প্রভাষক
২৮ নভেম্বর, ২০২৩ ১২:০২ অপরাহ্ণ
প্রভাষক
ভারতীয় সমাজের জাতিবর্ণ ব্যবস্থা (Caste
System)
জাতিবর্ণ প্রথাজাতিবর্ণ ব্যবস্থা হল এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে সমাজের সদস্যদের পেশার ভিত্তিতে নানা গোষ্ঠীতে ভাগ করা হয়েছে। এটি সামাজিক স্তরবিন্যাসের বদ্ধ রূপ যেখানে প্রতিটি জাতিবর্ণ একেকটি অন্তগোত্র বিবাহভিত্তিক যার সদস্যরা জন্মসূত্রে নিজ জাতির সদস্যপদ লাভ করে এবং যে যে বর্ণে জন্মগ্রহণ করে তাকে সে বর্ণেই থাকতে হয়।
আজকের আলোচনার বিষয় ভারতবর্ষে জাতিবর্ণ প্রথা – যা শ্রেণী ও জাতিবর্ণ স্তরবিভাজ এর অর্ন্তভুক্ত, এই অঞ্চলের হিন্দুদের মধ্যে এক ধরনের ভেদাভেদ প্রথার কথা উল্লেখ পাওয়া যায়। এই ব্যবস্থাতে বিশ্বাস করা হয় কোন মানুষ জন্মের সময়ই তাঁর সামাজিক অবস্থান নিয়ে আসেন। আর সেই অবস্থানটা বদলানো যায় না। এই বিশ্বাসের সাথে ধর্মীয় কিছু ব্যাখ্যাও প্রচলিত আছে। কিন্তু ভেদাভেদটা কেবল বিশ্বাসের নয়, সামাজিক অনুশীলনেও তা দেখা যায়। এটাকে নৃবিজ্ঞানীরা জাতিবর্ণ (caste) বলেছেন। কারো কারো মতে এটা সাব-কাস্ট (sub-caste)।
জাতিবর্ণ ব্যবস্থা ভারতীয় অঞ্চলের একটি বিশেষ সামাজিক সম্পর্ক। জাতিবর্ণ
ব্যবস্থা হল এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে সমাজের সদস্যদের পেশার ভিত্তিতে নানা গোষ্ঠীতে
ভাগ করা হয়েছে। তবে বিষয়টি এমন নয় যে কোন একটি সময়ে হটাৎ করে এটি শুরু হয়েছে। এরও একটি
নির্দিষ্ট ইতিহাস আছে। বলা যায় সমাজে প্রাথমিকভাবে শ্রেণি বিভাজন দেখা দেবার পর কয়েকশ
বছরের বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে ভারতীয় অঞ্চলে জাতিবর্ণ প্রথার ভিত্তিতে সামন্ততান্ত্রিক
ব্যবস্থার উদ্ভব হয়েছিল। আর্য সভ্যতার কোন একটি ঐতিহাসিক পর্যায়ে বর্ণ প্রথার উদ্ভব
হয়। বর্ণ প্রথায় সমাজের সদস্যদের সামাজিক কাজের ভিত্তিতে চারভাগে ভাগ করা হয়; যথা ব্রাহ্মণ,
ক্ষত্রিয়, বৈশ্য এবং শূদ্র। ব্রাহ্মণদের কাজ হল যাগ যজ্ঞ করা, ক্ষত্রিয়দের কাজ হল সমাজকে
বহিঃশত্রুর হাত থেকে রক্ষা করা বা যুদ্ধ করে রাজ্যের বিস্তার ঘটানো, বৈশ্যদের কাজ হল
ব্যবসা বাণিজ্য পরিচালনা করা এবং শূদ্রদের কাজ হল এই তিন বর্ণের সেবা করা।
প্রাথমিকভাবে খ্রীষ্টপূর্ব ১৫০০ শতক থেকে বর্ণ ব্যবস্থার যে বীজ দেখা দেয় তা আর্য অনার্য
