Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ ০৫:৫৯ অপরাহ্ণ

বিশ্ব অর্থনীতিতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব

পৃথিবীতে যত বেশি উন্নয়ন, তত উষ্ণায়ন। ২০১৬ সালে শক্তিশালী এল নিনোর কবলে ছিল পৃথিবী। এ সময় এল নিনোর প্রভাবে আমেরিকা, আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল এবং এশিয়া মহাদেশ দাবদাহে পুড়েছে। তখন বিশ্বের ছয় কোটি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এ বছর এল নিনোর প্রভাবে ভারত বাংলাদেশে কোনো বৃষ্টিপাত হয়নি। গরমে ভারতের এক মহিলা পাকা রাস্তার ওপর ডিম ভাজি করে বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন। ২০১৬ সালে থাইল্যান্ডে ৬৬ ডিগ্রি তাপমাত্রা ছিল। এল নিনো হচ্ছে, বায়ুম-লীয় ও গ্রীষ্মম-লীয় অঞ্চলের সমুদ্রগুলোর মধ্যে একটি পর্যায়বৃত্তের পরিবর্তন। এল নিনোর প্রভাবে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন দেখা দেয়। এল নিনো

পর্যায় বৃত্তের উষ্ণ পর্যায়, লা নিনো হচ্ছে, শীত পর্যায়। পর্যায় বৃত্তের পরিবর্তনের নির্দিষ্ট কোনো সময় নেই। তবে ৩ থেকে ৮ বছরের মধ্যে পরিবর্তন দেখা দেয়। এল নিনো বন্যা, খরাসহ অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। পৃথিবী নামের এই গ্রহটি মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণে চরম ক্ষতির সম্মুখীন।

বাংলাদেশ নাতিশীতোষ্ণ তাপমাত্রার দেশ হলেও গত কয়েক দশকে তাপমাত্রার অস্বাভাবিক আচরণ লক্ষ করা যাচ্ছে। আবহাওয়া ক্ষণে ক্ষণে বদলাচ্ছে। ছয় ঋতুর চরিত্র এখন একটাই গরম। দেশের মোট আয়তনের চার ভাগের এক ভাগ বনভূমি থাকার কথা। কাগজে-কলমে, বই-পুস্তকে লেখায় ১২ ভাগ, প্রকৃত অর্থে আছে সাত থেকে আট ভাগ। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ও বিপদাপন্ন দেশের তালিকায় অন্যতম বাংলাদেশ। এক সময় বাংলাদেশে ছিল বাঁশ-বেত-ছন-মাটির তৈরি ঘর-বাড়ি। বন-জঙ্গল ছিল প্রচুর। প্রকৃতিতে ছিল মনোমুগ্ধকর হিমেল বাতাস। এখন কড়া রোদের তেজ। দিনভর তির্যক সূর্যের দহন। প্রচ- খরতাপে পুড়ছে সারা দেশ। রাতে ও দিনে দাবদাহে শরীর ঝলসানো ও ঘাম ঝরানো গরম। গ্রাম-শহরে একই অবস্থা। রাস্তাঘাট, গাছতলায় কোথাও একটু ঠা-া বাতাস নেই। লোহা পোড়ানোর মতো গরমে নদ-নদী, খাল-বিল, হাওর, পুকুর সব শুকিয়ে যাচ্ছে।

আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান জার্মান ওয়াচ প্রকাশিত গ্লোবাল ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স এর তথ্যতে বলা হয়, জলবায়ুর পরিবর্তনের বিচারে শীর্ষ দশ ক্ষতিগ্রস্ত দেশের মধ্যে প্রথম অবস্থানে বাংলাদেশ। জলবায়ুর ব্যাপক পরিবর্তনের জন্য দায়ী কার্বন। শিল্পোন্নত দেশগুলোর কার্বনের কারণে অনুন্নত দেশগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের মাথাপিছু কার্বন উদগিরণের হার ১৭.৬২ মেট্রিক টন, রাশিয়ার ১২.৫৫ মেট্রিক টন, চীন ৬.৫২ মেট্রিক টন, ব্রাজিল, অস্ট্রেলিয়া, সৌদি আরবসহ অনেক দেশ কার্বন ছড়াচ্ছে বেশি। অথচ বাংলাদেশের মাথাপিছু কার্বন উদগিরণের হার মাত্র ০.৩৭ মেট্রিক টন।

