Loading..

ব্লগ

রিসেট

১১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ ১১:৪৫ অপরাহ্ণ

ঐতিহাসিক স্থাপনার শহর পাবনা -ডক্টর মোহাম্মদ ইদ্রিস

ঐতিহাসিক স্থাপনার শহর পাবনা

ডক্টর মোহাম্মদ ইদ্রিস

 

দারুল আমান ট্রাস্ট: পাবনা শহর দেখতে এসে বাস থেকে নেমে আপনি প্রথমে পাবনা কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালের বাইপাস মোড়ে দারুল আমান ট্রাস্ট নামে একটি বিশাল ফটক দেখতে পাবেন জানা যায় এ প্রতিষ্ঠানটি সমাজ সেবা, ইসলামের প্রচার ও শিক্ষা বিস্তারে যথাযথ ভূমিকা পালন করে আসছে। বিগত শতাব্দীর নব্বই এর দশকের প্রথমার্ধে পাবনার বিশিষ্ট সমাজ সেবক ও ইসলামী চিন্তাবিদদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় পাবনা শহরের উপকণ্ঠে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমন্ডিত, কোলাহলমুক্ত মনোরম পরিবেশে গড়ে উঠেছে দারুল আমান ট্রাস্টক্যাম্পাস। পাবনা কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল সংলগ্ন বাইপাস মোড় থেকে উত্তরদিকে লস্করপুর মৌজায় বিশাল অট্টালিকা সমৃদ্ধ ক্যাম্পাস দারুল আমান ট্রাস্ট। ট্রাস্টের পশ্চিম দিকের ভবনগুলো ইয়াতিমখানা, উত্তরদিকের ভবনগুলো ইসলামিয়া মাদরাসা, পুর্বদিকে ইসলামিয়া ডিগ্রী কলেজ, উপকণ্ঠে আল-আমান হাসপাতালঅবস্থিত। ট্রাস্টের প্রধান ফটকটি বাইপাস সড়কে সংলগ্ন অবস্থিত এবং পশ্চিম দিকে অবস্থিত মসজিদে তাকওয়া, যা আধুনিক স্থাপত্যকলার সৌন্দর্যে দেদীপ্যমান। উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার পাবনা শহরে বেসরকারী ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ট্রাষ্ট কর্তৃপক্ষ একটি প্রকল্প গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ মহৎ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য দেশ-বিদেশের হৃদয়বান ব্যক্তি ও সংস্থাসমূহের শুভ দৃষ্টি কামনা করা হয়েছে। পাবনা কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালের বাইপাস মোড়ে দারুল আমান ট্রাস্টের বিশাল ফটক পেরিয়ে হোমিওপ্যাথিক মেডিক্যাল কলেজ পাড়ি দিয়ে আমরা টেক্সটাইল কলেজের গেটে পৌঁছিলাম। এরপর স্কয়ারের মেরিল রোড সংলগ্ন শহীদ এম মুনসুর আলী কলেজ পার হয়ে আমরা কবি সাহিত্যিক, ছড়াকার, গ্রন্থকার ও চিত্রশিল্পী বন্দে আলী মিয়ার বাড়ীতে পৌঁছিলাম।

