Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৭ ডিসেম্বর, ২০২৩ ০৯:৩৬ পূর্বাহ্ণ

ইসলামী রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে কিছু বুনিয়াদী নিতিমালা তুলে ধরা হয়েছে

ইসলামী রাষ্ট্রের বুনিয়াদী নীতিমালা 

ইসলামে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে কিছু বুনিয়াদী নীতিমালা রয়েছে, যার অনুসরণ আকান্ত আবশ্যক। কুরআন, সুন্নাহ ও খুলাফায়ে রাসেদীনের অনুসৃত আদর্শের আলোকে কিছু মূলনীতি নিম্নে তুলে ধরা হলোঃ 

১. ইসলামী রাষ্ট্র একটি আদর্শ ভিত্তিক দীনি রাষ্ট্র। ইসলামী জীবন দর্শনই এই রাষ্ট্রের সকল আইনের উৎস। এটি শুধু জাগতিক কোন সংগঠন নয়। বরং রাষ্ট্র ব্যবস্থাও ধর্মের অন্তর্ভুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। 

২. এ রাষ্ট্রের অন্যতম মূলনীতি হলো, এ বিশ্ব আল্লাহর এবং সৃষ্টিও তাঁরই। কাজেই শাসন ব্যবস্থা প্রণয়ন ও প্রবর্তনের অধিকারও তাঁরই। তাঁর শাসন ব্যবস্থা মেনে তাঁরই অনুগত হয়ে জীবন-যাপনের মধ্যেই মানুষের যথার্থ কল্যাণ নিহিত রয়েছে। সার্বভৌমত্বের মালিক একমাত্র আল্লাহ তা'আলা এবং বিধানদাতাও তিনিই।  কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছেঃ 

আকাশমণ্ডলী এবং পৃথিবীর সর্বময় কর্তৃত্ব (সার্বভৌমত্ব) তাঁরই। (সুরা হাদীদ, ৫৭ঃ ২) 

বিধানতাদাও তিনিই। এ প্রসঙ্গে কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছেঃ  হুকুম তো আল্লাহ তা'আলারই। (সুরা আন'আম, ৬ঃ ৫৭) এ ক্ষেত্রে তার কোন শরীক নেই। এরশাদ হয়েছেঃ 

এবং তিনি কাউকে নিজ হুকুমে শরীক করেন না। (সুরা কাহফ, ১৮ঃ ২৬)  আল্লাহর বিধানের বরখেলাফ করা জায়িয নেই। (রাসুলুল্লাহ (সাঃ) ইরশাদ করেনঃ 

আল্লাহ তা'আলা কিছু কিছু বিধান অপরিহার্য করে দিয়েছেন, তোমরা তা নষ্ট করো না; কিছু বিষয় হারাম সাব্যস্ত করেছেন, তোমারা তা করো না। এবং কিছু কিছু বিষয়ে সীমা নির্ধরণ করে দিয়েছেন, তা লংঘন করো না। 

সুতরাং ইসলামী রাষ্ট্রে এমন কোন আইন ও বিধান প্রণয়ন ও রচনা করা যাবে না, যা কুরআন-সুন্নাহ তথা ইসলামের পরিপন্থী। 

৩. হুকুমতের মূল মালিক আল্লাহ তা'আলা। তিনিই মানুষের প্রতি রাষ্ট্র পরিচালনার গুরু দায়িত্ব অর্পণ করেছেন। মানুষের উপর অর্পিত এই দায়িত্ব প্রতিনিধিত্ব মূলক দায়িত্ব। এটি একটি পবিত্র আমানত। এ কারো উত্তরাধিকারী সম্পদ নয় এবং তা শক্তির মাধ্যমে হাসিল করার মতো বিষয়ও নয়। 

৪. খলীফা বা রাষ্ট্রপ্রধান হওয়ার জন্য পদ প্রার্থনা করা সমীচীন নয়। কেউ যদি তা পার্থনা করে তবে তাকে তা দেওয়া হবে না। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) হযরত আব্দুর রহমান এবন সামুরা (রাঃ)- কে লক্ষ্য করে বলেনঃ 

হে আব্দুর রহমান! তুমি আমীর হওয়ার জন্য পার্থনা করো না। কেননা, যদি তা তোমাকে চাওয়ার পর প্রদান করা হয় তবে এর দায়-দায়িত্ব তোমাকেই বহন করতে হবে। আর যদি না চাওয়া অবস্থায় তোমাকে তা প্রদান করা হয়, তবে এ বিষয়ে তুমি সাহায্যপ্রাপ্ত হবে। 

৫. মা'রুফ তথা ভাল কাজেই খলীফা বা সরকারের আনুগত্য অপরিহার্য। পাপাচারে আনুগত্য পাওয়ার অধিকার কারো নেই। এ মূলনীতির তাৎপর্য হলো, সরকার এবং সরকারী কর্মকর্তাদের কেবল সে সব নির্দেশই তাদের অধীনস্ত ব্যক্তিবর্গের মেনে চলা ওয়াজিব, যা আইনানুগ। আইনের বিরুদ্ধে নির্দেশ দেওয়ার অধিকার কারো নেই এবং তা মেনে চলা কারো জন্য অপরিহার্যও নয়।  রাসুলুল্লাহ (সাঃ) ইরশাদ করেনঃ 

