Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ ০৭:০৭ পূর্বাহ্ণ

অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি পাকশী

  • অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি পাকশী
  • ডক্টর মোহাম্মদ ইদ্রিস

সচ্ছ পানির ঢেঊয়ের সঙ্গে অবাক ছন্দে দোল খাওয়া, সীমাহীন আকাশের ক্ষণে ক্ষণে রোমঞ্চকর রূপ পাল্টানো রং, চোখ জুড়ানো সবুজের সমারহ। গাছ-পালা, লেবু-কাঁঠাল আর লিচুর বাগান, দুর থেকে ভেসে আসা মাঝি-মাল্লাদের গান। পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার পদ্মা নদীর তীরে অবস্থিত এক মনোহরিণী স্থান পাকশী। পাক বা পবিত্র স্থান হিসাবেই পাকশীর নামকরণ বলে জানা যায়। দেখলে মনে হবে বিদেশের কোন স্থানে ভ্রমণে বেড়িয়েছেন। কিন্তু না ইতিহাস-ঐতিহ্য ও সৌন্দর্যের লীলাভূমি পাবনার পাকশী। যেখানে মিশে আছে পদ্মা নদীর বালুচর, মেঘ আর আকাশ। পদ্মার এপার-ওপারের মানুষসহ দেশ-বিদেশের শত শত মানুষ প্রতিদিন এখানে সমবেত হয়। নদীর স্্েরাতে পাল তোলা ডিঙ্গি নৌকার ভেসে চলা, কিম্বা গন্তব্যে ছুটে চলা মালবাহী স্টিমার, পদ্মাপাড়ের মানুষদের জীবনচিত্র সবকিছু দেখে মুগ্ধ হওয়া ছাড়া উপায় নেই।

যাবেন যেভাবে: রাজধানী ঢাকা থেকে পাবনার দূরুত্ব ১৬১ কিলোমিমিটার। রেল, সড়ক ও আকাশ পথে পাবনা যাওয়া যায়। ঢাকার গাবতলী বাস টার্মিনাল হতে দিবা-রাত্রি সব সময় এসি-ননএসি বাস পাবনার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। ঢাকা থেকে তিন-চার ঘন্টার মধ্যে পাবনা শহরে পৌঁছানো যায়। শ্যামলী, সি-লাইন, পাবনা এক্সপ্রেস, রাজা-বাদশা, বাদল, মহানগর, সরকার ট্রাভেল্স, নাইট স্টার, কিংস, এশা, ক্যাপিটাল সার্ভিসসহ বিভিন্ন বাস দেশের প্রায় সকল জেলা শহর থেকে পাবনার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়।

পাবনা শহর থেকে ঈশ্বরদীর দূরুত্ব প্রায় ২৫ কিলোমিমিটার। ঈশ্বরদী  থেকে পাকশীর দূরুত্ব প্রায় ১০ কিলোমিমিটার। পাবনা কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল হতে ত্রিশ মিনিট পর পর বাস-মিনিবাস এ উপজেলা শহরের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। পাবনা থেকে এক ঘন্টার মধ্যে এ উপজেলা শহরে পৌঁছানো যায়। এ ছাড়া পাবনা কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল হতে সি.এন.জি চালিত অটোরিকসায় করে মাত্র ত্রিশ থেকে চল্লিশ মিনিটের মধ্যে এখানে পৌঁছানো যায়। এ ছাড়া সহজ পথে সি.এন.জি চালিত অটোরিকসায় অথবা মাইত্রো বাসে করে আওতাপাড়া হয়ে সরাসরি যাওয়া যায় পাকশীতে। সফরসঙ্গী বেশী হলে মাইত্রো বাসে ভ্রমণেই সুবিধা বেশী যাতে কম সময়ে বেশী স্পট ভ্রমণ করা যায়। রাত্রি যাপনের জন্য এখানে জেলা পরিষদের ডাক বাংলো রয়েছে। আয়েশী ভ্রমণের জন্য রয়েছে পাকশী রিসোর্ট। রেলওয়ে জংশনের আশে-পাশে অনেক হোটেল ও বোডিং রয়েছে। রেল পথে রেলওয়ে জংশন ঈশ্বরদী নেমে সি.এন.জি চালিত অটোরিকসায় পাকশীতে যাওয়া যায়। আকাশ পথে  ঈশ্বরদী বিমান বন্দর থেকে পাকশীতে পৌঁছানো যায়। অটোরিকসায় ওঠার পর থেকেই শুরু হবে নাগরিক কোলাহলমুক্ত ছায়া ¯িœগ্ধ সুশোভিত এক নতুন পথ চলা। আওতাপাড়া ও বাঁশেরবাধার সরু পথে রয়েছে সবুজ গাছ-পালা, লেবু-কাঁঠাল আর লিচুর বাগান। গ্রীষ্মকালে দাশুড়িয়া থেকে রূপপুর পর্যন্ত রাস্তার দুইধারের লিচু বাগানের থোকা-থোকা লিচু আপনাকে সত্যিই মুগ্ধ করবে। দেখতে দেখতে আপনি কখন রূপপুরে পৌঁছে যাবেন, সেটা টেরই পাবেন না।

