Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৫ জানুয়ারি, ২০২৪ ১০:২৩ পূর্বাহ্ণ

নকশি কাঁথার ধরন বা নামকরন

নকশি কাঁথা: বাংলাদেশের লোকশিল্পের একটা অংশ

একটি নকশী কাথাঁ সেলাইয়ের পিছনে থাকে আনেক হাসি-কান্নার কাহিনী। জীবনের গল্প। বিচ্ছেদের গল্প।

ব্যবহার করা জিনিসপত্র কে বিভিন্ন পদ্ধতি অনুসরন করে তা আবার পুনরায় ব্যবহার করার উপযোগী করে তোলাই হলো রিসাইক্লিং। এটাই রিসাইক্লিং এর সহজ সমীকরন। আর এ সমীকরন আধুনিক ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি থেকে শুরু করে সব খানেই কি-পয়েন্ট হিসেবে কাজ করছে। রিসাকেলিং এর সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত আরেকটি শব্দ হলো আপসাক্লিং। পুরোনো জিনিসপত্র এমন ভাবে দ্বিতীয় জীবন দেয়া যা আগের তুলনায় আরও বেশ ব্যাবহারিক, সুন্দর এবং মূল্যবান হয়ে উঠে। আর এই পুরো বিষয়টি সাসটেইনেবল ফ্যাশন আন্দলনেরই একটি অংশ। ভাবুন তো, এই সাসটেইনেবল, রিসাইক্লিং, আপসাইক্লিং এর সাথে আমাদের চিরোচেনা শতবর্ষের পুরনো ঐতিহ্য নকশি কাঁথা -র কোনো মিল পাওয়া যায় কিনা! যা শত শত বছর আগে গ্রামের মহিলারা প্রকৃতিবান্ধব এই শিল্প আধুনিক শিল্প আন্দলেনের সাথে যুক্ত হয়ে গেছেন।

পুরো বাংলাদেশেই নকশি কাঁথা তৈরি হয়, ময়মনসিংহকে নকশি কাঁথার শহর ধরা হয়। এছাড়াও রাজশাহী, যশোর, ফরিদপুর নকশি কাঁথার জন্য বিখ্যাত। যদিও ২০০৮ সালে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য নকশি কাঁথার ভৌগোলিক স্বীকৃতি পায়।

Nakshi kantha

কাথাঁ এবং নকশী কাথাঁ

Nakshi kantha

কাথাঁ হলো পুরনো শাড়ি বা ছোট ছোট কাপড়ের ‍টুকরো জোড়াতালি দিয়ে সাধারন সোজা ফোঁড় দিয়ে তৈরী একটি আচ্ছাদন বস্ত্র। যা কম্বলের তুলনায় পাতলা। বর্ষা মৌসুমে এবং হালকা শীতের সময় গায়ে জড়ানোর জন্য ব্যাবহার করা হয়। এসব কাথাঁ সেলাই করার জন্য যে সুতা ব্যাবহার করা হতো তা পুরনো শাড়ির নকশা পাড় থেকে খুলে নেয়ার চেষ্টা করা হতো।

নকশি কাঁথা হলো সাধারন কাথাঁর উপর মনের মাধুরী মিশিয়ে নানা ধরনের নকশা ফুটিয়ৈ তুলে যে কাথাঁ তৈরী করা হয়। একটি নকশী কাথাঁ সেলাইয়ের পিছনে থাকে আনেক হাসি-কান্নার কাহিনী। জীবনের গল্প। বিচ্ছেদের গল্প।

নকশি কাঁথার নকশা শুধু কাঁথার জমিনে সুঁইয়ের ফোঁড়ে ফুটিয়ে তোলা নকশাই নয়, একেকটি নকশী কাঁথার জমিনে লুকিয়ে থাকে গল্প, কখনো ভালোবাসার, কখনো দুঃখের। বাংলার পথে প্রান্তরে হারিয়ে যাওয়া গল্পকে বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে একেকটি নকশী কাঁথা।

যদিও শুরুর দিকে নিদৃষ্ট কোন নকশা ছিলো না। সূচিশিল্পী তার জীবন অভিজ্ঞতা, তার আশপাশে দেখা ফুল লতাপাতা, পাখি , মাছ, ময়ূরসহ বিভিন্ন নকশা ফুটিয়ে তুলতো। পরবর্তীতে নকশার একটা ফরমেট বা সূত্র তৈরী হয়ে যায়। এ বিষয় আরো বিস্তারিত থাকবে দ্বীতিয় অধ্যায়ে।