বন্দে আলী মিয়ার বসত বাড়ী: কবি, শিশু সাহিত্যিক, ছড়াকার, গ্রন্থকার ও চিত্রশিল্পী বন্দে আলী মিয়া ১৯০৭ খ্রীষ্টাব্দের ১৭ জানুয়ারী পাবনা জেলা শহরের এডওয়ার্ড কলেজ সংলগ্ন রাধানগরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম উমেদ আলী মিয়া এবং মাতার নাম লেকজান নেসা। তাঁর পিতা তৎকালীন পাবনা জজ আদালতের সরকারী কর্মচারী ছিলেন। ১৯২৩ খ্রীষ্টাব্দে তিনি রাধানগর মজুমদার একাডেমী থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। কবির মা বাবার ইচ্ছা ছিল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চ শিক্ষালাভ করে ছেলে সুশিক্ষিত হবে। কিন্তু চিত্রশিল্পী হবার দুর্বার আকাংখায় কবি মাতা-পিতার বাসনাকে সফল না করে কলিকাতা ইন্ডিয়াস আর্ট একাডেমীতে ভর্তি হন। কবি চিত্রবিদ্যায় অধ্যয়নরত থাকলেও সে সময়ে তিনি শিশুদের উপযোগী করে নিয়মিত কবিতা লিখতে শুরু করেন। এ গুলো তারই অংকিত চিত্রসহ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হত। দীর্ঘ চার বছর ধরে চিত্রবিদ্যা অধ্যয়ন শেষ করে ১৯২৭ খ্রীষ্টাব্দে টাঙ্গাইলের করটিয়া সাদত কলেজ ও পরে কলিকাতা বিদ্যাসাগর কলেজে ভর্তি হন। কবি তাঁর শিক্ষা জীবন অসমাপ্ত রেখে প্রবেশ করেন কর্মজীবনে। ১৯৩০ খ্রীষ্টাব্দ থেকে ১৯৪৬ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত তিনি কলিকাতা কর্পোরেশন স্কুলে শিক্ষকতা করেন। ১৯৪৭ খ্রীষ্টাব্দে দেশ বিভাগের পর কবি পাবনা রাধারনগরে বসবাস শুরু করেন এবং দীর্ঘদিন পর ১৯৬৪ খ্রীষ্টাব্দে বাংলাদেশ বেতারে চাকরিতে যোগদান করেন। গ্রামীণ পরিবেশ, সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, ধ্যান-ধারণা, ল্লী প্রকৃতি ছিল কবি বন্দে আলী মিয়ার লেখার প্রধান উপজীব্য বিষয়। কবি বন্দে আলী মিয়া ১৯৭৯ খ্রীষ্টাব্দের ২৭ জুন তাঁর বাসভবনে ইন্তিকাল করেন। পাবনা এডওয়ার্ড কলেজের পাশে রাধানগর মহল্লায় তাকে সমাহিত করা হয়। কবি সাহিত্যিক, ছড়াকার, গ্রন্থকার ও চিত্রশিল্পী বন্দে আলী মিয়ার বসত বাড়ী পরিদর্শন শেষ করে আমরা এডওয়ার্ড কলেজ ক্যাম্পাসে পৌঁছালাম।

 এডওয়ার্ড কলেজ: পাবনা অঞ্চলে শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিকাশের উল্লেখযোগ্য প্রাচীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ। পাবনা শহরের প্রাণকেন্দ্রে  রাধানগরে কলেজ ক্যাম্পাসটি অবস্থিত। এ প্রতিষ্ঠানটি ১৮৮৯ খ্রীষ্টাব্দে গোপালচন্দ্র লাহিরী ও এবং স্থানীয় জনগণের সহায়তায় পাবনা ইনিস্টিটিউটনামে প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর ১৯১১ খ্রীষ্টাব্দে বিট্রিশ লর্ড এডওয়ার্ড এর নামানুসারে এর নামকরণ করা হয় এডওয়ার্ড কলেজ। এ প্রতিষ্ঠানটিতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে প্রায় বিশটি বিষয়ে ¯œাতক সন্মান ও ¯œাতকোত্তর শ্রেনীতে অধ্যয়নের সুযোগ রয়েছে। পাবনা শহরের কোলাহলমুক্ত নিরিবিলি পরিবেশে কলেজ ক্যাম্পাসটি অবস্থিত। এডওয়ার্ড কলেজ ক্যাম্পাস পরিদর্শন শেষ করে এর পাশে আপনি পাবনা আলিয়া মাদরাসা ক্যাম্পাসে যেতে পারেন।

