Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৬ জানুয়ারি, ২০২৪ ০৭:৫৩ পূর্বাহ্ণ

লিখন দক্ষতা বৃদ্ধির কৌশল সমূহঃ 2

                                                       লিখন দক্ষতা বৃদ্ধির কৌশল সমূহঃ 2 

লেখকঃ মোঃ সুজাউল ইসলাম মোল্লা, সহকারি  শিক্ষক,

বানাইচ সপ্রাবি,ক্ষেতলাল,জয়পুরহাট।

লিখন দক্ষতা বৃদ্ধির কৌশলঃ আমাদের স্কুলগুলোতে দেখা যায় যে অনেক শিক্ষার্থী বাংলা ভালোমতো লিখতে পারে না। যে কৌশলের মাধ্যমে লিখন দক্ষতা বাড়ানো যায় তাকে লিখন দক্ষতা বৃদ্ধির কৌশল বলে।লিখন দক্ষতা বৃদ্ধির অনেক কৌশল আছে। কোন শিক্ষক যদি এই কৌশলগুলো শ্রেনিকক্ষে প্রয়োগ করে বা কোন শিক্ষার্থী যদি নিজেই এই কৌশলগুলো আয়ত্ত্ব করে তাহলে অবশ্যই একজন শিক্ষার্থীর লেখার দক্ষতা অর্জন হবেই।  নিন্মে কৌশলগুলোর বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।      

 

(১) বর্ণ থেকে শব্দ লেখাঃ লিখন দক্ষতা অর্জনের জন্য শিক্ষার্থীদের প্রথমে বর্ণ চিনাতে হবে। যে শিক্ষার্থী এলোমেলো বর্ণ লিখতে পারবে তাকে শব্দ লিখতে দিতে হবে। যেমন- ক একটি বর্ণ, ল একটি বর্ণ এবং ম একটি বর্ণ ( কম )= কলম।  তাহলে একত্রে লিখবে কলম। এভাবেও লিখন দক্ষতার চর্চা করা যায়।

 

 

(২) শব্দ থেকে বাক্য লিখাঃ যে  সকল শিক্ষার্থী এলোমেলো শব্দ লিখতে পারবে তাকে বাক্য লিখতে দিতে হবে। যেমন-লাল একটি শব্দ,  এবং কলম একটি শব্দ তাহলে একত্রে বাক্য হবে লাল কলম। 

 

(৩) একাধিক শব্দ যোগে বাক্য লেখাঃ  যে  সকল শিক্ষার্থী এলোমেলো শব্দ বলতে পারবে তাকে একাধিক শব্দ দিয়ে বাক্য লিখতে দিতে হবে। যেমন-  আমি একটি শব্দ,লাল একটি শব্দ,কলম একটি শব্দ, দিয়ে একটি শব্দ, লিখি একটি শব্দ   তাহলে একত্রে বাক্য হবে আমি লাল কলম দিয়ে লিখি।

    

(৪) বর্ণ  শব্দ ও বাক্য লেখা চর্চা করাঃ বাংলা লিখতে যে সকল শিক্ষার্থী দূর্বল তাদেরকে ১মে বর্ণ তারপর শব্দ তারপর বাক্য এভাবে লেখা শেখানো কার্যাবলী পরিচালনা করতে হবে। এভাবেও লিখন দক্ষতার চর্চা করা যায়।

 

(৫) শুধু লেখা দক্ষতার উপর শিক্ষকের প্রশিক্ষন চালু করাঃ প্রশিক্ষিত শিক্ষক,শিক্ষিত জাতি কথাটি সামনে রেখে শিক্ষকদের বেশি করে প্রশিক্ষন চালু করতে হবে বিশেষ করে লিখন দক্ষতার উপর শিক্ষকদের প্রশিক্ষন বাড়াতে হবে  তাহলে লিখন দক্ষতা অর্জিত হবে।  

 

(৬) মুক্তপাঠ, শিক্ষক বাতায়ন, অনলাইন শিক্ষা ডট কম পত্রিকা থেকে শিক্ষকদের শিক্ষা গ্রহন করাঃ  বর্তমানে মুক্তপাঠ, শিক্ষক বাতায়ন ও অনলাইন পত্রিকা থেকে ও বিভিন্ন লিখন দক্ষতার উপর বিনামুল্যে প্রশিক্ষন চালু রেখেছে যেমনঃWriting Instructing কোর্সটি গ্রহন করলে লেখার দক্ষতা অনেক বাড়বে। 

 

