Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ ০৬:৩৯ অপরাহ্ণ

পালি ভাষার উৎপত্তির ইতিবৃত্ত

‘পালি ভাষার উৎপত্তির ইতিবৃত্ত’

– মো: আব্দুল্লাহ আল মামুন 

কোন একটি ভাষার ইতিহাস নিয়ে বিশদে আলোচনা করতে গেলে কিংবা সেই ভাষার ঐতিহাসিক পরিচয় পেতে গেলে প্রথমে জানা দরকার যে, — যে ভাষাটি নিয়ে আলোচনায় প্রবৃত্ত হতে হচ্ছে, সেই ভাষার নামটি কোথা থেকে এবং কিভাবে এসেছে। তাই পালিভাষার ক্ষেত্রে — ভাষাটির নাম কেন ‘পালি’ হয়েছে, সে সম্পর্কে আলোচনা করবার প্রয়োজন রয়েছে।

ইতিহাস বলে যে, অতীতে ‘পালি’ শব্দটি এক একসময়ে এক এক রকমের অর্থে ব্যবহৃত হয়েছিল। পালি কথাটির অর্থ হল — যা পালন করা হয়।

“পালেতিতি রক্ষতেতি পালি” — অর্থাৎ, যা পালন করা বা রক্ষা করা হয়, সেটাই হল পালি।

সাধারণভাবে সকলে বিশ্বাস করেন যে, যেহেতু গৌতম বুদ্ধের উপদেশ ও বাণীগুলি এই ভাষাতেই পালন এবং রক্ষা করা হয়েছিল, সেহেতু এটির নাম হল পালি। পালি নামটি সম্বন্ধে অন্য যে বিশ্বাসটি প্রচলিত রয়েছে, সেটা হল যে, এই ভাষাতেই বুদ্ধদেবের উপদেশের পাঠ বা ‘text’ সংরক্ষিত করা হয়েছিল। এই ধারণার পিছনে যে যুক্তিটি রয়েছে, সেটা হল যে — পাঠ শব্দটি থেকে পালি শব্দটি এসেছে। অর্থাৎ, পাঠ → পাল → পালি। পাঠ শব্দটি থেকে যে পালি শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে, এই ধারণা যে খৃষ্টীয় পঞ্চম ও ষষ্ঠ শতাব্দী পর্যন্ত মানুষের মনে কাজ করেছিল, সে বিষয়ে ঐতিহাসিক প্রমাণের কোন অভাব নেই।

সুদূর অতীতে একটি প্রাচীন লিপির এক জায়গায় বলা হয়েছিল — “ইতি পি পালি”; এর অর্থ হল — ইতি পি পাঠ, এটাও পাঠ বা text।

আবার অন্য এক জায়গায় বলা হয়েছিল — “পালিমত্তম ইধানীতং নত্থি অত্থকথা ইধ।” এই বাক্যটিকে সংস্কৃত ভাষায় রূপান্তরিত করলে হয় — ‘পালিমাত্রং ইদং আনীতং, নহি অর্থকথা ইদং’; অর্থাৎ — শুধুমাত্র পালিই আনা হয়েছে বা text আনা হয়েছে, এখানে কোন অর্থকথা নেই।

আরেকটি জায়গায় পাওয়া যায় — “নেব পালিয়ং ণ অত্থ কথায়ং।” এর সংস্কৃত হল — ‘নৈব পালিয়ং, নৈব অর্থকথায়ং’; অর্থাৎ — পাঠেও নেই, অর্থকথাতেও নেই।

এই তিনটি ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত বাক্য থেকে বোঝা যায় যে, পালি কথাটি পাঠ বা ‘text’ — এই অর্থে খৃষ্টীয় পঞ্চম-ষষ্ঠ শতাব্দী পর্যন্ত প্রচলিত ছিল। এর থেকেই, পরে যখন পালি শব্দটি পাঠ না বুঝিয়ে একটা ভাষার নামকে বোঝানোর জন্য ব্যবহৃত হয়েছিল, তখন সেই নামকরণের পিছনে বোধহয় এই যুক্তি কাজ করেছিল যে, পালি হচ্ছে এমন একটা ভাষা, যে ভাষাতে বুদ্ধদেবের উপদেশগুলির পাঠ বা ‘text’ ধরা রয়েছে।

পালি নামটির উৎপত্তি সম্পর্কে তৃতীয় মতটিও এক্ষেত্রে অনুধাবনযোগ্য। আচার্য দীনেশচন্দ্র সেন তাঁর ‘পূর্ববঙ্গ গীতিকা’ গ্রন্থের তৃতীয় খণ্ডে যে ভূমিকাটি লিপিবদ্ধ করেছিলেন, সেখানে তিনি বলেছিলেন যে, সংস্কৃত ‘পঙক্তি’ শব্দটি যে অর্থে ব্যবহার করা হয় (অর্থাৎ — শ্লোকের চরণ), সেই অর্থ পালি শব্দটিতেও প্রয়োগ করা যেতে পারে। সেই ভূমিকাতে তিনি আরো জানিয়েছিলেন যে, অতীতে পূর্ববঙ্গের একশ্রেণীর মানুষ গদ্য-কাহিনীর শ্লোক-অংশকে পালি বলতেন। তবে, পঙক্তি শব্দটি কিভাবে বদল হয়ে পালি শব্দে পরিণত হয়েছিল, সে সম্পর্কে কোন সন্তোষজনক ইঙ্গিত তাঁর গ্রন্থে পাওয়া যায় না। আচার্য বিধুশেখর শাস্ত্রীও — পালি শব্দটি পঙক্তি শব্দ থেকে এসেছে বলে জানিয়েছিলেন। কিন্তু সংস্কৃত পঙক্তি শব্দ থেকে পালি শব্দটির বিবর্তন কিভাবে সম্ভব হয়েছিল — সেটার কোন যুক্তিগ্রাহ্য উত্তর তিনিও দেননি।

