মুহাদ্দিস
২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ ০৮:২১ পূর্বাহ্ণ
মুহাদ্দিস
মুমিনদের পরস্পর ভালোবাসা
আল্লাহর অনুগত বান্দারা সুযোগ পেলেই দু’হাত তুলে আল্লাহর কাছে মিসকিনের মতো ফরিয়াদ করে! অশ্রু ঝরিয়ে নীরবে নিভৃতে মহান প্রতিপালকের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে- হে মহীয়ান, গরিয়ান, দয়ালু মাবুদ আপনি দয়া করে আমাকে ক্ষমা করে দিন। আপনি তো দয়ার আধার। আপনি ছাড়া দুনিয়ার জমিনে আমার কোনো সাহায্যকারী নেই। আপনি তো রাহমানুর রাহিম। এভাবে কাকুতি-মিনতি করে দোয়ার সময় কেউ যদি অন্য মুসলিম ভাইয়ের জন্য দোয়া করে তাহলে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তার দোয়া দ্রুত কবুল করেন।
রাসূলুল্লাহ সা: আরো বলেছেন, ‘কেউ-ই জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না, আর তোমরা ঈমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ না একে অন্যকে ভালোবাসবে। আমি কি তোমাদের তা বলে দেবো না, কী করলে তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসার সৃষ্টি হবে? তা হলো- তোমরা পরস্পর বেশি বেশি সালাম বিনিময় করবে।’ (মুসলিম-৯৮)
فَإِذَا دَخَلْتُمْ بُيُوتًا فَسَلِّمُوا عَلَى أَنْفُسِكُمْ تَحِيَّةً مِنْ عِنْدِ اللَّهِ مُبَارَكَةً طَيِّبَةً كَذَلِكَ يُبَيِّنُ اللَّهُ لَكُمُ الْآيَاتِ لَعَلَّكُمْ تَعْقِلُونَ
অর্থাৎ “যখন তোমরা গৃহে প্রবেশ করবে, তখন তোমরা তোমাদের স্বজনদের প্রতি সালাম বলবে। এ হবে আল্লাহর নিকট হতে কল্যাণময় ও পবিত্র অভিবাদন।” (সূরা নূর ৬১ আয়াত)
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَدْخُلُوا بُيُوتًا غَيْرَ بُيُوتِكُمْ حَتَّى تَسْتَأْنِسُوا وَتُسَلِّمُوا عَلَى أَهْلِهَا
অর্থাৎ “হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদের গৃহ ব্যতীত অন্য কারও গৃহে গৃহবাসীদের অনুমতি না নিয়ে ও তাদেরকে সালাম না দিয়ে প্রবেশ করো না।” (সূরা নূর ২৭ আয়াত) সালামের জবাবের পদ্ধতি:
وَإِذَا حُيِّيتُمْ بِتَحِيَّةٍ فَحَيُّوا بِأَحْسَنَ مِنْهَا أَوْ رُدُّوهَا إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ حَسِيبًا
Avi hLb †Zvgv‡`i‡K mvjvg †`qv n‡e ZLb †Zvgiv Zvi †P‡q DËg mvjvg †`‡e| A_ev Rev‡e ZvB †`‡e| wbðq Avjøvvn me wel‡q c~Y© wnmveKvix| (সূরা নিসা- ৮৬)
عَن أَبِي هُرَيرَةَ رضي الله عنه: أنَّ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم ، قَالَ: يُسَلِّمُ الرَّاكِبُ عَلَى المَاشِي، وَالمَاشِي عَلَى القَاعِدِ، وَالقَليلُ عَلَى الكَثِيرِ . متفقٌ عَلَيْهِ