গোষ্ঠীগুলির মধ্যে সংগ্রাম ও আত্তীকরণের মধ্যে দিয়ে নানা ভাঙন ও গঠনের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে
চলে। ফলে এমন উদাহরণও পাওয়া যায় যেখানে যোগ্যতার ভিত্তিতে নিম্ন বর্ণের সদস্য উচ্চবর্ণে
উন্নীত হয়েছে আবার তার উল্টোটাও ঘটেছে। তবে এই প্রথাকে দৃড় করবার লক্ষ্যে (নির্দিষ্ট
বর্ণে) জন্মের ভিত্তিতে পেশা নির্ধারণ ও অসবর্ণ বিবাহ বন্ধ করবার একটি প্রচেষ্টা উচ্চবর্ণের
(তৎকালীন সময়ের শোষকশ্রেণির) দিক থেকে বরাবরই চালু ছিল এবং বিভিন্ন শাস্ত্র ও সংস্কৃতিতেও
তার প্রকাশ ঘটেছে। যাইহোক আরোও পরবর্তী সময়ে বিশেষতঃ চতুর্থ শতক থেকে যে জাতিবর্ণ ব্যবস্থার
উদ্ভব ঘটে সেটি সপ্তম শতক নাগাদ একটি কঠোর সামাজিক বিভাজনের রূপ নেয়। জাতিবর্ণ ব্যবস্থায়
বর্ণগুলিকে বিশেষতঃ শূদ্রবর্ণকে পেশার ভিত্তিতে আবার বহু জাতিতে (caste) ভাগ করা হয়েছে
যেমন কামার, কুমোর, তাঁতী, জেলে, গোয়ালা ইত্যাদি। এই ব্যবস্থার বিশেষ বৈশিষ্টগুলি হল;
১) প্রতিটি জাতির জন্য পেশা নির্দিষ্ট।
২) জাতির বাইরে বিবাহ নিষিদ্ধ।
৩) জাতি পরিচয় ঠিক হয় জন্ম দিয়ে।
জাতিবর্ণ প্রথার আরও কিছু উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য-
বংশানুক্রমিতা
অন্তর্বিবাহ
সূচীবায়ুতা
বিধিনিষেধ
জাতির সামাজিক সচলতার অভাব
জাতির সর্বজনিনতা
জাতির অস্পৃশ্যতা
এই প্রথায় শূদ্রজাতির নীচে থাকে আর একটি বিরাট জনসমষ্টি যাদের অতিশূদ্র আখ্যা দেওয়া হয়। সমাজে এদের স্থান থাকে প্রায় দাসের স্তরে, ধর্মীয় আইনে এরা কোন ধরনের সম্পত্তির মালিক হতে পারে না, এদের দায়িত্ব হল গোটা গ্রামের সেবায় সবচেয়ে কষ্টকর কাজগুলি করা এবং একইসাথে অস্পৃশ্য বলে গ্রামের বাইরে বাস করা। বর্তমানে এরাই দলিত বলে পরিচিত। তাই জাতিবর্ণ ব্যবস্থার যে বিশেষ বৈশিষ্টটি মনোযোগ দিয়ে বোঝা দরকার তা হল যে এই সমাজে একজন কাপড় বোনে সেই কারণে তার পরিচয় তাঁতী নয়, সে তাঁতী এই কারণে যে সে তাঁতী জাতির ঘরে জন্ম নিয়েছে এবং সেই কারণে জন্মের মধ্যে দিয়ে তার পেশাও নির্দিষ্ট হয়ে গেছে। এই ব্যবস্থায় ব্রাহ্মণ সন্তান বিদ্যাচর্চায় অনুৎসাহী হলেও সে ব্রাহ্মণই থাকে এবং সে কখনই কৃষিকাজ সহ শূদ্রদের জন্য নির্দিষ্ট পেশার কাজে অংশগ্রহণ করতে পারবে না। তেমনি এই ব্যবস্থায় শূদ্র ও অতিশূদ্র জাতিগুলির বিদ্যাচর্চার কোন অধিকার নেই।
৭১
১৪৫ মন্তব্য