Loading..

ব্লগ

রিসেট

২১ নভেম্বর, ২০২৩ ০৯:৪৫ অপরাহ্ণ

নতুন শিক্ষাক্রম অবশ্যই একটি স্মার্ট কারিকুলাম

২০৪১ সালের স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার লক্ষে ২০২৩ সালের নতুন চমক বা মাইল ফলক হল নতুন জাতীয় শিক্ষা নীতি ২০২২।রাষ্ট্র কর্তৃক নতুন শিক্ষানীতি প্রবর্তন করা হয় এবং এ বছর থেকে তা দেশ ব্যাপী বাস্তবায়ন করা হয়।ইতোমধ্যে দেশের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সংশ্লিষ্ট সবাই এই শিক্ষা নীতি তথা শিক্ষাক্রমের সাথে পরিচিত হয়েছেন।যদিও বিষয়টা বর্ষাকালের জলের মত ঘোলাটে হলেও ধীরে ধীরে তা আশ্বিন মাসের স্বচ্ছ জলের মত পরিস্কার হতে চলছে।ইতোমধ্যে দেশব্যাপী ৮ম ও ৯ম শ্রেণির শিক্ষাক্রমের বিস্তরণের লক্ষে মাস্টার ট্রেইনার প্রশিক্ষণ তথা TOT Training অনুষ্ঠিত হয়।এ শিক্ষাক্রমের উল্লেখযোগ্য অনেক পরিবর্তন থাকলেও মাধ্যমিক স্তরের প্রেক্ষাপটে তিনটি বিষয়ে ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়েছে।১)পাঠ্য পুস্তক ২)শিখন - শেখানো প্রক্রিয়া ও কৌশল ৩)মূল্যায়ন ব্যবস্থা।
পাঠ্যপুস্তক ঃ গতানুগতিক ধারার পাঠ্য বইয়ের স্থলে আনা হয়েছে ব্যাপক পরিবর্তন। সময়ের চাহিদা অনুযায়ী উপযুক্ত, দক্ষ,মানবিক এবং বিশ্বমানের নাগরিক গড়াই মূল উদ্দেশ্যে পাঠ্য বইয়ের কন্টেন্ট বা বিষয়বস্তুসমূহ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।একটি আদর্শ পাঠ্যপুস্তকের বৈশিষ্ট্য বলতে গেলে বলতে হবে ১) সমস্যা নির্ভর পাঠ্যপুস্তক যা শিক্ষক ও শিক্ষার্থীকে সক্রিয় রাখে।২)মুখস্থনির্ভরতাকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।৩)শিক্ষার্থীরা হাতে কলমে অর্থাৎ করে করে (learning by doing)শিখবে।৩)বইগুলো পূর্বজ্ঞান ও যোগ্যতার ভিত্তিতে রচিত।অর্থাৎ ৬ষ্ঠ শ্রেণির জ্ঞান ও যোগ্যতার সাথে সুস্পষ্ট লিংক বা সংযোগ রয়েছে ৭ম ,৮ম ও ৯ম শ্রেণির পাঠ্য বইয়ে। এভাবে প্রতেকটি শ্রেনিতে যদি পূর্ববর্তী শ্রেনির জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার সংযোগ রাখা হয় তবে তা নিঃসন্দেহে একটি উত্তম মানের পাঠ্যপুস্তক। ৫)পাঠ্য বইগুলো সহজ সরল এবং আকর্ষনীয় ও বোধগম্য।