আবূ হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু ’আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ’’আরোহী পায়ে হাঁটা ব্যক্তিকে, পায়ে হাঁটা ব্যক্তি বসে থাকা ব্যক্তিকে এবং অল্প সংখ্যক লোক অধিক সংখ্যক লোককে সালাম দেবে।’’ (বুখারী-মুসলিম)
وَقَالَ عمرَان بن حُصَيْن: جَاءَ رجل إِلَى النَّبِي [صلى الله عَلَيْهِ وَسلم] فَقَالَ: " السَّلَام عَلَيْكُم، فَرد عَلَيْهِ، ثمَّ جلس فَقَالَ النَّبِي [صلى الله عَلَيْهِ وَسلم] : " عشر " ثمَّ جَاءَ آخر فَقَالَ: السَّلَام عَلَيْكُم وَرَحْمَة الله، فَرد عَلَيْهِ فَجَلَسَ فَقَالَ: " عشرُون " ثمَّ جَاءَ آخر فَقَالَ: السَّلَام عَلَيْكُم وَرَحْمَة الله وَبَرَكَاته، فَرد عَلَيْهِ فَجَلَسَ فَقَالَ: " ثَلَاثُونَ " رَوَاهُ أَبُو دَاوُد وَالتِّرْمِذِيّ
পরস্পরের মধ্যে সালাম দেয়াও একটি দোয়া। সালাম মানে শান্তি, তাই মুমিনরা পরস্পর সালাম বিনিময়েই অন্তরে প্রশান্তি লাভ করে। এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সা:-এর কাছে এসে বললেন, ‘আসসালামু আলাইকুম’। তখন তিনি বললেন, ‘লোকটির জন্য ১০টি নেকি লেখা হয়েছে’। এরপর অন্য এক ব্যক্তি এসে (একটু বাড়িয়ে) বললেন, ‘আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।’ তখন আল্লাহর রাসূল সা: তার সালামের উত্তর দিয়ে বললেন ‘তার জন্য ২০টি নেকি লেখা হয়েছে’। এরপর অন্য এক ব্যক্তি এসে (আরো একটি শব্দ বাড়িয়ে) বললেন, ‘আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ ওয়া বারাকাতুহু’। তখন রাসূলুল্লাহ সা: তার (সালামের) উত্তর দিয়ে বললেন, ‘লোকটির জন্য ৩০টি নেকি লেখা হয়েছে’। (আবু দাউদ)
সুবহানাল্লাহ! কত সুন্দর আল্লাহ তায়ালা
আর কত সুন্দর তার রাসূল মুহাম্মদ সা: এবং কত সুন্দর কুরআনুল কারিমের
শিক্ষা-শিষ্টাচার। মুমিনরা পরস্পর শুধু সালাম বিনিময়েই
ক্ষান্ত নয়; জীবন
চলার পথে তারা পরস্পর সহযোগিতা-সহমর্মিতা ও আন্তরিকতার মেলবন্ধনে আবদ্ধ। এ
প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ সা: বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের পার্থিব কোনো বিপদ দূর করে দেবে,
আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার কোনো একটি কঠিন
বিপদ দূর করে দেবেন। যে ব্যক্তি কোনো অভাবগ্রস্ত মানুষের অভাব দূর করে দেবে,
আল্লাহ দুনিয়া ও আখিরাতে তার অভাব দূর
করে দেবেন। আর যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমের দোষত্রুটি গোপন করে,
আল্লাহ দুনিয়া ও আখিরাতে তার দোষত্রুটি
গোপন রাখবেন। আল্লাহ তাঁর বান্দাদের ততক্ষণ পর্যন্ত সহযোগিতা করেন,
যতক্ষণ সে তার অন্য ভাইয়ের সাহায্যে রত
থাকে।’ (মুসলিম-২৬৯৯)
رَبَّنَا اغۡفِرۡ لَنَا وَ لِاِخۡوَانِنَا الَّذِیۡنَ سَبَقُوۡنَا بِالۡاِیۡمَانِ وَ لَا تَجۡعَلۡ فِیۡ قُلُوۡبِنَا غِلًّا لِّلَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا رَبَّنَاۤ اِنَّکَ رَءُوۡفٌ رَّحِیۡمٌ