পালি শব্দটির উৎপত্তি সম্পর্কে চতুর্থ একটি মতও প্রচলিত রয়েছে। কেউ কেউ বলেন যে, পল্লীবাসীদের ভাষা — এই অর্থে পালি শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছিল। কিন্তু এই ধরণের অনুমানের পিছনেও কোন সন্তোষজনক যুক্তি খুঁজে পাওয়া যায় না। কারণ, পল্লী থেকে বিবর্তিত হয়ে পাড়া শব্দটি এসেছে মনে বলে করাই অধিকতর সঙ্গত (পল্লীগ্রাম → পাড়াগাঁ)। কারণ, ভাষাবিদদের মতে — ‘র’–এর জায়গায় ‘ল’–এর ব্যবহার বা ‘ল’–এর জায়গায় ‘র’–এর ব্যবহার মাগধী প্রাকৃতের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য। ‘আর্যমঞ্জুশ্রীমূলকল্প’ নামক প্রাচীন গ্রন্থ, শতপথ ব্রাহ্মণ এবং পতঞ্জলি — সবকিছুতেই এই সিদ্ধান্তের ঐতিহাসিক প্রমাণ পাওয়া যায়। সুতরাং পল্লী থেকে পালি শব্দের উৎপত্তি হয়েছে — এটা খুব একটা যুক্তিসঙ্গত বলে মনে হয় না। অনেকের মতে, খুব সম্ভবতঃ বৌদ্ধবিদ্বেষী এবং পালিভাষার প্রতি অশ্রদ্ধাশীল কোন গোষ্ঠী বা সম্প্রদায় এই ধরণের উক্তির মধ্যে দিয়ে পালিভাষা ও সাহিত্যকে জনসমাজে হেয় করবার উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে চেয়েছিলেন।

পালি শব্দটির উৎপত্তি সম্বন্ধে ইতিহাস থেকে এই ক’টি মত পাওয়া যায়। এগুলো থেকে শুধু এইটুকুই বোঝা যায় যে, বর্তমানে পালিভাষা মৃত হলেও অতীতের কোন একসময়ে এই ভাষাটির গুরুত্ব কিন্তু বিন্দুমাত্র কম ছিল না; এই ভাষার শক্তিকে অবহেলা করবার দুঃসাহসও তখন কারো মধ্যে ছিল না। পালি যদি নেহাৎই সেকালের একটা অপাংক্তেয় ভাষা হত, তাহলে ভাষাটির নামের উৎপত্তি নিয়ে পণ্ডিতেরা হয়ত এতটা মাথা ঘামাতেন না। গৌতম বুদ্ধের জ্ঞানগর্ভ উপদেশ ও মতবাদের শক্তিশালী বাহন হিসাবে পালির ব্যবহার একদিন ভারতের সর্বত্র ব্যাপকভাবেই করা হয়েছিল। বৌদ্ধদের কাছে আজও পালি একটি পবিত্র ভাষা হিসাবে স্বীকৃত। খৃষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দী থেকে শুরু করে পরবর্তী একহাজার বছর ধরে ভারতে এই ভাষাটি প্রচলিত ছিল। এখনও বৌদ্ধদের মধ্যে ধর্মচর্চার প্রধান বাহন হিসাবে, — ভারতে এবং সিংহলে — এই ভাষাটির পুঁথিগত ব্যবহার দেখতে পাওয়া যায়। এই সমস্ত দিক বিবেচনা করলে সম্ভবতঃ এরকম সিদ্ধান্ত করাই সঙ্গত হবে যে, পালন কিংবা পাঠ (text) — এই শব্দদুটির যেকোন একটি থেকেই পালি শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে।