রুপপুর মোড়ে বিদেশীদের জন্য গড়ে উঠা গ্রীণ সিটি দেখলে আপনি আরো অভিভূত হয়ে যাবেন। রুপপুর পারমানবিক বিদুৎ কেন্দ্রটি দুই হাজার চার শত মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন বাংলাদেশের প্রথম পারমানবিক বিদুৎ কেন্দ্র। এটি একটি পরিকরিকল্পিত বিদুৎ কেন্দ্র। এ পারমানবিক বিদুৎ কেন্দ্রের বিদেশী প্রকৌশলী ও কর্মচারীদের জন্য নির্মিত হয়েছে এই সবুজ নগরী। এ পথে চলতে চলতে আপনি দেখতে পাবেন বিশাল আকৃতির পারমানবিক চুল্লিগুলো। এত চমৎকার সব দৃশ্য অবলোকনের পর পাকশীতে আর কিইবা দেখব ? হ্যাঁ দেখার অনেক কিছুই আছে।

পাকশীতে যেখানে গিয়ে আপনার গাড়ী থামবে, সেখানে আপনি বিস্ময়ে হতভাগ হবেন নিশ্চয়ই। মনে হবে আপনি একটি পাহাড়ের পাদদেশে দাঁড়িয়ে আছেন। আসলে এটি ব্রিটিশ রাজের গড়া হার্ডিঞ্জব্রীজ সংলগ্ন পাকশী রেলওয়ে স্টেশন। সমতল থেকে প্রায় দুইশত ফুট উঁচুতে সিড়ি বেয়ে উঠতে হয় রেলওয়ে স্টেশনে। হিমছড়ির ন্যায় এখানে দাঁড়িয়ে আপনি অবলোকন করতে পারবেন প্রমত্তা পদ্মার আসল রুপ বৈচিত্র। বিদেশের কোন সমুদ্র সৈকত নয়, এটি সপ্নের রাজ্য পাবনার পাকশী। নীলাকাশে সাদা মেঘের ভেলা, ঢেউয়ের দোলায় ছন্দময় অনুভুতি। ঝাঁকে ঝাঁকে সাদা বকের ওরাউরি এ সবকিছুই যে কাউকে নিজের অজান্তেই টেনে নিয়ে যাবে ভাবনার অন্য এক জগতে। এখানে দাঁড়িয়ে আপনি আরো অবলোকন করতে পারবেন পশ্চিম দিকে মাইকেল লর্ড হার্ডিঞ্জ (১৯১২ খ্রী:) এর নামানুসারে নির্মিত হার্ডিঞ্জব্রীজ, দক্ষিণে লালনশাহ সেতু, পূর্ব দিকে রুপপুর পারমানাবিক বিদুৎ কেন্দ্রের বিশাল আকৃতির চুল্লিগুলোর মাথা, উত্তর দিগন্তে পদ্মা নদীরপাড়ের সু-সজ্জিত বাংলাদেশ রেলওয়ের অফিস ও বিশাল আবাসিক এলাকা। এরই গাছ-পালার উপর দিয়ে দেখা যাবে ফুরফুরার খানকাহ শরীফের সু-উচ্চ মিনার।

