সহকারী শিক্ষক
০৮ নভেম্বর, ২০২৩ ০৮:২৮ অপরাহ্ণ
ঘূর্ণিঝড় কি? এটি কিভাবে তৈরি হয়? এর নামকরণ কিভাবে করা হয়?
ঘূর্ণিঝড় কি?
ঘূর্ণিঝড় হলো সমুদ্রে সৃষ্ট বৃষ্টি, বজ্র ও প্রচণ্ড ঘূর্ণি বাতাস সংবলিত আবহাওয়ার একটি নিম্ন-চাপ প্রক্রিয়া যা নিরক্ষীয় অঞ্চলে উৎপন্ন তাপকে মেরু অঞ্চলের দিকে প্রবাহিত করে। এই ধরনের ঝড়ে বাতাস প্রবল বেগে ঘুরতে ঘুরতে ছুটে চলে বলে এর নামকরণ হয়েছে ঘূর্ণিঝড়।
ঘূর্ণিঝড় কিভাবে তৈরি হয়?
ঘূর্ণিঝড় তৈরি হওয়ার জন্য নিম্নলিখিত বিষয়গুলি প্রয়োজন:
- সমুদ্রের উপরিতলের তাপমাত্রা ২৬.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি।
- উচ্চ আর্দ্রতা।
- বায়ুমণ্ডলের উপরের স্তরে শীতল বাতাস।
এই বিষয়গুলি যখন একত্রিত হয়, তখন সমুদ্রের উপরের স্তরের উষ্ণ বাতাস হালকা হয়ে ওপরে উঠে যায়। এর ফলে নিচের স্তরের বাতাসের চাপ কমে যায়। এই চাপের তারতম্য পূরণ করতে আশেপাশের এলাকা থেকে বাতাস প্রবল বেগে ছুটে আসে। এই বাতাসগুলো ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে ঘুরতে থাকে এবং একটি নিম্নচাপ কেন্দ্র গঠন করে। এই নিম্নচাপ কেন্দ্রের চারপাশে বাতাস ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে প্রবল বেগে ঘুরতে থাকে। এই ঘূর্ণন বায়ুমণ্ডলের উপরের স্তরে থাকা জলীয় বাষ্পকে উপরে উঠতে সাহায্য করে। এই জলীয় বাষ্প ঘনীভূত হয়ে বৃষ্টিপাত ঘটায়।
ঘূর্ণিঝড় কত প্রকার ও কত ধরনের হয়?
ঘূর্ণিঝড়ের আকার ও শক্তি বিভিন্ন রকম হতে পারে। ছোট ঘূর্ণিঝড়ের ব্যাস কয়েক কিলোমিটার হতে পারে, কিন্তু বড় ঘূর্ণিঝড়ের ব্যাস কয়েকশো কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে।
ঘূর্ণিঝড় প্রধানত চার প্রকার:
- নিম্নচাপ – বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ১১৯ কিলোমিটারের কম হলে একে “নিম্নচাপ” বলা হয়।
- ঝড় – বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ১১৯ কিলোমিটারের থেকে ১৫৩ কিলোমিটার গতিবেগ হলে একে “ঝড়” বলা হয়।
- তীব্র ঝড় – বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ১৫৩ কিলোমিটারের থেকে ২৪৯ কিলোমিটার গতিবেগ হলে একে “তীব্র ঝড়” বলা হয়।
- হাইপার সাইক্লোন – বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ২৪৯ কিলোমিটারের বেশি গতিবেগ হলে একে “হাইপার সাইক্লোন” বলা হয়।
ঘূর্ণিঝড়ের ধরন নির্ধারণ করা হয় বাতাসের গতিবেগ এবং কেন্দ্রের চাপের পরিবর্তনের উপর ভিত্তি করে।
উপকূলীয় অঞ্চলগুলিতে ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব সবচেয়ে বেশি হয়। ঘূর্ণিঝড়ের কারণে বৃষ্টিপাত, বন্যার পাশাপাশি প্রবল বাতাস, জলোচ্ছ্বাস, বিদ্যুৎ বিভ্রাট ইত্যাদি ঘটতে পারে। এছাড়াও, ঘূর্ণিঝড়ের কারণে ভবন ধ্বংস, গাছপালা উপড়ে পড়া, যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ইত্যাদি ঘটতে পারে।
ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ কিভাবে করা হয়?
