সহকারী শিক্ষক
২৪ জানুয়ারি, ২০২৪ ১২:৫১ পূর্বাহ্ণ
সঠিকটা জানুন, শরীফ থেকে শরীফা হওয়ার গল্প।
যারা ৭ম শ্রেণির ইতিহাস ও সামাজিক বিজ্ঞানের শরীফার গল্পের বিষয়টি না পড়েই বিতর্কে বা কুতর্কে জড়িয়েছেন তাদের জন্য এই পোস্টটি। পুরো বইয়ে কোথাও 'ট্রান্সজেন্ডার' বা সমকামিতার কথা উল্লেখ নেই। আমার মেয়ে ৭ম শ্রেণিতে পড়ে! তার বইটি বারবার পড়েই লিখছি। এই গল্পটি শুধুই মানবিক এক গল্প, তৃতীয় লিঙ্গ তথা হিজড়াদের বিষাদময় জীবনালেখ্য! তাদের জন্ম, বেড়ে উঠা, পরিবার ও সমাজ থেকে আলাদা হয়ে হিজড়া সম্প্রদায়ে যুক্ত হওয়ার দুঃখের কাহিনী। পরিবার তথা ফেলে আসা জীবনের নষ্টালজিক হওয়ার মানবিক কান্নার সত্য কাহিনী এই "শরীফার গল্প"! আমরা যখন বাইরে বের হই বিশেষ করে ট্রেনযাত্রা করি তখন আমাদের বাচ্চারা ভয় আর উৎসুক দৃষ্টিতে হিজড়াদের কর্মকাণ্ড দেখে! তাদের উৎসুক মন জানতে চায় এরা কারা, কেন এরকম সাজ, কোথায় থাকে, কি তাদের জীবন! এই পাঠ সেইসব প্রশ্নের সহজ, সরল, সাবলীল এবং মানবিক উত্তর!
২০১৩ সালে সরকার এই হিজড়া গোষ্ঠীকে স্বীকৃতি দিয়েছে! তারা সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদা পেয়েছে। বর্তমানে তাদের অনেকেই করুণার পাত্র না হয়ে একজন সাধারণ মানুষের মতোই কৃতিত্বের সাথে সামাজিক উন্নয়নে অবদান রাখছে। অবহেলার চোখে না দেখে মানুষ হিসাবে স্বীকৃতি ও সুযোগ করে দিলে তাদের করুণ গল্পটা অন্যরকম হতে পারে তারই উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে এখানে!
❣️আমাদের বাচ্চাদের জন্য এই গল্পের মেসেজ হচ্ছে হিজড়াদের অবহেলার দৃষ্টিতে না দেখে মানবিক দৃষ্টিতে দেখতে হবে! তারা করুণার পাত্র নয় বরং পরিবেশ এবং সুযোগ করে দিলে তারাও আমাদের সুন্দর সমাজ বিনির্মাণে অংশীদার হতে পারে।❣
তাহলে কোথায় পেলেন ট্রান্সজেন্ডার আর সমকামিতার বয়ান? নতুন সময়োপযোগী সৃজনশীল শিক্ষার বিরুদ্ধে যারা, সেই সিন্ডিকেটই অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির জন্য এমনটা করছে বলেই মনে হয়!
ধন্যবাদ জানাই যারা হিজড়া সম্প্রদায়ের বিষয়টি এতো সহজ, সরল এবং মানবিকতার সাথে পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। ?
৭ম শ্রেণির ইতিহাস ও সামাজিক বিজ্ঞান বইয়ের লেখাটি হুবহু তুলে ধরা হলো----
?নতুন পরিচয়?
পরের ক্লাসে খুশি আপা একজন অতিথিকে সঙ্গে নিয়ে এলেন। তিনি বললেন, ইনি ছোটবেলায় তোমাদের স্কুলে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছেন। আজ এসেছেন, নিজের স্কুলটা দেখতে।
সুমন জানতে চাইল, আপনার নাম কী? তিনি বললেন, আমার নাম শরীফা আকতার। শরীফা বললেন, যখন আমি তোমাদের স্কুলে পড়তাম তখন আমার নাম ছিল শরীফ আহমেদ।
আনুচিং অবাক হয়ে বলল, আপনি ছেলে থেকে মেয়ে হলেন কী করে?
শরীফা বললেন, আমি তখনও যা ছিলাম এখনও তাই আছি। নামটা কেবল বদলেছি।
ওরা শরীফার কথা যেন ঠিকঠাক বুঝতে পারল না।
আনাই তাকে জিজ্ঞেস করল, আপনার বাড়ি কোথায়?
শরীফা বললেন, আমার বাড়ি এখান থেকে বেশ কাছে। কিন্তু আমি এখন দূরে থাকি।
আনাই মাথা নেড়ে বলল, বুঝেছি, আমার পরিবার যেমন অন্য জায়গা থেকে এখানে এসেছে, আপনার পরিবারও তেমন এখান থেকে অন্য জায়গায় চলে গিয়েছে।
শরীফা বললেন, তা নয়। আমার পরিবার এখানেই আছে। আমি তাদের ছেড়ে দূরে গিয়ে অচেনা মানুষদের সঙ্গে থাকতে শুরু করেছি।এখন সেটাই আমার পরিবার। শরীফা নিজের জীবনের কথা বলতে শুরু করলেন। ----
?শরীফার গল্প?