হার্ডিঞ্জ ব্রীজ: হার্ডিঞ্জ ব্রীজের দৈঘ্য ৫৮৫৪ ফুট বা ১.৮ কিলোমিটার। এর উপড় দুইটি ব্রডগ্রেজ রেল লাইন রয়েছে। ১৮৮৯ খ্রীষ্টাব্দে তৎকালীন অবিভক্ত ভারতের ব্রিটিশ সরকার আসাম, ত্রিপুরা, নাগপুর ও উত্তরবঙ্গের সাথে কলকাতার যোগাযোগ সহজতর করার লক্ষ্যে পদ্মা নদীর উপড় ব্রীজ নির্মাণের  প্রস্তাব করে। পরবর্তীতে ১৯০৮ খ্রীষ্টাব্দে ব্রীজ নির্মাণের  অনুমতি লাভের পর ব্রিটিশ প্রকৌশলী স্যার রবার্ট গেইলস সেতুটি নিমার্ণের দায়িত্ব গ্রহন করে। ১৯০৯ খ্রীষ্টাব্দে ব্রীজ নির্মাণের জন্য সমীক্ষা শুরু হয়। ১৯১০-১১ খ্রীষ্টাব্দে পদ্মার তীরে বাঁধ নির্মাণ করা হয়। ১৯১২ খ্রীষ্টাব্দে সেতুটির গাইড ব্যাংক নির্মাণ কাজ শুরু হয়। চব্বিশ হাজার শ্রমিক অক্লান্ত পরিশ্রম করে ১৯১৫ খ্রীষ্টাব্দে নির্মাণ কাজ শেষ করে। তৎকালীন অবিভক্ত ভারতের ভাইরস ছিলেন লর্ড হার্ডিঞ্জ। তার নামানুসারে সেতুটির নামকরণ করা হয় হার্ডিঞ্জব্রীজ। এ সেতুর নির্মাণ ব্যয় ছিল তিন কোটি একান্ন লক্ষ বত্রিশ হাজার একশত চৌষট্টি টাকা। সেতুটির ১৫ টি স্প্যান আছে। ১৯৭১ সালে মহান  মুক্তিযুদ্ধের সময় সেতুটির ১২ নম্বর স্প্যানটি বোমা মেরে ক্ষতিগ্রস্থ করা হয়। পরে সেটিকে আবার মেরামত করা হয়।

লালনশাহ সেতু: হার্ডিঞ্জ ব্রীজের ঠিক দক্ষিণে লালনশাহ সেতু অবস্থিত। লালনশাহ সেতুরও দৈঘ্য ৫৮৫৪ ফুট বা ১.৮ কিলোমিটার। এর উপড় দুইটি লেন রয়েছে। ২০০১ সালে এর ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করা হয়। পরবর্তীতে ২০০৩ সালে চীনের মেজর ব্রীজ ইন্জিনিয়ারিং বুরো সেতুটি নিমার্ণের দায়িত্ব গ্রহন করে। ২০০৪ সালের ১৭মে ব্রীজটি উদ্বেধন করা হয়। সেতুটির ১৭ টি স্প্যান আছে।

পদ্মার রুপ বৈচিত্র: রেলওয়ে স্টেশন থেকে দাড়িয়ে আপনি পদ্মার আসল রুপ বৈচিত্র অবলোকন করার পর নিচে নেমে এসে প্রায় অর্ধ কিলোমিটার সবুজ বেষ্টনী বাদাম আর ভুট্টার ক্ষেত পেড়িয়ে  পদ্মার বিশাল জলরাশির পাশে পৌঁেছ যাবেন। পদ্মার এপার-ওপারের মানুষসহ দেশ-বিদেশের শত শত মানুষ প্রতিদিন এখানে সমবেত হয়। নদীর স্্েরাতে পাল তোলা ডিঙ্গি নৌকার ভেসে চলা, কিম্বা গন্তব্যে ছুটে চলা মালবাহী স্টিমার, পদ্মা পাড়ের মানুষদের জীবনচিত্র সবকিছু দেখে মুগ্ধ হওয়া ছাড়া উপায় নেই। মালবাহী স্টিমারের ভিতরে অনেকে বাসা বেঁধে বসে আছে। জীবন ও  জীবিকার প্রয়েজনে তারা নৌকা- স্টিমারে বাস করে আসছে বছরের পর বছর।

