সহকারী শিক্ষক
২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ ০৭:৫৪ পূর্বাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
‘মুর্শিদকুলি খাঁ ও সমকালীন বাংলা’
– মো: আব্দুল্লাহ আল মামুন
খৃষ্টীয় অষ্টাদশ শতাব্দীর শুরুর দিকের বঙ্গদেশের রাষ্ট্ৰীয় ইতিহাসের প্রধান নায়ক ছিলেন – মুর্শিদকুলি খাঁ। ১৭০০ খৃষ্টাব্দে মুঘল সম্রাট ঔরঙ্গজেব তাঁকে বাংলার দেওয়ান পদে নিযুক্ত করেছিলেন। ঢাকা তখন মুঘল সাম্রাজ্যের বাংলা সুবার রাজধানী ছিল। কিন্তু তৎকালীন বাংলার সুবেদার আজিম-উস-সানের সঙ্গে বনিবনা না হওয়ার জন্য মুর্শিদকুলি তাঁর দপ্তরটি ঢাকা থেকে – মুকসুদাবাদে (মুর্শিদাবাদে) স্থানান্তরিত করেছিলেন। মুর্শিদকুলি খাঁ তৎকালীন বাংলার রাজস্ব বিভাগের গলদগুলি ভালোভাবে লক্ষ্য করেছিলেন। তিনি দেখতে পেয়েছিলেন যে, সমকালীন বাংলা সুবার বেশীরভাগ অংশই মুঘল সাম্রাজ্যের সামরিক জায়গীরদারদের হাতে ন্যস্ত রয়েছে। জায়গীরের যেসব অংশগুলি তখন সরাসরি সুবেদারের নিয়ন্ত্রণে ছিল, সেগুলির মিলিত আয় সুবার সামরিক ও অসামরিক শাসন বিভাগের ব্যয় নির্বাহ করবার জন্য যথেষ্ট ছিল না। এই কারণে বাঙলা সুবা তখন সবসময়েই ঋণে ডুবে থাকত, এবং সেই ঋণ অন্যান্য সুবা থেকে প্রাপ্ত অর্থের মাধ্যমে পরিশোধ করা হত। ওই অবস্থায় মুর্শিদকুলি ভেবেচিন্তে দেখেছিলেন যে, যদি সমস্ত ভূম্যধিকারীদের সরাসরি দেওয়ানের অধীনস্থ করা হয় তাহলে বাংলা সুবার রাজস্ব প্ৰভূত পরিমাণে বাড়ানো যেতে পারে। এরপরে তিনি তাঁর সেই প্রস্তাবটি মুঘল সম্রাট ঔরঙ্গজেবের কাছে পেশ করেছিলেন, এবং সম্রাট তাঁর প্রস্তাব অনুমোদনও করে দিয়েছিলেন।
তারপরে রাজস্ব আদায় ও জমি বিলির ব্যবস্থা করে, মুর্শিদকুলি বঙ্গদেশের মালগুজারী বাবদ প্ৰতি বছর প্রায় এক কোটি টাকা ঔরঙ্গজেবকে পাঠাতে শুরু করেছিলেন। অর্থাৎ সম্রাটকে খুশী করে নিজের পদটি সুপ্রতিষ্ঠিত করবার জন্য তিনি বাংলাকে দোহন করতে শুরু করেছিলেন। বাংলা থেকে প্রাপ্ত রাজস্ব বৃদ্ধি পাওয়ায় পরে তিনি ঔরঙ্গজেবের প্রিয়পাত্র হয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু তাতে বাংলার তৎকালীন সুবেদার আজিম-উস-সান তাঁর প্রতি ঈর্ষান্বিত হয়ে উঠেছিলেন। তিনি মুর্শিদকুলি খাঁকে হত্যা করবার জন্য আবদুল ওয়াহিদ নামের নগদি অশ্বারোহী বাহিনীর একজন সেনাপতির সঙ্গে মিলিতভাবে চক্রান্ত করেছিলেন। পথিমধ্যে মুর্শিদকুলিকে হত্যা করবার জন্য তিনি তাঁকে মুর্শিদাবাদ থেকে ঢাকায় ডেকে পাঠিয়েছিলেন। পথে মুর্শিদকুলি খাঁ আক্রান্ত হয়েছিলেন। কিন্তু সেই আক্রমণের সময়ে তিনি অসাধারণ সাহস প্ৰদৰ্শন করবার ফলে চক্রান্তকারীদের সেই চক্ৰান্ত ব্যর্থ হয়ে গিয়েছিল। এরপরে ঢাকায় পৌঁছে মুর্শিদকুলি আজিম-উস-সানকে সেই চক্রান্তের স্রষ্টা হিসাবে দোষী করেছিলেন এবং হাতে একটি ছুরি তুলে নিয়ে তাঁকে বলেছিলেন –