পাবনা আলিয়া মাদরাসা: পাবনা শহরের প্রাণ কেন্দ্রে ইছামতী নদীর তীরে পাবনা ঈশ্বরদী রোডের পূর্ব পার্শ্বে অবস্থিত পাবনা আলিয়া মাদরাসা। তৎকালীন সময়ে স্থানীয় উলামায়ে কেরামের সার্বিক সহযোগিতায় বাংলাদেশের প্রাচীন জেলা শহর পাবনায় ১৯১৯ খ্রীষ্টাব্দের এ মাদরাসাটি প্রতিষ্ঠিত হয়। পাবনা আলিয়া মাদরাসা প্রতিষ্ঠার সমসাময়িককালে এ অঞ্চল তৎকালীন হিন্দু জমিদার ক্ষিতিশভূষণ ও বনমালী রায় বাহাদুরের অধীনস্ত ছিল। এ প্রভাবশালী জমিদারদের শাসনামলে ধুলাউড়ী (১৮৯৬ খ্রী.) ও পার্শ্ববর্তী হাদলে (১৯০৯ খ্রী.) মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হলে স্থানীয় ইসলাাম প্রিয় মানুষেরা পাবনা শহরেও একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠার চিন্তাভাবনা শুরু করেন। সর্বপ্রথম চাঁপা বিবি জামে মসজিদ সংলগ্ন জায়গায় একটি মাদরাসা স্থাপন করা হয়। পরবর্তীতে মাদরাসাটিকে শহরের রাধানগর মৌজায় এডওয়ার্ড কলেজ সংলগ্ন বর্তমান স্থানে স্থানান্তর করা হয়। এ প্রতিষ্ঠানটিতে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বেশ কয়েকটি বিষয়ে স্নাতক সন্মান ও স্নাতকত্তর শ্রেনীতে অধ্যয়নের সুযোগ রয়েছে। পাবনা আলিয়া মাদরাসা ক্যাম্পাস পরিদর্শন শেষ করে আপনি সাহিত্যিক তোরাব আলীর বসতবাড়ী  যেতে পারেন।

কবি তোরাব আলীর বসত বাড়ী: মুসলিম শিশু সাহিত্যিক তোরাব আলী ১৮৯৮ খ্রীষ্টাব্দে পাবনা শহরের পৈলানপুরে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৬৪ খ্রীষ্টাব্দে তিনি কর্মজীবন থেকে অবসর গ্রহণ করেন। ছাত্রজীবন থেকে তিনি সাহিত্য চর্চা শুরু করেন। কর্মজীবনেও তিনি সাহিত্য চর্চার ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখেন। সাপ্তাহিক মোহাম্মদী, যুগান্তর, মাসিক সওগাত ইত্যাদি স্বনামখ্যাত পত্র-পত্রিকায় তাঁর রচনা প্রকাশিত হত। তাঁর অধিকাংশ রচনাতেই মুসলিম মনীষীদের জীবন চরিত ও ইসলামী শিক্ষা-সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য উদ্দীপ্ত করে তোলার প্রয়াস ছিল। তাঁর উল্লে¬খযোগ্য গ্রন্থাবলী হলো ছোটদের মোস্তফা (১৯৩৬), ছোটদের আশুরঙ্গজেব (১৯৩৮), গল্পে ওমর ফারুক (১৯৩৯), গল্পে আলী মরতোজা (১৯৪০) ফেরেস্তার চেয়ে বড় (১৯৫০) ইত্যাদি। তিনি ছিলেন পাবনা মুসলিম ইন্সটিটিউট এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। এ মহান ব্যক্তিত্ব ১৯৭২ খ্রীষ্টাব্দে পাবনায় তাঁর নিজ বাসভবনে ইন্তিকাল করেন। পৈলানপুরে তাকে সমাহিত করা হয়। সাহিত্যিক তোরাব আলীর বসত বাড়ী পরিদর্শন শেষ করে আমরা বনমালী ইনস্টিটিউটে পৌঁছালাম।

বনমালী ইনস্টিটিউট: পাবনা শহরের প্রাণকেন্দ্রে  আব্দুল হামীদ রোডে অবস্থিত জমিদার রাজা রায় বাহাদুর বনমালী রায়ের  স্মৃতি বিজরিত বনমালী ইনস্টিটিউট। উপমহাদেশের বরেণ্য গুণীজন, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এখানে আগমন করেছেন। এখানে রয়েছে নাট্যশালা ও মুক্তমঞ্চ যা পাবনা টাউন হল বা স্বাধীনতা চত্বর হিসাবে পরিচিত। পাবনা শহরের সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড ও বই মেলা বনমালী ইনস্টিটিউকে কেন্দ্র করে পরিচালিত হয়। এর পাশেই রয়েছে অন্নদা গোবিন্দ পাবলিক লাইব্রেরী। বনমালী ইনস্টিটিউট পরিদর্শন শেষ করে আমরা জমিদার রায় বহাদুরের রাজবাড়ী তারাশ বিল্ডিং পৌঁছালাম।