(৭) বিভিন্ন উপকরনের ব্যবহারঃ শ্রেনিকক্ষে শিক্ষককে প্রচুর পরিমানে লিখন দক্ষতার উপর উপকরন ব্যবহার করতে হবে যেমনঃশব্দ কার্ড, বর্ণ কার্ড, বাক্য কার্ড, বিভিন্ন ভিডিও ইত্যাদি। এভাবেও লিখন দক্ষতার চর্চা করা যায়। 

 

(৮) ভালো লেখকদের লেখা অনুসরন করাঃ শ্রেনিতে যেসকল শিক্ষার্থী ভালো লেখতে পারে তাদেরকে সামনে নিয়ে বোর্ডে লিখতে দিতে হবে আর বাকিদের অনুসরন করতে দিতে হবে এবং যারা কম পারে তাদেরকে সামনে বসতে দিতে হবে।

           

 

(৯) শুধু লেখার জন্য আলাদা সময় বের করে লেখাঃ লিখন দক্ষতা বৃদ্ধির সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো আলাদা সময় বের করে লেখা। শুধু লেখার জন্য আলাদা করে প্রতিদিন ১০-১৫ মিনিট লিখতে হবে। এভাবেও লিখন দক্ষতার চর্চা করা যায়।     

 

(১০) বার বার লেখা অনুশীলন করাঃ লিখন দক্ষতা বৃদ্ধি করার জন্য একজন শিক্ষার্থীকে বারবার অনুশীলন করতে হবে।অনুশীলন করা ছাড়া কোন শিক্ষার্থী লেখা ভালো করতে পারে না।  

 

(১১) লেখার লক্ষ্য নির্ধারন করাঃ লেখার দক্ষতা বৃদ্ধির করার জন্য একজন শিক্ষার্থীকে তাঁর লেখার লক্ষ্য নির্ধারন করতে হবে । যদি তার লেখার লক্ষ্য থাকে যে লেখা সুন্দর করতে হবে তাহলে তার লেখা অবশ্যই সুন্দর হবে।

 

   

(১২) লেখার উদ্দেশ্য নির্ধারন করাঃ  পাঠ্য সমূহ লেখার সময় উদ্দেশ্য নির্ধারণ করার অনুশীলন করতে হবে।পাঠ্য সমূহ কেন লেখা হয়েছিল এবং এই পাঠ থেকে কি বুঝানো হয়েছে সে সম্পর্কে চিন্তা করুন এবং আপনি কি উদ্দেশ্য লিখছেন তা সনাক্ত করুন। এভাবেও লিখন দক্ষতার চর্চা করা যায়। 

 

(১৩) লেখার সময় নোট তৈরি করাঃ শিক্ষার্থীরা লেখার সময় বিভিন্ন কঠিন শব্দ,যুক্তবর্ণ,  সমার্থক শব্দ, বুঝতে না পারা শব্দ তাঁর নোট খাতায় লিখে রাখবে, আলাদা সময় চর্চা করবে  এবং প্রয়োজনে শিক্ষকের সহায়তা নিবে। 

 

 

 

 

(১৪) শ্রেষ্ঠ লেখক বা সেরা লেখক বা কলম যোদ্ধা তৈরি করাঃপ্রতিটি বাংলা ক্লাশে  সপ্তাহে কমপক্ষে একদিন লেখার দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য যথাযথ বিরামচিনহ ব্যবহারে বাংলা বিষয়ে লিখন মূল্যায়ন  নেওয়া হবে, যার লেখা সবচেয়ে ভালো হবে তাকে এ সপ্তাহের জন্য শ্রেষ্ঠ লেখক ঘোষনা করা হবে এবং সম্ভব হলে পুরুস্কৃত করা হবে। এভাবে প্রতিটি সপ্তাহে ভিন্ন ভিন্ন শ্রেষ্ঠ লেখক ঘোষনা করা হবে। এতে করে শিক্ষার্থীর লেখাভীতি দূর হবে এবং লেখার প্রতি ঝোক বাড়বে।        

 

 

(১৫) শিক্ষার্থীদের লেখার মান অনুযায়ী অবস্থান নির্নয় করাঃ প্রতিটি বাংলা ক্লাশে  সপ্তাহে কমপক্ষে একদিন লিখন দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য বাংলা বিষয়ে লিখন পরীক্ষা নেওয়া হবে, যাদের লেখা বেশি সুন্দর হবে তাদের একটি দল আলাদা করতে হবে, যাদের লেখা মধ্যম তাদের আলাদা করতে হবে এবং সম্ভব হলে পুরুস্কৃত করা হবে। আর যারা লিখতে পারে না তাদের আলাদা করে নিতে হবে এবং আলাদা ভাবে যত্ন নিতে হবে। এতে করে শিক্ষার্থীর লেখাভীতি দূর হবে এবং লেখার প্রতি ঝোক বাড়বে।      