“তুমি যদি আমার প্রাণ নিতে চাও, তাহলে এখানেই সেটার মীমাংসা হয়ে যাক, নচেৎ তোমাকে আমি সাবধান করে দিচ্ছি যে, এইধরণের কাজ করা থেকে তুমি ভবিষ্যতে বিরত থাকবে।”
যদিও আজিম-উস-সান তখন সেই বিষয়ে নিজেকে নিরপরাধ বলে ঘোষণা করেছিলেন, এবং আবদুল ওয়াহিদকে ভর্ৎসনা করে তাঁর সৈন্যদলকে রাজকীয় বাহিনী থেকে অপসৃত করেছিলেন। এরপরে মুর্শিদকুলি সেই ঘটনার একটি যথার্থ প্ৰতিবেদন তৈরি করে সেটাকে ঔরঙ্গজেবের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। মুর্শিদকুলি খাঁকে হত্যার চক্রান্তের প্রতিবেদন পেয়ে ঔরঙ্গজেব ক্রোধান্বিত হয়ে আজিম-উস-সানকে লিখে পাঠিয়েছিলেন যে, মুর্শিদকুলি খাঁর কোন ধরণের ক্ষতি হলে আজিম-উস-সান তাঁর পৌত্র বলে রেহাই পাবেন না; তিনি তাঁকে যথাযথ শাস্তি দেবেন। এছাড়া সেই ঘটনার পরে তিনি আজিম-উস-সানকে বাংলা ত্যাগ করে বিহারে গিয়ে বাস করবার আদেশ দিয়েছিলেন। মুঘল সম্রাটের সেই আদেশের পরে আজিম-উস-সান বাংলার শাসনভার তাঁর দ্বিতীয় পুত্র ফারুকশিয়ারের ওপরে অর্পণ করে পাটনায় চলে গিয়েছিলেন।
নিজেকে বাংলা সুবায় প্রতিষ্ঠিত করে মুর্শিদকুলি বাংলা থেকে প্রাপ্ত রাজস্বের পরিমাণ রীতিমত বাড়িয়ে তুলেছিলেন, এবং সশরীরে সম্রাটের কাছে রাজস্বের হিসাব-নিকাশ দিতে গিয়েছিলেন। তখন সম্রাট তাঁর কাজের প্রশংসা তো করেছিলেনই, এছাড়া তিনি তাঁকে সম্মানিতও করেছিলেন। এরপরে তিনি মুর্শিদকুলিকে – বিহার, বাঙলা ও উড়িষ্যা – এই তিনটি প্রদেশের দেওয়ানের পদে যেমন পুনর্নিযুক্ত করেছিলেন, তেমনি তাঁকে বাঙলা ও উড়িষ্যার ডেপুটি নিজাম পদে উন্নীতও করেছিলেন। বলাই বাহুল্য যে, আজিম-উস-সান তাতে ভীষণ ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন, কিন্তু নিজের পিতামহের স্বৈরতান্ত্রিক মেজাজের কথা স্মরণ করে তিনি তাঁকে কিছু বলবার সাহস করেন নি। ইতিমধ্যে ঔরঙ্গজেবের সন্তানদের মধ্যে হিন্দুস্থানের মসনদ নিয়ে প্রবল দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়েছিল, এবং তাঁর তৃতীয় পুত্ৰ সুলতান মহম্মদ আজিম সম্রাটের প্রিয়পাত্র হয়ে উঠেছিলেন। মহম্মদ আজিম তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র আজিম-উস-সানের প্রতি ঈর্ষান্বিত হয়ে তাঁকে পাটনা থেকে দিল্লীতে প্ৰত্যাগমন করতে বলেছিলেন। সেই ঘটনার কিছু পরেই ১৭০৭ খৃষ্টাব্দে ঔরঙ্গজেবের মৃত্যু হয়েছিল। এবং এরপরেই জাজোঁ নামক জায়গায় মহম্মদ আজিমও আততায়ীর হাতে নিহত হয়েছিলেন।