নকশি কাঁথা: বাংলাদেশের লোকশিল্পের একটা অংশ

A part of Bangladeshi folk art

লোকশিল্প কি? যদি প্রশ্ন করা হয় তবে সহজ এবং সাধারন উত্তর হলো। লোকশিল্প হলো সাধারন লোকের জন্য, সাধারন লোক দ্বারা সৃষ্ট সেই শিল্প যা সমাজের একটি বড় অংশের কাছে গ্রহনযোগ্য একটি নান্দনিক ভাবনা এবং তা ঐতিহ্যগত ভাবে বংশ পরম্পরায় ধরে রাখে।

এই শিল্প সমাজের মৌলিক সংস্কৃতিকে তুলে ধরে।

বাংলার লোকশিল্পকলার মধ্যে – বয়ন ও বুননশিল্প, মৃৎশিল্প, দারুশিল্প, সূচিশিল্প, পটশিল্প, শঙ্খশিল্প, পাটশিল্প ও অন্যান্য আরো লোকশিল্প দিয়ে সমৃদ্ধ আমাদের বাংলাদেশ। নকশি কাঁথা হলো লোকশিল্পের সূচিশিল্পর একটা অংশ।

কাঁথার আদি কথা

History of nakshi kantha

কাথাঁ শব্দটির উৎপত্তির স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া না গেলেও ধারনা করা হয়, সংস্কৃত শব্দ কন্থা থেকে কাথাঁ শব্দের উৎপত্তি। নকশি কাঁথা ভারত এবং বাংলাদেশের লোকশিল্পের একটা অংশ। ঐতিহ্যগিত এবং অবস্থানগত যে সীমারেখা, তার মধ্যে দিয়েই ধীরে ধীরে তৈরী হয়েছেল নিজস্ব একটি কারুশিল্প। গ্রামীন জীবনযাপনে গৃহিণীরা ব্যাবহারীত তাঁতের শাড়িগুলো পরতে পরতে যখন নরম হয়ে যেতো কিংবা ছিড়ে যেতো তখন তারা কাথাঁ তেরী করার্ জন্য তা রেখে দিতো। পরবর্ততীতে তা দিয়ে সাধারন কাঁথা কিংবা নকশী কাঁথা তৈরী করতো।

বহুপ্রাচিন কাল থেকে কাথাঁর ব্যাবহার শুরু হলেও কাথাঁর গায়ে নকশার ব্যাবহার ১৮ দশকের দিকে বলেই ধারনা করা হয়। সাধারনত গ্রামের মহিলারা তাদের অবসর সময় কাথাঁ সেলাই করতেন। বিকেল বেলা বা রাতের খাবারের পর মহিলারা এক সাথে বসে গল্প করতেন আর সেলাই করতেন। তাদের গল্পের সাথে সাথে কাথাঁয় ফোড়ে ফোড়ে গল্পগুলো প্রতিফলিত হতো। জীবনের গল্প। বিচ্ছেদের গল্প। আশেপাশে দেখা সুন্দর জিনিস পত্র তাদের নিজস্ব শৈল্পিক মন দিয়ে একেঁ তার উপর সেলাই করতেন। যা হয়ে উঠতো এক একটা শিল্প।

কাথাঁ যে ভাবে তৈরী হয় এবং তার উপকরণ

Kantha Making

এখন বাণিজ্যিক ভাবে নতুন কাপড়, সুতা দিয়ে কাঁথা তৈরি করা হলেও, আগে কি ভাবে টুকড়ো কাপড় বা পুরানো শাড়ি দিয়ে একটা কাঁথা তৈরি করা হতো, এখানে তার বর্ননা করা হবে।

কাথাঁ তৈরিতে উপকরন

১. পুরনো শাড়ি, ধুতি কিংবা লুঙ্গি

২. সূচ

৩. সেলাই করবার সুতা

৪. কাচি ( সুতা কাটার জন্য)

