সহকারী শিক্ষক
২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ ০২:২৫ অপরাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
‘বাস্তব জীবনের গল্পকার বনফুল’
– মো: আব্দুল্লাহ আল মামুন
সাহিত্যিক বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায়ের ছদ্মনাম ছিল ‘বনফুল’, আর এই ছদ্মনামেই বাংলা সাহিত্যের বিবর্তনে অতীতের চিকিৎসক বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় খ্যাতকীর্তি গল্পকার, ঔপন্যাসিক ও কবি হিসেবে সাহিত্যজগতে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন। বর্তমানযুগে তিনি একজন কথাসাহিত্যিক হিসেবেই স্বভাবী ও সাধারণ পাঠক-পাঠিকাদের কাছে সর্বাধিক বন্দিত। প্রথম মহাযুদ্ধোত্তর কালে, ‘কল্লোল’ পত্রিকার প্রকাশের সম-সময়ে বাংলার সাহিত্যজগতে তাঁর আবির্ভাব ঘটলেও তিনি কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে কল্লোলের লেখক হয়ে উঠতে পারেননি। সেই সময়ে কল্লোলের অনেক আগে থেকেই প্রতিষ্ঠিত মাসিক ‘প্রবাসী’ পত্রিকার জয়যাত্রা অব্যাহত ছিল, আর সেই ‘প্রবাসী’ পত্রিকার ১৩২৯ বঙ্গাব্দের আশ্বিন সংখ্যায় তিনি – ‘চোখ গেল’ – শিরোনামে তাঁর সাহিত্যিক জীবনের প্রথম গল্পটি লিখেছিলেন। বলাইচাঁদ তখনও কলকাতার মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র, এবং ভবিষ্যতে একজন ডাক্তার হওয়ার অধ্যয়ন-সাধনায় গভীরভাবে নিবিষ্ট ছিলেন।
নিজের প্রথম গল্প ‘চোখ গেল’ থেকেই বনফুল গল্পের মাধ্যমে মানব জীবনের রহস্য সন্ধানে উৎসুক হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু তাঁর সেই রহস্য-সন্ধান চেষ্টা তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের মত, বা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখের মত – ছোটগল্পের কাহিনী, ঘটনা, চরিত্রের বিস্তারিত রূপের মধ্যে দিয়ে আসেনি; এসেছিল ছোটগল্পের অতিসংক্ষিপ্ত শিল্পপ্রকরণের মধ্যে দিয়ে। সাহিত্য-জীবনকে গ্রহণ করে নেওয়ার প্রথমদিক থেকেই তিনি তাঁর গল্পের অঙ্গগঠনে সচেতন, সতর্ক ও মিতবাক ছিলেন। একটি গোপন রহস্য সব সময়েই তাঁর গল্পে এমনভাবে অন্তর্গূঢ় অথচ গতিশীল থাকে – যেটাকে বুঝতে বা ধরতে হলে তাঁর গল্পের শেষ বাক্যটি পাঠক-পাঠিকাদের অবশ্যপাঠ্য। একজন লেখক হিসেবে পাঠক-পাঠিকাদের কাছে তাঁর গল্প পড়বার এই শর্তটি হল – ‘command’। বনফুলের গল্পে কাহিনী ও ঘটনা থাকলেও সেগুলি নিজে কিছু বলে না, সেগুলি বলিয়ে নেয়। বনফুল এমনভাবে তাঁর গল্পে বাক্য সাজাতেন ও ঘটনা তৈরি করতেন, অথবা এমনভাবে সংলাপের গুরুত্ব ও দায়িত্ব ওজন করতেন – যা স্বর্ণকারের স্বর্ণ ওজন করবার সমতুল।
