সহকারী শিক্ষক
২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ ১১:১৪ পূর্বাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
‘কোম্পানি আমলে বাংলার ভূমি-ব্যবস্থা’
– মো: আব্দুল্লাহ আল মামুন
পলাশীর যুদ্ধের পরে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি মোঘল যুগের ভূমি-ব্যবস্থা ও ভূমি-সম্পর্ককে ভেঙে দিয়ে নতুন ব্যবস্থার প্রবর্তন করেছিল। ফলে বাংলার কৃষকেরা চরম দুর্গতি-দুর্দশার সম্মুখীন হয়েছিলেন, এবং কৃষি-ব্যবস্থার চরম অবনতি ঘটেছিল। ইতিমধ্যে ইংরেজ-বণিকেরা বাংলার দেওয়ানি লাভ করে জমির মালিক হয়ে বসেছিলেন এবং জমিদারদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণে ধার্য খাজনা আদায় করবার জন্য রেজা খাঁ, গঙ্গাগোবিন্দ সিংহ, দেবী সিংহ, হরেরাম প্রভৃতি নিষ্ঠুর উৎপীড়কদের নিযুক্ত করেছিলেন। তাঁরা কৃষকদের প্রহার করে, তাঁদের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়ে গ্রাম বাংলার বুকে সন্ত্রাস সৃষ্টি করে খাজনা ও আবওয়াব আদায় করেছিলেন বটে; কিন্তু কোম্পানির স্বার্থের থেকেও তাঁদের নিজেদের আখের গুছানোর দিকেই নজর ছিল বেশি। তাছাড়া কোম্পানি আমলে বাংলার ভূমি-রাজস্ব এতটাই বিপুল হারে বৃদ্ধি করা হয়েছিল যে, পীড়ন-পেষণ-লুণ্ঠন সত্ত্বেও সেটা কারোর পক্ষেই আদায় করা সম্ভব ছিল না। উপরন্তু সেই অমানুষিক শোষণ-উৎপীড়নের বিরুদ্ধে সারা বাংলা জুড়ে কৃষক-বিদ্রোহ দেখা দিয়েছিল। সেই কৃষক-বিদ্রোহকে দমন করবার জন্য – সেনাবাহিনী নিয়োগের ব্যয়ভার বহনের জন্য এবং রাজস্ব আদায়ের অনিশ্চয়তাকে দূর করবার জন্য লর্ড কর্নওয়ালিস ১৭৯০ খৃষ্টাব্দে সর্বোচ্চ হারে রাজস্ব নির্দিষ্ট করে বাংলার জমিদারদের সঙ্গে যে দশসালা বন্দোবস্ত করেছিলেন, সেই বন্দোবস্তও কোম্পানির রাজস্ব-সংগ্রহের অনিশ্চয়তাকে দূর করতে সক্ষম হয়নি। অথচ কোম্পানির কোর্ট অব ডিরেক্টর্স স্থায়ী রাজস্ব-নীতি প্রবর্তনের পক্ষপাতী ছিলেন; তাঁরা অনুভব করেছিলেন যে, রাজস্ব-নীতির অনবরত পরিবর্তন দেশীয় বিত্তশালী অধিবাসীদের বিশেষতঃ জমিদারদের ভীত-সন্ত্রস্ত করে তোলে এবং কোম্পানি-শাসনের স্থায়িত্ব সম্পর্কে তাঁরা আস্থা হারিয়ে ফেলেন। সেই অবস্থায় ১৭৯৩ সালে কোম্পানির বোর্ড অব কন্ট্রোলের সভাপতি হেনরী ডানডাসের কাছে দশসালা বন্দোবস্তকে চিরস্থায়ী করবার জন্য নানাবিধ যুক্তি প্রদর্শন করে লর্ড কর্নওয়ালিস যে প্রস্তাবগুলি জানিয়েছিলেন, ডানডাস বৃটেনের তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী পিটের সঙ্গে সুদীর্ঘ আলোচনা করে সেই প্রস্তাবে সম্মতি জ্ঞাপন করেছিলেন, এবং সেটারই পরিণতিতে ১৭১৩ সালের ২২ মার্চ তারিখে দশ বছরের বন্দোবস্তকে কোম্পানির লণ্ডনের কোর্ট অব ডিরেক্টসের