Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৩ নভেম্বর, ২০২৩ ০৭:০৯ অপরাহ্ণ

হিসাববিজ্ঞানের উৎপত্তি, ইতিহাস, শ্রেণিভাগ

হিসাববিজ্ঞান বা অ্যাকাউন্টিং হল কোন অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান, যেমন ব্যবসায় বা সংঘবদ্ধ দলের আর্থিক ও অনার্থিক তথ্য পরিমাপণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং যোগাযোগের একটি মাধ্যম। আকাউন্টিঙের আধুনিক শাখাটি প্রতিষ্ঠিত হয় বেনেডিক্ট কটরুলজেভিক কর্তৃক ১৪৫৮ খ্রিস্টাব্দে। যিনি একজন ব্যবসায়ী, কুটনীতিক, বিজ্ঞানী এবং অর্থনীতিবিদ ছিলেন। তাঁর সাথে ছিলেন দুব্রভনিক (ক্রোয়েশিয়া) ও ইতালিয়ান গণিতবিদ লুকা প্যাসিওলি। ১৪৯৪ খ্রিস্টাব্দে ব্যবসায়ের ভাষা হিসেবে স্বীকৃত হিসাববিজ্ঞান প্রতিষ্ঠানের আর্থিক কর্মকান্ডের ফলাফল পরিমাপ করে এবং এই তথ্য বিভিন্ন ধরনের ব্যবহারকারীর ( বিনিয়োগকারী, ঋণদাতা, ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার) কাছে দিয়ে থাকে। হিসাববিজ্ঞান চর্চাকারীগণকে হিসাববিদ বলা হয়। হিসাববিজ্ঞান ও আর্থিক প্রতিবেদনকরণ প্রায় সমার্থক হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

পণ্য ক্রয়, বিক্রয়, মজুদকরণ, হিসাব নিকাশ, মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনাসহ ব্যবসায়ের অন্যান্য হিসাব সংরক্ষণের জটিল এবং ক্লান্তিকর কাজগুলো আজকাল কম্পিউটার সফটওয়্যারের সাহায্যে অনেক দ্রুততার সাথে করা যায়। এই সফটওয়্যারগুলো সচরাচর প্রত্যেকটি প্রধান কার্যক্রমের সাথে অন্তর্নিহিতভাবে সংযুক্ত থাকে; এতে করে একটি তথ্য প্রবেশ করালে তা সমস্ত হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। এই সফটওয়্যারগুলো দিয়ে একজন কর্মী প্রায় ২০০ মানুষের কাজ একাই করে ফেলতে পারে। এই ধরনের একাউন্টিং সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানের কাজ অনেক সহজ করে দেয় এবং এতে করে পণ্য ও সেবার গুণগত মান বৃদ্ধি এবং অর্থ সাশ্রয় হয়।

হিসাববিজ্ঞান প্রায় হাজার বছর ধরে চর্চিত একটি বিদ্যা। প্রাচীন মেসোপটেমিয়া সভ্যতায় উৎপাদিত ফসল এবং মন্দিরে সংগৃহীত শস্যের হিসাব রাখার জন্য হিসাববিজ্ঞানের প্রাচীনতম পন্থাগুলো ব্যবহৃত হতো।

হিসাববিজ্ঞানের উৎপত্তি

এই বৈজ্ঞানিক হিসাবশাস্ত্রের প্রচলন করেছিলেন ইতালীয় রেনেসাঁসময়ের গণিতজ্ঞ ও ধর্মযাজক লুকা প্যাসিওলি। লুকা প্যাসিওলি ছিলেন লিওনার্দো দা ভিঞ্চি’র একজন নিকটতম বন্ধু ও গৃহশিক্ষক এবং ইতালীয় নাবিক ক্রিস্টোফার কলম্বাস এর সমসাময়িক। লুকা প্যাসিওলির ১৪৯৪ সালের মূলপাঠ ল্যাটিন ভাষায় (summa de Arithmatica Geometrica proportionet proportionalita) সুম্মা ডি এরিথিমেটিকা, জিওমেট্রিকা প্রপোরসোনিয়েট প্রোপোরসনালিটাতে এই প্যাসিওলি বর্ণনা করেন দু'তরফা দাখিলা পদ্ধতি যেটা নিশ্চিত করে অর্থনৈতিক তথ্য রেকর্ড করা হয় দক্ষতার সাথে এবং যথাযথভাবে। লুকা প্যাসিওলির স্বর্ণসূত্র দ্বারা খুব সহজেই সম্পদ, দায়, আয়, ব্যায় এর ডেবিট-ক্রেডিট নির্ণয় করা যায়।]

ইতিহাস

অতি প্রাচীনকাল থেকে মানুষ লেনদেনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে ও বিভিন্নভাবে তা সংরক্ষণের উপায় বের করে । দক্ষিণ আফ্রিকার একটি প্রাচীন গুহা থেকে উদ্ধারকৃত কিছু লিপি থেকে বোঝা যায় যে প্রায় ৭৬,০০০ বছর আগেও মানুষ হিসাব সংরক্ষণের চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছিল। এটি ছিল হিসাববিজ্ঞানের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রাচীন নিদর্শন।