আনুমানিক ১৫০০ খৃষ্টপূর্বাব্দের কাছাকাছি সময় থেকে আর্যরা ভারতবর্ষের মূল ভূখণ্ডে প্রবেশ করতে শুরু করেছিলেন, এবং অনেকগুলি ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত অঞ্চলে এবং পাঞ্জাবের পশ্চিমদিকে নিজেদের উপনিবেশ স্থাপন করবার কাজে মনোনিবেশ করেছিলেন। ধীরে ধীরে আর্যরা সমগ্র উত্তরভারতে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারিত করেছিলেন, এবং সেই সঙ্গে, সেই সময়ে ভারতের মূল ভূখণ্ডে যাঁরা বাস করতেন, অর্থাৎ — অনার্যদের, ভাষা ও সংস্কৃতিকে সম্পূর্ণভাবে নিজেদের করে নিয়ে আর্যভাষার আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। যে আর্যরা বিভিন্ন ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে ভারতবর্ষের মূল ভূখণ্ডে প্রবেশ করেছিলেন; তাঁদের নিজেদের কথ্য ভাষার মধ্যে অল্পস্বল্প পার্থক্য থাকলেও তাঁদের সমস্ত ভাষার মধ্যে কিন্তু একটা মূলগত ঐক্য ছিল। তাঁদের আদি জীবিকা ছিল পশুপালন, ভারতবর্ষের মূল ভূখণ্ডে আসবার পরে তাঁদের যাযাবর পশুপালক জীবন কৃষিজীবী হিসাবে স্থায়িত্ব পেয়েছিল। আর্যদের সবথেকে বড় মূলধন ছিল তাঁদের শক্তিশালী ভাষা এবং সত্যিকারের কাব্যময় দেবদেবীর বন্দনাগীতিমূলক চমৎকার সাহিত্য। সেই ভাষাই হল বৈদিক ভাষা; ঋগ্বেদের মধ্যে সেই প্রাচীন সাহিত্যিক ভাষার উৎকৃষ্টতম উদাহরণ সঙ্কলিত হয়েছিল। গবেষকদের মতে, ঋগ্বেদের রচনার সময়ের প্রায় পাঁচশো বছর পরে — আনুমানিক ১০০০ খৃষ্টপূর্বাব্দে সেই গাথাগুলি বা বৈদিক সূত্রগুলি সঙ্কলিত করা হয়েছিল। বৈদিক সাহিত্যের আনুমানিক রচনাকাল হল ১৫০০–৬০০ খৃষ্টপূর্বাব্দ। এই সাহিত্যের তিনটি ভাগ, যথা — বেদ বা সংহিতা, ব্রাহ্মণ, এবং উপনিষদ। বেদের ব্যাখ্যা হল ব্রাহ্মণ, আর ব্রাহ্মণের পরিশিষ্ট অংশ হল উপনিষদ। বেদের অন্তর্গত যজ্ঞকার্যের বিবরণ ও সেগুলির বিশ্লেষণ ছাড়াও ব্রাহ্মণে কিছু কিছু প্রাচীন উপাখ্যানের ইঙ্গিতও পাওয়া যায়। উপনিষদে সে যুগের কবি-মনীষীদের দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক চিন্তাভাবনার সাহিত্যিক কবিত্বময় প্রকাশও এখানে অনুধাবনযোগ্য। ব্রাহ্মণ এবং উপনিষদ — দুটিই প্রধানতঃ গদ্যে লেখা হয়েছিল।

এগুলোই প্রত্ন ভারতীয়-আর্য (Old Indo-Aryan) ভাষার সাহিত্যিক রচনার প্রাচীনতম নিদর্শন। এগুলিতে প্রধানতঃ ধর্মসাহিত্যেরই পবিত্র প্রকাশ ঘটেছিল। এছাড়াও আরেকটি সাহিত্যিক ভাষা সেকালের শিষ্ট এবং শিক্ষিত মানুষের ব্যবহারের ফলে ক্রমে ক্রমে প্রাধান্য পেয়েছিল বলে পণ্ডিতেরা সিদ্ধান্ত করেছেন। সেই ভাষাতে অবৈদিক এবং লোকায়ত কাহিনী উপাখ্যানগুলি রচিত হয়েছিল, কিন্তু সেই ভাষার প্রাচীনতম কোন নিদর্শন পাওয়া যায় না। এর অনেক পরে রামায়ণ-মহাভারত প্রমুখ মহাকাব্যের মাধ্যমে, প্রাচীন পুরাণের ভাষার মধ্যস্থতায় সেই ভাষাটির পরিণত রূপটির সঙ্গে পরিচিত হওয়া যায়। পাণিনি সেই শিষ্ট ভাষাকে ব্যাকরণের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে সেটাকে শৃঙ্খলার মধ্যে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। সেই ভাষাটিই হল — সংস্কৃত।

সংস্কৃত ভাষার উৎপত্তি সম্পর্কে প্রচলিত আরেকটি মতকেও এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে। কেউ কেউ বলেন যে, ভারতে আগত আর্যদের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে তৎকালীন ভারতের আদি অনার্যদের সঙ্গে প্রথমে বিরোধ সৃষ্টি হলেও কালক্রমে সেই বিরোধ পারস্পরিক মিলনে পরিণত হয়েছিল। আর্যদের ভাষায় বহু অনার্যশব্দ প্রবিষ্ট হয়েছিল, এবং ইতরজনের মুখে আর্য অনার্য ভাষা ক্রমাগত ব্যবহারের ফলে একটা মিশ্রভাষার উদ্ভব ঘটেছিল। সাধারণ মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত সেই মিশ্রভাষাই যখন পরে প্রবল শক্তিশালী হয়ে হয়েছিল, তখন পাণিনি প্রমুখ বৈয়াকরণরা সেই মিশ্রভাষাকে সংস্কার করে সেটাকে একটা শিষ্ট মার্জিত রূপ দিয়েছিলেন। সংস্কার করা সেই মিশ্রভাষাই নাকি সংস্কৃত ভাষা, — যা এরপরে রাজকার্যে, রাজসভায়, সাহিত্যরচনায় ব্যবহৃত হতে শুরু করেছিল; এবং জনসাধারণের ভাষা বা প্রাকৃতজনের ভাষা হিসাবে সেই মিশ্র ভাষাটি থেকে গিয়েছিল, যেটাকে এখন প্রাকৃত বলা হয়। তবে এই মতটি কতদূর সত্যি — সে সম্পর্কে যুক্তিসঙ্গত ঐতিহাসিক প্রমাণের অভাব রয়েছে। সেই কারণে, অধিকাংশ ভাষাতত্ত্ববিদ সংস্কৃত ভাষার উৎপত্তি সম্পর্কে প্রথম মতটিকে সমর্থন করে থাকেন।

