সহকারী অধ্যাপক
০১ মার্চ, ২০২৪ ১০:১৩ পূর্বাহ্ণ
সহকারী অধ্যাপক
চাটমোহর শাহী মসজিদ, শীতলাই জমিদার বাড়ি ও সমাজ শাহী মসজিদ
ডক্টর মোহাম্মদ ইদ্রিস
পাবনার যে সব স্থাপত্য নিদর্শনের সন্ধান পাওয়া যায় সেগুলি প্রকৃতই বাংলার ইতিহাসের আকর উৎস হিসাবে বিবেচিত হয়। চাটমোহর থানা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯০৯ খ্রীষ্টাব্দে। অতীতে মির্জাপুর, মাধুরাপুর ও শাহাপুর ছিল এখানকার প্রসিদ্ধ ব্যবসা কেন্দ্র। কীর্তিরাজির এক অর্পূব নিদর্শন চাটমোহর ‘মাসুম খাঁর মসজিদ’ যা চাটমোহর শাহী মসজিদ নামে পরিচিত। এ জনপদের উল্লে¬খযোগ্য নিদর্শনাবলীর মধ্যে আরো রয়েছে শীতলাই জমিদার বাড়ি, সমাজ শাহী মসজিদ (৯৫৮ হি:) জগন্নাথ মন্দির, শাহ মোখলেসুর রহমান খোরাসানী (র:) এর সমাধি সাহিত্যিক প্রমথ চৌদুরীর বসত বাড়ি ইত্যাদী। মাসুম খাঁ কাবুলী ছিলেন সম্রাট আকবরের পাঁচ হাজারী মনসবদার। তিনি সম্রাটের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হন এবং পাবনা অঞ্চলে কিছু সময়ের জন্য একটি স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। চাটমোহর শাহী মসজিদের প্রাপ্ত শিলালিপি পাঠে জানা যায়, তাঁরই সময়ে মোহাম্মদ খাঁন কাকশালের পুত্র খান মোহাম্মদ এ ইমারতটি ১৫৮২ খ্রীষ্টাব্দে (৯৮৯ হি:) নির্মাণ করেছিলেন। আবার আইন-ই- আকবরী গ্রন্থসূত্রে জানা যায়, এ মসজিদটি মুঘল রাজত্বকালে ১৫৭০ খ্রীষ্টাব্দে মাসুম খাঁ নামক জনৈক কাবুলী সেনাধ্যক্ষ কর্তৃক নির্মিত হয়।
যাত্রা শুরু যেভাবে: ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবসের ছুটির দিনের এক আনন্দঘন মূহুর্তে আমরা পারিবারিকভাবে পাবনার চাটমোহর-ভাঙ্গুরা ও ফরিদপুরের দর্শনীয় স্থানসমুহ ভ্রমণের জন্য ফযরের নামায আদায় করে নাস্তা সেরে পাবনা শহর থেকে টেবুনিয়া হয়ে চাটমোহরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। পাবনা শহর থেকে দেওবত্তর-চাটমোহর রেল বাজার পার হয়ে আমরা সকাল আটটায় চাটমোহর শাহী মসজিদ প্রাঙ্গনে পৌঁছালাম। সারা দিন শীতলাই জমিদার বাড়ি, সমাজ শাহী মসজিদ, জগন্নাথ মন্দির, শাহ মোখলেসুর রহমান খোরাসানী (র:) এর সমাধি সাহিত্যিক প্রমথ চৌদুরীর বসত বাড়ি পরিদর্শন শেষে আমরা রাতে গন্তব্যে ফিরে এলাম।
চাটমোহর শাহী মসজিদ: চাটমোহর শাহী মসজিটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ইট দ্বারা নির্মিত তিন গম্বুজ বিশিষ্ট। এর দৈঘ্য ৫৯ ফুট ৬ ইঞ্চি এবং প্রস্থ ২৭ ফুট দেওয়ালের প্রশস্ততা ৬ ফুট এবং উচ্চতা ছিল ৪৫ ফুট। মসজিদটির সম্মুখভাগ তিনটি আয়তকার ফ্রেমের মধ্যে তিনটি খিলান বিশিষ্ট প্রবেশ পথে বিভক্ত। এ তিনটি প্রবেশ পথের খিলান পথটি দুই পার্শ্বের খিলান পথ থেকে অপেক্ষাকৃত উঁচু। তিনটি প্রবেশ পথের সাথে সঙ্গতি রেখে পশ্চিম দেয়ালে তিনটি মিহরাব রয়েছে। চারকোণে রয়েছে অষ্টকোণাকৃতির গম্বুজ। মসজিদটি সংস্কারের অভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হওয়া সত্বেও এর কেন্দ্রীয় মিহরাবের শীর্ষে ইট অলংকরণের চিহ্ন আজও দৃশ্যমান। মসজিদটির ভিতরে একখ- কালো পাথরের একপৃষ্ঠে ফারসী ভাষায় মসজিদ নির্মাণের ইতিহাস অংকিত রয়েছে। বর্তমানে পাথর খন্ডটি রাজশাহী বরেন্দ্র রিসার্চ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত রয়েছে। এখানে চাটমোহর শাহী মসজিদ পরিদর্শন শেষে আমরা সমাজ শাহী মসজিদ ও আশরাফ জিন্দানী (র:) এর সমাধির পথে রওয়ানা হলাম।