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (WMO) ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ করে থাকে। ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ করার জন্য বিভিন্ন দেশের নাম ব্যবহার করা হয়। উদাহরণস্বরূপ, ভারত মহাসাগরের ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ করা হয় আটটি দেশের নামের তালিকা থেকে। এই আটটি দেশ হলো বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, মায়ানমার, মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড এবং ওমান।
ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ একটি নিয়ম অনুসারে করা হয়। প্রথমে, ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ করার জন্য একটি তালিকা তৈরি করা হয়। এই তালিকায় বিভিন্ন দেশের প্রদত্ত নাম থাকে। প্রতি বছর একটি নতুন তালিকা তৈরি করা হয়।
যখন একটি ঘূর্ণিঝড় তৈরি হয়, তখন তালিকার প্রথম নামটি ব্যবহার করা হয়। ঘূর্ণিঝড় যদি আবার আসে, তাহলে তালিকার দ্বিতীয় নামটি ব্যবহার করা হয়। এভাবেই তালিকায় থাকা নামগুলো ব্যবহার করা হয়। যখন তালিকায় থাকা সব নাম ব্যবহার শেষ হয়ে যায়, তখন আবার নতুন তালিকা তৈরি করা হয়।
ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ করার উদ্দেশ্য হলো ঘূর্ণিঝড়টিকে সহজে চিহ্নিত করা এবং জনসাধারণকে সচেতন করা। যখন ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ করা হয়, তখন মানুষ ঘূর্ণিঝড়টিকে চিনতে পারে এবং সতর্কতা অবলম্বন করতে পারে।
আরোও পড়ুন
আগ্নেয়গিরি কি ? কত প্রকার ? কিভাবে তৈরি হয় ?
ঘূর্ণিঝড়ের এবং হ্যারিকেনের মধ্যে পার্থক্য কি?
ঘূর্ণিঝড় এবং হ্যারিকেন একই ধরনের আবহাওয়ার ঘটনা। এগুলো সবই সমুদ্রে সৃষ্ট বৃষ্টি, বজ্র ও প্রচণ্ড ঘূর্ণি বাতাস সংবলিত আবহাওয়ার নিম্ন-চাপ প্রক্রিয়া। তবে, এই দুটি শব্দের ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিছু পার্থক্য রয়েছে।
ঘূর্ণিঝড় হলো একটি সাধারণ শব্দ যা সমস্ত ধরণের ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড়কে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। হ্যারিকেন হলো একটি নির্দিষ্ট ধরণের ক্রান্তীয় ঘূর্ণিঝড় যা উত্তর-পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগর এবং উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরের একটি অংশে ঘটে।
ঘূর্ণিঝড়ের বৈশিষ্ট্যগুলি হল:
- এটি সমুদ্রে সৃষ্টি হয়।
- এটিতে প্রচণ্ড বাতাস থাকে।
- এটিতে বৃষ্টিপাত হয়।
- এটিতে বজ্রপাত হয়।
- এটি একটি নিম্নচাপ কেন্দ্র গঠন করে।
হ্যারিকেনের বৈশিষ্ট্যগুলি হল:
- এটি উত্তর-পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগর এবং উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরের একটি অংশে ঘটে।
- এর বাতাসের গতিবেগ ঘণ্টায় ৭৪ কিলোমিটার বা তার বেশি হয়।
- এটিতে প্রচণ্ড বাতাস থাকে।
- এটিতে বৃষ্টিপাত হয়।
- এটিতে বজ্রপাত হয়।
- এটি একটি নিম্নচাপ কেন্দ্র গঠন করে।
সুতরাং, ঘূর্ণিঝড় এবং হ্যারিকেন একই ধরনের আবহাওয়ার ঘটনা, তবে হ্যারিকেন হলো একটি বিশেষ অঞ্চলের ঘূর্ণিঝড়ের একটি বিশেষ ধরণ।
৫৩
৯১ মন্তব্য