বর্তমানে — বৈদিক এবং সংস্কৃতকেই প্রত্ন ভারতীয়-আর্য (O. I. A.) ভাষা বলা হয়ে থাকে। কিন্তু এখানে বিশেষভাবে মনে রাখতে হবে যে, এই দুটি ভাষা মূলতঃ এক উৎসজাত হলেও এগুলির মধ্যে বহু মৌলিক এবং কালপরিণামগত পার্থক্য রয়েছে। বৈদিক ভাষারই সরলীকৃত রূপ হল সংস্কৃত, এবং সংস্কৃতের সরলীকৃত রূপ হল প্রাকৃত। এই প্রসঙ্গে ডঃ সুকুমার সেন তাঁর ‘ভাষার ইতিবৃত্ত’ গ্রন্থের ৭৯ নং পৃষ্ঠায় (৫ম সংস্করণ) বলেছিলেন —

“বৈদিক ভাষা ক্রমশঃ সরল হইয়া সংস্কৃতে পরিবর্তিত হইল, কিন্তু প্রত্ন ভারতীয় কাঠামো ঠিক রহিল। তাহার পরে, অর্থাৎ খৃষ্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দী হইতে, ভারতীয় আর্যভাষায় যে-পরিবর্তন দেখা দিল তাহাতে কাঠামো কতকটা বদলাইয়া গেল, ভারতীয়-আর্য প্রাচীন অবস্থা বা সংস্কৃত রূপ ছাড়িয়া মধ্য অবস্থায় বা প্রাকৃতে পরিণত হইল। ‘প্রাকৃত’ বা ‘প্রাকৃত ভাষ’ কথাটির আসল তাৎপর্য হইতেছে ‘প্রকৃতির’–র অর্থাৎ জনগণের কথ্য ও বোধ্য ভাষা। যেমন, শিষ্ট সমাজের ‘শুদ্ধ’ ভাষা সংস্কৃত’।”

সেই কারণে পণ্ডিতেরা বলেন যে, প্রাচীন ভারতীয় আর্যভাষা কালক্রমে দুটি শাখায় বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল — (১) জনপদবাসীদের ‘নিরুক্তি’ বা দেশীয় ভাষা; এবং (২) ‘ছান্দস্য’ বা সাহিত্যের ভাষা, যা বেদে, ব্রাহ্মণগুলিতে এবং উপনিষদে ধরা রয়েছে। এখন প্রশ্ন হল যে, সুদূর অতীতে জনসাধারণের মধ্যে প্রচলিত এই নিরুক্তিই কি প্রাকৃতভাষার আদিমতম রূপ? হয়ত সেটাই। কিন্তু একইসাথে একথা অস্বীকার করাও কঠিন যে, জনপদবাসীদের লোকায়ত ভাষাই কালক্রমে প্রাকৃতে পরিণত হয়ে গিয়েছিল।