রাজা রায় বাহাদুরের তারাশ বিল্ডিং: পাবনা শহরের প্রাণকেন্দ্রে  আব্দুল হামীদ রোডে জেলা কারাগার ও জেলা স্কুলের সামনে অবস্থিত জমিদার রাজা রায় বাহাদুর বনমালী রায়ের  রাজবাড়ী যা তারাশ বিল্ডিং হিসাবে পরিচিত। রাজবাড়ীটি এখন পর্যন্ত প্রায় অক্ষত অবস্থায় আছে। ইমারতটি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রতœতত্ত অধিদপ্তর কর্তৃক সংরক্ষিত। পাবনা শহরের প্রধান সড়ক আব্দুল হামীদ রোডে প্রবেশ পথ দিয়ে রাজবাড়ী ঢুকতেই হাতি নিয়ে প্রবেশের উপযুক্ত বিশাল গেট খুবই চিত্রাকর্ষক। গেটের সোজা পশ্চিম দিকে রয়েছে একটি দ্বোতলা বিল্ডিং এটি ছিল জমিদারের রাজস্ব অফিস। এখানে খাজনা আদায় ও প্রজাদের অভাব অভিাযোগ শ্রবণের কাজ হতো। বিল্ডিংটির সুন্দর কারুকাজ এবং গাম্ভীর্য এতই গভীর যে, এখানে প্রবেশ করে বাস্তবিকই আপনি দূর অতীতকে ভাবতে শুরু করবেন। জমিদার রায় বাহাদুরের রাজবাড়ী তারাশ বিল্ডিং পরিদর্শন শেষ করে আপনি পায়ে হেঁটে জোড় বাংলা মন্দিরে যেতে পারেন।

জোড় বাংলা মন্দির: পাবনা শহরের প্রাণকেন্দ্রে  বড় বাজার থেকে সামান্য পুর্ব দিকে দক্ষিণ রাঘবপুরে বড় পুকুরের সামনে এ জোড় বাংলা মন্দির অবস্থিত। ব্রিটিশ  শাসননামলেই  সরকার কর্তৃক  ইমারতটি  প্রতœতত্ত  অধিদপ্তর কর্তৃক সংরক্ষণের জন্য গৃহীত হয়। জানা যায়, ব্রজমোহন ক্রোড়ী নামক মুর্শিদাবাদের এক নবাবের তহশিলদার আঠার শতকের মধ্যভাগে এটি  নির্মাণ করেন। জোড় বাংলা মন্দিরটিতে কোন  শিলারিপি নেই। এ স্থাপত্য নিদর্শনটি  ইটের উপর ইট গেঁথে নির্মিত ইমারত বরং এটি যেন শিল্পির আপন মনের আাঁকা একটি কাব্য। জোড় বাংলা মন্দির ক্যাম্পাসে চারদিকে দেয়াল ঘেরা সুসজ্জিত ফুলের বাগান আপনাকে পুলকিত করবে। হিন্দু সম্প্রদায়ের অত্যন্ত তীর্থ স্থান হিসাবে এটি পরিচিত। জোড় বাংলা মন্দিরে পরিদর্শন শেষ করে আপনি অনন্ত মোড় হয়ে এডরুক ঐষধ কোম্পানীর শীতলাই হাউস দিকে যেতে পারেন।

শীতলাই হাউস: শীতলাই হাউস পাবনা শহরের দক্ষিণ রাঘবপুরে অবস্থিত। চাটমোহরের শীতলাই জমিদারের পাবনা শহরে নির্মিত সুরমা ভবনই শীতলাই হাউস নামে পরিচিত। ইতিহাস সুত্রে জানা যায় এ হাউসটি জমিদার যোগেন্দ্রনাথ মৈত্রেয় উনিশ শতকের প্রথম দিকে নির্মাণ করেন। হাউসটি এখনো অক্ষত অবস্থায় রয়ে গেছে। পরবতীতে হাউসটির মালিকগণ দেশ ত্যাগ করায় সরকারি সম্পত্তিতে পরিণত হয়। এডরুক ঐষধ কোম্পানীর মালিক হাউসটি সরকারের কাছ থেকে ক্রয় করেন। কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে শীতলাই হাউস পরিদর্শন করে আপনি অনন্ত মোড় হয়ে হাজীর হাট হয়ে ঐতিহাসিক ভাড়ারা মসজিদের দিকে যেতে পারেন।