আজিম-উস-সান পাটনা থেকে দিল্লীতে আহুত হওয়ার পরে মুর্শিদকুলি খাঁই কার্যতঃ বাঙলা, বিহার ও উড়িষ্যার শাসক হয়ে উঠেছিলেন; যদিও আজিম-উস-সান তাঁর পুত্র ফারুকশিয়ারকে নিজের উত্তরাধিকারী হিসাবে সুবা বাংলার নাজিমের গদিতে বসিয়ে গিয়েছিলেন।
ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর পরে তাঁর দ্বিতীয় পুত্র বাহাদুর শাহ (আজিম-উস-সানের পিতা) যখন দিল্লীর সম্রাট হয়েছিলেন, তখন তিনি তাঁর পুত্ৰ আজিম-উস-সানের প্ররোচনায় মুর্শিদকুলি খাঁকে দক্ষিণাত্যের দেওয়ান করে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু এরপরেই বাংলার নতুন শাসক বিদ্রোহী সেনার হাতে নিহত হওয়ার ফলে মুঘল সম্রাট বাংলা সুবার দেওয়ান ও ডেপুটি নিজামের পদ দুটিকে একত্রিত করে মুর্শিদকুলি খাঁকেই বাংলার শাসক হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। সেবারে মুর্শিদকুলি খাঁ মেদিনীপুর জেলাকে উড়িষ্যা থেকে বিচ্ছিন্ন করে বাংলার সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন, এবং নিজের জামাতা সুজাউদ্দিন মহম্মদ খাঁকে উড়িষ্যার ডেপুটি নিজাম পদে অধিষ্ঠিত করেছিলেন। সমকালীন দু’জন হিন্দু ব্রাহ্মণকে তিনি তাঁর প্রশাসনে দুটি বিশ্বস্ত পদ দিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে ভূপত রায়কে তিনি ট্রেজারী বা খালসার সচিব ও কিশোর রায়কে তাঁর গোপন সচিব বা প্ৰাইভেট সেক্রেটারির পদে নিযুক্ত করেছিলেন। কিন্তু সমকালীন বাঙলার হিন্দু জমিদারদের প্রতি তাঁর ব্যবহার অত্যন্ত অত্যাচারপূর্ণ ছিল বলে জানা যায়। প্রদেশের রাজস্ব সম্বন্ধে প্ৰকৃত পরিস্থিতি জানবার জন্য তিনি তাঁদের বন্দী করেছিলেন, এবং নিজের নিযুক্ত প্ৰতিনিধিদের মাধ্যমে রাজস্ব আদায় করতে শুরু করেছিলেন। তৎকালীন বাঙলার মাত্র দু’জন জমিদার তখন তাঁর হাত থেকে অব্যাহতি পেয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন বীরভূমের আফগান ভূস্বামী আশা-উদ-দৌল; ন্যায়পরায়ণ বাক্তি হিসাবে যাঁর তখন অত্যন্ত সুনাম ছিল এবং যিনি তাঁর আদায়ীকৃত খাজনার অর্ধেক অংশ জনহিতকর কাজে ব্যয় করতেন। আর অপরজন ছিলেন বিষ্ণুপুরের জমিদার, যাঁর জমিদারির অধিকাংশই অনুর্বর ছিল এবং যিনি ঝাড়খণ্ডের পার্বত্য অঞ্চল থেকে বিদেশী আক্রমণগুলি প্রতিহত করবার ব্যাপারে সরকারকে সাহায্য করতেন। মুর্শিদকুলি তাঁদের দু’জনকে এই শর্তে নিজেদের জমিদারিতে বহাল রেখেছিলেন যে, তাঁরা নিয়মিতভাবে মুর্শিদাবাদের খাজাঞ্চীখানায় রাজস্ব জমা দেবেন। এছাড়া, ১৭২২ সালে মুর্শিদকুলি বাঙলার সমস্ত জমির নতুন করে জরীপ করিয়েছিলেন। তাঁর সেই জরীপ ইতিহাসে ‘জমা-ই-কামিল তুমার’ নামে পরিচিত। সেই জরীপ অনুযায়ী বঙ্গদেশকে ১৩টি চাকলায় ভাগ করা হয়েছিল। সেই ১৩টি চাকলার অন্তর্ভুক্ত মহাল বা পরগণার সংখ্যা ছিল ১,৬৬০টি ও সেগুলি থেকে প্রাপ্ত রাজস্বের পরিমাণ ছিল ১,৪২,৮৮,১৮৬ টাকা।
