই সব স্থূলবুদ্ধি লোকে কি বুঝবে - খোকা তাঁকে কতখানি ভালবাসে বা সে খোকাকে কত ভালবাসে। এদের কাছে কিছু বলে লাভ নেই। পিতা-পুত্রের সেই সূক্ষ্ম অবিচ্ছেদ্য ভালবাসার গূঢ় তত্ত্ব, যা মুখে বলা যায় না, যার বলে এক বছরের শিশু তাঁর অত বয়সে বড় বাপের মনের ভাব বুঝতে পারে, সে জিনিসের ব্যাখ্যা যাঁর তাঁর কাছে করে কি হবে?” ‘ইছামতী’তে শিশুপুত্র টুনুকে নিয়ে ভবানী বাঁড়ুজ্যের যে বাৎসল্যের ছবি আঁকা হয়েছে, সেটা বিভূতিভূষণ তাঁর নিজেরই জীবন থেকে নিয়েছিলেন। সেখানে শিশু যে ভালবাসার ধন, সেই বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই; কিন্তু সেই সঙ্গে সে ভগবানের মাধুর্য আস্বাদ করবার একটা পরম আশ্রয়ও বটে। ভবানী বা বিভূতিভূষণের কাছে শিশু অবশ্য প্রতীকমাত্র ছিল না, শিশুর প্রেমই তাঁদের কাছে বড় হয়ে উঠেছিল। ভবানীর মতোই বিভূতিভূষণের অধ্যাত্ম জিজ্ঞাসা আত্মজ শিশুর মধ্যে দিয়ে সার্থক হয়ে উঠতে চেয়েছিল। বাবলুর প্রতি বিভূতিভূষণের ভালোবাসা বা সাহিত্যে সেই ভালোবাসার প্রকাশ যে পুরোপুরি খাঁটি ছিল, সেই বিষয়ে কোনো সন্দেহই থাকতে পারে না। কিন্তু একই সঙ্গে আরেকটি কথাও এখানে উল্লেখ্য। বৃহদারণ্যক উপনিষদে দেখা যায় যে, যাজ্ঞবল্ক্য মৈত্রেয়ীকে উপদেশ দিয়ে বলেছিলেন, “ন বা অরে পুত্রস্য কামায় পুত্ৰঃ প্রিয়ো ভবতি - আত্মনস্তু কামায় পুত্রঃ প্রিয়ো ভবতি।” অর্থাৎ, পুত্রের আকাঙ্ক্ষায় পুত্র প্রিয় নয়, আত্মার কামনায় পুত্র প্রিয় হয়। বিভূতিভূষণের তুলনাহীন বাৎসল্যের অন্তরালে তাঁর নিজেরই অন্তরাত্মার আকাঙ্ক্ষা ছিল। শিশুর মধ্যে তাঁর আত্মা অনন্ত ভালোবাসার স্বাদ পেয়েছিল বলেই তিনি তাঁর শিশু সন্তানকে অত গভীরভাবে ভালাবাসতে পেরেছিলেন। মহাকবির নিঃসক্ত আত্মা সম্ভবতঃ অমন করেই জীবনের পরম অনুরাগে স্বেচ্ছাবন্দিত্বকে স্বীকার করে নিয়েছিল।

বিভূতিভূষণের শেষ জীবনের লেখাগুলি থেকে দুটি জিনিস দেখতে পাওয়া যায়। একদিকে তাঁর কবিদৃষ্টিতে যে সব জিনিস এর আগে ধরা দিয়েছিল, ওই সময়ে সেগুলো পরিণত হয়ে উঠেছিল; অন্যদিকে জীবনের পরিবর্তমান রূপ তাঁর কল্পনাকে আকর্ষণ করেছিল। তাঁর শেষ ক’বছরের উপন্যাসগুলির মধ্যে দুটির নাম এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য। সেগুলির মধ্যে একটি হল ‘দেবযান’, এবং অপরটি হল ‘ইছামতী’। মৃত্যুর পরে মানুষের আত্মার অস্তিত্ব আছে কিনা, সে সম্পর্কে যৌবন থেকেই তাঁর আগ্রহ ছিল। প্রথমদিকে স্ত্রী গৌরী দেবী এবং বোন আশালতার মৃত্যু তাঁর সেই আগ্রহের বড়ো কারণ ছিল। এর কয়েক বছর পরে মায়ের মৃত্যুও তাঁকে মৃত্যু সম্পর্কে ভাবিয়ে তুলেছিল। পরলোক সম্পর্কে তাঁর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ঠিক কি ছিল, সে সম্পর্কে কিছু জানা না গেলেও, পরলোক সম্পর্কে একটা চেতনা যে তাঁর অন্তরে জেগে উঠেছিল - সেকথা অবশ্যই জানা যায়। সেই চেতনাটিই বিভূতিভূষণের ‘দেবযান’ উপন্যাসে একটা রূপ নিয়েছিল। উক্ত উপন্যাসের গল্পটি কাল্পনিক, এবং সেই উপন্যাসের জগতের পরিকল্পনাও একটা উচ্চ শ্রেণীর কবিকল্পনা ছিল। কিন্তু সেটা কল্পনাচারী কবির খেয়ালমাত্র ছিল না, সেটা ছিল বিভূতিভূষণের আন্তরিক বিশ্বাস। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে হোক, অথবা পরলোকতত্ত্ব নিয়ে বিভিন্ন গ্রন্থ পড়েই হোক - পরলোক সম্পর্কে তাঁর অন্তরে যে একটা স্থির বিশ্বাস জেগে উঠেছিল, সেকথা সত্যি। তবে প্ল্যানচেট বা অনুরূপ কোনো প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রেতলোকের সঙ্গে সংযুক্ত হওয়ার কোন ধরণের আগ্রহ তাঁর মধ্যে ছিল বলে মনে হয় না। বস্তুতঃ পরলোক সম্পর্কে তাঁর ধারণা, মূলতঃ সৃষ্টি সম্পর্কে তাঁর কল্পনা বা চেতনারই একটা অংশ ছিল। ‘দেবযান’ উপন্যাসে তাঁর সেই কল্পনা বা চেতনারই সার্থক প্রতিফলন দেখতে পাওয়া যায়। পরলোক সম্পর্কে সৌরীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়কে বিভূতিভূষণ যে পত্রটি লিখেছিলেন, সেটার কিছুটা অংশ এরকম ছিল - “আপনি পরলোক সম্বন্ধে জানতে চেয়েছেন? আমি সারা জীবন ধরে জন্ম-মৃত্যু রহস্যের আলোচনা করে ও রহস্য জেনে ফেলেছি। আমি গত ২৫ বৎসর ধরে spiritualism আলোচনা করেছি - মৃত্যু যে বৃহত্তর জগতের দ্বার সেকথা আমি জানি যখন আমার বয়স ২৭ বৎসর তখন থেকেই। প্রেতলোকের অস্তিত্ব সম্বন্ধে সন্দেহ করবার কিছুই নেই। পৃথিবীর ঊর্ধ্বে বহু স্তর বিদ্যমান, বিশ্বে বহুলোক, বহু স্তর, বহু গ্রহ, মৃত্যুর পর সেখানে জীবের গতি হয়। এই সব super-mundane worlds আছে এবং ঋষিরাও প্রাচীন যুগে তাদের অস্তিত্ব জেনেছিলেন। বৃহদারণ্যক ও ঈশোপনিষদে এদের কথা আছে।” (ধৃতিদীপা, ১৬ই আষাঢ়, ১৩৭৩ বঙ্গাব্দ)

‘ইছামতী’ উপন্যাসটি বিভূতিভূষণের প্রথম জীবনের সাধের পরিপূর্ণতারূপে সৃষ্টি হয়েছিল। কলকাতার খেলাৎচন্দ্র স্কুলের কাজ ছেড়ে দেওয়ার কিছুকাল পরে তিনি ইছামতী নদীর তীরে অবস্থিত তাঁর জন্মভূমি ব্যারাকপুরে স্থায়িভাবে বাস করতে শুরু করেছিলেন। তাঁর ছোটো ভাই নুটবিহারী তখন ঘাটশিলায় ডাক্তারি করতেন। বিভূতিভূষণ মাঝে মাঝে ঘাটশিলায় যেতেন, কিছুকাল সেখানে থাকতেন, তারপরে আবার ব্যারাকপুরে ফিরে আসতেন। তৎকালীন বিহারের বনভূমির সৌন্দর্য যে তাঁকে আকৃষ্ট করেছিল, সেটার পরিচয় তাঁর দিনলিপির কোনো কোনো অংশ থেকেও পাওয়া যায়। সেই সময়ে ঘাটশিলা থেকে লেখা একটি পত্রে তিনি তাঁর একজন বন্ধুকে সেখানে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়ে লিখেছিলেন, “এখানে পাহাড়ে বেড়ান, কাল বিকেলে পাহাড়ের নীচে একটা হ্রদে স্নান করে এলাম, বনে বনে কুরচিফুলের সুবাস, কচি পাতা ওঠা শালবন, কি সুন্দর লাগলো অরণ্য প্রকৃতির অপূর্ব পরিবেশটি। ঘাটশিলার নিকটে কালচিতি নামক মৌজায় ২৫ বিঘা ধানজমি ও শালবন এবং একটা বড় পুকুর (কাছে পাহাড়, ঝর্ণা ও বন) দু’হাজার টাকায় ক্রয় করার দরুন ওখানে একটি ছোট ঘর বনপ্রান্তে। শাল ফুলের সুবাস ও মহুয়া ফুলের মিষ্ট বাতাস - কেমন মনে করেন এ পরিবেশ? আসবেন দু’ দিনের জন্যে?” (শনিবারের চিঠি, অগ্রহায়ণ, ১৩৫৭ বঙ্গাব্দ) বিহারের আরণ্যক প্রকৃতির রূপ তাঁকে মুগ্ধ করলেও তাঁর প্রাণের টান কিন্তু ব্যারাকপুরের কোল দিয়ে বয়ে যাওয়া ইছামতীর উপরেই থেকে গিয়েছিল। ইছামতীর উপরে সেই টান শুধু বিভূতিভূষণেরই ছিল না, সেই টান কল্যাণী দেবীর মধ্যেও সঞ্চারিত হয়েছিল। সেই কারণে নিজের ‘হে অরণ্য কথা কও’ নামক দিনলিপিতে বিভূতিভূষণ লিখেছিলেন, “মঙ্গলবার দিন যখন গাড়ী এসেছে খড়গপুরে, তখন বাংলা দেশের সবুজ ঘাসভরা মাঠ ও টলটলে জলে ভর্তি মেদিনীপুর জেলার খালবিল দেখে আমাদের ইছামতীর কথা মনে পড়ে গেল। খড়গপুর থেকে তখন সবে নাগপুর ছেড়েছে, কল্যাণী বলে উঠলো - ‘আজই চলো বারাকপুর যাই, ইছামতী টানচে।’ … আমারও মন চঞ্চল হয়ে উঠেছে তখন যশোর জেলার এই ক্ষুদ্র গ্রামটির জন্যে। যত দেশ-বিদেশেই বেড়াই, যত পাহাড়-জঙ্গলের অপূর্ব দৃশ্যই দেখি না কেন, বাল্যের লীলাভূমি সেই ইছামতীর তীর যেমন মনকে দোলা দেয় - এমন কোথাও পেলাম না আর।” ‘ইছামতী’কে নিয়ে তিন খণ্ডের একটি এপিক উপন্যাস লেখবার পরিকল্পনাও বিভূতিভূষণের ছিল, তাতে তিনি ভবানী বাঁড়ুজ্যের ছেলে টুনুর জীবন নিয়ে কালের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে জীবনের ছবি আঁকতে উৎসুক হয়েছিলেন। কিন্তু অকালে মৃত্যু এসে তাঁর সেই পরিকল্পনায় ছেদ এনে দিয়েছিল। শৈশবের স্বপ্নলোক নিশ্চিন্দিপুরের জীবন থেকে শুরু করে অপুর জীবনের উত্তর-পর্ব, অথবা আরেকটি নতুন জীবনের কল্পনা নিয়ে ‘কাজল’ লেখবার জন্যও তখন তিনি প্রায় তৈরি হয়ে গিয়েছিলেন। সেসব সম্পূর্ণ হতে পারলে তাঁর কল্পনা আর কবি দৃষ্টির গোটা পরিচয়ই হয়ত ওই সব কাহিনীর মধ্যে পাওয়া যেত। কিন্তু যা হয়নি, সেগুলো নিয়ে এখন আর আক্ষেপ করে কোন লাভ নেই। জীবনের শেষের দিকের লেখাগুলোতে কাল সম্পর্কে তাঁর চেতনার আশ্চর্য কিছু পরিচয় পাওয়া যায়। তাঁর স্মৃতিময় লেখাগুলোর মধ্যে অতীতের মায়া বা আবেশ থাকলেও তিনি যে নতুন কালকে চেনেননি এমনটা কিন্তু নয়। তাঁর সমকালকে ফুটিয়ে তোলবার জন্য তিনি শুধুমাত্র ‘অশনি সংকেত’ ছাড়া অন্য কোনো উপন্যাস না লিখলেও, তাঁর অনেক ছোটো গল্পে রোম্যান্টিক-কল্পনা ভ্রষ্ট স্বার্থসর্বস্ব সেই যুগের নিখুঁত ছবি পাওয়া যায়। বিভূতিভূষণের ‘কমপিটিশন’, ‘ব্ল্যাক মার্কেট দমন কর’ বা ‘আচার্য কৃপালনী কলোনী’ পড়লে স্পষ্টভাবে বুঝতে পারা যায় যে, তিনি সেই যুগকে কতটা গভীরভাবে চিনতে পেরেছিলেন। তাঁর কবিদৃষ্টিতে সেকালের মর্ম উদ্ঘাটিত হওয়ার সম্ভাবনা যথেষ্টই ছিল।

বিভূতিভূষণের মৃত্যুর পরে বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল) লিখেছিলেন, “কথাশিল্পী বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্য শোক করবার প্রয়োজন নেই, কারণ সে ব্যক্তিটি অমর। আমার কষ্ট হচ্ছে এই ভেবে যে, আমাদের সেই বিভূতিকে আর দেখতে পাব না, যাঁর ছেঁড়া গেঞ্জী আর ময়লা লুঙ্গী নিয়ে আমরা ঠাট্টা করতাম, যে ইলেকট্রিক পাখা বন্ধ করে দিয়ে সিগারেট খেত, গরম লুচি আর বেগুন ভাজার প্রতি যাঁর লোভ ছিল, মানুষের চেয়ে প্রকৃতির সঙ্গ যাঁর বেশী ভাল লাগত, প্রকাণ্ড সভায় সভাপতিত্ব করার চেয়ে রেল লাইনের ধারে ডিসটাণ্ট সিগন্যালের নীচে বসে দিগন্তের দিকে চেয়ে থাকাটা প্রিয়তর ছিল যাঁর কাছে, বয়স্কদের এড়িয়ে কিশোর কিশোরীদের সঙ্গে আড্ডা জমাতে ভাল লাগত যাঁর, সেই বিভূতি আর আমাদের কাছে আসবে না।” (কথাসাহিত্য, অগ্রহায়ণ, ১৩৫৭ বঙ্গাব্দ) বনফুলের কথার রেশ ধরে বলা যেতে পারে যে, বিভূতিভূষণ শুধুমাত্র একজন কথাশিল্পী ছিলেন না, তাঁর সমগ্র জীবনটাই একটা শিল্প ছিল, এবং সেই শিল্পও তাঁর কথাশিল্পের মতোই সহজ ছিল। সেটার মধ্যে কোথাও সামান্যতম আবিলতা ও কুটিলতা ছিল না। সহজের রসে তাঁর সারা জীবনই যেন জরানো ছিল। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় তাঁর চরিত্র সম্পর্কে যে কথাগুলি বলেছিলেন, সেগুলিকে একেবারে যথার্থ বলেই মনে হয়। তিনি বলেছিলেন, “তাঁর ব্যক্তিগত সরলতা এতখানি ছিল যে, নিজের কথা পঞ্চমুখে বলে যেতেন, নিজের ভুলচুক দোষত্রুটি হাস্যকর পরিস্থিতি কিছুই ঢেকে চেপে কথা কইতে জানতেন না। তাঁর মনটি ছিল স্ফটিকশুভ্র, তার অন্তস্তল পর্যন্ত দেখা যেত। অনেক সময়ে তাঁর নিজের আচরণ অন্যলোকের সম্বন্ধে যা তিনি নিজেই ব্যক্ত করতেন তা এত বোকার মত আমাদের কাছে লাগত যে, তা নিয়ে আমরা বহুভাবে তাঁকে ঠাট্টা করেছি, গঞ্জনাও দিয়েছি, কিন্তু তাতে তাঁর চিত্ত-প্রিয়তার কোন বিকার কখনও দেখিনি। বিভূতিবাবুর অনুরাগী ভক্ত মেয়ে আর পুরুষ, স্কুলের ছেলে আর কলেজের অধ্যাপক জুটত প্রচুর। তিনি নিজেকে কারো