এই কথাটার আরেকটু ব্যাখ্যার প্রয়োজন রয়েছে। বনফুল ছোটগল্প রচনা করবার সময়ে কখনোই বাস্তব জীবন থেকে দূরে সরে যাননি। কিন্তু সেই জীবনচিত্র তাঁর বর্ণনায় নিরাসক্ত হয়ে উঠেছিল। তিনি দূরে থেকে সেই জীবন দেখেছিলেন এবং দেখিয়েছিলেন। আর সেই দেখাবার সময়ে তিনি শিল্পকৌশলে সতর্ক হয়ে উঠেছিলেন। গল্পের খাতিরে ঠিক যতটুকু দরকার সেটুকুই রেখে, গল্পের অবয়ব গঠনে অতিরেক বর্জন করাটা তাঁর লেখনীর একটা প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল। সেই কারণেই স্বভাবতঃই আজও তাঁর গল্পগুলি পথ করবার সময়ে পাঠক-পাঠিকারা অবলীলায় সেগুলিতে মনোনিবেশ করতে পারেন। বনফুলের সভাবে ও মনে একজন বিজ্ঞানীর শিক্ষা ছিল। তাই তাঁর লেখা গল্পগুলি যেমন প্রয়োজনহীন উপাদানগুলির কাট-ছাঁট করে সংক্ষিপ্ত ও সংযত শিল্পরূপের একটি পরীক্ষাগার হয়ে উঠতে পেরেছে, তেমনি প্রসঙ্গের উপস্থাপনেও সেগুলিতে মন ও মননের প্রয়োজনমতো প্রয়োগবৈচিত্র্য লক্ষ্য করা যায়। বনফুল কখনও তাঁর গল্পের চরিত্রের বা মূল ভাবের মননে নিজেকে নিবিষ্ট রাখেননি, তাঁর গল্পের চরিত্রগুলির আচার-আচরণ, সংলাপ ও ঘটনানির্ভর ‘sequence’ থেকে যদি কোনো মন বা স্বভাব পাঠক-পাঠিকাদের তাড়িত করে, সেটার জন্য তাঁর গল্পে তিনি স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রতীক্ষার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন।
১৯৩৮ সালে ‘বনফুলের আরো গল্প’ শিরোনামে তাঁর দ্বিতীয় গল্প-সংকলনটি প্রকাশিত হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তখন তাঁর জীবনের একেবারে শেষপ্রান্তে উপনীত হয়ে গিয়েছিলেন। উক্ত গ্রন্থটি পড়ে রবীন্দ্রনাথ বনফুলকে একটি পত্রে জানিয়েছিলেন –
“জগতের আনাচে-কানাচে আড়ালে-আবডালে ধূলিধূসর হয়ে আছে যারা, তুচ্ছতার মূল্যেই তাদের মূল্যবান করে দেখার কাজে কোমর বেঁধে বেরিয়েছে তোমাদের মতো বিজ্ঞানী মেজাজের সাহিত্যিক, তোমাদের সন্ধান জগতের অভাজন মহলে — তোমাদের ভয় পাছে তার অকিঞ্চিৎকরত্বের বিশিষ্টতাকে ভদ্র চাদর পরিয়ে অস্পষ্ট করে ফেলো।”
বনফুল তাঁর অনেক গল্পে তুচ্ছ বিষয়কে বেছে নিলেও কৌতূহল দিয়ে সেটাকে অন্য স্বাদ দিতে সমর্থ হয়েছিলেন। বনফুলের গল্পের প্রথম থেকে শেষপর্যন্ত পাঠক-পাঠিকার কৌতূহল বজায় থাকে; সেই কৌতূহল গল্পের ‘ফর্ম’ থেকে ক্রমশঃ ‘content’–এর অভ্যন্তরে প্রবেশ করে এমন ব্যঞ্জনা আনে – যাতে পাঠক-পাঠিকাদের মনে – ‘শেষ হয়ে না হইল শেষ’ – এই অর্থে শেষপর্যন্ত ঔৎসুক্য বজায় থাকে। এই কৌতূহলের সঙ্গে মিশে থাকে প্রচ্ছন্ন কৌতূক – সেটার নানান রকমফেরে শ্লেষ, ব্যঙ্গ, ব্যঙ্গোক্তি, নির্মল পরিহাস-রসিকতা ইত্যাদি সবকিছুই। বলফুলের ‘ব্যতিক্রম’ নামের গল্পটিও উপরিউক্ত বৈশিষ্ট্যগুলি থেকে বঞ্চিত নয়। তবে শুধু ‘ব্যতিক্রম’ নয়, বনফুলের সমস্ত উল্লেখযোগ্য গল্পগুলিকে স্মরণে