মুর্শিদকুলির সময়ে ভুষনার জমিদার সীতারাম রায় তাঁর বিরুদ্ধাচরণ করেছিলেন। মুর্শিদকুলি কয়েকবার তাঁকে দমনের চেষ্টা করেও সফল হতে পারেননি। ফলে এরপরে তিনি সৰ্ববিষয়েই একজন স্বাধীন শাসকের মত আচরণ করতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু ঐশ্বৰ্যমদে মত্ত হয়ে উঠবার ফলে তাঁর রাজ্যে বিশৃঙ্খলতার উদ্ভব হয়েছিল। সেই সুযোগে নবাবের সৈন্যরা তাঁর বাসগ্ৰাম মহম্মদপুর আক্রমণ করে তাঁকে পরাজিত ও বন্দী করতে পেরেছিলেন। প্রচলিত কিংবদন্তী অনুযায়ী তাঁকে শূলে চড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।
তবে জমিদারদের নিপীড়ন করা ছাড়াও মুর্শিদকুলি খুবই ন্যায়পরায়ণ শাসক ছিলেন। তাঁর বিচার এতটাই পক্ষপাতশূন্য ছিল যে, আইনভঙ্গ করবার জন্য তিনি নিজের পুত্রকেও মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করতে কুন্ঠিত হননি।
মুর্শিদকুলির প্রতাপ ও প্ৰতিপত্তি দেখে ত্রিপুরা, কুচবিহার ও আসামের রাজারা এমনভাবে সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন যে, তাঁরা তাঁকে মূল্যবান উপঢৌকন পাঠাতেন, এবং মুর্শিদকুলি খাঁ সেসবের পরিবর্তে তাঁদের প্রতীক-পোষাক উপহার দিতেন, যে পোষাক পরিধান করলে নবাবের আনুগত্য স্বীকার করা হত। প্ৰতি বছরই তাঁদের মধ্যে ঐধরণের উপঢৌকন ও উপহার বিনিময় করা হত।
সেই সময়ে হুগলীর মুঘল ফৌজদার বাংলার দেওয়ান ও নাজিম থেকে স্বতন্ত্র ও স্বাধীন ছিলেন। কিন্তু একই রাজ্যের মধ্যে অন্য একজন দ্বিতীয় শাসক থাকা অযৌক্তিক বলে প্ৰতিপন্ন করে মুর্শিদকুলি মুঘল সম্রাটের কাছ থেকে অনুমতি সংগ্ৰহ করেছিলেন যে, ওই পদে তিনি তাঁর নিজের মনোনীত ব্যক্তিকে নিযুক্ত করবেন। সেইমত তিনি ওয়ালি বেগ নামের একজন ব্যক্তিকে হুগলীর ফৌজদার পদে নিযুক্ত করেছিলেন। তাঁর আগের অপসৃত ফৌজদার জিনুদ্দিন তখন শান্তভাবেই বাংলা থেকে প্ৰস্থান করবার জন্য তৈরি হচ্ছিলেন, কিন্তু ওয়ালি বেগ যখন অপসৃত ফৌজদারের পেশকার কিঙ্কর সেনকে হিসাবপত্র বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য আটক করেছিলেন, তখন অপসৃত ফৌজদার জিনুদ্দিন সেটার প্ৰতিবাদ করেছিলেন এবং তার ফলে তাঁদের উভয়ের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়েছিল। জিনুদ্দিন তখন চুঁচুড়ায় থাকা ওলন্দাজদের ও চন্দননগরে থাকা ফরাসিদের কাছ থেকে সাহায্য প্রার্থনা করেছিলেন। অন্যদিকে মুর্শিদকুলিও তখন ওয়ালি বেগকে সাহায্য করবার জন্য দলপত সিং নামের একজন ব্যক্তির অধীনে হুগলীতে সৈন্যবাহিনী পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। দলপত সিং চন্দননগরের কাছে নিজের শিবির স্থাপন করলেও আগ বাড়িয়ে কোনধরণের যুদ্ধে