পহেলা বৈশাখের এই আনন্দঘন মূহুর্তে আমার আম্মা, তিন বোন মেঝ দুলা ভাই, সেঝ ভাই, সেঝ ভাবী, আমার সহধর্মিনী, ভাতিজা ইকবাল মাহমুদ, নবপুত্রবধু শাপলা, ভাগ্নী মাহফুজা, মিম, ভাতিজী শাহনাজ, শারমিন, শিরিন, সোনামনি সাকিব, মেহজাবিন, নাতি ফাহাদ, সাকাত ও জান্নাতি। ছোট বড় মোট বিশজন সফর সঙ্গীসহ আমরা পদ্মার আসল রুপ বৈচিত্র অবলোকন করার পর প্রায় অর্ধ কিলোমিটার বাদাম আর ভুট্টার ক্ষেত আবার পেড়িয়ে পদ্মার হার্ডিঞ্জ ব্রীজের নীচে ক্লান্ত- শ্রান্ত হয়ে চাদর বিছায়ে বসে পড়লাম। সফরের খাদ্য বিভাগের দায়িত্ব ছিল মেঝ দুলা ভাই জনাব মারুফ হোসেনের। তিনি সবাইকে লাইন ধরে বসার পরামর্শ দিলেন।

একটি সুন্দর পরিবেশে উন্মুক্ত স্থানে বসে খাওযা-দাওয়া খুব ভালই লাগছিল। হঠাৎ দুরে বিকট আওয়াজ শুনে সবাবই ভয় পেয়ে গেলাম। না, এটি তেমন কিছুই ছিলনা, খুলনা থেকে ছেড়ে আসা আন্ত-নগর রূপসা এক্সপ্রেস ট্রেনটি ঝক-ঝক শব্দে আমাদের মাথার উপর দিয়ে চলে গেল। মনে হল দুনিয়াটা একেবারে উলট-পালট হয়ে যাচ্ছে। শিরিন, সাকিব, মেহজাবিন, নাতি ফাহাদ, সাকাত ও জান্নাতি ওরা কান্না - কান্না ভাব। খাওযা-দাওয়া শেষে আমার আম্মার কাছ থেকে এই সাঁড়ার ব্রিজের (হার্ডিঞ্জ ব্রীজের আরেক নাম) জি¦ন-পরী ও পাকশী ফুরফুরা শরীফের খানকার গল্প শুনলাম। এর পর মনোহরিণী স্থান পাকশীর পদ্মার পাড় ছেড়ে আমরা পাকশী রিসোর্টের দিকে রওয়ানা হলাম।

পাকশী রিসোর্ট: পাকশী রিসোর্টে রয়েছে তিনতলা বিশিষ্ট দুইটি ভবন, বিদেশী স্থাপত্য কঠামোয় গড়ে উঠা পাকশী রিসোর্টে  পাবেন আধুনিক সব সুযোগ সুবিধা। এর প্রতিটি কক্ষই শীততাপ নিয়ন্ত্রিত, সব কিছুতেই পরিপাটি, সাজানো গোছানো। পাবেন আধুনিক বিশ্বের রিসোর্টের খেলা-ধুলা, সুইমিংসহ অনেক ইভেন্ট। সবকিছুতে যেন আধুনিকতার ছোঁয়া। পাকশী রিসোর্টে থেকে রেলওয়ের আবাসিক এলাকা পারি দিয়ে আমরা পাকশীর ফুরফুরা শরীফের খানকায় প্রবেশ করলাম।