কাছ থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যেতে পারতেন না, প্রাণ খুলে গা ঢেলে সকলের সঙ্গে মিশতেন। এতে করে মাঝে মাঝে নিজেকে খেলো করে ফেলতেন - কিন্তু বন্ধুদের অনুযোগে কোনো ফল হত না, ভারিক্কি হবার কলা তাঁর কৌশলের বাইরে ছিল। … সদানন্দ প্রকৃতিগতপ্রাণ আত্মভোলা এই মানুষটিকে ভাল না বেসে কেউ পারত না। ইনি কারো তাচ্ছিল্য তুচ্ছতামিশ্র ব্যবহার গায়ে মাখতেন না, এক সহজ চিত্তপ্রসন্নতা এঁকে যেন অভেদ্য বর্মে আবৃত করে রেখেছিল। ক্রমে বুঝছি, এই চিত্তপ্রসন্নতার আড়ালে তাঁর চরিত্রে এমন একটা বড় জিনিস ছিল যার হদিস আমাদের কাছে পৌঁছয় নি।” (কথাসাহিত্য, অগ্রহায়ণ, ১৩৫৭ বঙ্গাব্দ) বিভূতিভূষণের সদানন্দ আত্মভোলা ভাব বা তাঁর সহজ চিত্ত-প্রসন্নতা সম্পর্কে অনেক গল্প তাঁর সংস্পর্শে যাঁরা এসেছিলেন তাঁদের লেখা থেকে জানতে পারা যায়। গৌরীশঙ্কর ভট্টাচার্য তাঁর নিরভিমান প্রকৃতির দৃষ্টান্ত হিসাবে নিজের লেখায় যে ঘটনার কথা উল্লেখ করেছিলেন, সেটা সভ্যতার পালিশ করা একালের সমাজে রীতিমত অবিশ্বাস্য বলেই মনে হতে পারে। তিনি লিখেছিলেন, “একটি দিনের কথা। কোন একজন নামজাদা ব্যক্তি এক জায়গায় যাবেন বলে কথা দিয়ে শেষ পর্যন্ত গেলেন না। তাঁর না যাওয়ার অজুহাতটা খুবই হাস্যকর। আহ্বায়ক মশাইয়ের বাড়ীর গাড়ি কোন কারণে আবদ্ধ ছিল, সেইজন্য তাঁরা লোক পাঠিয়েছিলেন ট্যাক্সি করে সেই ঔপন্যাসিককে নিয়ে যাওয়ার জন্য। মাত্র এই কারণেই সে ভদ্রলোক বেঁকে বসলেন। অথচ এমন একটা ক্ষেত্র, যেখানে এই না যাওয়াটা খুবই বিসদৃশ ব্যাপার। বিশেষ করে যে ভদ্রলোক নিতে এসেছিলেন, তাঁর আর মুখ দেখাবার পথ থাকে না। সাহিত্যিকদের সঙ্গে এঁর খুব খাতির - একথা সর্বজন বিদিত, অথচ সেই খাতিরের এই পরিচয়! বিড়ম্বিত অবস্থায় ভদ্রলোক চুপ করে বসে আছেন। এমন সময়ে বড়দার প্রবেশ। বড়দা তো ভদ্রলোকের মুখ-চোখের চেহারা দেখে উদ্বিগ্নভাবে সব খবর নিলেন। পরিশেষে উনি বললেন, আপনি কি মনে করেন, আমাকে দিয়ে আপনার মুখ রক্ষা হতে পারে? তা যদি হয়, চলুন আমি যাচ্ছি। এই কথাটা ঠিক অনুরূপ অবস্থায় আর কেউ প্রস্তাব করতে পারতেন বলে আমি বিশ্বাস করি না। আসলে জীবনের মূল সত্যটাকে উনি এত সহজ এবং অনায়াসরূপে দেখতে পেতেন, যার জন্য অনেক তথাকথিত শোভনতা বা সমাজিক শিষ্টাচার তাঁর চোখে নিরর্থক বলে প্রতিভাত হ’ত।” (শনিবারের চিঠি, অগ্রহায়ণ, ১৩৫৭ বঙ্গাব্দ)

বিভূতিভূষণ ভোজনপ্রিয় বলে তাঁর বন্ধু মহলে পরিচিত ছিলেন, এমনকি কেউ কেউ তাঁকে ‘ঔদরিক’ বলেও জানতেন। কিন্তু তাঁর সঙ্গে যাঁরা অন্তরঙ্গ ভাবে মিশেছিলেন, তাঁরা সকলেই জানতেন যে, বিভূতিভূষণ আসলে বেশি খেতে পারতেন না। বিচিত্র খাদ্যের স্বাদ পাওয়ার জন্য তাঁর মধ্যে যথেষ্ট আগ্রহ ছিল, তিনি রুচিকর বিভিন্ন খাদ্য খেতে ভালবাসতেন। কিন্তু তাঁর মূল আহার খুবই পরিমিত ছিল। তিনি যেমন নিজের দু’চোখ মেলে পৃথিবীকে দেখতে আগ্রহী ছিলেন, তেমনই রসনায় খাদ্যের বিচিত্র স্বাদ পেতেও উৎসুক ছিলেন। সেই দুটোই যেন তাঁর একই আকাঙ্ক্ষার রূপভেদ ছিল। এই প্রসঙ্গে হরেকৃষ্ণ মুখ্যোপাধ্যায় ও কালিদাস রায়ের স্মৃতিকথা থেকে কিছুটা অংশ তুলে ধরা যেতে পারে। হরেকৃষ্ণ মুখ্যোপাধ্যায় লিখেছিলেন, “বিভূতিভূষণ ভোজন বিলাসী ছিলেন, কিন্তু কলিকাতা শহরে দুই-একবার একসঙ্গে নিমন্ত্রণে গিয়া দেখিয়াছি, তিনি বচনে যেরূপ আড়ম্বর সৃষ্টি করিতেন, উদর তাঁহার ততখানি সমর্থন করিত না। আমি এই বিষয় লইয়া মাঝে মাঝে তাঁহার সহিত রহস্য করিতাম। একদিনের কথা মনে আছে। আমি কলেজ স্ট্রীট