নির্দেশে ‘চিরকালের জন্য অপরিবর্তনীয়’ বলে ঘোষণা করা হয়েছিল। সেই ঘোষণা ‘কর্নওয়ালিস কোড’ নামে ইতিহাসে পরিচিত এবং সেই কোডে রেগুলেশনের সংখ্যা ছিল ৪৮টি। লর্ড কর্নওয়ালিস ঘোষণা করেছিলেন যে, আগে দশ বছরের চুক্তি শেষ হওয়ার সময়ে জমিদারেরা যে রাজস্ব জমা দিতেন, সেই নির্দিষ্ট রাজস্বের কোনো পরিবর্তন ঘটবে না। তাঁরা এবং তাঁদের আইনসম্মত উত্তরাধিকারীরা আগেকার নির্দিষ্ট খাজনায় তাঁদের জমিদারি চিরকালের জন্য ভোগ করতে পারবেন; কিন্তু সেই সুবিধাভোগের বিনিময়ে তাঁদের নিম্নলিখিত বিধি-নিষেধগুলি মেনে চলতে হবে –
(১) খরা, বন্যা অথবা যেকোনো ধরণের প্রাকৃতিক দুর্যোগের জন্য নির্দিষ্ট ভূমি-রাজস্ব প্রদান স্থগিত রাখা বিংবা হ্রাস করবার দাবি উত্থাপনের কোনো অধিকার জমিদারদের থাকবে না। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সরকারের ঘরে রাজস্ব জমা দিতে অক্ষম হলে তাঁদের সম্পূর্ণ জমিদারি কিংবা জমিদারির একটি অংশ – বাকি পড়ে যাওয়া রাজস্ব পরিশোধ করবার জন্য নিলাম করে দেওয়া হবে।
(২) অধীনস্থ রায়ত-কৃষকদের কিংবা তালুবদারদের – যাঁরা জমিদারদের মাধ্যমে খাজনা জমা দেন, তাঁদের জমি, বাড়ি কিংবা তাঁদের অন্যা কোন সম্পত্তি ক্রোক করা কিংবা বিক্রি করবার আইনসম্মত কোন অধিকার জমিদারদের থাকবে না।
(৩) লাঙ্গল, বীজ, শস্য, কারিগরি যন্ত্র ও কৃষিকাজে নিযুক্ত গবাদি পশু ক্রোক করবার কোন অধিকারও তাঁদর থাকবে না।
(৪) কোনো জমিদারই রায়তদের কাছ থেকে কোনো ধরণের অজুহাতে আবওয়াব বা মাথট আদায় করতে পারবেন না। সেই জাতীয় প্রত্যেকটি বেআইনী আদায়ের জন্য তাঁকে আদায়ীকৃত অর্থর তিনগুণ জরিমানা করা হবে। সেই কারণে জমিদারেরা রায়তদেরকে দেয় অর্থর পরিমাণ লিখে পাট্টা দেবেন এবং তাঁরা জেলা আদালতে পাট্টার চেকমুড়িগুলিকে নিবন্ধভুক্ত করতে বাধ্য থাকবেন।
এইভাবে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে চিরকালের জন্য সরকারি রাজস্ব নির্দিষ্ট করে দেওয়ার ফলে জমিদারেরা যেমন উপকৃত হয়েছিলেন, অন্যদিকে তাঁরা তখন যে সমস্ত ক্ষমতা ভোগ করতেন, সেগুলির অনেকাংশ কেড়ে নেওয়ার ফলে ক্ষতিগ্রস্তও হয়েছিলেন। এর ফলে ভূস্বামীশ্রেণীর মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছিল, এবং নিজেদের ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য তাঁরা সেই নতুন আইনকে প্রতিরোধ করতে সচেষ্ট হয়েছিলেন। অবশ্য তাঁদের সেই প্রতিরোধ বাংলার বুক থেকে বৃটিশ-শাসনকে উৎখাত করা কিংবা তাঁদের পছন্দমত একটা বিকল্প ব্যবস্থা প্রবর্তন করবার জন্য কোনো সংগঠিত আন্দোলনের রূপ পরিগ্রহণ করেনি। সরকারি রাজস্ব-আদায় যাতে অনিশ্চিত হয়ে উঠে, সেজন্য তাঁরা নিজেদের মধ্যে ছোট ছোট দলে কিংবা ব্যক্তিগতভাবে