শিখন-শেখানো প্রক্রিয়া ও কৌশল ঃ নতুন শিক্ষাক্রম ২০২২ এর শিখন প্রক্রিয়া সম্পর্কে আলোচনা করতে গেলে বলতে হয় আমেরিকান মনোবিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদ প্রফেসর David Kolb এর শিক্ষা তত্ত্ব EBLS ( Experience Base Learnig System) এর আলোকে প্রণীত। এটি ১৯৮৪ সালে প্রকাশিত হয়।Experiential Learning (EL থিওরি) বা অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিখনের মূল কথা হল Learning by doing. অর্থাৎ শিক্ষার্থী কোন কাজ করে করে শিখবে।শিক্ষার্থীর চাহিদা,রুচি ও সামর্থ্য অনুযায়ী ধাপে ধাপে বিভিন্ন অভিজ্ঞতার মাধ্যমে পরিচালিত শিখনকে অভিজ্ঞতা ভিত্তিক শিখন বলা হয়।এর মূল কথা হল বিষয়বস্তুকে নানা ধরনের কাজের মাধ্যমে পরিবেশন করা। শিক্ষার্থী সেই কাজে সক্রিয় ভাবে অংশ নেবে এবং অভিজ্ঞতা অর্জনের মাধ্যমে শিখবে।যেমন চিড়িয়াখানা সম্পর্কে শিখন হল চিড়িয়াখানায় যেয়ে পর্যবেক্ষণ করা,নতুন ধারণা নেয়া এবং সক্রিয় পরীক্ষণ করা।যেমন সাঁতার শিখতে হলে লার্নিং বাই ডুয়িং প্রক্রিয়ায় শিখতে হবে। kolb এর শিখন তত্ত্বে ৬টি মূল নীতি বা ধাপ আছে।তবে সমন্বিত করে ৪টি ধাপে শিখন চক্রাকারে আবর্তিত হয় ১)বাস্তবঅভিজ্ঞতা২)প্রতিফলনমূলক পর্যবেক্ষণ ৩)বিমূর্ত ধারণায়ন ৪)সক্রিয় পরীক্ষণ।শিক্ষার্থী এই চক্র সম্পন্ন করার মাধ্যমে শিখনের দিকে অগ্রসর হয়।
১। বাস্তব অভিজ্ঞতা (concrete experience) ঃ এ ক্ষেত্রে শিখন প্রক্রিয়াটি একটি মূর্ত বা বাস্তব অভিজ্ঞতা গ্রহণের মধ্য দিয়ে শুরু হয়।ইতোমধ্যে ঘটে যাওয়া কোন ঘটনার পুনরায় কল্পনা করার জ্ঞান।যেমন গান, নাচ, সাঁতার, সাইকেল চালানো প্রভৃতি শব্দগুলো বললে আমাদের মস্তিষ্কে এক ধরনের অভিজ্ঞতার সৃষ্টি হয়।যা বাস্তব অভিজ্ঞতা।
২। প্রতিফলনমূলক পর্যবেক্ষণ /চিন্তনশীল অবলোকন (Reflective observation) ঃ বাস্তব অভিজ্ঞতায় নিযুক্ত হবার পরে শিক্ষার্থীর কাজের প্রতিফলনের পর্যায় শুরু হয়।এ ক্ষেত্রে,নানান পদক্ষেপ গ্রহন করে শিক্ষার্থী অনুধাবনমূলক পর্যবেক্ষণ করে। এ পর্যায়ে বিভিন্ন প্রশ্নের উদ্রেক হয় এবং অপরের সাথে অভিজ্ঞতার আদান- প্রদান হয়।যেমন নাচ শিখতে যেয়ে শিক্ষককে পর্যবেক্ষণ করা, তাকে অনুসরণ করা, অনুকরণ করা,প্রশ্ন করে করে জানতে চাওয়া।
৩।বিমূর্ত ধারণায়ণ (Abstract conceptualisation) ঃ শিখনের এ ধাপে শিক্ষার্থী নতুন ধারণা আয়ত্ত করে পূর্ববর্তী জ্ঞানের প্রতিফলন ঘটাবে।নতুন ধারণা প্রয়োগ করে নতুন সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।যেমন নাচের শিক্ষার্থী নতুন আইডিয়া ব্যবহার করে নাচতে পারবে।
৪।সক্রিয় পরীক্ষণ Active experiment)ঃ শিখনের এ পর্যায় হচ্ছে পরীক্ষা পর্যায়।শিক্ষার্থী নতুন ধারণায় আসার পর তা বাস্তবায়ন করতে পারা।অর্জিত জ্ঞান নতুন পরিস্থিতিতে প্রয়োগ করতে পারবে।প্রয়োজনে তা পরিবর্তন, পরিমার্জন,পরিবর্ধন করতে পারবে।যেমন নাচের শিক্ষার্থী এবার নতুন ভাবে যে কোন নাচ নিজে তুলতে পারবে।
