Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৮ নভেম্বর, ২০২৩ ১১:০০ পূর্বাহ্ণ

নীরদচন্দ্র চৌধুরী মননশীল লেখক ও বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ------------------------------------

নীরদচন্দ্র চৌধুরী 

মননশীল লেখক ও বিশিষ্ট চিন্তাবিদ

----------------------------------------------------

নীরদচন্দ্র চৌধুরী একজন খ্যাতনামা দীর্ঘজীবী বাঙালি মননশীল লেখক ও বিশিষ্ট চিন্তাবিদ। স্কলার এক্সট্রাঅর্ডিনারী শীর্ষক ম্যাক্স মুলারের জীবনী লিখে ১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দে নীরদচন্দ্র চৌধুরী ভারত সরকার প্রদত্ত দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সাহিত্য সম্মাননা হিসেবে সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন।


 নীরদচন্দ্র চৌধুরী তার ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি ও তির্যক প্রকাশভঙ্গির জন্য বিশেষভাবে আলোচিত ছিলেন।


উপেন্দ্র নারায়ণ চৌধুরী ও সুশীলা সুন্দরী চৌধুরানীর ৮ সন্তানের মধ্যে দ্বিতীয় নীরদ চৌধুরী তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের অবিভক্ত বাংলা বর্তমান বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদীতে ১৮৯৭ খ্রিষ্টাব্দের ২৩ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। 


তিনি বাংলাদেশের কিশোরগঞ্জ এবং কলকাতায় পড়াশোনা করেছেন। এফএ পরীক্ষা পাশ করে তিনি কলকাতার রিপন কলেজে বর্তমান সুরেন্দ্রনাথ কলেজের অন্যতম বাঙালি লেখক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাথে একত্রে ভর্তি হন। 


এরপর নীরদ কলকাতার অন্যতম খ্যাতিমান স্কটিশ চার্চ কলেজে ইতিহাস বিভাগে ভর্তি হন। ১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন স্কটিস চার্চ কলেজের ছাত্র হিসেবে তিনি ইতিহাসে সম্মানসহ স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন এবং মেধা তালিকায় নিজের স্থান করে নেন।


 স্কটিশ চার্চ কলেজের সেমিনারে ভারতবর্ষের অতিপরিচিত ব্যক্তিত্ব ও ইতিহাসবেত্তা প্রফেসর কালিদাস নাগের সাথে অংশগ্রহণ করেন। স্নাতক ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স ডিগ্রিতে ভর্তি হন।


১৯২০-এর অনুষ্ঠিত এম. এ. পরীক্ষায় অংশ না নেয়ায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করতে পারেন নি। এখানেই তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ইতি। ইতোমধ্যে ১৯১৭ খ্রিষ্টাব্দে Objective Methods in History শিরোনামে একটি তাত্ত্বিক প্রবন্ধ রচনা করেন|


নীরদ চৌধুরীর কর্মজীবনের সূত্রপাত হয় ব্রিটিশ-ভারতীয় সেনাবাহিনীর হিসাবরক্ষণ অধিদপ্তরে একজন কেরাণী হিসেবে। চাকুরির পাশাপাশি একই সময়ে তিনি বিভিন্ন ধরনের প্রবন্ধ রচনা করতে থাকেন।


 জনপ্রিয় সাময়িকীগুলোতে নিবন্ধ পাঠানোর মাধ্যমে লেখার জগতে অংশগ্রহণ করতে শুরু করেন। তার প্রথম নিবন্ধটি ছিল অষ্টাদশ শতকের বিখ্যাত বাঙালি কবি ভারত চন্দ্রের উপর।


 এই নিবন্ধটি ঐ সময়ে কলকাতা থেকে প্রকাশিত বিখ্যাত ইংরেজি সাময়িকী "মডার্ন রিভিউ"-তে স্থান পায়। ইতোমধ্যে ১৯২৪ সালে তার মাতা সুশীলা সুন্দররানী চৌধুরানী পরলোকগমন করেন।


নীরদ চৌধুরী হিসাবরক্ষণ অধিদপ্তর থেকে অল্প কিছুদিন পরই চাকুরি ত্যাগ করেন এবং সাংবাদিক ও সম্পাদক হিসেবে নতুন কর্মজীবন শুরু করেন। 


ঐ সময়ে কলকাতা কলেজ স্কয়ারের কাছাকাছি মির্জাপুর স্ট্রিটে অন্যতম লেখক - বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ও দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদারের সাথে একত্রে বোর্ডার হিসেবে ছিলেন। 


তিনি তখনকার সময়ে অত্যন্ত জনপ্রিয় ইংরেজি ও বাংলা সাময়িকী হিসেবে মডার্ন রিভিউ, প্রবাসী এবং শনিবারের চিঠিতে সম্পাদনা কর্মে সম্পৃক্ত ছিলেন। এছাড়াও, তিনি দুইটি ক্ষণস্থায়ী অথচ উচ্চস্তরের সাময়িকী - সমসাময়িক এবং নতুন পত্রিকা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। 


১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দে দ্য মডার্ন রিভিউ পত্রিকায় রমানন্দ চ্যাটার্জির অধীনে সহকারী সম্পাদকের চাকুরি গ্রহণ করেন। ১৯২৭-এ বাংলা সাময়িকী শনিবারের চিঠি সম্পাদক পদের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এ বছরই রবীন্দ্রনাথের সাথে তার সৌজন্য সাক্ষাৎ ঘটে।