প্রাচীনতম প্রাকৃত থেকেই পালি সাহিত্যের ভাষা, এবং সেটার উৎপত্তি ঘটেছিল। ছান্দস্যের ধারায় বা সাহিত্যের ভাষার ধারায় পালি গড়ে উঠেছিল, যে ধারাতে সংস্কৃত এবং সাহিত্যিক প্রাকৃতও পরিণতিলাভ করেছিল। সেই হিসাবে দেখলে একথা বলা যায় যে, প্রত্ন ভারতীয়-আর্যভাষার গঠনের ক্ষেত্রে মোটামুটি চারটে স্তর ছিল — বৈদিক, সংস্কৃত, পালি এবং সাহিত্যিক প্রাকৃত। পালিভাষা মধ্যস্তরের আর্যভাষার (Middle Indo- Aryan) অন্তর্গত। ঠিক কোন সময়ে এই ভাষার উৎপত্তি হয়েছিল — সেকথা সঠিকভাবে বলা না গেলেও অনুমান করা যায় যে, খৃষ্টপূর্ব ৬০০ থেকে ৮০০ অব্দের মধ্য কোন একটা সময়ে পালিভাষার উৎপত্তি ঘটেছিল। বৈদিক আর্যভাষার সঙ্গে সংস্কৃত ভাষা যে সম্বন্ধে আবদ্ধ রয়েছে, সাহিত্যিক প্রাকৃতের সঙ্গে পালির সেই একই ধরণের সম্বন্ধের সম্পর্ক রয়েছে। সন-তারিখের হিসাবে বৈদিক আর্য এবং সংস্কৃতের মাঝামাঝি সময়েই পালিভাষার স্থান। এই ভাষাটিতে বৈদিক আর্যভাষার কিছু কিছু বিশেষত্ব ধরা দিয়েছে বলেই একথা বলা হচ্ছে না, বৈদিক আর্যভাষা থেকে সংস্কৃত এবং সাহিত্যিক প্রাকৃতের ক্রমপরিণতির নানা স্তরের বহু তথ্য এই পালিভাষার মাধ্যমেই পাওয়া যায়। সেজন্যই প্রাচীন বা মধ্যভারতীয় আর্যভাষার চর্চার ক্ষেত্রে পালিভাষার স্থান এতটা গুরুত্বপূর্ণ। গবেষকদের মতে বাংলা, উড়িয়া, অসমীয়া, হিন্দী, মৈথিলী ইত্যাদি নব্য ভারতীয়-আর্যভাষার (Modern Indo- Aryan) সঙ্গে পালির ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধ রয়েছে। শুধু ভারতের সীমার মধ্যেই নয়, বৌদ্ধধর্ম এবং বৌদ্ধ দর্শনের প্রচারের প্রধানতম বাহন হিসাবে সিংহলী, বর্মী, শ্যামদেশীয় ভাষা প্রভৃতির ওপরেও পালিভাষার প্রভাব দেখতে পাওয়া যায়। এই প্রসঙ্গে অন্য যে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি মনে রাখবার দরকার রয়েছে, সেটা হল যে, নব্য ভারতীয়-আর্য ভাষাগুলির ওপরে পালির প্রভাব বৈদিক আর্য বা সংস্কৃতের মধ্যে দিয়ে আসেনি, সেটা সাহিত্যিক প্রাকৃত এবং প্রাকৃতের অপভ্রংশের মধ্যে দিয়ে এসেছিল। গবেষকদের এই ধারণার মূলেও সাহিত্যিক প্রাকৃতের সঙ্গে পালির ঘনিষ্ঠ যোগ রয়েছে।

অতীতে বৈদিক আর্যভাষার মাধ্যমে যে সমস্ত সাহিত্যকীর্তিকে গ্রন্থিত করা হয়েছিল, সেগুলো দেবদেবীর বন্দনামূলক গীতিসাহিত্য ছিল। সেই কারণেই বৈদিক আর্যভাষাকে দেবভাষা বলা হয়ে থাকে। সুতরাং সেই অর্থে পালিভাষাকে তন্তিভাষা বা তন্ত্রভাষা বলা যেতে পারে, কারণ — এই ভাষাতেই বৌদ্ধতন্ত্র প্রচারিত হয়েছিল। লোকশ্রুতি অনুসারে বুদ্ধদেব তাঁর ধর্মমতকে মাগধীভাষায় প্রচার করেছিলেন। হয়ত সেজন্যই প্রাচীন বৌদ্ধশাস্ত্রগুলি যে ভাষায় সংরক্ষিত করা হয়েছিল, সেটাকে মাগধী নিরুক্তি বলা হয়ে থাকে। কিন্তু পালির মাধ্যমে যে বৌদ্ধ শাস্ত্র এবং দর্শনের সঙ্গে মানুষের পরিচয় রয়েছে, সেই ভাষার সঙ্গে মাগধী নিরুক্তির — অর্থাৎ খৃষ্টীয় প্রথম থেকে পঞ্চম শতাব্দী পর্যন্ত, এই পাঁচশো বছর ধরে সংস্কৃত নাটকে সেযুগের নিম্নস্তরের মানুষের ভাষা হিসাবে যে মাগধী প্রাকৃত ব্যবহৃত হয়েছিল, — সেটার সঙ্গে পালির কোন মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। ধ্বনি, উচ্চারণ ও ভাষাতত্ত্বগত অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে পালি এবং সেই মাগধী প্রাকৃত — সম্পূর্ণভাবে আলাদা। সেজন্যই বহু ভারতীয় এবং ইউরোপীয় পণ্ডিতেরা বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে পালির উৎপত্তি সম্বন্ধে নিজেদের মতামত প্রকাশ করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ জানিয়েছিলেন যে, অতীতে পশ্চিম-ভারতের কোন একটি ভাষা থেকে সাহিত্যিক ভাষা হিসাবে পালির জন্ম হয়েছিল। আবার কারো কারো মতে, পূর্বভারতের কোন একটি কথ্য ভাষা থেকে পালির উৎপত্তি ঘটেছিল। আর্যাবর্ত বা মধ্য-ভারতের কোন একটি ভাষার থেকেই অতীতে পালির উদ্ভব ঘটেছিল — এরকম মতও কেউ কেউ প্রকাশ করেছিলেন। এখনও পর্যন্ত পালিভাষার উৎপত্তি সম্বন্ধে যে সমস্ত প্রধান প্রধান মত চালু রয়েছে, সেগুলিকে শ্রেণীবদ্ধ করলে নিম্নরূপ হয় —