উল্লেখ্য যে,এই অভিজ্ঞতা চক্রের মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থীর জন্য নির্ধারিত যোগ্যতাসমূহ অর্জন করবে।অর্থাৎ যোগ্যতা নির্ভর শিক্ষা অভিজ্ঞতা ভিত্তিক শিখনের মাধ্যমে অর্জিত হবে।
যোগ্যতা চক্রঃ ১ ) জ্ঞান৷ ২) দক্ষতা ৩) মূল্যবোধ ৪) দৃষ্টিভঙ্গি ।যোগ্যতাকে কেন্দ্র করে এই ৪টি বিষয় আবর্তিত হয়। অর্থাৎ যোগ্যতার প্রেক্ষাপট হল - জ্ঞান, দক্ষতা, মূল্যবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গি। এই চারটি স্তর মিলেই যোগ্যতা। আবার বলা হয় এই জ্ঞান,দক্ষতা,মূল্যবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গি প্রত্যেকটা এক একটি আলাদা যোগ্যতা।
যেমন- ১।একজন ব্যক্তির খাদ্য ব্যবসা সম্পর্কে জ্ঞান আছে ২। সুষ্ঠুভাবে সে ব্যবসা চালানোর দক্ষতা আছে।৩। কিন্তু সে ব্যক্তি যদি খাদ্যে ভেজাল ও ক্ষতিকর পদার্থ মিশিয়ে ব্যবসা করে তবে তার মূল্যবোধ ও দৃষ্টি ভঙ্গি সঠিক নয় বলে সে অযোগ্য। এক্ষেত্রে তার যোগ্যতা অর্জিত হবেনা।
শ্রেণি কক্ষে অভিজ্ঞতা ভিত্তিক শিখন ঃ
অভিজ্ঞতা ভিত্তিক শিখন ফলপ্রসূ করতে শিক্ষকের ভূমিকা অনস্বীকার্য। প্রচলিত ভাবমূর্তির উর্ধ্বে গিয়ে শিক্ষক হবেন শিক্ষার্থীর সহায়তাকারী। শিক্ষার্থীদের সাথে সাথে তিনিও হবেন একজন শিক্ষার্থী। তিনি শিক্ষার্থীদের জন্য সহায়তামূলক, একীভূত ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিখন পরিবেশ নিশ্চিত করবেন যাতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিখনে আগ্রহ ও উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়।এককথায় শ্রেণিকক্ষের শিখন পরিবেশ হবে শিক্ষার্থী কেন্দ্রিক, গনতান্ত্রিক ও সহায়তামূকক।শিক্ষক শিক্ষার্থীর আগ্রহ, প্রবণতা ও সবলতা বিবেচনা করে বিদ্যালয় ও বিদ্যালয়ের বাইরে অভিজ্ঞতামূলক শিখন কার্যক্রম পরিচালনা করবেন।
মূল্যায়নের নামে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আর অশুভ প্রতিযোগিতা নয়।সংশ্লিষ্ট পাঠ চলাকালে পারস্পরিক সহযোগিতামূলক পরিবেশে শিক্ষার্থী কাঙ্ক্ষিত যোগ্যতা অর্জন করতে ও প্রয়োগ করতে পারছে কিনা তা যাচাই করাই হল মূল্যায়ন ।এখন মূল্যায়নের উদ্দেশ্য কোন অশুভ প্রতিযোগিতাকে উসকে দেওয়া নয়।বরং সবাই মিলে একসাথে যোগ্যতা অর্জন করেছে কিনা তা দেখা এবং প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে তার নিজ অবস্থান থেকে একটু একটু সরিয়ে নেয়াই মূল্যায়নের উদ্দেশ্য।