নানাবিধ পদ্ধতি অবলম্বন করে সরকারের রাজস্ব-আদায়ের পথে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করেছিলেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে সরকারি রাজস্ব মকুব করা, জমির নির্ধারিত মূল্য হ্রাস করা, তালুকগুলিকে বিভক্ত করবার নীতিকে বন্ধ করা, পাট্টা আইন প্রত্যাহার এবং সর্বোপরি রায়ত-কৃষকদের দমন করবার ঐতিহ্যগত ক্ষমতার পুনঃপ্রতিষ্ঠা প্রভৃতি তাঁদের প্রধান দাবি ছিল। সরকারের কাছ থেকে সেই সমস্ত দাবি আদায় করবার জন্য ভূস্বামীশ্রেণী নানাবিধ কৌশলের দ্বারা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবার ফলে রাজস্ব-আদায় ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে উঠেছিল। এরপরে ১৭৯৩ সালের অষ্টম আইন, অর্থাৎ পাট্টা আইন বাংলার ভূস্বামী শ্রেণীকে বিক্ষুব্ধ করে তুলেছিল। সেই আইনের দ্বারা প্রজাদের কাছ থেকে আসল জমা ছাড়া আবওয়াব ইত্যাদি পীড়নমূলক অর্থ আদায় করাকে নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। তৎকালীন ব্যবস্থায় প্রজাদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করা কোনো নির্দিষ্ট আইনের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ছিল না। ভূস্বামীকে আসল জমা ছাড়া কত কর দিতে হবে, সেকথা রায়তরা জানতেন না। সেই সময়ে প্রায় সমস্ত কিছুর জন্যই রায়তদের কর দিতে হত। খাজনা সংগ্রহের জন্য ব্যয়-বাবদ কর; শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য কর; রাস্তা তৈরির জন্য কর; বাড়ি, হাট, বাজার ইত্যাদির জন্য কর; জমিদার-বাড়িতে জন্ম, মৃত্যু, বিবাহ, ও অন্যান্য উৎসবানুষ্ঠানের জন্য কর; কাশী, বৃন্দাবন, পুরী প্রভৃতি তীর্থস্থানে জমিদার-পরিবারের তীর্থ করতে যাওয়ার জন্য কর ইত্যাদি তখন প্রজাদের কাছ থেকে ‘আবওয়াব’ নামে আদায় করা হত। আসল জমার সঙ্গে সেই সমস্ত কর যুক্ত হয়ে যে পরিমাণ অর্থ রায়তদের দিতে বাধ্য করা হত, সেটা তাঁদের ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছিল। অথচ ১৫৮৮ সালে রাজা টোডরমলের দ্বারা নির্দিষ্ট আসল জমার অতিরিক্ত কোনো কর প্রজাদের কাছ থেকে দাবি করবার কোনো অধিকার কিন্তু জমিদারদের ছিল না। (রাজা টোডরমল বাংলার ভূমি জরিপ করে যে রাজস্বের হার নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন, সেটা আসল জমা নামে অভিহিত হত। আসল জমার উপরে অতিরিক্ত কোন করকে আবওয়াব বলা হত। সেকালে জমির মূল্যবৃদ্ধির জন্য খাজনার হার বৃদ্ধিকল্পে আবওয়াব ধার্য করা হত। নবাব আলীবর্দী খাঁর পর থেকে আবওয়াব প্রজাদের জন্য অত্যাচারে পরিণত হয়েছিল। বাংলার জমিদারেরা তাঁদের মর্জিমাফিক আবওয়াব আদায় করতেন।) সুতরাং রায়তদের কাছ থেকে সেই জাতীয় উৎপীড়নমূলক কর আদায় বন্ধ করবার জন্য কোম্পানির পাট্টা আইনে বলা হয়েছিল –