(১) জার্মান পণ্ডিতদ্বয় — ‘Kuhn’ এবং ‘Westerguard’ — জানিয়েছিলেন যে, উজ্জয়িনী (অবন্তীর রাজধানী) অঞ্চলের ভাষা থেকে পালির জন্ম হয়েছিল। এই অনুমানের পিছনে তাঁর যুক্তি দিয়েছিলেন যে, পালি ভাষার সঙ্গে মহারাজ অশোকের গির্ণার শিলালিপির ভাষার মিল খুঁজে পাওয়া যায়। লোকশ্রুতি অনুসারে মহারাজ অশোকের পুত্র বা মতান্তরে জামাতা মহেন্দ্রর বৌদ্ধশাস্ত্র নিয়ে উজ্জয়িনী থেকে সিংহলে যাওয়ার কথা পাওয়া যায়। যদি উজ্জয়িনীর কথ্যভাষা থেকে পালির জন্ম হয়েছিল বলে স্বীকার করে নেওয়া হয়, তাহলে মহেন্দ্রর উজ্জয়িনী থেকে সিংহলে যাওয়াকেও ঐতিহাসিক দিক থেকে সমর্থন করতে হয়।

(২) উপরোক্ত লোকশ্রুতির অংশটুকু এবং সেটার অবশ্যম্ভাবী সিদ্ধান্তের সম্পর্কে কোন ধরণের মতামত প্রকাশ না করে ডঃ সুকুমার সেন অভিমত প্রকাশ করেছিলেন যে — “দক্ষিণ পশ্চিম ও প্রাচ্যমধ্যার (সম্ভবতঃ উজ্জয়িনী অঞ্চলে) মিশ্রণে গড়া পালি পুরাপুরি ধর্মসাহিত্যের ভাষা।” তিনি ভাষাতত্বের বিচারে প্রাচ্যমধ্যার অর্থাৎ দিল্লী অঞ্চলের প্রাকৃতের সঙ্গে পালির মিল দেখতে পেয়েছিলেন; যেমন — ‘র’–কারের ‘ল’–কারে পরিণত হওয়ার প্রবণতায়, বিসর্গযুক্ত অকারান্ত পদ ‘এ’–কারে পরিবর্তিত হওয়ায়। আবার দক্ষিণ-পশ্চিমার মত পালিতেও আত্মনেপদ দেখতে পাওয়া যায় বলে তিনি জানিয়েছিলেন।

(৩) জার্মান পণ্ডিত ‘Otto Franke’ বলেছিলেন যে, উজ্জয়িনীর কাছাকাছি অঞ্চলের কথ্য ভাষা থেকেই পালির উৎপত্তি হয়েছিল। তিনি তাঁর মতের সমর্থনে বলেছিলেন যে, সেই অঞ্চলের প্রাকৃত ভাষায় রচিত শিলালিপির সঙ্গে পালির খুব ঘনিষ্ঠ মিল রয়েছে।

(৪) ‘Sten Konow’–র মতে বিন্ধ্য অঞ্চলের ভাষা থেকেই পালির উৎপত্তি ঘটেছিল। তিনি জানিয়েছিলেন যে, অতীতে বিন্ধ্য অঞ্চলের কথিত ভাষা ছিল পৈশাচি প্রাকৃত। সেই পৈশাচি প্রাকৃতের সঙ্গে পালির মিল দেখতে পেয়েই তিনি নিজের সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলেন।

(৫) পণ্ডিত গ্রীয়ার্সন অভিমত প্রকাশ করেছিলেন যে, পালি আসলে একটি মিশ্রভাষা, এবং তক্ষশিলা অঞ্চলে সেটা বর্ধিত হয়েছিল। তাঁর মতকে সমর্থন করে জার্মান পণ্ডিত ‘Windiche’–ও জানিয়েছিলেন যে, মাগধীর ওপরে ভিত্তি করেই পালি পৈশাচি প্রাকৃতের সঙ্গে সম্বন্ধযুক্ত। তাঁদের দু’জনেরই মতে পালির উৎপত্তি কান্দাহার অঞ্চলে হয়েছিল।

(৬) ‘Oldenburg’ এবং ‘E. Muller’ মনে করতেন যে, পালি হচ্ছে কলিঙ্গ অঞ্চলের ভাষা। লোকশ্রুতি অনুযায়ী অশোকের পুত্র বা মতান্তরে জামাতা মহেন্দ্রর সিংহলে বৌদ্ধধর্মশাস্ত্র নিয়ে যাওয়ার কাহিনীটি তাঁরা বিশ্বাস করেননি। তাঁরা জানিয়েছিলেন যে, মহেন্দ্রর সিংহলে যাওয়ার অনেক আগেই সেখানে পালিভাষার এবং বৌদ্ধধর্মের প্রচার হয়ে গিয়েছিল। সেই প্রচারের সমস্ত কৃতিত্ব কলিঙ্গ অঞ্চলের বন্দর থেকে সমুদ্রগামী বাণিজ্যতরীর বণিকদের ছিল। তাঁরা বাণিজ্যসূত্রে বহির্ভারতের নানা দ্বীপে উপদ্বীপে যাওয়ার সময়ে বাণিজ্যপণ্যের সঙ্গে সঙ্গে ভারতীয় সংস্কৃতিরও প্রচার করেছিলেন। পালি যে কলিঙ্গ অঞ্চলের ভাষা, নিজেদের এই মতের সমর্থনে উক্ত জার্মান পণ্ডিতদ্বয় দেখিয়েছিলেন যে, কলিঙ্গ অঞ্চলের খণ্ডগিরি এবং উদয়গিরি পর্বতগুহায় প্রাপ্ত শিলালিপির ভাষার সঙ্গে পালিভাষার সাদৃশ্য রয়েছে।