একজন মুসলমানের উপর তার আমীরের কথা শোনা এবং মেনে চলা অপরিহার্য। তা তার পসন্দ হোক বা না হোক; যতখণ তাকে কোন পাপাচারের নির্দেশ না দেওয়া হয়। পাপাচারের নির্দেশ দেওয়া হলে আর কোন আনুগত্য নেই।  তিনি আরো ইরশাদ করেনঃ  আল্লাহ নাফরমানীমূলক কাজে কোন আনুগত্য নেই। আনুগত্য কেবল মা'রূফ তথা ভাল কাজেই। 

৬. ইসলামী রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি হলো, তা শূরা ভিত্তিক পরিচালিত হবে। অর্থাৎ যারা রাষ্ট্রীয় বিষয়ে প্রজ্ঞাবান তাঁদের সাথে পরামর্শ করে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকাণ্ড আঞ্জাম দিতে হবে। পরামর্শ করে কাজ করার প্রতি কুরআন ও হাদীসে বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। 

কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছেঃ 

এবং কাজ-কর্মে তাদের সাথে পরামর্শ কর। (সুরা আলে ইমরান, ৩ঃ ১৫৯)  হযরত আলী মুরতাযা (রাঃ) বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সাঃ) -এর খিদমতে আরয করলাম, আপনার পর যদি আমাদের সামনে এমন কোন বিষয় উপস্থিত হয়; যে সম্পর্কে কুরআনে কোন নির্দেশ নেই এবং আপনার থেকেও সে ব্যাপারে আমরা কিছু না শুনে থাকি; তখন আমরা কি করব? জবাবে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বললেনঃ এ ব্যাপারে দীনের প্রজ্ঞাসম্পন্ন ফকিহগণের সাথে এবং ইবাদতগুযার ব্যক্তিগণের সাথে পরামর্শ করবে। এ ক্ষেত্রে কোন ব্যক্তি বিশেষের রায়ের উপর ফয়সালা করবে না। 

৭. ইসলামী রাষ্ট্রের অন্যতম মূলনীতি হচ্ছে, সকল মানুষের প্রতি সুবিচার। অর্থাৎ ইসলামী আইন সকলের জন্য সমান। রাষ্ট্রের সাধারণ ব্যক্তি থেকে আরম্ভ করে রাষ্ট্রপ্রধান পর্যন্ত সকলের উপর তা সমভাবে প্রয়োগ করা অপরিহার্য। এতে কারো প্রতি কোন পক্ষপাতমূলক আচরণের বিন্দুমাত্র অবকাশ নেই।  কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছেঃ 

এবং আমি আদিষ্ট হয়েছি তোমাদের মধ্যে ন্যায়বিচার করতে। (সুরা শূরা, ৪২ঃ ১৫)  অর্থাৎ পক্ষপাতমুক্ত সুবিচার নীতি অবলম্বন করার জন্য আল্লাহ তা'আলা নির্দেশ দিয়েছেন। পক্ষপাতিত্বের নীতি অবলম্বন করে কারো পক্ষে বা বিপক্ষে যাওয়া উচিত নয়। সকল মানুষের সাথে সমান সম্পর্ক রাখতে হবে। অর্থাৎ আদল ও সুবিচারের সম্পর্ক। যা সত্য তা সকলের জন্যই সত্য; যা গুনাহ তা সকলের জন্যই গুনাহ; যা হারাম তা সবার জন্যই হারাম; যা হালাল তা সবার জন্যই হালাল; আর যা ফরয তা সকলের জন্যই ফরয। 

আল্লাহ আইনের এ সর্বব্যাপী নির্দেশ সকলের জন্য প্রযোজ্য। এ প্রসঙ্গে হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মাখযুমী সম্প্রদায়ের জনৈক মহিলা চুরির অপরাধে অপরাধী হওয়ায় তা কুরায়শ বংশের লোকদেরকে খুব দুশ্চিন্তায় ফেলে দেয়। সাহাবীগণ বললেন, এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সাঃ)-এর সাথে কে কথা বলতে পারবে? রাসুলুল্লাহ (সাঃ)-এর প্রিয় পাত্র উসামা (রাঃ) ছাড়া কেউ এ সাহস পাবে না। তখন উসামা ইবন যায়দ (রাঃ) রাসুলুল্লাহ (সাঃ)-এর সাথে এ বিষয়ে কথা বললে তিনি বললেনঃ  তুমি কি আল্লাহর দণ্ডবিধির ব্যাপারে সুপারিশ করছো? তারপর তিনি দাঁড়িয়ে খুতবা প্রদান করলেন এবং বললেনঃ 