ভাড়ারা মসজিদ: পাবনা সদর উপজেলা গঠিত হয় ১৮৭২ খ্রীষ্টাব্দে। এ উপজেলার প্রাচীন নিদর্শনাদির মধ্যে তিন গম্বুজ বিশিষ্ট ভাড়ারা মসজিদ (১১৭৬ হি.) অন্যতম। পাবনা শহর থেকে দশ কিলোমিটার পূর্বে সবুজ ফসলের ক্ষেতঘেরা ভাঁড়ারা গ্রামে এ প্রাচীন মসজিদ রয়েছে। পাবনা সদর এলাকায় ইসলাম প্রচারে ভাঁড়ারা মসজিদ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। এ মসজিদকে কেন্দ্র করে অত্র এলাকায় ইসলামের সুমহান আদর্শ প্রচারিত হয়। মসজিদটি ভূমি-নকশায় আয়তাকৃতির এবং তিন গম্বুজবিশিষ্ট। এ মসজিদের দৈর্ঘ্য প্রায় ১৩.৫১ মিটার (৪৪¢-৪ক্ষ্ম) এবং প্রস্থ ৬.১০ মিটার (২০ ফুট) দেয়াল ০.৯১ মি. (৩ ফুট) চওড়া এবং গম্বুজের ব্যাসার্ধ ৬.১০ মি. (১ ফুট ১০ ইঞ্চি) বর্তমানে মূল মসজিদ ভবনের সাথে নতুন একটি বারান্দা যুক্ত হয়েছে। এ সুরম্য মসজিদে রয়েছে তিনটি প্রবেশপথ এবং এ তিনটি প্রবেশ পথের সমান্তরালে পশ্চিম দেয়াল, তিনটি মেহরাব। মসজিদের কেন্দ্রীয় প্রবেশ পথের শীর্ষে কালো ব্যাসাল্ট পাথরের শিলালিপি রয়েছে। ফারসি ভাষায় এ শিলালিপিটি নাস্তালিক রীতিতে লিখিত। এতে রয়েছে তিন সারি লেখা এবং সবশেষে মসজিদের নির্মাণ তারিখ। শিলালিপির পাঠ থেকে জানা যায়, ভারতের বাদশা দ্বিতীয় শাহ আলমের রাজত্বকালে দৌলত খানের পুত্র আসালত খান মসজিদটি হিজরি ১১৭৬ সনে (১৭৬২ খ্রী.) নির্মাণ করেন। ভাড়ারা মসজিদ পরিদর্শন শেষ করে আপনি ঐতিহাসিক সাদুল্ল¬াহপুর মসজিদ  পরিদর্শনে যেতে পারেন। 

সাদুল্লহপুর মসজিদ: সাদুল্ল¬াহপুর মসজিদটি পাবনার আরো একটি পুরাতন মসজিদ। পাবনা শহর থেকে প্রায পনের কিলোমিটার দক্ষিণ পূর্বে সবুজ ফসলের ক্ষেতঘেরা সাদুল্ল¬াহপুর গ্রামে এ প্রাচীন মসজিদ রয়েছে। মসজিদটি তিন গম্বুজবিশিষ্ট আয়তাকৃতির এবং আয়তন ১৫.৩৭ মি.´৪.৮৮ মি. মসজিদের চার প্রান্ত কোণে রয়েছে চারটি পার্শ্ববুরুজ। মসজিদের উপরের অংশ বিভিন্ন প্যানেল নকশায় অলঙ্কৃত। এ মসজিদের প্রবেশপথ তিনটি এবং প্রবেশ পথের পলেস্তরার জালি সম্বলিত ছিল। মসজিদটির কেন্দ্রীয় প্রবেশপথের উপরে শিলালিপিটি দৃশ্যমান। এ শিলালিপি থেকে মসজিদের নির্মাণকাল জানা যায়, ১২২৪ হিজরী (১৮০৯ খ্রী.) এ মসজিদের শিলালিপিটি কালো ব্যাসাল্ট পাথরের উপরে উৎকীর্ণ। লিপিটি ফারসি ভাষায় নাস্তালিক রীতিতে লিখিত। সাদুল¬øাহপুর জামে মসজিদে সমসাময়িককালের অন্যান্য মসজিদের অনুরূপ নির্মাণ কৌশল ও স্থাপত্যরীতি পরিলক্ষিত হয়। সাদুল্ল¬াহপুর মসজিদ পরিদর্শন শেষ করে ফিরে এসে আপনি মহানায়িকা সুচিত্রা সেনের বসত বাড়ীর দিকে যেতে পারেন