পাকশী খানকাহ

পাকশী খানকাহ: পাবনা অঞ্চলের উল্লে¬খযোগ্য দ্বীনি প্রতিষ্ঠান দারুস শরীয়ত যা পাকশী ফুরফুরা শরীফের খানকাহ নামে পরিচিত। সূফী ত্বরিকায় বাইআত গ্রহণ, যিকর আমল ও ইলমে মারিফাতের প্রশিক্ষণের জন্য এ প্রতিষ্ঠানটির অবদান অনন্য। প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠা লগ্ন থেকে ইসলামের প্রচার ও প্রসারে যথাযথ ভূমিকা পালন করে আসছে। পাকশীর উপকণ্ঠে এক মনোরম পেিবশে অবস্থিত দারুস শরীয়ত পাকশী। তেত্রিশ একর জমির উপর প্রতিষ্ঠিত এ প্রতিষ্ঠানটির প্রধান তত্ত্বাবধায়ক বর্তমান ফুরফুরা শরীফের পীর আবু বকর আব্দুল হাই আমিমুল মিশকাত সিদ্দিকী সাহেব। ব্রিটিশ শাসনের শেষ লগ্নে সমগ্র বাংলা ভারত আসামে ফুরফুরা শরীফের উলামায়ে কেরাম ইসলামের বাণী প্রচার করেন। ফুরফুরা শরীফের পীর শাহসূফী আবু বকর সিদ্দিকী (র:) সহ আলিমগণ বাংলাদেশের আনাচে কানাচে ইসলামের সুমহান বাণী প্রচারে আত্মনিয়োগ করেন। তাঁদের প্রচেষ্টায় এ অঞ্চলে গড়ে উঠে অনেক মসজিদ, মাদরাসা, ও খানকাহ।

১৯৪৭ খ্রীষ্টাব্দে ব্রিটিশ শাসনের অবসানে জন্ম নেয় স্বাধীন ভারত ও পাকিস্তান নামক দুটি দেশ। ফুরফুরা শরীফ ভারতে অবস্থানের কারণে এ দেশের মানুষ ফুরফুরা শরীফের উলামায়ে কেরামের হেদায়াত বাণী ও সহচার্য থেকে বঞ্চিত হয়ে পড়ে। লক্ষ লক্ষ ভক্তবৃন্দের অনুরোধে প্রতিষ্ঠিত হয় পাকশী দারুস শরীয়ত খানকা শরীফ। জানা যায় শাহ সূফী আবু বকর সিদ্দিকী (র:) পাকশীতে খানকা প্রতিষ্ঠা করেন ১৯৩৫ খ্রীষ্টাব্দে। সে সময় থেকে পাকশী খানকাহকে কেন্দ্র করে এ অঞ্চলে ইসলামের প্রচার কাজ চলতে থাকে।

১৯৩৯ খ্রীষ্টাব্দে তাঁর ওফাতের পর তার জৈষ্ঠ্য পুত্র এদেশবাসীকে তালিম, তালকিন দেয়ার লক্ষ্যে বাংলার ঐতিহাসিক স্থান পাকশীর উপকণ্ঠে পঞ্চাশ দশকের সূচনা লগ্নে প্রতিষ্ঠা করেন ফুরফুরা শরীফের কায়েমে মোকাম খানকাহ হিসেবে। তখন থেকে ফুরাফুরার উলামায়ে কেরাম বাংলাদেশের জন্য এটি প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচালনা করে আসছে। পাকশী দারুস শরীয়ত খানকা শরীফের অভ্যন্তরে রয়েছে বিশাল স্থাপনাসমূহ ও রিয়াজুল জান্নাহ মসজিদ কমপে¬ক্স। এ মসজিদটির মিনার পাকশী সেতু ও রেলষ্টেশন থেকেও দেখা যায়। এ ছাড়াও রয়েছে, একটি দাওরায়ে হাদীস কওমী মাদরাসা, হিফজুল কুরআন মাদরাসা, মক্তব, কুতুবখানা, মুসাফির খানা, মহিলা মাদরাসা, ও সুসজ্জিত বক্তৃতা মঞ্চ। পাকশীতে বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ ইছালে সওয়াব মাহফিল প্রতি বছর ফাল্গুন মাসের প্রথম শুক্র, শনি ও রবি তিনদিনব্যাপী অনুষ্ঠিত হয়। পাকশীর ফুরফুরা শরীফের খানকা পরিদর্শন শেষে আমরা ঈশ্বরদী ইপিজেড এর দিকে রওয়ানা হলাম।

ঈশ্বরদী ইপিজেড: ঈশ্বরদী ইপিজেড বা রপ্তানী প্রক্রিয়াকরণ এলাকা হার্ডিঞ্জ ব্রীজের ঠিক উত্তর-পূর্ব দিকে অবস্থিত। ৩০৯ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত এই ইপিজেটটি বাংলাদেশের তৃতীয় বৃহত্তম রপ্তানী প্রক্রিয়াকরণ এলাকা। ২০০১ সালে ঈশ্বরদী ইপিজেড বা রপ্তানী প্রক্রিয়া করণ এলাকা স্থাপিত হয়। ইপিজেড পরিদর্শন শেষে আমরা ঈশ্বরদী রেলওয়ে জংশন এর দিকে রওয়ানা হলাম।