৫. পেরেক কিংবা খেজুর কাটা

৬. পাটি

৭. নকশা তোলার জন্য পেনছিল বা ট্রেসিং পেপার

একটা স্টার্ডাড সাইজের কাঁথা তৈরি করতে ৫ থেকে ৭টা শাড়ি দরকার হয়। শাড়ির কমবেশি নির্ভর করে কাঁথার পুরুত্বের উপর। মাটির উপর একটা পাটি বিছিয়ে তার উপর পুরনো শাড়ি গুলো স্তরে স্তরে সাজিয়ে নিতে হবে। তারপর চার কর্নারে পেরেক বা খেজুর কাটা দিয়ে গেঁথে টানটান করে বিছিয়ে নিয়ে তার উপর সুতা দিয়ে বড়ো বড়ো ফোঁড় দিয়ে শাড়ির সবগুলো স্তর সেলাইয়ের মাধ্যমে আটকাতে হবে। যেটাকে টাক দেয়া বলে।

টাক দেয়া হলে বড়ো বড়ো ফোঁড় দিয়ে চারপাশে মুড়ি ভেঙ্গে দেয়া হয়। যাবে মুল কাঁথা সেলাই করার সময় সুতা উঠে না যায়।

আগের দিনে যে শাড়ি গুলো দিয়ে কাঁথা বানানো হতো, সেই শাড়ির পাড় থেকে সুতা বের করে সেই সুতা ব্যাবহার করা হতো সেলাই করবার জন্য। কারন হিসেবে পুরাতন কাপড়ের উপর নতুন সুতার কাজ করলে পুরাতন শাড়ির জমিন কেটে যাওয়ার সম্ভবনা থাকে। এছাড়া শাড়ি গুলোর সর্বোচ্চ ব্যাবহার হতো।

এরপর কাঁথার মুল আদল তৈরি হলে চার কর্নারের কাটা বা পেরেক সড়িয়ে নিয়ে একজন সূচি শিল্পী তার ইচ্ছা মত হাতে নিয়ে ঘুড়িয়ে ঘুড়িয়ে সেলাই শুরু করে দেয়। প্রয়োজন অনুযায়ী একটি কাঁথা চারদিক থেকে অনেক জন একসাথে সেলাই করে থাকে।

যদি নকশি কাঁথা হয়, সে ক্ষেত্রে বড় বড় ফোড় দিয়ে মুল কাঁথার আদল তৈরি হবার পর টান টান অবস্থায় নিজস্ব মাধুরী মিশিয়ে বিভিন্ন নকশা অঙ্কন করে নেয়। আগে পেনছিল দিয়ে নিজেদের ইচ্ছা মতো নকশা আঁকতেন। তারপর আসে কাঠের ব্লক দিয়ে নকশার ছাপ দেয়া, বর্তমানে ট্রেসিং পেপার দিয়ে বা স্ক্রিন প্রিন্ট করে মুল নকশা ছাপ দিয়ে তার উপর দিয়ে নৈপুণ্যতার সাথে সেলাই করে একটি শিল্প তৈরী করে একজন সূচি শিল্পী। যা আমাদের লোকঐতিহ্য নকশী কাঁথা।

কাঁথা সেলাই এর সময়কাল

Duration of Kantha stitch

একটা কাঁথা সেলাই করতে কতটা সময় সাপেক্ষ তা নির্ভর করে কাঁথার সাইজ কিংবা কাঁথার নকশার উপর। তবে একটা সাধারন কাঁথা সেলাই করতে৭ থেকে ১০ দিন সময় লাগে।

আর নকশী কাঁথার ক্ষেত্রে কাঁথার নকশা, কাঁথার সাইজ, কতজন সূচিশিল্পী এক সাথে সেলাই করছে তার উপর নির্ভর করে। কোনো কোনো কাঁথা এক বছর এর বেশি সময় লেগে যায়।

নকশি কাঁথার ধরন বা নামকরন

Types of Nakshi Kantha

সাধারন কাঁথার উপর নকশা করা থাকলেই আমরা সাধারন ভাবে নকশি কাঁথা বলে আক্ষ্যায়িত করতে পারি। তবে এসব নকশি কাঁথার ব্যাবহার ভেদে কিংবা স্থান ভেদে বিভিন্ন নাম রয়েছে।

গায়ের দেয়ার নকশি কাঁথা, বিছানার সৌন্দর্য বর্ধনের কাঁথা, সুজনী কাঁথা, বর্তনী রুমাল কাথা, পালিকির কাঁথা, বালিশের ঢাকনি, দস্তরথানা, পান পেঁচানী, আরশীলতা ইত্যাদি।


মন্তব্য করুন