সুচিত্রা সেনের বাড়ী: পাবনা শহরে ডিসি অফিসের পাশেই রয়েছে মহানায়িকা সুচিত্রা সেনের বসত বাড়ী। তিনি ১৯৩১ সালের ৬ এপ্রিল পাবনা শহরে জন্মগ্রহন করেন। তার প্রকৃত নাম রমা দাসগুপ্ত। তার বাবা করুণাময় দাশগুপ্ত ছিলেন এক স্থানীয় বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। মা ইন্দ্রিরা দেবী ছিলেন গৃহিনী। সুচিত্রা সেন ছিলেন কবি রজনী কান্ত সেনের নাতী। পাবনা শহরেই তিনি পড়াশুনা করেন। ১৯৪৭ সালে শিল্পপতি আদিনাথ সেনের পুত্র দিবানাথের  সাথে সুচিত্রা সেনের বিয়ে হয়। ১৯৫২ সালে সুচিত্রা সেন বাংলা চলচিত্র জগতে অভিনয় শুরু করেন। পাবনা শহরে  মহানায়িকা সুচিত্রা সেনের বসত বাড়ীটিতে একটি অন্যতম দর্শনীয় স্থান। দশ টাকা টিকিটে মহানায়িকা সুচিত্রা সেনের বসত বাড়ীর পরিদর্শন শেষ করে আপনি পাবনা জর্জকোর্ট ভবনের দিকে যেতে পারেন।

পাবনা জর্জকোর্ট ভবন: পাবনা জর্জকোর্ট ভবনটি ব্রিটিশ রাজের গড়া শতাধিক বছরের একটি ঐতিহাসিক ইমারত। দেশের অন্যান্য পুরাতন স্থাপনার মত লাল ইট দিযে গড়া এ ভবন সত্যিই আকর্ষনীয়। ছুটির দিন ছাড়া এখানে লোক-কোলাহলে মুখরিত থাকে সারা দিন। আদালত পাড়ার এ ভবনটি বেশ আরমের জায়গা হিসাবে পরিচিত। পাবনা জর্জকোর্ট ভবনটি পরিদর্শন শেষ করে আপনি পুলিশ লাইন-লাইব্রেরী বাজার হয়ে  হিমায়েতপুরের দিকে যেতে পারেন।

মানসিক হাসপাতাল: ১৮৩২ খ্রীষ্টাব্দে পাবনা জেলা প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর পাবনার সিভিল সার্জন জমিদার বাড়ীতে পাবনা মানসিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে শহরের তিন কিলোমিটার পশ্চিমে হিমায়েতপুরে প্রায় ১১৩ একরের বিশাল ক্যাম্পাসে হাসপাতালটি স্থানন্তরিত হয়। বর্তমানে হাসপাতালটির শয্যা সংখা ৫০০টি। হাসপাতালটির লাল রংয়ের ভবনগুলো খুবই দৃষ্টিনন্দন। উপমহাদেশের সুখ্যাত এ হাসপাতালটিতে দেশ-বিদেশ থেকে আগত মানসিক রোগী এখানে প্রতিনিয়ত ভীড় জমায়। পাবনা মানসিক হাসপাতালের পুর্বদিকে রয়েছে পাবনা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল। পাবনা মানসিক হাসপাতালের দক্ষিণের একটি ভবন পাবনা মেডিকেল কলেজের ছাত্রী হোষ্টেল হিসাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। পাবনা মানসিক হাসপাতাল পরিদর্শন শেষ করে আমরা পায়ে হেঁটে পাশের অনুকুল চন্দ্রের আশ্রমের দিকে রওয়ানা হলাম।