নীরদ চৌধুরী ১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দে লেখিকা অমিয়া ধর পরবর্তীতে অমিয়া চৌধুরানীর সঙ্গে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন। তাদের সংসারে তিনটি পুত্র সন্তানের জন্ম হয়। 


নীরদ চৌধুরীর মধ্যম পুত্র কীর্তি নারায়ণ চৌধুরী খ্যাতনামা ইতিহাসবিদ। জ্যেষ্ঠ পুত্র ধ্রুব নারায়ণ পিতার অনেক অপ্রকাশিত লেখা সম্পাদনা করে প্রকাশ করেছেন। পৃথ্বী তাদের কনিষ্ঠ সন্তান।


১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দে নীরদচন্দ্র চৌধুরী ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে সংশ্লিষ্ট রাজনীতিবিদ শরৎ চন্দ্র বসুর একান্ত সচিব হিসেবে চাকুরি গ্রহণ করেন। ফলশ্রুতিতে তিনি খ্যাতিমান মহাপুরুষ যেমন: মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহরু, নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু-সহ অনেক খ্যাতিমান রাজনৈতিক নেতাদের সংস্পর্শ পান।


 ভারতীয় রাজনীতির অভ্যন্তরে কাজ করার দরুন ও রাজনীতির সাথে নিবীড় ঘনিষ্ঠতা থাকায় ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের চূড়ান্ত পরিণতি সম্বন্ধে সন্দিহান হন। 


নীরদ চন্দ্র চৌধুরী স্বাধীনতা আন্দোলনে সংশ্লিষ্ট ভারতীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। এ পর্যায়ে তিনি বাংলা ভাষায় লেখালিখি ছেড়ে দেন।


সচিব হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি নীরদচন্দ্র চৌধুরী বাংলা ও ইংরেজি দৈনিক, সাময়িকীগুলোতে প্রবন্ধ রচনা প্রকাশ করতে থাকেন। এছাড়াও, তিনি অল ইন্ডিয়া রেডিও'র (এআইআর) কলকাতা শাখার রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন।


১৯৪১ খ্রিষ্টাব্দে নীরদ চৌধুরী অল ইন্ডিয়া রেডিও'র দিল্লী শাখায় কর্মজীবন শুরু করেছিলেন। বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, প্রখ্যাত সম্পাদক, ঐতিহাসিক এবং ঔপন্যাসিক খুশবন্ত সিং নীরদচন্দ্র চৌধুরী'র বন্ধু ছিলেন। 


The Autobiography of an Unknown Indian প্রকাশ করেন ১৯৫১ খ্রিষ্টাব্দে। ১৯৫৫-তে প্রথমবারের মতো বিদেশযাত্রা; এ দফায় তিনি ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও ইতালি ভ্রমণ করেন। A Passage to England প্রকাশ করেন ১৯৫৯ খ্রিষ্টাব্দে।


 এবং The Continent of Circe খ্রিষ্টাব্দে। ১৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দে ‘The Continent of Circe: An Essay on the Peoples of India’ বইটির জন্য "Duff Cooper Memorial" পুরস্কার লাভ করেন। The Intellectual in India প্রকাশিত হয় ১৯৬৭ খ্রিষ্টাব্দে।


নীরদ চৌধুরী ভারত ত্যাগ করে ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ডে পাড়ি জমান ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দে। এসময় Scholar Extraordinary বইটি লেখার কাজে হাত দেন। বইটি Scholar Extraordinary. The Life of Professor the Right Honourable Friedrich Max Muller, P.C. প্রচ্ছদনামে ১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত হয়।


 ইতোমধ্যে ভারতীয় জীবনযাত্রার এক অতি সুন্দর প্রতিচ্ছবি সংবলিত গ্রন্থ To Live or Not to Live প্রকাশিত হয় ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে। ১৯৭৫, ১৯৭৬ এবং ১৯৭৯ খ্রিষ্টাব্দে যথাক্রমে প্রকাশ করেন তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বই।


এগুলো হলো, Clive of India. A Political and Psychological Essay, Culture in the Vanity Bag. Clothing and Adornment in Passing and Abiding India এবং Hinduism. A Religion to Live By।


নীরদ চৌধুরীর মহান কীর্তি Thy Hand! Great Anarch! India: 1921—১৯৫২ নামীয় গ্রন্থটি। এই গ্রন্থটি ১৯৮৭ তে প্রকাশিত হয়। তখন তার বয়স নব্বুই।


 এ বয়সে তার দৈহিক এবং মানসিক কর্মক্ষমতা অটুট ছিল। পাণ্ডিত্য ও মণীষার স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় তাকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রী প্রদান করে। 


১৯৯২-এ ইংল্যান্ডের রাণী তাকে কমান্ডার অব দি অর্ডার অব ব্রিটিশ এম্পায়ার (সিবিই) উপাধি অর্পণ করেন।১৯৯৪ সালে তার স্ত্রী অমিয়া চৌধুরানীর দেহত্যাগ করেন।


১৯৯৯ খ্রিষ্টাব্দের ১লা আগস্ট  তৃতীয় সহস্রাব্দের প্রাক্কালে - ১০১ বৎসর বয়সে - নীরদচন্দ্র চৌধুরী অক্সফোর্ডে নিজ বাসগৃহে মৃত্যুবরণ করেন।


আজ  খ্যাতনামা দীর্ঘজীবী বাঙালি মননশীল লেখক ও বিশিষ্ট চিন্তাবিদ নীরদচন্দ্র চৌধুরীর জন্মদিন আজকের এই দিনে উনাকে গভীর শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা।

মন্তব্য করুন