সব উন্নয়নশীল দেশই বিরাট ঋণের বোঝা বইছে, এবং অবস্থা আরও করুণ হয়েছে কভিড-১৯ এর কারণে। ২০২০ সালে অনেক দেশ তাদের সার্বভৌম ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়েছে। ইউএনডিপি ৭২টি দেশকে চিহ্নিত করেছে ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে দুর্বল হিসেবে, আর তাদের মধ্যে বেশ কয়েকটি দেশের পরিস্থিতি সংকটজনক। খাদ্য নিরাপত্তা একটা বড় উদ্বেগের ক্ষেত্র, কারণ তা দেশের প্রায় ৫০ শতাংশ মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ১৫ শতাংশ অবদান রাখে এবং ১৩০ কোটি মানুষকে খাদ্য নিরাপত্তা দেয়।

এই অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে কপ-২৬ এর ঠিক আগে জি-২০ অর্থমন্ত্রীদের বৈঠক বসছে। সেখানে এই সব বিষয়ই আসার কথা। উপযুক্ত কারণেই জলবায়ুগত ক্ষতি প্রশমনের বিষয়টি সদস্যদের কাছে, যাদের মধ্যে উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলো আছে, সর্বাধিক গুরুত্ব পাবে। ভারতের অবস্থান অবশ্য এই গোষ্ঠীতে অনন্য। সে মোট জাতীয় আয়ের নিরিখে বিশ্বের মধ্যে পঞ্চম বৃহত্তম অর্থনীতি হিসেবে বিশিষ্ট, কিন্তু তার মাথাপিছু আয় জি-২০ এর উন্নয়নশীল সদস্যদের মধ্যে সব থেকে কম। অন্যদিকে শক্তি উৎপাদনের জন্য ভারত কয়লার ওপর নিভর্রশীল হলেও পুনর্বীকিরণযোগ্য শক্তি উৎপাদনে সে বিশ্বের নেতা হয়ে উঠতে চলেছে, এবং তার পরেই রয়েছে চীন। বাংলাদেশের মতোই ভারত খুবই দুর্বল অবস্থানে রয়েছে, কারণ তার মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের বেশ কয়েক শতাংশ ২০৫০ সালের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিপন্ন হতে পারে। খাদ্য নিরাপত্তা একটা বড় উদ্বেগের ক্ষেত্র, কারণ তা দেশের প্রায় ৫০ শতাংশ মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ১৫ শতাংশ অবদান রাখে এবং ১৩০ কোটি মানুষকে খাদ্য নিরাপত্তা দেয়। এই সব বিষয়েই বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের মিল রয়েছে। গ্রিনহাউজ গ্যাসের চতুর্থ বৃহত্তম নিঃসরণকারী হিসেবে (চীন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের পরেই) ভারতের ওপর প্রশমনের জন্য বড়সড় ব্যবস্থা নেওয়ার চাপ খুবই বেশি। তা হলেও ভারত এখনো তার নতুন লক্ষ্য (এনডিসি) ঘোষণা করেনি। কিন্তু ভারতের জন্য অভিযোজনের গুরুত্ব অপরিসীম। তবে বিশেষ করে অভিযোজনের জন্য অর্থসংস্থান নিয়ে কপ-২৬-এ বেশ চড়া সুরে বিতর্ক হবে। ২০২০ সালের ওইসিডি রিপোর্টে বলা হয়েছিল ২০১৮ সালে পরিবেশের জন্য ৭৮৯ কোটি মার্কিন ডলার তোলা হয়েছিল, আর তার মধ্যে ৬২০ কোটি ডলার এসেছে গণ-উৎস থেকে। এখন উন্নয়ন সংস্থাগুলোর মধ্যে যেভাবে জলবায়ুর জন্য অর্থসংস্থানের বিষয়টিকে ওডিএ থেকে বার করে আনার ক্ষেত্রে কে প্রথম হবে তা নিয়ে সৌন্দর্য প্রতিযোগিতা চলছে, সেই বিষয়টি উদ্বেগজনক।

অপরদিকে বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের গড় তাপমাত্রা ১ থেকে দেড় ডিগ্রি বাড়বে এবং ক্ষতিগ্রস্ত হবেন ১৩ কোটি ৪০ লাখ লোক। এ সময় দেশের আর্থিক ক্ষতি হবে ৪০ লাখ ১৯ হাজার ৩০০ কোটি টাকা এবং মানুষের জীবনযাত্রার মান ৬.৮ শতাংশের নিচে নেমে যেতে পারে। এশিয়া উন্নয়ন ব্যাংক বলেছে, ২০১১-২০৫০ সালের মধ্যে এ দেশের ৯৬ লাখ মানুষ জলবায়ু তাড়িত বাস্তচ্যুতির শিকার হবে এবং দারিদ্র্যের হার ১৫ শতাংশ বেড়ে যেতে পারে।