প্ৰবৃত্ত হননি। এর কিছুদিন পরে জিনুদ্দিন সন্ধি করবার জন্য দলপত সিংয়ের কাছে নিজের একজন দূতকে পাঠিয়েছিলেন। সেই দূতের সঙ্গে দলপত সিং যখন কথোপকথনে ব্যস্ত ছিলেন, ঠিক সেই সময়ে একজন ফরাসি গোলন্দাজ কর্তৃক নিক্ষিপ্ত গোলা তাঁর ওপরে গিয়ে পড়েছিল, এবং তাতে তিনি নিহত হয়েছিলেন। দলপত সিংয়ের ওরকম অকস্মাৎ মৃত্যুর পরে নবাবের সৈন্যবাহিনী কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে হুগলীতে গিয়ে আশ্ৰয় নিয়েছিল। এরপরে জিনুদ্দিন শান্তভাবে দিল্লীর উদ্দেশ্যে প্রস্থান করেছিলেন। নবাব কিঙ্কর সেনকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন এবং তাঁকে হুগলী জেলায় রাজস্ব আদায়কারীর পদে নিযুক্ত করেছিলেন। কিন্তু এর কিছুকাল পরেই আবার তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আসবার জন্য তাঁকে কারারুদ্ধ করা হয়েছিল; এবং এর অল্পদিন পরে কারাগারেই তাঁর মৃত্যু হয়েছিল।
রাজস্ব আদায় করবার ব্যাপারে মুর্শিদকুলি চূড়ান্ত কঠোরতামূলক নীতি অনুসরণ করেছিলেন। রাজস্ব আদায় করবার ব্যাপারে তাঁর নিযুক্ত ব্যক্তিরা নানাধরণের অমানুষিক শাস্তি ও পীড়নের পথগুলিকে বেছে নিয়েছিলেন, যেমন – মাথা নীচের দিকে করে পা বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা, কিংবা শীতকালে উলঙ্গ করে গায়ে ঠাণ্ডা জল ঢেলে দেওয়া, কিংবা বগলের তলা দিয়ে দড়ি বেঁধে পচা পুকুরের মধ্যে দিয়ে টেনে নিয়ে যাওয়া ইত্যাদি ইত্যাদি। তাছাড়া কখনও কখনও তাঁদের ঢাউস ইজের পরিয়ে সেটার ভেতরে জ্যান্ত বেড়াল ছেড়ে দেওয়া হত। মুর্শিদকুলির আমলের বাংলায় এই ধরণের উৎপীড়ন ও অত্যাচারের মাধ্যমে জমিদারদের কাছ থেকে রাজস্ব আদায় করা হত, এবং প্ৰতি বছরের বৈশাখ মাসে ৩০০ জন অশ্বারোহী ও ৫০০ জন পদাতিক সৈন্য সমভিব্যাহারে দিল্লীতে মুঘল সম্রাটের কাছে এক কোটি পঞ্চাশ লক্ষ টাকা পাঠানো হত। এসবের ফলে তাঁর সময়ে সমগ্র বঙ্গদেশ করভারে পীড়িত হয়ে পড়েছিল।
আগেই বলা হয়েছে যে, আজিম-উস-সান যখন বাংলা থেকে দিল্লীতে প্ৰত্যাগমন করেছিলেন, তখন তিনি তাঁর পুত্র ফারুকশিয়ারকে বাংলা ও উড়িষ্যার মসনদে নিজের প্রতিভু হিসাবে রেখে গিয়েছিলেন। যদিও মুর্শিদকুলিই তখন কাৰ্যতঃ বাংলার শাসক হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন, কিন্তু তা সত্ত্বেও ফারুকশিয়ার মুর্শিদকুলি খাঁর সাথে সদ্ভাবই বজায় রেখেছিলেন। কিন্তু ১৭১২ সালে মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহের মৃত্যুর পরে তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্ৰ জাহান্দর শাহ যখন নিজের ভাই আজিম-উস-সানকে হত্যা করে মুঘল সম্রাট হয়েছিলেন, ফারুকশিয়ার তখন তাঁর পিতার মৃত্যুর