রেলওয়ে জংশন: বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রেলওয়ে জংশন পাকশীর অদূরে ঈশ্বরদীতে অবস্থিত। এটি ব্রিটিশ রাজের গড়া প্রায় শতবছরের পুরানো রেলওয়ে জংশন। এটি ঈশ্বরদী পৌর সদরে অবস্থিত। এখানে দাঁড়িয়ে আপনি আরো অবলোকন করতে পারবেন সারি-সারি রেলের বগিগুলো যা কয়েক কিলোমিটার ব্যাপী বিস্তৃৃত। আরো অবলোকন করতে পারবেন হাজার হাজর মানুষের গন্তবে ফেরার ব্যস্ততা। দিন-রাত সব সময় এখানে কোলাহর লেগেই থাকে। রাতের রেলওয়ে জংশন ও এখানকার মানুষের জীবন চিত্র দেখলে আপনি অবাক হবেন।

ঈশ্বরদী থানা গঠিত হয় ১৯০৬ খ্রীষ্টাব্দে। ঈশ্বরদী বিমান বন্দর রয়েছে। বাংলাদেশের একমাত্র ইক্ষু গবেষণা কেন্দ্র ও ডাল গবেষণা কেন্দ্র রয়েছে এখানে। চিনিকল, পেপার মিল, সুতাকল, সিমেন্ট কারখানা এখানকার উল্লেখযোগ্য শিল্প। ঈশ্বরদী রেলওয়ে জংশন ও শহর পরিদর্শন শেষে আমরা আলহাজ মোড়ে ইক্ষু গবেষণা কেন্দ্র ও ডাল গবেষণা কেন্দ্র এর দিকে রওয়ানা হলাম। এগুলো পরিদর্শন শেষে আমরা ঐতিহাসিক পতিরাজপুরের দিকে রওয়ানা হলাম।

পতিরাজপুর মসজিদ: ঈশ্বরদীর মুলাডুলি ইউনিয়নের অন্তর্গত পতিরাজপুর একটি গ্রাম। ধারণা করা হয় যে, এ গ্রামে প্রতিষ্ঠিত মসজিদটি ৪০০ বছর পূর্বের। কেউ কেউ বলেন, ঈসা খান যখন এ দেশে রাজা মানসিংহের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেন, তখন তিনি এ স্থানের পশ্চিম দিকে ঈশ্বরদীতে তাঁবু ফেলেন এবং এ এলাকাটি মুসলিমদের করতলগত হয়। পরবর্তীতে মুসলিম বিজয়ের স্মৃতি স্বরূপ মসজিদটি নির্মিত হয়েছিল বলে জানা যায়। এ মসজিদের প্রথম মুতাওয়ালি¬ ছিলেন জনৈক কানু প্রামানিক। অন্যদিকে কেউ কেউ বলেন, কানু প্রামানিকই এই মসজিদ নির্মাণ করেন। মসজিদের প্রধান দরজার উপরিভাগে একটি কৃষ্ণ পাথরে ফারসী শিলালিপি রয়েছে। শিলালিপিটি নি¤œ অংশ মুছে যাওয়াতে এর প্রতিষ্ঠার সাল ও তারিখসহ প্রতিষ্ঠাতার নাম মুছে গেছে। মসজিদটি হিন্দু রাজা পতিরাজের রাজত্বের অব্যবহিত পরেই প্রতিষ্ঠিত হয়। মসজিদটি প্রতিষ্ঠার ফলে এতদঞ্চলে ইসলাম ব্যাপক প্রসার লাভ করে। মসজিদটি এতদঞ্চলের সবচেয়ে প্রাচীন মসজিদ বলে স্বীকৃত।