হিসাববিজ্ঞানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শনগুলি পাওয়া যায় ব্যাবিলনিয়, এশিরীয় ও সুমেরীয় সভ্যতায়। এই সভ্যতাগুলো প্রায় ৭,০০০ বছর পূর্বে মেসোপটেমিয়া নদীর তীরে গড়ে ওঠে এবং বিকাশ লাভ করে। উক্ত সভ্যতার লোকেরা শুধুমাত্র কৃষি উৎপাদন পরিমাপ করতেই হিসাবের আদিম পদ্ধতিগুলো ব্যবহার করত। সেই আদিম পদ্ধতিগুলো ব্যবহার করে ফসল গত বছরের তুলনায় কম হয়েছে না বেশি হয়েছে তা নির্ণয় করা যেতো। উৎপাদিত ফসলের একটি অংশ মন্দিরে দান করতে হতো। আর কে কতোটুকু দান করল মন্দির কর্তৃপক্ষ তা দেওয়ালে চিহ্নের মাধ্যমে লিখে রাখতো। এই প্রাচীন দেওয়াল খোদাইগুলোকেও হিসাববিজ্ঞানের প্রাচীন প্রচেষ্টা বলা যেতে পারে।

শ্রেণিভাগ

আর্থিক হিসাববিজ্ঞান

নিম্ন ও উচ্চ মূল্যহ্রাস ও মূল্যবৃদ্ধিকালে নামমাত্র আর্থিক এককে (ঐতিহাসিক ব্যয় হিসাববিজ্ঞান বা ঐব্যয়হি) কিংবা আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিবেদনের নীতিমালা (International Financial Reporting Standards) অনুযায়ী অত্যুচ্চ মূল্যবৃদ্ধিকালে ধ্রুব ক্রয়ক্ষমতাসম্পন্ন এককে (ধ্রুব ক্রয়ক্ষমতা হিসাববিজ্ঞান বা ধ্রুবক্রয়হিসাব বিজ্ঞান) অর্থায়িত মূলধন রক্ষণাবেক্ষণকে আর্থিক হিসাববিজ্ঞান বলা হয়। আর্থিক হিসাববিজ্ঞান ঐব্যয়হি বা ধ্রুক্রয়হি অনুসারে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক তথ্যাবলির প্রতিবেদন তৈরি করে তা বহিঃস্থ ব্যবহারকারীদের, যেমন বিনিয়োগকারী, পরিচালকবৃন্দ এবং সরবারহকগণের নিকট উপস্থাপন করার উপর গুরুত্বারোপ করে। এটি সর্বজনগ্রাহ্য হিসাববিজ্ঞান নীতিমালা বা সহিনী (Generally accepted accounting principles or GAAP) অনুসারে বহিঃস্থ ব্যবহারকারীদের জন্য ব্যবসায়িক লেনদেন পরিমাপ ও সংরক্ষণ এবং আর্থিক বিবরণী প্রস্তুত করে থাকে।[৩] সহিনী তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক হিসাববিজ্ঞানের মধ্যকার বৃহৎ মতৈক্য হতে ধারাবাহিকভাবে উৎপন্ন হয়েছে, যা সিদ্ধান্তপ্রণেতাদের প্রয়োজনানুযায়ী কালক্রমে পরিবর্তিত হয়।]

আর্থিক হিসাববিজ্ঞানের সাহায্যে সাধারণত বাৎসরিক বা অর্ধবাৎসরিক সময়ের ভিত্তিতে কোনো প্রতিষ্ঠানের পূর্বকালীন প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়ে থাকে। যেমন, ২০০৬ সনে প্রস্তুতকৃত আর্থিক বিবরণী বর্ণনা করবে ২০০৫ সনের আর্থিক অবস্থা।

ব্যবস্থাপনা হিসাববিজ্ঞান

ব্যবস্থাপনা হিসাববিজ্ঞান সে সকল তথ্যাদি পরিমাপণ, সংরক্ষণ ও বিবরণের উপর গুরুত্বারোপ করে যেগুলি ব্যবস্থাপকদেরকে তাদের প্রতিষ্ঠানের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করে। ব্যবস্থাপনা হিসাববিজ্ঞানে ব্যয়-উপযোগিতা বিশ্লেষণ অনুযায়ী অভ্যন্তরীণ হিসাবনিকাশ ও বিবরণী তৈরি করা হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে সহিনী অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক নয়।

ব্যবস্থাপনা হিসাববিজ্ঞান ভবিষ্যৎ সময়ের জন্য বিবরণী প্রস্তুত করে থাকে, যেমন ২০০৬ সনের বাজেটটি ২০০৫ সনে প্রণয়ন করাটা এ ধরনের হিসাববিজ্ঞানের কাজ। এক্ষেত্রে, সময়ের পরিসীমা ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়ে থাকে। এরূপ বিবৃতিতে আর্থিক ও অনার্থিক, দু'ধরনের তথ্যই থাকতে পারে এবং উদাহরণস্বরূপ বিশেষ কোনো পণ্য বা বিভাগের উপর গুরুত্বারোপ করা হতে পারে।


মন্তব্য করুন