প্রতিহিংসা নেওয়ার জন্য মুর্শিদকুলির কাছে সাহায্য প্রার্থনা করেছিলেন। কিন্তু মুর্শিদকুলি দিল্লীর সম্রাটের প্রতি নিজের আনুগত্য পরিহার করতে রাজি হননি। তাঁর কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পরে ফারুকশিয়ার পাটনায় গিয়ে, সেখানে আজিম-উস-সান কর্তৃক অধিষ্ঠিত বিহারের তৎকালীন শাসক সৈয়দ হুসেন আলি খানের সাহায্য প্রার্থনা করেছিলেন। হুসেন আলি প্ৰথমে সেবিষয়ে তাঁকে সাহায্য করতে ইতঃস্ততঃ করেছিলেন, কিন্তু এরপরে ফারুকশিয়ারের পরিবারের মহিলারা একযোগে তাঁর কাছে উপস্থিত হয়ে সেবিষয়ে তাঁকে অনুনয় বিনয় করবার পরে তিনি ফারুকশিয়ারকে সাহায্য করতে সম্মত হয়েছিলেন। সমকালে এলাহাবাদের শাসক সৈয়দ আবদুল্লা খানকেও আজিম-উস-সানই তাঁর পদে অধিষ্ঠিত করেছিলেন। আবদুল্লা খান সৈয়দ হুসেন আলি খানেরই ভাই ছিলেন। তখন দুই ভাই একত্রিত হয়ে ফারুকশিয়ারকে সাহায্য করবার জন্য এগিয়ে গিয়েছিলেন। এরপরে তাঁরা বাংলা থেকে দিল্লী অভিগামী রাজস্ব লুঠ করেছিলেন, এবং পাটনা ও বারাণসীর ব্যাঙ্কারদের কাছ থেকে টাকা ধার করে নিজেদের একটি সৈন্যবাহিনী গঠন করেছিলেন। ১৭১২ সালে কাঠগয়া নামক জায়গায় তাঁরা মিলিতভাবে জাহান্দর শাহের জ্যেষ্ঠ পুত্ৰ আজিউদ্দিনকে যুদ্ধে পরাজিত করেছিলেন। এরপরে ১৭১৩ খৃষ্টাব্দে স্বয়ং মুঘল সম্রাট কর্তৃক পরিচালিত সৈন্যবাহিনীকেও ফারুকশিয়ারের সৈন্যদল আগ্রায় পরাজিত করেছিল, এবং আসাদ-উদ-দৌল্লা বিশ্বাসঘাতকতা করে মুঘল সম্রাটকে ফারুকশিয়ারের হাতে তুলে দিলে ফারুকশিয়ার তাঁকে হত্যা করেছিলেন। এভাবেই ১৭১৩ খৃষ্টাব্দে ফারুকশিয়ার হিন্দুস্থানের সম্রাট পদে আসীন হয়েছিলেন।
সেই ঘটনার একবছর আগে ফারুকশিয়ার যখন পাটনাতে নিজেকে মুঘল সম্রাট বলে ঘোষণা করেছিলেন, তখন কিছু প্ররোচনার বশীভূত হয়ে রশিদ খান নামের একজন ব্যক্তিকে তিনি বাংলার শাসক পদে নিযুক্ত করেছিলেন। সেই সংবাদ পাওয়া মাত্র মুর্শিদকুলি রশিদ খানকে মুর্শিদাবাদের কাছে প্ৰতিরোধ করেছিলেন। তখন রশিদ খানের সঙ্গে মুর্শিদকুলি খাঁর যে সংঘর্ষ হয়েছিল, সেই সংঘর্ষে রশিদ খান তাঁর নিজের অশ্ব থেকে পড়ে গিয়ে মারা গিয়েছিলেন। কিন্তু ১৭১৩ খৃষ্টাব্দে ফারুকশিয়ার যখন হিন্দুস্থানের সম্রাট হয়েছিলেন, মুর্শিদকুলি খাঁ তখন তাঁর নিজের কুটবুদ্ধি অনুযায়ী মুঘল সম্রাটের আনুগত্য স্বীকার করে নিয়েছিলেন, এবং তাঁকে দিল্লীতে বহু মূল্যবান উপঢৌকন পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। ফারুকশিয়ারও তখন মুর্শিদকুলির সাথে আর কোন বিবাদে জড়িয়ে না পড়ে তাঁকেই পুনরায় বাঙলা ও উড়িষ্যার সুবেদার পদে নিযুক্ত করেছিলেন। ১৭১৩ খৃষ্টাব্দেই মুর্শিদকুলি খাঁ মুকসুদাবাদের নাম পরিবর্তন করে মুর্শিদাবাদ করেছিলেন।