হে মানব মণ্ডলী! নিশ্চয়ই তোমাদের পূর্ববর্তী লোকেরা পথভ্রষ্ট হয়েছিল। কেননা যখন তাদের কোন সম্ভ্রান্ত লোক চুরি করতো তখন তারা তাকে রেহাই দিয়ে দিতো। আর যখন কোন দুর্বল লোক চুরি করতো তখন তারা তার উপর শরী'আতের শাস্তি প্রয়োগ করতো। আল্লাহর কসম! মুহামদ (সাঃ)-এর কন্যা ফাতিমাও যদি চুরি করতো তবে অবশ্যই মুহাম্মদ (সাঃ) তার হাত কেটে দিতেন। 

৮. আইন, শাসন ও বিচার বিভাগসমূহ যাতে সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হয়, সে জন্য যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এমন কোন পদক্ষেপ নেওয়া যাবে না, যার ফলে উপরোক্ত বিভাগের কর্মকাণ্ডসমূহ বিঘ্নিত হয়। 

৯. মৌলিক অধিকারের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের সমান অধিকার রয়েছে। কাজেই অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান এবং শিক্ষা ও চিকিৎসার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের সকল নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। এ পর্যায়ে কারো প্রতি স্বজনপ্রীতি প্রদর্শন বা কাউকে অযৌতিক অগ্রাধিকার প্রদান এবং কাউকে অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যাবে না। সমস্ত মুসলমান পরস্পর ভাই ভাই। 

কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছেঃ  মু'মিনগণ পরস্পর ভাই ভাই। (সুরা হুজুরাত, ৪৯ঃ ১০)  অন্য আয়াতে ইরশাদ হয়েছেঃ 

হে মানুষ! আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক মহিলা হতে; পরে তোমাদেরকে বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা একে অপরের সাথে পরিচিত হতে পার। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর নিকট সেই অধিক মর্যাদাসম্পন্ন যে তোমাদের মধ্যে অধিক মুত্তাকী। (সুরা হুজুরাত, ৪৯ঃ ১৩)   রাসুলুল্লাহ (সাঃ) ইরশাদ করেনঃ 

হে মানব জাতি! শোন, তোমাদের রব এক। অনারবের উপর আরবের এবং আরবের উপর অনারবের কোন মর্যাদা নেই। লালের উপর কালোর এবং কালোর উপর লালের কোন শ্রেষ্ঠত্ব নেই। তবে মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব হতে পারে তাকওয়ার ভিত্তিতে। 

১০. রাষ্ট্র পরিচালনা খলীফা এবং কর্মকর্তাদের জন্য একটি আমানত। এ আমানত যাদের সোপর্দ করা হবে তারা এ ব্যাপারে জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকবেন।  কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছেঃ  নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন আমানত তার হকদারকে প্রত্যার্পণ করতে। যখন তোমরা মানুষের মধ্যে বিচারকার্য পরিচালনা করবে তখন ন্যায়পরায়ণতার সাথে বিচার করবে। আল্লাহ তোমাদেরকে যে উপদেশ দেন তা কত উৎকৃষ্ট! আল্লাহ সর্বশ্রতা, সর্বদ্রষ্টা। (সুরা নিসা, ৪ঃ ৫৮)  এ প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) ইরশাদ করেনঃ  জেনে রেখ! তোমাদের প্রত্যেকেই একজন দায়িত্বশীল, আর তোমরা প্রত্যেকেই নিজ অধিনস্তদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। সুতরাং ইমাম বা শাসনকর্তা অধিনস্তদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবেন। 

১১. মানুষ জন্মগতভাবে আযাদ। তাদের এ আযাদী কোনভাবেই খর্ব করা যাবে না। মানুষের ব্যক্তিগত আযাদী; মত প্রকাশের আযাদী এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের আযাদী ইত্যাদি বিষয়াদিতে নিশ্চয়তা প্রদান রাষ্ট্রের বুনিয়াদী নীতিমালা সমূহের অন্তর্ভূক্ত। এ ব্যাপারে কোনরূপ শিথিলতা গ্রহণযোগ্য নয়। উল্লেখ্য যে, ভৌগলিক আযাদীও এক ধরনের আযাদী বটে। তবে এটাকে প্রকৃত আযাদী বলা যায় না। বস্তুত মানুষ তখনই প্রকৃত আযাদ বলে গণ্য হবে যদি ভৌগলিক আযাদীর সাথে সাথে আদর্শিক আযাদীও তাদের হাসিল হয়। পক্ষান্তরে মানুষ যদিমানুষের রচিত আইন-শাসনের অধীনে পরিচালিত হয়, তবে ভৌগলিক স্বাধীনতা অর্জন করা সত্ত্বেও তারা পরিপূর্ণভাবে স্বাধীন নয়। এ জন্যই কবি বলেছেনঃ  তুমি যদি প্রকৃত আযাদী ও স্বাধীনতা চাও, তবে মানুষের গোলামী প্রত্যাখ্যান করে আল্লাহর গোলামী মেনে নাও।  

মন্তব্য করুন

ব্লগ