হইতে পূজনীয় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মহাশয়ের বাড়ী যাইতেছি, বিভূতিভূষণ বনগ্রাম হইতে শিয়ালদহে নামিয়া কলিকাতা আসিতেছেন, পথে মির্জাপুর পার্কের নিকট তাঁহার সঙ্গে দেখা হইল। আমি তাঁহাকে দেখিয়াই বলিয়া উঠিলাম, কাল কোথায় ছিলে ভাই? ও, কি প্রচুর খাওয়াটাই না খাওয়া গেল। শুনিবামাত্র বিভূতিভূষণ এমনভাবে গালে হাত দিয়া বসিয়া পড়িলেন যে ব্যাপার দেখিয়া দু’-একজন করিয়া লোক জমিতে আরম্ভ করিল। আমি তাড়াতাড়ি তাঁহাকে উঠাইয়া লইয়া সরিয়া পড়িলাম।” (শনিবারের চিঠি, অগ্রহায়ণ, ১৩৫৭ বঙ্গাব্দ) কালিদাস রায় লিখেছিলেন, “ভোজনলুব্ধতার জন্য বিভূতিকে আমরা কতবার পরিহাস করেছি। সেকালে একালের মত রসনা তর্পণ সুখাদ্য এত সহজে অধিগম্য ছিল না। একদিন সে সুখাদ্যের অভাব বড় অনুভব করেছিল - সে কথা সে তাঁর বহু রচনার বহু চরিত্রের মারফতে প্রকাশ করেছে। বিভূতি যাঁদের জীবন নিয়ে গল্প-উপন্যাস লিখেছে তাঁদের পক্ষে ভোজনলুব্ধতা একটা প্রধান, এমনকি সব চেয়ে বড়ো মনোবৃত্তি। নিজে সুখাদ্যের অভাব একদিন অনুভব করেছিল বলেই ঐ মনোবৃত্তিটাকে অত চমৎকার করে ফোটাতে পেরেছিল। পরবর্তী জীবনে ভোজন সম্বন্ধে মৌলিক অনুরাগ প্রকাশও তাঁর দারিদ্র্যের মর্যাদা-স্বীকার। পরবর্তী জীবনে সে কি সত্যই ভোজনলুব্ধ ছিল? এটাও তাঁর একটা অভিনয়। এক সঙ্গে পাশাপাশি বসে বহুস্থলে বহুবার ত খেয়েছি। দেখেছি - সে ভোজনলোভ নিয়ে খুব আস্ফালন করেছে কিন্তু কী যে খাচ্ছে সে দিকে তাঁর একেবারেই লক্ষ্য বা মনোযোগ নেই। সে দই খাচ্ছে কি খই খাচ্ছে সে দিকে তাঁর হুঁস নেই। পরিবেশককে খেয়েও বলছে পাইনি, না পেয়েও বলেছে খেয়েছি ত। ভাতে পোলাওয়ে বা আলুতে রসগোল্লায়, প্রথম জীবনের বৈঁচি বনকুলে ও আম কাঁঠালের মতো তাঁর কোনো বিভেদজ্ঞান নেই ৷ মুড়ি মিছরিতে সমান দর কষতে আর কাকেও দেখিনি। খাওয়ার সময় গল্পে এত মসগুল কিংবা অন্যমনস্ক যে তাঁর আস্ফালনটাই সার, খাওয়াটা গৌণ মাত্র।” (কথা সাহিত্য, অগ্রহায়ণ, ১৩৫৭ বঙ্গাব্দ) বিভূতিভূষণ একদিকে যেমন জীবনের প্রতি একান্ত অনুরক্ত ছিলেন, অন্যদিকে তেমনি আবার একেবারে উদাসীনও ছিলেন। তবে অনুরক্ত হলেও তিনি আসক্ত ছিলেন না, এবং উদাসীন হলেও তিনি বিবাগী ছিলেন না। এটাই ছিল ব্যক্তি ও কবি বিভূতিভূষণের স্বভাব। তাঁর আন্তরিক প্রীতি অল্পক্ষণের মধ্যেই কাউকে নিজের আত্মীয় করে নিতে পারত। শুধুমাত্র অর্থের প্রতি তাঁর অনাসক্তি ছিল। লেখার জন্য তিনি প্রকাশকদের কাছ থেকে যে সব চেক পেয়েছিলেন, সেগুলো সময় মত না ভাঙাবার জন্য, সেগুলোর মধ্যে অনেকগুলিই যে বাজে কাগজের দলে সামিল হয়ে গিয়েছিল, সেদিকে তাঁর কোন ভ্রূক্ষেপ ছিল না। তাঁর প্রধান প্রকাশক ‘মিত্র ও ঘোষ’-এর অন্যতম স্বত্বাধিকারী কথাসাহিত্যিক গজেন্দ্রকুমার মিত্র নিজের লেখায় বিভূতিভূষণের অর্থে অনাসক্তির অনেক দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছিলেন। ভালো করে মিলিয়ে দেখবেন বলে তিনি প্রকাশকের কাছ থেকে বইয়ের হিসেব নিতেন, কিন্তু সেই হিসেব আর মেলাতেন না; এমনকি সেটা নিয়ে কেউ তাঁর কাছে অনুযোগ করলে তিনি সলজ্জভাবে তাঁকে সময়াভাবের কথা বলতেন। নিছক বিষয়ের কথা তাঁর কখনোই ভালো লাগত না। নিজের বেশভূষার ব্যাপারেও তিনি অত্যন্ত উদাসীন ছিলেন। এমনই ছিল তাঁর প্রকৃতি। সেই কারণেই, সেকালে যাঁরা তাঁর সঙ্গে একবার মিশেছিলেন, তাঁদের কাছে তাঁর স্মৃতি অতটা উজ্জ্বল ও মধুর হয়ে থেকে গিয়েছিল। সেই কারণেই তাঁর অনেক বন্ধু বলেছিলেন যে, তিনি কি মানুষ ছিলেন!