পতিরাজপুর মসজিদটি বাহির থেকে দৈর্ঘ্য প্রস্থ যথাক্রমে ৩৫¢ও ১৪¢ ৮ক্ষ্ম ভেতর থেকে দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ যথাক্রমে ২৮¢ ৩ক্ষ্মও ৭¢ ৯ক্ষ্ম মসজিদটির পূর্ব দেওয়ালে ৩টি অর্ধ চন্দ্রাকৃতি দরজা রয়েছে। দরজার উচ্চতা ও প্রস্থ ৬¢ ৬ক্ষ্মও ৩¢ তবে মূল স্থাপত্যে মসজিদটির দরজার উচ্চতা ছিল ৪¢ ৬ক্ষ্ম করে। মাথা নিচু করে মসজিদের ভেতরে প্রবেশ করতে হত। পরবর্তীতে কর্তৃপক্ষ কেটে তা বড় আকারে পরিণত করেন। মেহরাবটি ৬¢ ৮ক্ষ্ম, উত্তর ও দক্ষিণে দুইটি জানালা রয়েছে এর পরিমাপ ৫¢ ৯ক্ষ্ম৩¢ করে। মসজিদের ভেতরে ২টি পিলার আছে এর ব্যাস ২¢ ৮ক্ষ্ম করে। মসজিদের ৪ কোণে চারটি মজবুত পিলার রয়েছে এর ব্যাস ৫¢ ৪ক্ষ্ম। মসজিদটির উচ্চতা ছাদ পর্যন্ত ১২¢ মসজিদটি সুষ্ঠুভাবে রক্ষণাবেক্ষণের জন্য তৎকালীন মুসলিম শাসকগণ এই মসজিদের নামে ৫৪ বিঘা জমি ওয়াকফ সম্পত্তি দান করেন। বর্তমানে মসজিদের নামে ৫ বিঘা জমি রয়েছে। এ মসজিদকে কেন্দ্র করে ঈশ্বরদী এলাকায় ইসলামের প্রচারাভিযান শুরু হয় বলে জানা যায়। এখানে যে সকল স্থাপনা ও নিদর্শনাদি রয়েছে সেগুলো পরিদর্শন শেষে আমরা আটঘরিয়ার পথে রওয়ানা হলাম।

খানবাড়ি মসজিদ: ঈশ্বরদীর পাশপাশি ঐতিহাসিক তিন মসজিদের জনপদ আটঘরিয়া। ১৯৮৩ খ্রীষ্টাব্দে পাবনা জেলার অধীনে আটঘরিয়া উপজেলা গঠিত হয়। একদন্ত, শিবপুর ও দেবত্তর এখানকার উল্লেখযোগ্য ব্যবসায় কেন্দ্র। পান উৎপাদনের জন্য এ জনপদটি প্রসিদ্ধ। পাবনা জেলার আটঘরিয়া উপজেলার তিন মাইল পশ্চিমে মাজপাড়া ইউনিয়নের মাজপাড়া গ্রামে খানপাড়ায় খানবাড়ি মসজিদটি অবস্থিত। মসজিদটি আয়তাকার তিন গম্বুজবিশিষ্ট। এর উত্তর-দক্ষিণে দৈর্ঘ্য ১০.০৬ মিটার (২২ হাত) পূর্ব-পশ্চিমের প্রস্থ ৬.৪০ মিটার (১৪ হাত) ভূমি থেকে মসজিদের কার্নিশ পর্যন্ত উচ্চতা ৩.৬৬ মিটার (৮ হাত) আদি মসজিদের প্রবেশ পথ তিনটি, তবে মসজিদের সামনের প্রবেশ পথের সংখ্যা পাঁচটি মসজিদের দেয়াল পৌণে দুই হাত চওড়া। খানবাড়ি মসজিদটির চারকোণে আছে চারটি অষ্টভুজাকৃতি পার্শ্ব-বুরুজ। মসজিদের অভ্যন্তরভাগে গম্বুজের নিচে চারদিকে ঘিরে ও মেহরাবের মধ্যে ফুল, লতা-পাতার নকশা লক্ষণীয়। মাজপাড়া পরিদর্শন শেষে আমরা মৃর্ধাপাড়ার পথে রওয়ানা হলাম।