অর্থ: ‘হে আমাদের রব! আমাদের এবং ঈমানে অগ্রণী আমাদের ভাইদের ক্ষমা করুন। আর মুমিনদের বিরুদ্ধে আমাদের অন্তরে বিদ্বেষ রাখবেন না। হে আমাদের রব! আপনি তো দয়ালু, পরম দয়ালু।’ (সুরা হাশর: ১০)
وَالْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ يَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَيُقِيمُونَ الصَّلَاةَ وَيُؤْتُونَ الزَّكَاةَ وَيُطِيعُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ أُولَئِكَ سَيَرْحَمُهُمُ اللَّهُ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ حَكِيمٌ
Avi gywgb cyiæl I gywgb bvixiv G‡K Ac‡ii eÜz, Zviv fvj Kv‡Ri Av‡`k †`q Avi Ab¨vq KvR †_‡K wb‡la K‡i, Avi Zviv mvjvZ Kvwqg K‡i, hvKvZ cÖ`vb K‡i Ges Avjøvn I Zuvi ivm~‡ji AvbyMZ¨ K‡i| G‡`i‡K Avjøvn kxNÖB `qv Ki‡eb, wbðq Avjøvn civµgkvjx, cÖÁvgq| -(সূরা তওবা : ৭১)
হজরত উম্মুদ দারদা রা: থেকে বর্ণিত- রাসূলুল্লাহ
সা: বলেন, ‘এক মুসলমান যখন অপর
মুসলমানের অনুপস্থিতিতে তার জন্য দোয়া করে তখন তা কবুল করা হয়। তার মাথার কাছে
একজন ফেরেশতা নিযুক্ত করে দেয়া হয়। যখনই সে অপর মুসলমানের জন্য কল্যাণের দোয়া করে
তখনই সেই ফেরেশতা বলে, আমিন, তোমাকেও যেন অনুরূপ দান করা হয়।’ ولكَ بِمِثْلٍ (মুসলিম-৮৬)
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘ঈমানদারদের সাথে একজন ঈমানদারের সম্পর্ক ঠিক তেমন যেমন দেহের সাথে মাথার সম্পর্ক। সে ঈমানদারদের প্রতিটি দুঃখ-কষ্ট ঠিক অনুভব করে যেমন মাথা দেহের প্রতিটি অংশের ব্যথা অনুভব করে।
হজরত আবু বকর ইবনু আবু শায়বা (রহ.) হজরত জারীর (রা.) থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমার থেকে তিনটি বিষয়ে ‘বাইআত’ নিয়েছেন। এক, নামাজ কায়েম করা। দুই, জাকাত আদায় করা। তিন, প্রত্যেক মুসলমানের কল্যাণ কামনা করা। -(মুসলিম, কিতাবুল ঈমান)
আরেক হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘সাত ব্যক্তিকে আল্লাহ তায়ালা শেষ বিচারের দিনে তাঁর সুশীতল ছায়ায় স্থান দেবেন, যেদিন তাঁর ছায়া ব্যতীত আর কোনো ছায়া থাকবে না : (১) ন্যায় বিচারক ইমাম বা নেতা; (২) মহান আল্লাহর ইবাদতে মশগুল যুবক; (৩) মসজিদের সাথে সম্পর্কযুক্ত হৃদয়ের অধিকারী ব্যক্তি- যখন সে মসজিদ থেকে বের হয় আবার তাতে ফিরে আসা পর্যন্ত মন ব্যাকুল থাকে; (৪) এমন দুই ব্যক্তি, যারা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই পরস্পর ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ হয় এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই তাদের বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়; (৫) এমন ব্যক্তি, যে নির্জনে আল্লাহকে স্মরণ করে অশ্রু ঝরায়; (৬) এমন লোক, যাকে কোনো সম্ভ্রান্ত সুন্দরী নারী ব্যভিচারের জন্য আহ্বান করেছে, আর তখন সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলেছে- আমি তো আল্লাহকে ভয় করি; ((৭) যে ব্যক্তি এমন গোপনীয়তা রক্ষা করে দান-সাদকা করে যে, তার ডান হাত কী দান করল বাম হাতও তা জানতে পারে না।’