(৭) আচার্য সুনীতিকুমার মত দিয়েছিলেন যে, ধ্বনিতত্ত্ব (phonology) এবং রূপতত্ত্বের (morphology) বিচারে পালিভাষা শৌরসেনী প্রাকৃতের সঙ্গেই বেশি ঘনিষ্ঠ। অতীতে মধ্যভারতের মথুরা অঞ্চলে শৌরসেনী প্রাকৃতের চলন ছিল। আচার্য সুনীতিকুমার মনে করেছিলেন যে, মধ্যভারতের শৌরসেনী প্রাকৃত এবং মাগধী প্রাকৃতের প্রভাবেই কালক্রমে পালিভাষার উৎপত্তি হয়েছিল।

উপরোক্ত অংশে কারা কারা পালিকে ভারতের — পশ্চিম অঞ্চলের ভাষা, পূর্ব অঞ্চলের ভাষা এবং মধ্যভারতীয় অঞ্চলের ভাষা বলে মনে করেছিলেন, সেটার একটা সংক্ষিপ্ত পরিচয় দেওয়া হল। তবে, কিছু কিছু পণ্ডিতেরা অন্যরকমের মত পোষণ করলেও ‘Geiger’, ‘Winternitz’, ‘Childers’, ‘Rhys Davids’, ‘Barua’ প্রমুখ পণ্ডিতেরা অভিমত প্রকাশ করেছিলেন যে, মাগধী থেকেই পালির জন্মসূত্র খুঁজতে হবে। এই মাগধী, তাঁদের মতে — প্রাকৃত বৈয়াকরণরা যেটাকে মাগধী প্রাকৃত বলেছিলেন বা যে মাগধী প্রাকৃত প্রাচীন সংস্কৃত নাটকে বা গীতিকাব্যে ব্যবহৃত হয়েছিল — সেই মাগধী প্রাকৃত নয়। সেই ভাষাটি আসলে অতীতের মগধ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত সমগ্র উত্তর ভারতের জনগণের সাধারণ জীবনে ব্যবহৃত — ‘lingua franca’ — ছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ের গবেষকরা উপরোক্ত পণ্ডিতদের মত এবং উপরে লিপিবদ্ধ মতগুলির কোনটিকেই সম্পূর্ণ সত্যি বলে মেনে নেননি; তবে উপরোক্ত সমস্ত মতগুলিই যে আংশিকভাবে সত্যি — সেবিষয়ে সন্দেহ করবার কোন কারণও নেই। উপরোক্ত সবাই ভাষাতত্ত্বের দিক থেকেই পালিভাষার জন্মসূত্র নির্ণয় করবার চেষ্টা করেছিলেন; কিন্তু কোন একটি ভাষার জন্মসূত্র নির্ণয় করতে গেলে শুধুমাত্র ভাষাতত্ত্বকেই প্রধান অবলম্বন করলে চলে না। ভাষা মানব জীবনের একটা অঙ্গ, সুতরাং তৎকালীন মানব জীবনের নানা দিককেও একইসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। সেইসাথে সমাজের কথা, ইতিহাসের কথা, ভূগোলের কথা এবং পারিপার্শ্বিকের কথাও বিবেচনা করতে হবে।

