Loading..

ব্লগ

রিসেট

২১ ডিসেম্বর, ২০২৩ ১০:৩১ পূর্বাহ্ণ

মহান বিজয় দিবসের তাৎপর্য বর্ণনা

বিজয় দিবসের তাৎপর্য বর্ণনা

 

 

বিজয় দিবস আমাদের কাছে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। কেননা এ দিনটিতে আমরা পরাধীনতার শিকল থেকে মুক্তি লাভ করতে সক্ষম হয়েছি। ১৯৭১ সালের এই দিনে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) নতমস্তকে আত্মসমপর্ণ করেছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। তাই “বিজয় দিবস”  বাঙালি জাতির গৌরবের দিন। বিশ্ব মানচিত্রে লাল-সবুজের পতাকার স্থান পাওয়ার দিন। এই উপমহাদেশ-ভুক্ত কোন দেশে “বিজয় দিবস” বলতে কোন দিবস নেই। বাংলাদেশ ও বাঙালির “বিজয় দিবস” তাই অনন্য। সমগ্র বিশ্বের কোন জাতি এতো “দাম” দিয়ে স্বাধীনতা বা মুক্তি সংগ্রামের বিজয় অর্জন করেনি। অন্যায় ভাবে চাপিয়ে দেয়া একটি সশস্ত্র যুদ্ধের মোকাবেলা করে লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে এই বিজয় অর্জন করতে হয়েছে শুধু মাত্র বাঙালির।

এই বিজয় কী শুধুমাত্র পাকিস্তানী শত্রু সেনার বিরুদ্ধে বিজয় ছিলো?

বিষয়টিকে এতো সরল ভাবে দেখলে বিজয়ের অন্তর্নিহিত তাৎপর্যকে অনুধাবন করা সহজ হবেনা। আমাদের মুক্তির সংগ্রাম শুরু হয়েছিলো ১৯৪৮ সালে রাষ্ট্র ভাষার প্রশ্নে। ভাষা ও সংস্কৃতি অবিচ্ছিন্ন। ভাষা ও সংস্কৃতির অধিকার আদায়ের আন্দোলনের মাধ্যমে আমাদের জাতীয়তা-বোধ জাগ্রত হয়।  এই জাতীয়তাবোধ আবহমান বাংলার অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতির দিকে এগিয়ে নিয়ে যায় বাঙালি জাতিকে।

শুধু কী অসাম্প্রদায়িকতা?

 ভাষা ও সংস্কৃতির আন্দোলন জাতিকে নব্য ঔপনিবেশিক শাসন, শোষণ, মানুষে মানুষে বৈষম্য বিলোপের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ করে তুলে। একারণে একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বরের বিজয় ছিলো ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান, বাঙালি জাতীয়তাবাদ, অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র-সংস্কৃতি এবং সমতা ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার নিমিত্তে শহীদের রক্ত স্নাত এক মহিমান্বিত বিজয়।

যে সব বীর সন্তানের প্রাণের বিনিময়ে এই পতাকা ও মানচিত্র এসেছে, তাদের শ্রদ্ধা জানানোর মাধ্যমেই এই দিবসের মহিমা প্রকাশ পাবে। আর এ অর্জন একদিনে সম্ভব হয়নি। এর জন্য বাঙালি জাতির ছিল সুদীর্ঘ তপস্যা ও সাধনা। এ সাধনার কান্ডারি ছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাঙালিরা যখন স্বাধীনতা স্পৃহায় উদ্দীপ্ত হতে শুরু করে, পাকিস্তানি বর্বরতার মাত্রা বাংলার মানুষের ওপর আরও বাড়তে থাকে। ৭ মার্চ ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর সেই ঐতিহাসিক ভাষণের পর পাকিস্তানিরা আরও সোচ্চার হতে থাকে। ফলস্বরূপ ২৫ মার্চ মধ্যরাতে পাকবাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির ওপর আক্রমণ চালায়। ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণার পর থেকে মুক্তিবাহিনী যখন আস্তে আস্তে সুগঠিত হতে থাকে তখন পাকবাহিনীর অত্যাচারের মাত্রা আরও বেড়ে যায়। গ্রামে-গঞ্জে ঘুমন্ত মানুষের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়, বেছে বেছে যুবকদের ধরে এনে গুলি করে হত্যা করে ও পৈশাচিক নির্যাতন চালায়। পাকসেনা ও রাজাকারদের এমন নিপীড়ন-নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে বাংলার সাধারণ মানুষ এক সময় সম্মিলিত প্রয়াসে জনযুদ্ধে নেমে পড়ে। এখানে ছাত্র-শিক্ষক, কৃষক, কামার-কুমার, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, শিশু-কিশোর, নারী সবাই অংশগ্রহণ করে এবং দেশকে শত্রুমুক্ত করার আকাঙ্ক্ষায় তীব্র সংগ্রাম চালিয়ে যায়। দীর্ঘ নয় মাসের যুদ্ধের পর বাংলার মানুষের এ আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয় ১৬ ডিসেম্বরে। তাই ১৬ ডিসেম্বরের বিজয় কোনো সাধারণ বিজয় নয়, এটি আমাদের রক্তে রঞ্জিত চেতনার বিজয়, আমাদের জাতীয় আত্মপরিচয়ের বিজয়। এ বিজয় আমাদের কাছে তাই একইসঙ্গে প্রেরণার ও গৌরবের। বাঙালির প্রেরণার উৎস গৌরবময় এ বিজয় দিবস বর্তমানে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক, সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে এবং বাঙালির জীবন চেতনায় গভীরভাবে সম্পৃক্ত। এ বিজয়ের অনুপ্রেরণা থেকে বাঙালির আজকের দীর্ঘ পথচলা, যাবতীয় অর্জন।

বিজয় দিবস আমাদের কাছে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। কেননা, এ দিনটিতে আমরা পরাধীনতার শিকল থেকে মুক্তিলাভ করতে সক্ষম হয়েছি। ত্রিশ লাখ জীবনের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে আমাদের স্বাধীনতা।  রক্তের বিনিময়ে পাওয়া এ স্বাধীনতা আমাদের কাছে অত্যন্ত গৌরবের। প্রজন্মের পর প্রজন্ম বয়ে নিয়ে চলেছে মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের পতাকা, গাইছে বিজয়ের গৌরবগাথা। তাই বিজয় দিবসের গুরুত্ব অপরিসীম। প্রতিবছর এই দিনটি পালনের মধ্যদিয়ে আমাদের নতুন প্রজন্ম এবং বিশ্বকে বারবার মনে করিয়ে দেয় আমাদের মুক্তিযুদ্ধ আর মুক্তিযোদ্ধাদের কথা, বীর শহীদদের কথা। আমরা অনুপ্রাণিত হই আমাদের দেশের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের কথা স্মরণ করে। উদ্বুদ্ধ হই অগ্রগতির পথে এগিয়ে যেতে। সুতরাং বাংলাদেশকে একটি আদর্শ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে গঠন করে তুলতে হলে বিজয় দিবসের তাৎপর্য আমাদের অবশ্যই যথার্থভাবে অনুধাবন করতে হবে। 

মন্তব্য করুন