বাণী রায়কে বিভূতিভূষণ বলেছিলেন, “আমার বিষয়ে যখন লিখবেন, তখন সবাইকে বলে দেবেন আমার কোন অতৃপ্তি নেই। সব ইচ্ছাই আমার পূর্ণ হয়েছে। বেড়াবার ইচ্ছা ছিল তা খুব বেড়িয়েছি। খাবার আকাঙ্ক্ষা ছিল ভাল মন্দ - ওঃ, খুব খেয়েছি। নাঃ, আমার আর আকাঙ্ক্ষা নেই। আরও যা ছিল সাধ পূর্ণ হয়েছে। ... তা হলে, মনে থাকে যেন, আমার কথা যখন লিখবেন, লিখবেন আমার কোন আকাঙ্ক্ষাই অপূর্ণ নেই। আমি জীবনে তৃপ্ত হয়েছি।” (কথা সাহিত্য, অগ্রহায়ণ, ১৩৫৭ বঙ্গাব্দ) এমন কথা বলতে পারতেন বা বলতে পারেন, এমন মানুষ সেকালেও খুব একটা ছিলেন না, আর একালেও খুব একটা নেই। বিশেষ করে বর্তমান যুগের মানুষের অসন্তোষ আর অতৃপ্তি যখন দিনে দিনে বেড়েই চলেছে, তখন জীবনে - ‘তৃপ্ত হয়েছি’ - একথা বলবার লোক যেন কল্পনাই করা যায় না। বিভূতিভূষণ তাঁর জীবনে তৃপ্ত হয়েছিলেন, কারণ তাঁর আকাঙ্ক্ষা সহজ ছিল। সেজন্য জীবনে তিনি পরিতৃপ্ত ও মরণে তিনি পরিপূর্ণ হতে পেরেছিলেন। জীবন থেকে মরণে উত্তরণের ব্যাপারে তাঁর মধ্যে কোন ধরণের দ্বিধা ছিল না। ‘দেবযান’ তাঁর শিল্পকৃতের কল্পনা ছিল না; মৃত্যুর পরে যে আরেকটি জগৎ রয়েছে - সেটা তাঁর গভীর প্রত্যয় ছিল। তাঁর জীবনের মতোই তাঁর মৃত্যুর কাহিনীও তাই মানুষকে আজও আশ্চর্য করে।

বিভূতিভূষণ তখন ঘাটশিলার বাড়িতে বাস করছিলেন। সেখানে একদিন তিনি তাঁর নিত্যকার অভ্যাস মত ভোরে উঠে বনের মধ্যে কয়েক মাইল ঘুরে এসে জলখাবারে তাঁর অন্যতম প্রিয় খাদ্য খেতে খেতে বুকে একটু ব্যথা বোধ করেছিলেন। এরপরে তিনি প্রথমে একটু জল চেয়ে খেয়েছিলেন। যেহেতু তাঁর ভাই নুটবিহারী ডাক্তার ছিলেন, তাই বাড়িতে কোরামিন মজুদ ছিল। সেদিন কয়েক ফোঁটা কোরামিন খাওয়ার পরে তিনি সুস্থ বোধ করেছিলেন। সেদিন হজমের গোলমাল বা অন্য কোন কারণে হঠাৎ শরীর খারাপ হয়েছে বলে মনে করে তিনি সেই বিষয়ে আর বিশেষ ভ্রূক্ষেপ করেন নি। তাছাড়া তিনি তাঁর নিজের শরীরের যত্ন বিশেষ নিতেন বলেও জানা যায় না। ব্যারাকপুরে থাকবার সময়ে তিনি ইছামতীতে স্নান করতেন, আর ঘাটশিলায় থাকবার সময়ে তিনি সেখানকার একটা বড়ো পুকুরে তাঁর পাউটর বাবলুকে সঙ্গে নিয়ে স্নান করতে যেতেন। কিন্তু সেদিন তাঁর শরীর একটু খারাপ লাগছিল বলে তিনি সেখানে একাই গিয়েছিলেন। তারপরে সারা দিন বিশ্রাম করবার পরে তিনি আর শরীর খারাপ বোধ করেন নি। ওই সময়ে প্রমথনাথ বিশী ঘাটশিলায় বিভূতিভূষণের প্রতিবেশী ছিলেন। তাই সেই দিন বা পরের দিনের যে বিবরণ তাঁর স্ত্রী সুরুচি দেবী লিখেছিলেন, সেটাকে প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা বলা যেতে পারে। তিনি লিখেছিলেন, “কোনও এক ভদ্রলোকের বাড়ীতে সাহিত্যিকবৃন্দের নিমন্ত্রণ ছিল। ভদ্রলোকের নিজের মোটরগাড়ী এসে সবাইকে নিয়ে যাবে। আমাদের বাসার সামনে দিয়ে গাড়ী চলে গেল বিভূতিবাবুকে আনতে, কিছুক্ষণ পর এঁকেও নিয়ে গেল। সেদিন বেশ ঠাণ্ডা পড়েছিল, উনি একটু অসুস্থ শরীরে গেলেন। রাত ন’টার সময় ফিরে এসে বললেন, বিভূতিবাবু মোটরের মধ্যে দু’বার বমি করে অসুস্থ হয়েছেন। বললেন, ‘ভাগ্যিস বাবলুকে আনিনি সঙ্গে করে।’ (তিনি প্রায়ই ছেলে ছাড়া কোথাও যেতেন না।) শুনে মনটা খারাপ হয়ে গেল। বিশেষ কাজে উনি কলকাতা যাবেন। কাপড়-জামা পরে খেতে যাবেন, এমন সময় সুমথবাবু এদিকে আসছেন দেখে উনি বললেন, ‘কি ব্যাপার? বিভূতিবাবু কেমন আছেন?’ সুমথবাবু বললেন, ‘তাঁর জন্যই তো আপনার কাছে এসেছি। তিনি রাতে গাড়ি থেকে নামবার সময় বললেন - আমাকে ধরো। ধরে নামাতে সিঁড়িতেই অজ্ঞান হয়ে গেলেন! ধরাধরি করে বারান্দায় খাটিয়ায় শোয়ান হল। সারা রাত ডাঃ বোস ও ভ্রাতা ডাঃ ব্যানার্জি ঔষধ ইনজেকসন করেছেন। সকালের দিকে কিছু সুস্থ হয়েছেন। এখন তাঁকে কলকাতায় নিয়ে যাবার কথা ভাবা হচ্ছে।’ উনি বললেন, ‘অম্বলের জন্য এ রকম হয়েছে - কাল সারা রাত অত কষ্ট গেছে - এখন আবার রাস্তার ধকল হয়তো সহ্য করতে পারবেন না - কোনও বিপদ হতে পারে।’ উনি একাই কলকাতা রওনা হয়ে গেলেন। বাড়ীতে আমাদের অন্য পুরুষ মানুষ নেই যে, খবর নেব। আমি নিজে অসুস্থ ছিলাম, উৎকণ্ঠায় সারা দিন কেটে গেল। পরদিন খোকনকে পাঠালাম - সে এসে বললো, ‘দেখলাম জ্যেঠামশাই ঘুমোচ্ছেন, জ্যেঠিমা বললেন ভালই আছেন এখন।’ অনেকটা স্বস্তি পেলাম কিন্তু নিজে যেতে না পারায় বড় দুঃখ অনুভব করলাম মনে। পরদিন বেলা আটটা নয়টা হবে স্থানীয় এক ভদ্রলোক জানালেন, বিভূতিবাবুর অবস্থা খুব খারাপ। শোনা মাত্র যে মনের অবস্থা কেমন হল আজ তা কিছুই প্রকাশ করতে পারবো না। একটা রিক্সা ডেকে খোকনকে সাথে নিয়ে চলে গেলাম। বারান্দায় নানা জাতীয় লোক, ঘরে নানা জাতীর লোক - কতক চেনা কতক অচেনা। বিভূতিবাবুর বিছানার ধারে গেলাম অতি ধীরে - দেখলাম, তখন জ্ঞান আছে। মাঝে মাঝে দুই একটি ভুল কথা বললেন। চোখের চাহনি পরিষ্কার। আমাকে ও খোকনকে চিনলেন। মাঝে মাঝে নিজের একটা আঙ্গুল ঈষৎ কামড়াচ্ছেন - যেন কিছু ভাবছেন। কপাল আর চুলে হাত বুলোচ্ছেন। মুখে কিন্তু তাঁর কোন ম্লানিমা নেই। নিশ্বাস খুব জোরে জোরে পড়ছে, এবং তাতেই বেশ কষ্ট হচ্ছে। আস্তে আস্তে মাথায় কপালে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলাম - আরাম পেলেন বুঝলাম। মধ্যে মধ্যে হেঁচকি উঠছিল সে জন্যে কি একটা ভেজান রঙ্গীন জল অল্প অল্প মুখে দেওয়া হচ্ছিল, তাতে যে তাঁর তৃষ্ণা হচ্ছিল না তা বোঝা যাচ্ছিল। তাও কতক্ষণ বাদ বাদ হেঁচকি উঠছিলই। ইতিমধ্যে বরফ ভরে ব্যাগ আসলো। সেইটি মাথায় দিতেই আরামে চোখ বুঝলেন, মনে হলো ঘুমিয়ে পড়বেন। বিভূতিবাবুর স্ত্রী কল্যাণীদির মুখের দিকে চেয়ে দেখি মুখখানা যেন ছাইয়ের মত ফ্যাকাশে - তিনি তাঁর স্বামীর শয্যাপার্শ্ব থেকে উঠে স্নানাহার করতে যেতে রাজী হচ্ছেন না। অনেক অনুরোধের পর রাজী হলেন। নুটুবাবুকে (বিভূতিবাবুর ভাই) বার বার ডেকে বললেন - ঠাকুরপো, এসো কাছে বসো। কিন্তু নুটুবাবু দাঁড়িয়ে কেবলই কাঁদতে লাগলেন, কাছে বসতে পারছিলেন না। কিছুক্ষণ বাদে একটু শান্ত হয়ে বসে পেটে মালিশ করতে লাগলেন। কল্যাণীদি তখন উঠে গেলেন। স্নান সেরে সিঁদুরের টিপ পরে একখানা রঙীন শাড়ী পরেছেন দেখলাম। সেই শাড়ীই শেষ পর্যন্ত তিনি পরে ছিলেন।” (শেষ দুই বছর, সুরুচি দেবী, কথাসাহিত্য, অগ্রহায়ণ, ১৩৫৭ বঙ্গাব্দ)