মৃর্ধার মসজিদ: পাবনা জেলার আটঘরিয়া উপজেলার তিন মাইল পশ্চিমে মাজপাড়া ইউনিয়নের মাজপাড়া গ্রামের আধা মাইল পশ্চিমে মসজিদটি অবস্থিত। পাবনা আটঘরিয়া উপজেলার মৃধার মসজিদটি তিন গম্বুজবিশিষ্ট আয়তাকৃতির, এতে তিনটি প্রবেশপথ ও একটি মেহরাব আছে। কেন্দ্রীয় প্রবেশ পথের শীর্ষে আরবী ভাষায় কালেমা তাইয়্যেবাউৎকীণ করা আছে; ঠিক এরূপভাবে একই কালেমা খানবাড়ি মসজিদের প্রবেশ পথের উপরেও উৎকীণ করা ছিল। সম্প্রতি পলেস্তরা করায় তা অদৃশ্য হয়ে গেছে। মৃধার মসজিদটি আটঘরিয়ায় সবচেয়ে প্রাচীন মসজিদ বলে প্রতীয়মান হয়। এর নির্মাণকাল আনুমানিক সতের শতকের শেষভাগ অথবা আঠার শতকের প্রথম ভাগ। মৃর্ধাপাড়া পরিদর্শন শেষে আমরা বেরোয়ান মসজিদের পথে রওয়ানা হলাম।

বেরুয়ান মসজিদ: বেরোয়ান মসজিদটি আটঘরিয়া উপজেলার চাঁদভা ইউনিয়নের বেরুয়ান নামক গ্রামে অবস্থিত। এটি একটি আয়তাকৃতির গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদ। মসজিদটি বাইরে থেকে দৈর্ঘ্যে ১৪.৯০ মিটার ও প্রস্থে ৫.৯০ মিটার এবং ভেতর থেকে এর পরিমাপ দৈর্ঘ্যে ১৩.৩০ মিটার ও প্রস্থে ৪.০০ মিটার। এ মসজিদের চারটি বহির্কোণে রয়েছে চারটি অষ্টভুজাকৃতির বুরুজ এবং বুরুজের শীর্ষভাগ ক্ষুদ্রাকৃতির কিউপোলাবিশিষ্ট। মসজিদটি তিনটি গম্বুজ দ্বারা আবৃত এবং সম্মুখে তিনটি চতুর্কেন্দ্রিক খিলানবিশিষ্ট প্রবেশপথ। কেন্দ্রীয় প্রবেশপথটি দুই পার্শ্বের খিলান থেকে উঁচু। পশ্চিম দেয়ালে রয়েছে তিনটি অবতল মেহরাব এবং কেন্দ্রীয় মেহরাবটি দুপার্শ্বের মেহরাব থেকে উঁচু। বেরোয়ান মসজিদে কোন শিলালিপি নেই। এর নির্মাণ কাল সম্বন্ধে কোন তথ্য পাওয়া যায়নি; তবে স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করে একে সতের শতকের শেষপাদে অথবা আঠার শতকের প্রথম দিকের নির্মাণ বলে ধারণা করা হয়।

ঈশ্বরদী ইপিজেড

বিদায় বেলা: সারা দিনব্যাপী ভ্রমণ শেষে এবার বিদায়ের পালা। আটঘড়িয়া ও ঈশ্বরদীতে যে সকল স্থাপনা ও নিদর্শনাদি রয়েছে সেগুলো পরিদর্শন শেষে আমরা আমাদের গন্তব্যে রওয়ানা হলাম। পথে মাগরিব ও এশা নামাজ আদায় করে গন্তব্যের দিকে আবার রওয়ানা হলাম। পিছনে পড়ে রইল স্মৃতিময় পাকশী, লর্ড হার্ডিঞ্জ ব্রীজ, লালনশাহ সেতু, রুপপুর পারমানাবিক বিদুৎ কেন্দ্রের বিশাল আকৃতির চুল্লিগুলো, পদ্মা নদীর পাড়, পাকশী রিসোর্ট, সু-সজ্জিত রেলওয়ের আবাসিক এলাকা, ফুরফুরার খানকাহ শরীফের সু-উচ্চ মিনার, ঈশ্বরদী রেলওয়ে জংশনের লোক-কোলাহল, পতিরাজপুর মসজিদসহ অনেক কিছু।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, সাঁথিয়া মহিলা ডিগ্রি কলেজ, পাবনা। ই

মন্তব্য করুন

ব্লগ