এইভাবে শক্তিমান হয়ে উঠবার পরে মুর্শিদকুলি প্রথমেই ইংরেজদের সঙ্গে বিবাদে প্ৰবৃত্ত হয়েছিলেন। অতীতে মুঘল শাহজাদা সুজার কাছ থেকে ইংরেজরা যে সমস্ত সুযোগ-সুবিধাগুলি পেয়েছিলেন, সেগুলি সব তিনি বাতিল করে দিয়েছিলেন। মুঘল সম্রাটকে বাৰ্ষিক তিন হাজার টাকা প্ৰদানের পরিবর্তে ইংরেজরা বঙ্গদেশে অবাধে বাণিজ্য করবার যে অধিকার পেয়েছিলেন, সেটাও নাকচ করে দিয়ে তিনি আদেশ দিয়েছিলেন যে, সেই সময়ে হিন্দুরা যে হারে নবাব সরকারকে বাণিজ্যিক শুল্ক দেন, ইংরেজদেরও সেটা পুরোমাত্রায় দিতে হবে। নবাবের সেই আচরণে বিরক্ত হয়ে ইংরেজরা তখন দিল্লীতে মুঘল সম্রাটের কাছে নিজেদের দূত পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ১৭১৫ খৃষ্টাব্দে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি – জন সুরম্যান ও এডওয়ার্ড ষ্টিভেনসন – নামের দু’জন ব্যক্তিকে সেই দৌত্যকর্মে নিযুক্ত করে সরাসরি দিল্লীতে মুঘল বাদশাহ ফারুকশিয়ারের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছিল। তাঁদের সঙ্গে দোভাষী হিসেবে খোজা সারহাউদ ও চিকিৎসক হিসেবে ক্যাপটেন উইলিয়াম হ্যামিল্টন সেখানে গিয়েছিলেন। তাঁরা নিজেদের সঙ্গে করে মুঘল বাদশাহের জন্য বহুমূল্য উপঢৌকন নিয়ে গিয়েছিলেন। মুর্শিদকুলি তখন ইংরেজ পক্ষের দূতদের উদ্দেশ্য ব্যর্থ করবার জন্য সমস্ত রকমের চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু একটি আকস্মিক ঘটনা ইংরেজদের সহায়ক হয়েছিল, এবং তাঁরা মুঘল সম্রাটের কাছ থেকে সহানুভূতিশীল ব্যবহার পেয়েছিলেন। সেই ঘটনাটা আর কিছুই ছিল না, মুঘল সম্রাট তখন অণ্ডকোষের এক কঠিন পীড়ায় ভুগছিলেন। ১৭১৩ খৃষ্টাব্দে বাদশাহ ফারুকশিয়ারের আদেশে হুসেন আলি খান নামের একজন সেনাপতির অধীনস্থ মুঘল বাহিনী যোধপুর রাজ্য আক্রমণ করেছিল। যোধপুরের রাজা অজিত সিং তাঁদের কাছে পরাজিত হয়েছিলেন, এবং সন্ধির শর্ত অনুযায়ী অজিত সিং তাঁর কন্যার সঙ্গে মুঘল বাদশাহের বিবাহ দিতে সম্মত হয়েছিলেন। কিন্তু এরপরেই মুঘল সম্রাট হঠাৎ পীড়িত হয়ে পড়বার ফলে সেই বিবাহে বিঘ্ন ঘটেছিল। ঠিক সেই মুহূর্তেই ইংরেজ কোম্পানির দূতরা দিল্লীতে গিয়ে হাজির হয়েছিলেন। এরপরে ইংরেজ দূতদের সঙ্গে আগত চিকিৎসক ডাক্তার উইলিয়াম হ্যামিল্টন মুঘল সম্রাটকে পীড়ামুক্ত করেছিলেন। এভাবে তাঁর বিবাহের পথ প্রশস্ত হয়েছিল, ফলে সম্রাট খুশী হয়ে ইংরেজদের সমস্ত প্রার্থনা মঞ্জুর করে দিয়েছিলেন ও তাঁদের শাহী ফরমান প্রদান করেছিলেন। মুঘল সম্রাটের কাছে ইংরেজদের প্রার্থনা ছিল –
(১) কলকাতার প্রেসিডেন্ট কর্তৃক স্বাক্ষরিত ছাড়পত্র প্ৰদৰ্শন করলে নবাবের কোন কর্মচারী নৌপথে আগত ইংরেজদের কোন মাল আটক বা পরীক্ষা করতে পারবেন না।