মূল্যায়ন ব্যবস্থাঃ মূল্যায়ন দু'প্রকার।১)ধারাবাহিক বা শিখনকালীন মূল্যায়ন ২)সামষ্টিক মূল্যায়ন
শিখনকালীন মূল্যায়ন /ধারাবাহিক মূল্যায়ন /continuous assessment ঃ শিখন অভিজ্ঞতা (পাঠ) চলাকালীন নিয়মিত ফিডব্যাক প্রদান করার মাধ্যমে শিক্ষার্থীকে শিখনে সহায়তা করার প্রক্রিয়াই হল শিখনকালীন মূল্যায়ন। এর উদ্দেশ্য শিক্ষার্থীর যোগ্যতা অর্জনের মাত্রা নিরূপণ করা।শিক্ষককে শিখনকালীন মূল্যায়নের রেকর্ড রাখতে হবে এবং সামষ্টিক মূল্যায়নের সাথে সমন্বয় করে মূল্যায়ন ট্রান্সক্রিপ্ট তৈরি করতে হবে।এ মূল্যায়ন শিক্ষাবছর ব্যাপি চলতে থাকবে।শিক্ষক সহায়িকা বইয়ে নির্ধারিত যোগ্যতা সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞতা শেষে শিক্ষককে মূল্যায়ন করতে হবে।
সামষ্টিক মূল্যায়ন /Summative Evaluation ঃ ৬ মাস অন্তর অন্তর বছরে ২ বার সামষ্টিক মূল্যায়ন করার ব্যবস্থা আছে। শিক্ষার্থীর পরবর্তী শ্রেণি বা গ্রেডে উত্তরণের ক্ষেত্রে শিখনকালীন মূল্যায়ন ও সামষ্টিক মূল্যায়নে প্রাপ্ত উপাত্ত বিবেচনা করা হবে।এ মূল্যায়নের মাধ্যমে শিক্ষার্থীর পারদর্শিতার মাত্রা নিরূপণ করা হবে এবং ধারাবাহিক মূল্যায়নের সাথে সমন্বয় করে ট্রান্সক্রিপ্ট বা ফলাফল তৈরি করা হবে। এই ট্রান্সক্রিপ্ট দেখে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও অন্যান্য সবাই শিক্ষার্থীর সার্বিক অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে পারবে।
শিখনকালীন ও সামষ্টিক মূল্যায়ন এই দুই ক্ষেত্রেই কোন একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের নির্ধারিত যোগ্যতার কতটুকু অর্জন করতে পেরেছে তা নির্ধারণ করার সুবিধার্থে কিছু পারদর্শীতার সূচক বা PI নির্ধারণ করা হয়েছে।যেমন - নির্দিষ্ট একক যোগ্যতার অধীনে কিছু পারদর্শীতার সূচক আছে। এবং প্রত্যেকটি সূচকের জন্য তিনটি মাত্রা রয়েছে।মাত্রাগুলো হল—চতুর্ভুজ( ) , বৃত্ত ( ) এবং ত্রিভূজ( ) । নির্দিষ্ট যোগ্যতা যাচাইয়ে শিক্ষার্থী প্রারম্ভিক স্তরে থাকলে চতুর্ভুজ, মাঝামাঝি স্তরে থাকলে বৃত্ত এবং পারদর্শী স্তরে থাকলে ত্রিভুজ পাবে। মূল্যায়নের সময় শিক্ষার্থীর পারদর্শীতা দেখে শিক্ষক ঠিক করবেন যে শিক্ষার্থী ঐ সূচকের কোন মাত্রায় অবস্থান করছে।
কারিকুলামে ব্যবহৃত কয়েকটি সংক্ষিপ্ত শব্দঃ
NFC- National Curriculum Framework, (জাতীয় শিক্ষাক্রম রূপরেখা)
PI - Performance Indicator , PS- Performance Standard , EL-Experiential Learning.(চলমান)
All reactions:
19Sultan Mahmud, Wahid Shamim and 17 others

মন্তব্য করুন