(১) ভূস্বামীশ্রেণী রায়তদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণে অর্থ আদায় করবেন। সেটার অতিরিক্ত নতুন কোন আবওয়াব আদায় করা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছিল।
(২) নির্দিষ্ট আসল জমার অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের চেষ্টা করা হলে দেওয়ানি-আদালতে শাস্তি দেওয়া হবে বলে ঘোষণা করা হয়েছিল।
(৩) প্রত্যেকটি জমিদারকে দশ বছরের ইজারার ভিত্তিতে রায়তকে পাট্টা দিতে হবে বলে জানানো হয়েছিল। জমির উৎকর্ষতা, প্রতি বিঘার খাজনা ও অন্যান্য শর্ত ইত্যাদি পাট্টায়, অর্থাৎ চুক্তির দলিলে উল্লেখ করবার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
(৪) পাট্টার চেকমুড়ি দেওয়ানি-আদালতে নিবন্ধভুক্ত করবার জন্য পেশ করবার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
(৫) খুদকাস্তের পাট্টাকে কোনভাবেই নাকচ করা যাবে না বলে জানানো হয়েছিল।
কিন্তু জমিদারদের প্রবল প্রতিরোধের জন্য কোম্পানি-সরকারকে শেষপর্যন্ত তাঁদের সামনে নতিস্বীকার করতে হয়েছিল। ১৭৯৯ সালের আইনের দ্বারা বাংলার ভূস্বামীশ্রেণীর অতীতের সমস্ত সামন্ত-ক্ষমতা পুনর্বহাল করা হয়েছিল। ১৮১২ সালের পঞ্চম আইনে বলা হয়েছিল যে, দশ বছরের ইজারার মেয়াদের পাট্টা আইন বাতিল করা হয়েছে, এবং ভূম্যধিকারীশ্রেণী তাঁদের ইচ্ছানুযায়ী ইজারা প্রদানের সময় ও যেকোনো হারে খাজনা নির্দিষ্ট করতে পারবেন। ১৮১১ খৃষ্টাব্দের আইনে রায়ত ও জমিদারদের মধ্যবর্তী একটি মধ্যস্বত্বাধিকারীশ্রেণী প্রতিষ্ঠার অধিকার দেওয়া হয়েছিল। “এ সবই কর্নওয়ালিস কোডের আদর্শ-বিরোধী আইন। কেন কোম্পানীর সরকার জমিদারদের কাছে নতি স্বীকার করে? কারণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক। সামাজিক নেতা হিসেবে জমিদারদের সমর্থন-লাভ কোম্পানীর একটি রাজনৈতিক প্রয়োজন। কোম্পানীর যুদ্ধ নীতির অর্থ যোগায় বাংলার মাটি। সে মাটি নিয়ন্ত্রণ করে জমিদার। অতএব যে কোন মূল্যে জমিদারের আনুগত্য আদায় করা ছিল সরকারের ঔপনিবেশিক প্রয়োজন।” (The Permanent Settlement in Bengal: 1790-1819, Sirajul Islam, P: 14-16, 18, 41, 42, 47; বাংলার ইতিহাস: ঔপনিবেশিক কাঠামো, সিরাজুল ইসলাম, পৃ- ১৫৯)
চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে করসংগ্রাহক জমিদারেরা জমির মালিকরূপে ঘোষিত হওয়ার ফলে সেটার প্রতিক্রিয়া সুদূরপ্রসারী হয়েছিল। সেই আইনে রায়তদের স্বার্থরক্ষার কথা বলা হলেও বাস্তবে সেটা অর্থহীন ছিল। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের দ্বারা বলীয়ান হয়ে প্রবল প্রতাপশালী জমিদারেরা সহজেই সেই আইনকে অস্বীকার করে নিরক্ষর-নিঃসম্বল প্রজাদের দমন-পীড়ন করতে মেতে উঠেছিলেন। অতীতের ভারতের হিন্দু-মুসলিম যুগের ভূমি-ব্যবস্থাকে পরিবর্তন করে ইউরোপের ভূমি-ব্যবস্থার অনুকরণে বৃটিশ-বণিকেরা বঙ্গদেশে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সাহায্যে যে নতুন ভূমি-ব্যবস্থার প্রবর্তন করেছিলেন, সেটার কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য নিম্নরূপ ছিল –
(ক) ইতিপূর্বে বাংলার জমিদারেরা শুধুমাত্র কর-সংগ্রহকারী ছিলেন, জমির উপরে তাঁদের কোনো ধরণের স্বত্ব ছিল না। এই প্রসঙ্গে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির উচ্চপদস্থ কর্মচারী জে. এইচ. হ্যারিংটন বলেছিলেন, “রাষ্ট্রের পক্ষে রায়ত ও জমির উপস্বত্বঃভাগীদের কাছ থেকে আঞ্চলিক রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব পালন করেন জমিদার। একদিক থেকে তাঁকে তাঁর জমিদারির নির্দিষ্ট রাজস্বের বাৎসরিক কন্ট্রাক্টর বা ইজারাদার বলা যায়।” (বাংলার সামাজিক ইতিহাসের ধারা, বিনয় ঘোষ, পৃ- ১২) অথচ কোম্পানি-সরকার চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে সেই ইজারাদারদের জমির স্বত্ব দান করে দিয়েছিলেন, অর্থাৎ তখন থেকে জমিদারেরা ভূমির মূলস্বত্বভোগী হয়ে উঠেছিলেন। সেই নতুন ভূস্বামীশ্রেণীর সংজ্ঞা নির্দেশ করতে গিয়ে হ্যারিংটন বলেছিলেন, “জমিদার তাঁর জমিদারির মালিক – উত্তরাধিকার, দান বা কেনা-বেচা থেকে তিনি এই মালিকানাস্বত্ব লাভ করতে পারেন – তাঁর দায়িত্ব হল – তাঁর জমিদারির নির্দিষ্ট স্থায়ী রাজস্ব যথাসময়ে গভর্নমেন্টকে পরিশোধ করা। তাঁর দেয় রাজস্ব চুকিয়ে দিয়ে তিনি আইনসঙ্গতভাবে উপস্বত্বভোগী ও প্রজাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত মুনাফা ও খাজনা যতটা সম্ভব আদায় করতে পারেন এবং তা ভোগও করতে পারেন।” (বাংলার সামাজিক ইতিহাসের ধারা, বিনয় ঘোষ, পৃ- ১৩) অর্থাৎ, তখন থেকে জমিদারেরা চিরস্থায়ীস্বত্বে তাঁদের ভূসম্পত্তি ভোগ করবার, জমি থেকে কৃষকদের উচ্ছেদ করতে পারবার, রায়তদের কাছ থেকে ইচ্ছামত খাজনা আদায় করবার এবং সরকারকে স্থায়ীভাবে নিদিষ্ট পরিমাণে রাজস্ব দেওয়ার অধিকারী অবশ্যই হয়েছিলেন; কিন্তু একই সাথে নির্দিষ্ট সময়ের (চৈত্র সংক্রান্তির সূর্যাস্তের) মধ্যে সরকারের ঘরে রাজস্ব জমা দিতে না পারলে তাঁদের জমিদারি নিলাম করে দেওয়া হবে বলেও জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল। (কৃষকসভার ইতিহাস, আব্দুল্লাহ রসুল, পৃ- ১২) পরবর্তীকালে সেই জমিদারেরাই আবার শাসকগোষ্ঠীর সম্মতি নিয়ে তাঁদের সহকারীরূপে তালুকদার, জোতদার প্রভৃতি উপস্বত্বঃভাগীদের একটা বিরাট শ্রেণীর সৃষ্টি করেছিলেন।