রেখে নির্দ্বিধায় একথা বলা যেতে পারে যে, তিনি তাঁর গল্পের বিষয় হিসেবে আধুনিক জীবনকে যেমন গ্রহণ করতে ভোলেননি, তেমনি সেই জীবনের সমস্ত ভালো-মন্দ, ত্রুটি-বিচ্যুতি, জীবনের নানা অভিঘাতে পর্যুদস্ত সাধারণ মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত মানুষগুলির অনাড়ম্বর অসহায়তাকেও স্বকীয় দৃষ্টিতে যাচাই করেছিলেন। নিজের বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই তাঁর পক্ষে এমন যাচাই করা সম্ভব হয়েছিল। অবশ্য সেই দৃষ্টিভঙ্গিতে জীবনের গম্ভীর বিক্ষত রূপের বিচারণা পাওয়া যায় যায় না; তাতে লঘু কৌতুক-ব্যঙ্গের সঙ্গে নিজের মমতা, মানবিকতাবোধ ও সহমর্মিতা মিশিয়ে এক করুণ জীবন-স্বভাবের প্রতিচিত্রন পাওয়া যায়। তাঁর গল্পের বিষয়গুলি জীবনরূপে তন্নিষ্ঠ, সেগুলির দৃষ্টিভঙ্গি তন্ময়; কিন্তু সেগুলি পরিবেশন, পরিহাস ও কারুণ্যের মিশ্রণে বিচিত্র স্বাদে বর্ণময়।
বনফুল তাঁর সাহিত্যিক জীবনের প্রথমে ‘শনিবারের চিঠি’ পত্রিকায় একাধিক ব্যঙ্গ কবিতা লিখেছিলেন, আর সেগুলোই পরে তাঁর একাধিক গল্পে প্রসূত হয়েছিল। তাঁর – শ্রীপতি সামন্ত, সনাতনপুরের অধিবাসিবৃন্দ, জৈবিক নিয়ম, সমাধান, অজান্তে, ছেলে মেয়ে, ক্যানভাসার – ইত্যাদি গল্পে সেটার প্রমাণ পাওয়া যায়। শ্রীপতি সামন্তের অতি দরিদ্র, গ্রাম্য আচরণের পাশে বিনা টিকিটের প্রথমশ্রেণীর যাত্রী ভদ্রলোকের নকল রূপ উৎকট হয়ে পাঠক-পাঠিকাদের কাছে ধরা পড়ে। ‘সনাতনপুরের অধিবাসিবৃন্দ’ গল্পের শৈলেশ্বর মোক্তার ও শ্যামা ধোপানির অন্তর্ধান গ্রামের মানুষদের যে মিথ্যা কুৎসায় নিবিষ্ট করে, গল্পের শেষে পৌঁছে গল্পকার যেন তাঁদের লজ্জাহীন নোংরা স্বভাবকে ব্যঙ্গের মাধ্যমে কশাঘাত করেছিলেন। ‘জৈবিক নিয়ম’ গল্পের সেই বছর কুড়ি বয়সের তরুণের রেলস্টেশনে এক অপরিচিত তরুণীর সামনে যেভাবে যৌবনের আত্মপ্রচার করবার চেষ্টা এবং শেষে চলন্ত ট্রেনের তলায় মৃত্যুবরণ – তাঁর স্বভাবের ও যৌবনধর্মের অসঙ্গতিতে গল্পকার তাতে লঘুরসে বেদনাও যুক্ত করেছিলেন। ‘ক্যানভাসার’ গল্পের হীরালালের দাঁতের মাজন বিক্রির সময়ে একজনের সঙ্গে বচসায় নকল দাঁত খুলে পড়ে যাওয়ায়, ‘অজান্তে’ গল্পের এক ভিক্ষুকের কথায়, ‘সমাধান’ গল্পের কালো বিকৃতদর্শন শিশুকন্যার জন্য লেখকের করুণা, সেই ট্রেনের আর.এম.এস. ভ্যানে একের পর এক অন্যের চিঠি পড়বার মধ্যে পাঠকের নিজেরই তৃতীয় পক্ষের যুবতীর অন্য এক প্রেমিককে লেখা চিঠি পড়ে ফেলায় বজ্রপাত সুলভ আকস্মিকতার মধ্যে গল্পকারের শেষ-চমকে গল্পরচনারীতির বিশেষ পরিচয় পাওয়া যায়। এসব থেকে বলা যেতে পারে যে, গল্প এবং উপন্যাস – উভয়ক্ষেত্রেই বনফুল একটি নির্দিষ্ট রোম্যান্টিক সমাজ – আদর্শবাদে দীক্ষিত কথাকার ছিলেন।
০
০ মন্তব্য