ছোটবেলায় সবাই আমাকে ছেলে বলত। কিন্তু আমি নিজে একসময়ে বুঝলাম, আমার শরীরটা ছেলেদের মতো হলেও আমি মনে মনে একজন মেয়ে। আমি মেয়েদের মতো পোশাক পরতে ভালোবাসতাম। কিন্তু বাড়ির কেউ আমাকে পছন্দের পোশাক কিনে দিতে রাজি হতো না। মায়ের সঙ্গে ঘরের কাজ করতে আমার বেশি ভালো লাগত। বোনদের সাজবার জিনিস দিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে সাজতাম। ধরা পড়লে বকাঝকা, এমনকি মারও জুটত কপালে। মেয়েদের সঙ্গে খেলতেই আমার বেশি ইচ্ছে করত। কিন্তু মেয়েরা আমাকে খেলায় নিতে চাইত না। ছেলেদের সঙ্গে খেলতে গেলেও তারা আমার কথাবার্তা , চালচলন নিয়ে হাসাহাসি করত। স্কুলের সবাই, পাড়া-পড়শি এমনকি বাড়ির লোকজনও আমাকে ভীষণ অবহেলা করত। আমি কেন এ রকম একথা ভেবে আমার নিজেরও খুব কষ্ট হতো, নিজেকে ভীষণ একা লাগত।
এক দিন এমন একজনের সঙ্গে পরিচয় হলো যাকে সমাজের সবাই মেয়ে বলে কিন্তু সে নিজেকে ছেলে বলেই মনে করে। আমার মনে হলো, এই মানুষটাও আমার মতন। সে আমাকে বলল, আমরা নারী বা পুরুষ নই, আমরা হলাম তৃতীয় লিঙ্গ ‘থার্ড জেন্ডার’। সেই মানুষটা আমাকে এমন একটা জায়গায় নিয়ে গেল, যেখানে নারী-পুরুষের বাইরে আরও নানা রকমের মানুষ আছেন। তাদের বলা হয় ‘হিজড়া’ জনগোষ্ঠী। তাদের সবাইকে দেখেশুনে রাখেন তাদের ‘গুরু মা’। আমার সেখানে গিয়ে নিজেকে আর একলা লাগল না, মনে হলো না যে আমি সবার চেয়ে আলাদা। সেই মানুষগুলোর কাছেই থেকে গেলাম। এখানকার নিয়ম-কানুন, ভাষা, রীতি-নীতি আমাদের বাড়ির চেয়ে অনেক আলাদা। তবু আমরা সবার সুখ-দু:খ ভাগ করে নিয়ে একটা পরিবারের মতনই থাকি। বাড়ির লোকজনের জন্যও খুব মন খারাপ হয় কিন্তু তারা আমাকে আর চায় না, আশপাশের লোকের কথায়ও তাদের ভীষণ ভয়।
আজ থেকে বিশ বছর আগে বাড়ি ছেড়েছি। সেই থেকে আমি আমার নতুন বাড়ির লোকদের সঙ্গে, নতুন শিশু আর নতুন বর-বউকে দোয়া-আশীর্বাদ করে পয়সা রোজগার করি। কখনও কখনও লোকের কাছে চেয়ে টাকা সংগ্রহ করি। কিন্তু আমাদের ইচ্ছে করে সমাজের আর দশটা স্বাভাবিক মানুষের মতো জীবন কাটাতে, পড়াশোনা, চাকরি-ব্যবসা করতে। কিন্তু বেশির ভাগ মানুষ আমাদের সঙ্গে মিশতে চায় না,
যোগ্যতা থাকলেও কাজ দিতে চায় না। আমাদের মতো মানুষ পৃথিবীর সব দেশেই আছে। অনেক দেশেই তারা সমাজের বাকি মানুষের মতনই জীবন কাটায়। তবে আমাদের দেশের অবস্থারও বদল হচ্ছে। ২০১৩ সালে সরকার আমাদের স্বীকৃতি দিয়েছে। বিভিন্ন সরকারী ও বেসরকারী প্রতিষ্ঠান আমাদের জন্য কাজ করছে। শিক্ষার ব্যবস্থা করছে, কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করছে। সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর প্রচেষ্টা নিচ্ছে। নজরুল ইসলাম ঋতু, শাম্মী রানী চৌধুরী, বিপুল বর্মণে র মতো বাংলাদেশের অনেক হিজড়া জনগোষ্ঠীর মানুষ সমাজজীবনে এবং পেশাগত জীবনে সাফল্য পেয়েছেন।
?নতুন প্রশ্ন?
ওরা এত দিন জানত, মানুষ ছেলে হয় অথবা মেয়ে হয়। এখানেও যে বৈচিত্র্য থাকতে পারে, সে কথা ওরা কখন শোনেনি, ভাবেওনি। কিন্তু শরীফা আলাদা রকম বলে সবাই তাকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে, এমনকি তার পরিবারের লোকেরাও! শরীফার জীবন-কাহিনি শুনে সবার মন এমন বিষাদে ডুবে গেল যে তাকে আর বেশি
প্রশ্ন করতেও ইচ্ছে করল না। (সংগৃহীত)
৫৩
৯১ মন্তব্য