(খ) এর আগে কৃষকেরা যৌথভাবে জমির ফসল ভোগ করলেও জমি কেনাবেচা করবার কোন অধিকার তাঁদের ছিল না। সেটার ফলে ঋণগ্রস্ত কৃষকের জমিজমা আত্মসাৎ করবার কোন সুযোগও মহাজনের হত না। কিন্তু নতুন ব্যবস্থায় তাঁরা জমি কেনা-বেচা, দান-বন্ধক দেওয়ার অধিকার লাভ করেছিলেন। ভারতের ইতিহাসে সেই প্রথম জমিও পণ্য ক্রয়-বিক্রয়ের সামগ্রীতে পরিণত হয়েছিল। পরবর্তীকালে সেই ব্যবস্থার জন্যই ঋণগ্রস্ত কৃষকের অসহায়তার সুযোগ নিয়ে মহাজনেরা তাঁদের ভূমিহীন কৃষকে পরিণত করেছিলেন। এই প্রসঙ্গে ১৮০২ সালে মেদিনীপুর জেলার কালেক্টর তাঁর রিপোর্টে বলেছিলেন, “ক্রয়-বিক্রয় ও ক্রোক করবার প্রথার ফলে বাংলার ভূসম্পত্তির ক্ষেত্রে যে প্রভূত পরিবর্তন ঘটেছে, তার অপেক্ষা অধিকতর পরিবর্তন বোধহয় কোনও যুগে কোনও দেশেই কেবলমাত্র আভ্যন্তরীণ বিধিবিধানের দ্বারা সংঘটিত হয়নি।” (আজিকার ভারত, ২য় খণ্ড, রজনীপাম দত্ত, পৃ- ৩৯)
(গ) অতীতে যৌথ মালিকানায় কৃষকেরা সমষ্টিগতভাবে উৎপন্ন ফসলের (যে বছরে যা উৎপাদিত হত) একটা নির্দিষ্ট অংশকে সম্রাটের প্রতিনিধিরূপে থাকা জমিদারের হাতে তুলে দিতেন। নতুন নিয়মে ব্যক্তিগতভাবে প্রত্যেকটি কৃষককে (যৌথভাবে নয়) জমির নির্ধারিত মূল্যের ভিত্তিতে (উৎপন্ন ফসলের ভিত্তিতে নয়) নগদ মুদ্রায় (ফসলে নয়) একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ খাজনা (ফসলের উৎপাদন যাই হোক, না কেন) জমা দেওয়ার বন্দোবস্ত করা হয়েছিল। অর্থাৎ ফসল ভালো হোক বা মন্দ হোক, অজন্মা হোক অথবা নাই হোক, কি পরিমাণে জমি আবাদ করা হয়েছে বা আদৌ জমি আবাদ করা হয়নি – ইত্যাদি কোনো বিষয়ই তখন আর বিবেচনা করা হত না; শুধুমাত্র প্রত্যেক বছর নিয়মিতভাবে জমির মালিককে খাজনা বাবদ নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দিতে বাধ্য করা হয়েছিল।
ঐতিহাসিকদের মতে বঙ্গদেশে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তনের পিছনে বৃটিশ-বেনিয়াদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল। তাঁরা নিজেদের আগেকার অভিজ্ঞতা থেকে বুঝে গিয়েছিলেন যে, বাৎসরিক বা পাঁচসালা বন্দোবস্তের দ্বারা ভূসম্পত্তিহীন রাজস্ব-আদায়কারী জমিদারদের মাধ্যমে যে পরিমাণে রাজস্ব আদায় করা হত, সেটা দিয়ে কোম্পানির ক্রমবর্ধমান প্রশাসনিক ও সামরিক ব্যয়-নির্বাহ করা সম্ভব ছিল না। অথচ কোম্পানির রাজত্ব বজায় রাখতে হলে কৃষক-বিদ্রোহ দমন করতেই হত, কোম্পানির রাজত্ব বাড়াতে হলে ভারতের বিভিন্ন রাজ্য দখলের জন্য ক্রমশঃ যুদ্ধে লিপ্ত হওয়া ছাড়া তাঁদের সামনে অন্য কোন পথ খোলা ছিল না, এবং কোম্পানির অংশীদারদের ক্রমবর্ধমান লভ্যাংশের দাবি পূরণ করবার চাপও তাঁদের উপরে ছিল। তাই তাঁরা – ‘মাছের তেল দিয়ে মাছ ভাজার’ – নীতিটি গ্রহণ করেছিলেন। এই বিষয়ে ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র দত্ত বলেছিলেন যে, তখন – “ভারতবর্ষে এক বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তোলা হচ্ছিল, বড় বড় যুদ্ধ চালানো হচ্ছিল এবং শাসনকার্যও পরিচালিত হচ্ছিল ভারতের জনসাধারণের অর্থে। এই সমস্ত কাজের জন্য বৃটিশ জাতি একটি পয়সাও খরচ করেনি।” (The Economic History of India under Early British Rule, R. C. Dutta, Vol. I, P- 46) তবে কিছু দেশীয় কর্মচারীর সাহায্যে শোষণ-নিপীড়ন চালালেও বঙ্গদেশে কোম্পানির কোন ব্যাপক সামাজিক ভিত্তি ছিল না। অথচ স্থায়ীভাবে কোথাও শোষণ-কার্য চালাতে গেলে বিপুল সংখ্যক দেশীয় সমর্থক সংগ্রহেরও প্রয়োজন হয়। তাই তখন এমন কতগুলি সামাজিক স্তর সৃষ্টি করবার দরকার হয়ে পড়েছিল, যেগুলো বৃটিশ-কোম্পানির শাসন-শোষণকে দীর্ঘস্থায়ী করতে সাহায্য করবে। কোম্পানি সৃষ্ট বাৎসরিক বন্দোবস্ত ও পাঁচসালা বন্দোবস্তের ফলে ধ্বংসোন্মুখ পুরনো বনেদী জমিদারদের মধ্যে অনেকেই বঙ্গদেশে বৃটিশ-বিরোধী কৃষক-সংগ্রামে উৎসাহ-মদত-নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তাঁদের সম্পর্কে কোম্পানির কর্তৃপক্ষ তাই গভীর সন্দেহের মনোভাব পোষণ করতেন, এবং লর্ড হেস্টিংস সেকথা স্পষ্ট করে জানাতে গিয়ে বলেছিলেন, “বড় বড় জমিদারেরা সরকারের বিরুদ্ধে তাঁদের প্রচণ্ড প্রভাব ব্যবহার করে থাকেন এবং সেইজন্যই তাঁদের প্রভাব নষ্ট করা বাঞ্ছনীয়।” (স্বাধীনতা সংগ্রামে বাংলা, নরহরি কবিরাজ, পৃ- ৩২) সুতরাং, বাংলার কোম্পানি সরকার তখন নতুন নতুন দেশীয় বন্ধু সৃষ্টি করবার দিকে নজর দিয়েছিল, যাঁরা সমস্তরকমের বিদ্রোহ-বিক্ষোভের বিরুদ্ধে ইংরেজ শাসনকে সমর্থন-সাহায্য করবেন। নিজেদের সেই গূঢ় অভিসন্ধি নিয়েই বাংলায় তাঁরা চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তন করেছিলেন। শাসকগোষ্ঠীর সেই আশা ব্যর্থ হয়নি। সেই কারণেই ১৮২১ সালের ৮ই নভেম্বর তারিখে লর্ড বেন্টিঙ্ক সুস্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছিলেন, “বহু দিকে এবং কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের যতই গলদ থাকুক না কেন, একটি বিষয়ে উহার অপরিসীম গুরুত্ব স্বীকার করিতেই হইবে। কোন ব্যাপক গণ-বিক্ষোভ বা বিপ্লবের সম্ভাবনার বিরুদ্ধে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত এমন এক বিপুল সংখ্যক ধনী জমিদারশ্রেণী সৃষ্টি করিয়াছে যাঁহাদের স্বার্থ ব্রিটিশ-শাসন বজায় রাখার প্রশ্নের সহিত ঘনিষ্টভাবে জড়িত এবং জনসাধারণের উপর যাঁহাদের প্রভূত প্রভাব রহিয়াছে।” (মোঘল রাজত্বে ভূমি-রাজস্ব পরিচালন-ব্যবস্থা: ১৭০০-১৭৫০, এন. এ. সিদ্দিকী, পৃ- ৪১)
৫৩
৯২ মন্তব্য