 

(১৬) লেখার আগ্রহ সৃষ্টি করাঃ শিশুদের কোন কিছু লেখার আগে তাঁর মধ্যে যাতে আগ্রহ সৃষ্টি হয়  সে রকম কাজ যেমন গান, কবিতা, ছড়া বলতে হবে তাহলে শিক্ষার্থীদের  প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হবে।  

 

(১৭) লেখার পূর্বে বিষয়বস্তু সম্পর্কে ধারনা নেওয়াঃ যেকোন বিষয়ে লেখার পূর্বে এর সম্পর্কে কিছুটা ধারণা নিতে পারেন, অথবা লেখা শেষ হলে কি ধারনা পেলেন তা নির্ধারন করতে হবে। এভাবেও লিখন দক্ষতার চর্চা করা যায়।    

 

(১৮) দ্রুত লেখা চর্চা করাঃ শ্রেনিকক্ষে শিক্ষার্থীদের বাংলা লেখা দ্রুত চর্চা করতে হবে তাহলে ভালো লেখক তৈরি হবে।    

 

(১৯) লেখার আগে এক নজর চোখ বুলিয়ে নেওয়াঃশিক্ষার্থীদের লেখা শুরু করার আগে যে লেখাটি লেখা হবে তা একবার এক নজর চোখ বুলিয়ে নিতে হবে তাহলে লেখা অনেক সহজ হবে। এভাবেও লিখন দক্ষতার চর্চা করা যায়। 

 

(২০) লেখার আগে লেখাটা কি সম্পর্কে তা অনুমান করে  নেওয়াঃ  শিক্ষার্থীদের লেখা শুরু করার আগে যে লেখাটা লেখা হবে তা কি সম্পর্কে সেটি আগে থেকেই অনুমান করে নিতে হবে তাহলে লেখাটি অনেক সহজ হবে।    

 

 

(২১) স্মৃতিতে ধরে রাখাঃলিখন দক্ষতা বৃদ্ধির করার আরেকটি কৌশল হলো স্মৃতিতে ধরে রাখা। স্মৃতিতে ধরে রাখতে না পারলে লিখন দক্ষতা অর্জন করা সম্ভব নয়। এভাবেও লিখন দক্ষতার চর্চা করা যায়। 

 

(২২) পারগতার ভিত্তিতে ছাত্রছাত্রীদের দলে বিভক্ত করা ও ব্যবস্থা নেওয়াঃ পারগতার ভিত্তিতে শিক্ষার্থীদের তিনটি দলে ভাগ করতে হবে যথাঃ (ক) সাবলীল দলঃ যে সকল শিক্ষার্থী ভালো ভাবে লিখতে পারে তাদের আলাদা করে নিতে হবে। (খ) মধ্যম বা শিক্ষকের সহায়তায় লিখতে পারে এমন শিক্ষার্থীদের দলঃ  এ সকল শিক্ষার্থীদের শিক্ষক সহায়তা করে সাবলীল করে তুলবেন। (গ) অপারগ শিক্ষার্থীদের দলঃএই সকল শিক্ষার্থীদের আলাদা করে ক্লাশ টাইমে বা টিফিন টাইমে বা স্কুলের কার্যক্রম শুরু হওয়ার আগে তাদেরকে একেবারে বর্ণ থেকে শুরু করে বাক্য লিখাতে হবে।    

 

(২৩) মা সমাবেশ করে অভিভাবকদের সম্পৃক্ত করাঃ শ্রেনিকক্ষে যে সকল শিক্ষার্থী ভালোভাবে লিখতে পারে না তাদেরকে আলাদাভাবে সম্পৃক্ত করতে হবে। তাদের মা’দের ডেকে মা সমাবেশ করতে হবে যাতে মায়েরা বাড়িতে তাদের লেখার প্রতি নজর দিতে পারে।   

 

(২৪) লেখার প্রতি আগ্রহী করে তোলাঃ শিক্ষার্থীরা যাতে লেখার প্রতি আগ্রহী হয় তাঁর জন্য বিভিন্ন কার্যক্রম হাতে নিতে হবে যেমন লিখন দিবস, সহ পাঠ্যক্রমিক কার্যাবলী হিসেবে বিভিন্ন গল্পের বই, কবিতার বই, বিভিন্ন ছবির বই ছাত্রছাত্রীরা যাতে বাড়িতে নিয়ে যেতে পারে তাঁর জন্য ব্যবস্থা করতে হবে যেমন বিদ্যালয়ে লাইব্রেরী তৈরি করতে হবে।  