(২) সপ্তাহে তিনদিন মুর্শিদাবাদের নবাবী টাঁকশালে ইংরেজদের মুদ্রা নির্মাণের অধিকার থাকবে।
(৩) ইংরেজরা অনুরোধ করা মাত্রই ইংরেজদের কাছে ঋণী এরকম কোন ব্যক্তিকে ইংরেজদের হাতে সমৰ্পণ করতে হবে, এবং
(৪) কলকাতা সংলগ্ন ৩৮টি গ্রামের জমিদারী স্বত্ব ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কিনতে পারবে।
শাহী ফারমান মাধ্যমে মুঘল সম্রাট ইংরেজদের উপরোক্ত সব প্রার্থনাই মঞ্জুর করেছিলেন। বলাই বাহুল্য যে, মুর্শিদকুলি মুঘল সম্রাটের আদেশ অমান্য করতে সাহস করেননি। কিন্তু কোম্পানি কর্তৃক কলকাতা সংলগ্ন ৩৮টি গ্রামের জমিদারী স্বত্ব ক্রয় করবার বিষয়ে তিনি স্থানীয় জমিদারদের ওপরে এমন প্রভাব বিস্তার করেছিলেন যে, সেই বিষয়ে ইংরেজদের সবধরণের প্রচেষ্টাই তখন ব্যর্থ হয়ে গিয়েছিল।
১৭১৮ খৃষ্টাব্দে সম্রাট ফারুকশিয়ার মুর্শিদকুলি খাঁকে বিহারের শাসনকর্তা পদেও নিযুক্ত করেছিলেন। এর পরের বছরই, অর্থাৎ ১৭১৯ খৃষ্টাব্দে ফারুকশিয়ারের মৃত্যু হয়েছিল। তাঁর মৃত্যুর পরবর্তী সাত মাসের মধ্যে পর পর দু’জন ব্যক্তি মুঘল বাদশাহের পদে আসীন হয়েছিলেন; তারপরে ১৭২৭ খৃষ্টাব্দে মহম্মদ শাহ দিল্লীর বাদশাহ হয়েছিলেন। তিনিও মুর্শিদকুলিকে বাঙলা, বিহার ও উড়িষ্যার শাসক পদে বহাল রেখেছিলেন। কিন্তু মুর্শিদকুলি তখন দিল্লীর সঙ্গে নামমাত্র সম্পর্ক রেখে নিজেই বাঙলা, বিহার ও উড়িষ্যার স্বাধীন শাসক হয়ে উঠেছিলেন। এভাবেই তিনি বঙ্গদেশে নবাবী আমলের সূচনা করেছিলেন। ১৭২৭ খৃষ্টাব্দে মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যু হয়েছিল।
ঐতিহাসিকদের মতে মুর্শিদকুলি একজন যোগ্য শাসক হলেও বঙ্গদেশের আর্থিক বা সামাজিক অবস্থার কোন উন্নতি ঘটাতে পারেন নি। তাঁর হিন্দুবিদ্বেষ এবং জমিদার ও প্রজাদের পীড়ন করে অর্থসংগ্ৰহ করবার ফলে তৎকালীন বঙ্গদেশে হাহাকার পড়ে গিয়েছিল। তাঁর সহযোগিতায় দিল্লীর অর্থনৈতিক শোষণের কবলে পড়ে বাঙলা তখন ক্রমশঃ জীৰ্ণ হতে শুরু হয়েছিল। তাঁর আমলে দুর্ভিক্ষের সময়ে দেশের লোকের দুর্দশার কোন সীমা পরিসীমা থাকত না। তাঁর পরবর্তী শাসকদের সময়েও প্রায় একই অবস্থা চলেছিল। মোটকথা হল যে, সমগ্র অষ্টাদশ শতাব্দী জুড়েই বাঙালী সমাজে দৈন্যতা বর্তমান ছিল। তখন বছরের পর বছর ধরে দিল্লীতে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব পাঠানোর ফলে বঙ্গদেশে রৌপ্য মুদ্রার অভাব দেখা দিয়েছিল, যেটার অবশ্যম্ভাবী পরিণতিতে তৎকালীন বঙ্গদেশে কেনাবেচা ও লেনদেন – প্ৰাচীন প্ৰথানুযায়ী কড়ির মাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্ৰচলিত হয়েছিল। এরপরে পলাশী যুদ্ধের সময় পৰ্যন্ত বঙ্গদেশের সেই অবস্থা বহাল ছিল।
৭১
১৪৫ মন্তব্য