অনুকুল চন্দ্রের আশ্রম: শ্রী অনুকুল চন্দ্র ঠাকুর নামে এক ধর্মগুরু পাবনায় পিতা-মাতার স্মৃতি রর্ক্ষাথে একটি মন্দির নির্মাণ করেন। পরে তিনি সৎসঙ্গ নামে একটি জনহিতকর সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। যা অনুকুল চন্দ্রের আশ্রম নামে পরিচিতি লাভ করে মন্দিরের পাশে অতিথিশালয় ও পাঠাগার রয়েছে। এটি বর্তমানে হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম তীর্থস্থান হিসাবে দেশ-বিদেশের পর্যটকগণ এখানে প্রতি নিয়ত যাতায়াত করেন। পাবনা শহর ও শহরের আশে-পাশের এ সকল স্থাপনা ও নিদর্শনাদি রয়েছে সেগুলো পরিদর্শন শেষে আমরা আমাদের পরবর্তী গন্তব্য পাকশীর দিকে রওয়ানা হলাম।

যাবেন যেভাবে: রাজধানী ঢাকা থেকে পাবনার দূরুত্ব ১৬১ কিলোমিমিটার। রেল, সড়ক ও আকাশ পথে পাবনা যাওয়া যায়। ঢাকার গাবতলী বাস টার্মিনাল হতে দিবা-রাত্রি সব সময় এসি-ননএসি বাস পাবনার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। ঢাকা থেকে তিন-চার ঘন্টার মধ্যে পাবনা শহরে পৌঁছানো যায়। রেলপথে ঈশ্বরদী জংসন, চাটমোহর ষ্টেশন থেকে পাবনা শহরে পৌঁছানো যায়। পাবনা রেলওয়ে ষ্টেশন থেকে সোমবার ব্যতিত প্রতিদিন ভোর সারে পাঁচটায় ও রাত সারে নয়টায় ঢালারচরের উদ্দেশ্যে এবং সকাল সারে নয়টায় রাজশাহীর উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। আকাশ পথে ঈশ্বরদী বিমান বন্দর থেকে পাবনা শহরে পৌঁছানো যায়। পাবনা শহরে রাত্রি যাপনের জন্য বিভিন্ন রকমের রিসোর্ট, হোটেল ও কটেজ রয়েছে। থ্রি-স্টার মানের রতদ্বীপ, রূপকথা, পাকশীসহ বেশ কয়টি রিসোর্ট রয়েছে। হোটেল ড্রিম প্যালেজ, হোটেল শিলটন, হোটেল প্রবাসী ইন্টারন্যাশনাল, হোটেল মিড নাইট মুন, হোটেল জিহাদ, প্রাইম গেস্ট হাউস, হোটেল ইডেন, হোটেল ছায়ানীড়, হোটেল লোকমানিয়া, দোয়েলসহ শহরের আনাচে-কানাচে বিভিন্ন নামের, বিভিন্ন মানের প্রায় শতাধিক হোটেল, কটেজ ও বোডিং রয়েছে। খেতে পারবেন গরুর গোসত, খাসির গোসত, দেশী-বিদেশী মুরগী, হাঁস, কবুতরের গোসত। পাবেন ভাদাই-গাজনা ও চলন বিলের মিঠা পানির মাছ। কিনতে পারবেন তাঁতের শাড়ী-লুঙ্গী-গামছা, হোসিয়ারী সামগ্রী এবং পাবনা শহরের প্যারাডাইস, শ্যামলী, বনলতা, বনফুলের বিভিন্ন কাউন্টার থেকে খাঁটিঁ দুধের নানা-রকমের মিষ্টান্ন ও দই বাজারের দই। পাবনা বড় বাজার থেকে কিনতে পারবেন আঁখের গুড়, তাল-খেজুরের পাটালি এবং আউশ-আমন ধানের চিড়া, মুড়ি, গজা ও খই।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, সাঁথিয়া মহিলা ডিগ্রি কলেজ, পাবনা।

মন্তব্য করুন