আসলে বিভূতিভূষণ বুঝতে পেরেছিলেন যে, তাঁর মৃত্যু আসতে আর খুব বেশি দেরি নেই। কিন্তু সেজন্য তাঁর মনে কোন ধরণের উদ্বেগ ছিল না। তিনি দেবযানে বিশ্বাসী ছিলেন, এবং কোনভাবে কল্যাণী দেবীর অন্তরেও সেই বিশ্বাস সঞ্চারিত হয়েছিল। তাঁদের উভয়েরই মনেপ্রাণে বিশ্বাস ছিল যে, এই জীবনের পাড়ে এমন আরেকটি লোক আছে যেখানে আবার তাঁরা একদিন মিলিত হতে পারবেন। সেই লোকেই গৌরী দেবী বিভূতিভূষণের প্রতীক্ষা করছেন, এমনকি তাঁদের যে দুটি মেয়ে এই জগৎ থেকে হারিয়ে গিয়েছিল, তাঁদেরও সেখানে ফিরে পাওয়া যাবে। সুতরাং তাঁদের উভয়ের মধ্যেই মৃত্যু নিয়ে ভয় কিংবা শোক ছিল না, শুধু আসন্ন বিচ্ছেদের সুতীব্র বেদনা ছিল। বিভূতিভূষণ কখনো বিষয়ের চিন্তা করেন নি, এমনকি তিনি হঠাৎ চলে গেলে তাঁর সংসারের কি হবে, সে কথাও তিনি কখনো ভাবেন নি। নিজের শেষ সময়ে তিনি কল্যাণী দেবীকে ভগবানের নাম ও সাধকদের নাম করতে বলেছিলেন। সেইমত কল্যাণী দেবী তাঁকে ভগবানের ও সাধকদের নাম শোনাতে শুরু করেছিলেন। হঠাৎ বিভূতিভূষণ তাঁকে বলেছিলেন যে, একটি নাম বাদ পড়েছে। কল্যাণী দেবী কোন নাম জিজ্ঞাসা করলে তিনি রামপ্রসাদের নাম নিয়েছিলেন। এরপরে কল্যাণী দেবী রামপ্রসাদের নাম করেছিলেন। পরলোকে বিশ্বাস ছিল বলেই তিনি শেষ সাজে সাজাবার সময়ে স্বামীর কপালে নিজের হাতে চন্দন দিয়ে রামকৃষ্ণ নামটি লিখতে পেরেছিলেন। ইতিমধ্যে সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিল। কল্যাণী দেবী তাঁর স্বামীর কাছে ঠায় বসে ছিলেন। মৃত্যু যে অলক্ষ্য চরণে বিভূতিভূষণের দিকে এগিয়ে আসছে, সেটা তখন আর কারো অজানা ছিল না। বিভূতিভূষণ তখন তাঁর শেষ শয্যায় শুয়ে শান্ত নিরাকুল চিত্তে কি যেন করছিলেন। বাবলু পাশের ঘরে সন্ধ্যা থেকেই ঘুমাচ্ছিলেন, হঠাৎ তিনি জেগে উঠে কেঁদে উঠেছিলেন। কল্যাণী দেবী তাঁর একমাত্র পুত্রের ক্রন্দন শুনতে পেলেও ওই শেষ সময়ে নিজের স্বামীকে মুহূর্তের জন্যও ছেড়ে কোথাও যেতে চাননি। বিভূতিভূষণের মুখের কথা তখন জড়িয়ে আসলেও তাঁর জ্ঞান কিন্তু অটুট ছিল। তিনি অস্পষ্ট স্বরে কল্যাণী দেবীকে বাবলুর কাছে যাওয়ার জন্য বলেছিলেন। কল্যাণী দেবী বাবলুকে শান্ত করে কোলে করে সেই ঘরে নিয়ে এসেছিলেন। সেই ঘরে তখন এক অপরিচিত পরিমণ্ডল দেখে বাবলু হকচকিয়ে তাঁর পিতার মুখের দিকে তাকিয়েছিলেন। বিভূতিভূষণ কল্যাণী দেবীর কোলে বাবলুর দিকে কিছুক্ষণের জন্য দৃষ্টিপাত করেছিলেন, আর তারপরেই এক গভীর শান্তির নিবিড় তৃপ্তির ঘুমে তাঁর চোখ দুটি চিরকালের জন্য বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ক্যালেণ্ডারের পাতায় দিনটা ছিল, ১৩৫৭ বঙ্গাব্দের ১৫ই কার্তিক, বুধবার; ইংরেজি ১৯৫০ সালের ১লা নভেম্বর। ঘড়িতে সময় হয়েছিল রাত্রি আটটা বেজে পনেরো মিনিট।

                                        ©️রানা চক্রবর্তী©️

মন্তব্য করুন

ব্লগ