রাসূলুল্লাহ
সা: আরো বলেছেন, ‘যে আল্লাহর জন্য কাউকে ভালোবাসল,
আল্লাহর জন্য কাউকে ঘৃণা করল,
আল্লাহর জন্য কাউকে দান করল এবং আল্লাহর
জন্য কাউকে দান করা থেকে বিরত থাকল, সেই ব্যক্তি নিজ ঈমানকে পূর্ণতা দান করল।’
(আহমাদ-৪৬৮৩)
আবদুল্লাহ ইবনে আমর রা: বর্ণনা করেন- এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সা:-কে জিজ্ঞাসা করলেন, ইসলামে সর্বোত্তম কাজ কী? তিনি বললেন, ‘(ক্ষুধার্তকে) খাবার দান করবে এবং
পরিচিত-অপরিচিত নির্বিশেষে সবাইকে (ব্যাপকভাবে) সালাম দেবে।’ (মিশকাত)
وَعَنْ أَبي يُوسُفَ عَبدِ اللهِ بنِ سَلاَمٍ رضي الله عنه،
قَالَ: سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه ، يَقُولُ: « يَا أيُّهَا النَّاسُ،
أَفْشُوا السَّلاَمَ، وَأطْعِمُوا الطَّعَامَ، وَصِلُوا الأرْحَامَ، وَصَلُّوا
والنَّاسُ نِيَامٌ، تَدْخُلُوا الجَنَّةَ بِسَلاَم ». رواه الترمذي، وقال:
আবু ইউসুফ আবদুল্লাহ ইবনে সালাম রা:
বর্ণনা করেন- আমি রাসূলুল্লাহ সা:-কে বলতে শুনেছি, ‘হে মানুষ! তোমরা সালাম প্রচার করো,
(ক্ষুধার্তকে) খাবার দান করো,
আত্মীয়তার বন্ধন ঠিক রাখো এবং মানুষ যখন
(রাতে) ঘুমিয়ে থাকে, তখন তোমরা সালাত আদায় করো। তাহলে তোমরা নিরাপদে ও নির্বিঘ্নে জান্নাতে প্রবেশ করবে।’
(তিরমিজি) আল্লাহ তায়ালা মুমিনদের উদ্দেশে বলেছেন-
وَأَطِيعُوا اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَلَا تَنَازَعُوا فَتَفْشَلُوا وَتَذْهَبَ رِيحُكُمْ وَاصْبِرُوا إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ
‘তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করবে ও নিজেদের মধ্যে বিবাদ করবে না, করলে তোমরা সাহস হারাবে এবং তোমাদের শক্তি বিলুপ্ত হবে। তোমরা ধৈর্য ধারণ করো; নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে রয়েছেন।’ (সূরা আনফাল-৪৬)
হজরত আবু উমামাহ রা: থেকে বর্ণিত হয়েছে-
রাসূলুল্লাহ সা: বলেছেন, ‘আল্লাহর সর্বাধিক কাছাকাছি মানুষ ওই ব্যক্তি;
যে সর্বপ্রথম সালাম দেয়।’
(আবু দাউদ)
(১) সর্বস্তরে সালামের প্রচলন করা, নিজ, পরিবার, সমাজ,অফিস ইত্যাদি (২) সবসময় মমিনের পাশে থাকা (৪) সব কাজ হবে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য
মোঃ শাহজাহান আলী
সহকারী অধ্যাপক
বাঁশগ্রাম কামিল (এম.এ) মাদ্রাসা
কুমারখালী, কুষ্টিয়া।
৫৩
৯১ মন্তব্য