 

(২৫) পুরুস্কৃত করাঃ যে সকল শিক্ষার্থীরা সুন্দর ভাবে লিখতে পারে তাদেরকে পুরুস্কৃত করার ব্যবস্থা করতে হবে তাহলে তাদের লেখার প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি পাবে।   

 

(২৬) সকাল সন্ধ্যা লেখার অভ্যাস করাঃ মা সমাবেশের মাধ্যমে, মায়েদের তদারকির মাধ্যমে প্রতিটি শিক্ষার্থী যাতে সকাল-সন্ধ্যা বাড়িতে পড়তে ও লিখতে বসে তা শিক্ষককে নিশ্চিত করতে হবে।  

 

(২৭) সাপ্তাহিক/পাক্ষিক/মাসিক/ লিখন পরীক্ষা নেওয়াঃ শিক্ষার্থীদের সাপ্তাহিক না হলে পাক্ষিক না হলে কমপক্ষে মাসে একবার রিডিং পরীক্ষা নিতে হবে তাহলে তাদের লেখার প্রতি আগ্রহ বাড়বে।   

 

(২৮) One to one approach: শ্রেনির সব শিক্ষার্থীর লিখন দক্ষতা নিশ্চিত করার জন্য শিক্ষক পালাক্রমে সব শিক্ষার্থীর কমপক্ষে পাঁচ লাইন লিখে নিবেন এবং এককভাবে নিয়মিত পর্যবেক্ষন করবেন এবং শিক্ষার্থীদের অবস্থান নির্ণয় করবেন।প্রয়োজনে ফলাবর্তন দিবেন, এভাবেও লিখন দক্ষতার চর্চা করা যায়। 

 

(২৯) অপারগ শিশুদের আলাদাভাবে যত্ন নেওয়াঃ  শ্রেনির যে সকল শিক্ষার্থী লিখনে অপারগ তাদের আলাদা করে দল করে শিক্ষক নিজে বা পারগ শিক্ষার্থী দ্বারা অপারগ শিক্ষার্থীদের লিখনের ব্যবস্থা করতে হবে।    

 

(৩০) বিরাম চিহ্ন শেখার মাধ্যমেঃ শিক্ষার্থীদের লিখনে ভালো করতে হলে তাদের অবশ্যই বিরাম চিনহের ব্যবহার জানতে হবে।  তাহলে তার হাতের লেখা সঠিক/শুদ্ধ হবে।

 

(৩১) সহজ পড়া থেকে কঠিন পড়ার দিকে অগ্রসর হয়েঃ শিক্ষার্থীদের যেকোন লিখন সহজ থেকে কঠিনের দিকে অগ্রসর হতে হবে। তাহলে তার হাতের লেখা ভালো হবে।

 

(৩২) প্রতিদিন এক পৃষ্ঠা করে লেখা বাধ্যতামুলক করাঃ শিক্ষার্থীরা যাতে প্রতিদিন একপৃষ্ঠা করে লেখা শিক্ষককে ক্লাশে জমা দিতে পারে তার বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা করতে হবে। তাহলে তার হাতের লেখা ভালো হবে।

 

(৩৩) ইচ্ছে মতো লিখতে দিয়েঃ প্রাক প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের ইচ্ছে মতো লিখতে দিয়ে   লিখন অগ্রগতি বৃদ্ধি করা যায়। তাহলে তার হাতের লেখা ভালো হবে। এভাবেও লিখন দক্ষতার চর্চা করা যায়।

 

(৩৪) যেমন আছে তেমন লিখতে দিয়েঃ প্রাক প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের যেমন আছে তেমন লিখতে দিয়ে লিখন অগ্রগতি বৃদ্ধি করা যায়। এভাবেও লিখন দক্ষতার চর্চা করা যায়।

 

(৩৫) একই লাইন বারবার লিখতে দিয়েঃ এক লাইন বারবার লিখতে দিয়ে যেকোন শিক্ষার্থীর লিখন অগ্রগতি বৃদ্ধি করা যায়। তাহলে তার হাতের লেখা সুন্দর হবে। এভাবেও লিখন দক্ষতার চর্চা করা যায়।

 

 

মন্তব্য করুন