গৌতম বুদ্ধ কোশল রাজ্যের অধিবাসী ছিলেন, কিন্তু ধর্মপ্রচারসূত্রে তিনি সমগ্র উত্তর এবং মধ্য-ভারত পরিভ্রমণ করেছিলেন; এবং সেখানকার সাধারণ মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন। বিচিত্র ভারতের বিবিধ সমাজ, ভাষা, আচার-আচরণ সবকিছুর সঙ্গেই তিনি পরিচিত হয়েছিলেন। তাঁর জীবদ্দশাতেই — কপিলাবস্তু, কৌশান্বী, শ্রাবন্তী, কুশীনারা, রাজগৃহ, নালন্দা, অবন্তী — ইত্যাদি নানা বিখ্যাত জায়গায় বৌদ্ধধর্ম দর্শন ও শাস্ত্র আলোচনার জন্য বহু বৌদ্ধবিহার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল; বহু বৌদ্ধ শ্রমণ সেগুলিতে বাস করতেন, বৌদ্ধশাস্ত্র চর্চা করতেন, ছাত্ররা দূর দূরান্তর থেকে সেখানে শিক্ষা নিতে আসতেন। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সমবেত সেই শ্রমণরা এবং ছাত্ররা প্রথমে তাঁদের নিজেদের আঞ্চলিক ভাষাতেই কথাবার্তা বলতেন, তখন যাতায়াতের পথ সুগম ও নিরাপদ না হওয়ার জন্য অন্য অঞ্চলের কথ্য ভাষার সঙ্গে তাঁদের পরিচিত হওয়ার সুযোগ ছিল না। পরে যাতায়াতের কিছুটা সুবিধা হওয়ার ফলে এক বিহার থেকে অন্য বিহারে শ্রমণদের পারস্পরিক ভাব বিনিময় হওয়া সম্ভব হয়েছিল। তখন প্রতিটি বিহারে যে পাক্ষিক ধর্মালোচনা এবং বৌদ্ধ ধর্মশাস্ত্র আবৃত্তি করা হত — সেগুলিতে সেখানকার শ্রমণদের এবং তাঁদের ছাত্রদের যোগ দেওয়াটা বাধ্যতামূলক ছিল। তখনই সম্ভবতঃ বিভিন্ন প্রান্তবাসী শ্রমণদের ধর্ম-আলোচনার ও শিক্ষার সুবিধার জন্য একটা সর্বজনবোধ্য সাধারণ ভাষার প্রয়োজনীয়তা তাঁরা অনুভব করেছিলেন। বুদ্ধদেব তাঁর জীবদ্দশায় নিজ নিজ অঞ্চলের ভাষায় ধর্মালোচনার ব্যাপারে কোন আপত্তি করেননি। কিন্তু পরে গণতান্ত্রিক উপায়ে সুসংগঠিত বিহারগুলিতে ধর্মালোচনা এবং শিক্ষার মাধ্যম হিসাবে একটি সাধারণ ভাষার সৃষ্টি অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠেছিল। বুদ্ধদেবের দেহত্যাগের পরে প্রধান প্রধান বৌদ্ধবিহারগুলির ৫০০ জন শিষ্য যে বৌদ্ধসঙ্গীতিতে সমবেত হয়েছিলেন, সেখানে সুদীর্ঘ তিনমাস ধরে তাঁরা বৌদ্ধধর্মের উপদেশাবলী এবং দর্শনের সূত্রগুলিকে এক একটি অধ্যায়ে সংরক্ষিত করবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ইতিমধ্যে শ্রমণদের পরস্পরের মনোভাব ব্যক্ত করবার জন্য যে সাধারণ মিশ্র ভাষাটি শক্তিশালী হয়ে গড়ে উঠেছিল, সেই ভাষার দিকেই তখন সকলের নজর পড়েছিল, এবং সেই ভাষাতেই গৌতম বুদ্ধের উপদেশগুলি — ‘রক্ষা করা’, ‘পালন করবার’ — দিকে বুদ্ধশিষ্যদের দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়েছিল; এবং সেই মিশ্রভাষারই নাম রাখা হয়েছিল — পালি।

এদিক থেকে বিচার করলে সিদ্ধান্ত করা যেতে পারে যে, অতীতের বৌদ্ধ বিহারগুলিতেই পালিভাষার উৎপত্তি হয়েছিল। প্রথমে কথ্য ভাষা আসে, তারপরে আসে সাহিত্যের ভাষা। এই সূত্র অনুযায়ী একথা সিদ্ধান্ত করবার সঙ্গত কারণ রয়েছে যে, সেযুগে সমগ্র উত্তর ভারতে প্রচলিত কথ্যভাষা মাগধী প্রাকৃতের উপরে ভিত্তি করেই সাহিত্যিক ভাষা হিসাবে পালির উৎপত্তি ঘটেছিল। বুদ্ধদেব নাকি তাঁর উপদেশাবলী মাগধী প্রাকৃতের মাধ্যমেই প্রচার করেছিলেন বলে শোনা যায়। তাই বৌদ্ধ শ্রমণরাও মাগধী প্রাকৃতকে বর্জন না করে সেটাকেই মূল হিসাবে নিয়ে পালিভাষা নামের একটি মিশ্রভাষার সৃষ্টি করেছিলেন। মিশ্র, — কারণ, তাতে তৎকালীন ভারতে প্রচলিত সব প্রধান প্রধান ভাষারই শব্দ-সম্ভার দেখতে পাওয়া যায়। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের শ্রমণদের পারস্পরিক মেলামেশা ও ভাবের আদান-প্রদানই সেটার প্রধান কারণ ছিল। তাই পালি ঠিক প্রাচীন বা অর্ধ বা অশোকের শিলালিপিতে ব্যবহৃত মাগধী প্রাকৃত নয়, বরং ভারতের মধ্য অঞ্চলে প্রচলিত মাগধী, সংস্কৃত, শৌরসেনী, পৈশাচি প্রভৃতি সমস্ত কিছুর সংমিশ্রণ থেকে জাত একটা ‘hybrid’ বা সঙ্কর ভাষা ছিল বলা চলে। কোন এক জায়গায় একই উদ্দেশ্যে বিভিন্ন ভাষাভাষী অনেক মানুষ সমবেত হলে এরকম হওয়াটাই স্বাভাবিক ব্যাপার। উদাহরণস্বরূপ বলা চলে যে, সৈন্যবাহিনীতে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষ শিক্ষা নেওয়ার সময়ে সেখানে একটা — ‘standard mixed’ — ভাষায় সবাইকে শিক্ষা দেওয়া হয়। সেই ভাষা না খাঁটি হিন্দী, আবার না খাঁটি উর্দু। প্রাচীন ভারতের বৌদ্ধবিহারগুলিতে সমবেত শ্রমণদের ক্ষেত্রেও ঠিক সেই একই ব্যাপার ঘটেছিল।

মন্তব্য করুন

ব্লগ