এ ছাড়া উপকূলের ৩ কোটি ৫ লাখ মানুষ বাস্তচ্যুতির শিকার হবে। ইতিমধ্যে লবণাক্ততায় ৬০ লাখ মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন, ২০৫০ সালে হবে দেড় কোটি আক্রান্ত। উষ্ণতা বৃদ্ধি পাওয়ায় ইতিমধ্যে ঘূর্ণিঝড়ের কারণে ৩৫টি জেলার ২০৯টি উপজেলায় ৬৩ হাজার হেক্টর জমির ফসল একাধিকবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেশের অর্থকরী ফসল পাট এখন উধাও। ভোলা জেলার আয়তন অনেক কমেছে। বায়ুমণ্ডলে বিরাজমান জলীয় বাষ্প, কার্বন ডাই অক্সাইড, মিথেন, নাইট্রাস, ওজোন, ক্লোরোফ্লোরো কার্বনকে গ্রিন হাউজ বলা হয়। বায়ুমণ্ডলের উপরিস্থিত স্তরের সর্বপ্রথম উপাদান হচ্ছে ওজোন স্তর। যা পৃথিবীকে সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মির বিকিরণ থেকে রক্ষা করে। ভূ-গর্ভস্থ জ্বালানি, দাবানল, মানুষ ও অন্যান্য জীবজন্তুর নিঃশ্বাসে কার্বন ডাই-অক্সাইড, পশু পালন, আবর্জনা, শোধনপ্রণালী, গ্যাস বিতরণ লাইনের ছিদ্র, শিল্পকারখানা, ইটভাটার ধোঁয়া ও যানবাহনের ব্যবহৃত জ্বালানি তেলের দহনে নাইট্রাস অক্সাইড, রেফ্রিজারেটর, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্র, এরোসেল ব্যবহারে ক্লোরোফ্লোরো অক্সাইড এবং দহন প্রক্রিয়ায় সৃষ্ট মিথেন গ্যাসে ওজোন স্তর ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বায়ুমণ্ডলের অতিরিক্ত পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমনের কারণে গত ১ শতকে গড়ে ১.৭৪ শতাংশ বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২১ সালে ৩ ডিগ্রি তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ার কথা রয়েছে। আইপিসিসির মতে, ২০১০ সালে ১.৮ ডিগ্রি থেকে সর্বোচ্চ ৪.২ ডিগ্রি তাপমাত্রা বাড়বে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) বলেছে, ২০২১ সালে কার্বন ডাই-অক্সাইড ৫ শতাংশ বেড়ে যাবে।

কিন্তু অর্থনীতি ও অভিযোজন ক্ষমতা শক্তিশালী হলে এই সব দেশ যেমন লাভবান হবে, তেমনই লাভবান হবে অন্য দেশগুলোও। গ্লোবাল কমিশন অন অ্যাডাপটেশন ২০১৯ সালে বলেছিল যে, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে যুঝতে পারে এমন কাজের জন্য খরচ করা প্রতি মার্কিন ডলার থেকে নিট অর্থনৈতিক লাভের পরিমাণ হতে পারে ২ থেকে ১০ মার্কিন ডলার। একটি নির্দিষ্ট দেশে এমন বিনিয়োগের সুফল কিন্তু ছড়িয়ে যাবে সেই দেশের সীমান্ত পার করেও। জলবায়ু পরিবর্তন ও কভিড-১৯-এর কারণে সব দেশই যে অর্থনৈতিক দুর্দশায় পীড়িত হলো, তা এই ছোঁয়াচে অসুখের উদাহরণ। জনকল্যাণ পরিষেবাগুলো আসলে জাতীয় বা বিশ্বের প্রয়োজনের পরিপ্রেক্ষিতে নীতিগত ভাবে বেছে নেওয়া পরিবর্তনীয় সামাজিক নির্মাণ।

শেষতম আইপিসিসি রিপোর্টের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা আশা করতে পারি প্যারিস চুক্তির সপ্তম অনুচ্ছেদের আওতায় এনে পুরো বিশ্বের লক্ষ্য ও বিশ্বজনীন দায়িত্ব হিসেবে গণ্য করার বিষয়টি কপ-২৬-এ আরও উচ্চৈঃস্বরে অনুরণিত হবে। সবশেষে আমাদের প্রত্যাশা তো এই যে, সুস্থ চিন্তাই জয়ী হবে, এবং এই বোধগুলো তৈরি হবে যে জলবায়ু পরিবর্তন সত্যিকারের বিপদ এবং দুর্বল অংশের প্রতি মনোযোগী মানবিক নিরাপত্তা এমন উন্নততর শান্তি ও বিশ্বব্যাপী সুস্থিতি নিয়ে আসতে পারে এটাই বিশ্ববাসীর প্রত্যাশা।

মন্তব্য করুন

ব্লগ