সমাজ শাহী মসজিদ: চাটমোহরের সমাজগ্রাম একটি ঐতিহাসিক প্রাচীন জনপদ। এক সময়ে আফগান ও মুঘলদের এ অঞ্চলে শাসন পরিচালনার কেন্দ্রস্থল ছিল। এখানে রয়েছে সমাজ শাহী মসজিদ আশরাফ জিন্দানী (র:) এর সমাধি। এক গম্বুজ বিশিষ্ট ক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ইট দ্বারা নানা রকম কারুকার্য খচিত এ মসজিদটির উচ্চতা প্রায় ২৩ ফুট, প্রস্থ ১৮ ফুট। একটি বিরাট দীঘির সন্নিকটে উচ্চ ভূমির উপর মসজিদটি নির্মিত। মসজিদের সম্মুখে দু’টি কালোবর্ণের স্তম্ভ রয়েছে। মসজিদের ভিতরে আল-কুরআনের আয়াত লিখিত আরও দুটি শিলালিপি পাওয়া গেছে। লিপি দুটি ১৯২৪ খ্রীষ্টাব্দে দিল¬ীর পাঠান সম্রাট শেরশাহ এর পুত্র শাহাজাদা সেলিম কর্তৃক নির্মিত হয়েছিল। মসজিদটিকে ঘিরে এলাকায় নানা কাহিনী ও কিংবদন্তী ছড়িয়ে আছে। বর্তমানে এ মসজিদটি প্রয়োজনীয় সংস্কারের অভাবে কালের অতল গহৃবরে বিলিন হতে চলেছে। পাবনা অঞ্চলে ইসলাম প্রচার ও প্রসারে শাহ আশরাফ জিন্দানী (র:) এর নাম স্মরণীয়। জানা যায় তাঁর আগমনের পর পাবনা চাটমোহর এলাকা মুসলিম লোকালয়ে পরিণত হয়।
সমাজে অবস্থিত সমাজ শাহী মসজিদের সম্মুখে দক্ষিণ-পূর্ব কোণে হজরত শাহ আশরাফ জিন্দানী (র:) এর সমাধি অবস্থিত। এ সমাধিগাত্রে একটি শিলালিপি সংস্থাপিত আছে। লিপিটি আরবী ভাষায় উৎকীর্ণ। জানা যায় সমাজ শাহী মসজিদ প্রতিষ্ঠার সমসাময়িক কালে অথাৎ ষোড়শ শতকের প্রথম দিকে হজরত আশরাফ জিন্দানী (র:) এ অঞ্চলে আগমন করেন। শাহ আশরাফ জিন্দানী (র:) এর সমাধির পাশে বিশাল বিস্তৃত একটি দিঘি রযেছে। জানা যায় তিনি জনসাধারণের সুবিধার জন্য দিঘিটি খনন করেন। শাহ আশরাফ জিন্দানী (র:) এর সমাধির পরিদর্শন শেষে আমরা পাবনা জেলার শীতলাই জমিদার বাড়ির পথে রওয়ানা হলাম।
শীতলাই রাজবাড়ী: শীতলাই জমিদার বাড়ি পাবনা জেলার চাটমোহর উপজেলার নিমাইচড়া ইউনিয়নের শীতলাই গ্রামে অবস্থিত। ইতিহাস সুত্রে জানা যায় এ রাজবাড়িটি জমিদার যোগেন্দ্রনাথ মৈত্রেয় উনিশ শতকের প্রথম দিকে নির্মাণ করেন। শীতলাই জমিদার ছিলেন শরৎনগর এলাকার জমিদার। পনের একর জায়গায় সুউচ্চ প্রাচীর দিয়ে ঘেরা বিশাল রাজবাড়িটি দোতলা এবং ত্রিশটি কক্ষ বিশিষ্ট। প্রাসাদটি ইন্দো-ইউরোপিয়ান উপনিবেশিক স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত। প্রাসাদের পাশেই রয়েছে বিশাল দিঘী এবং সিঁড়ি ঘাট। প্রাসাদটি এডরুক ঐষধ কোম্পানীর ল্যাবরেটরী হিসাবে ব্যবহার করা হচ্ছিল। প্রাসাদটির বর্তমান অবস্থা অবস্থা নাজুক। শীতলাই জমিদার বাড়ি পরিদর্শন শেষে আমরা পাবনা জেলার সর্ব উত্তরে অবস্থিত হান্ডিয়াল ইউনিয়নের পথে রওয়ানা হলাম।
হান্ডিয়াল জগন্নাথ মন্দির: ইতিহাস সুত্রে জানা যায় চাটমোহরের হান্ডিয়াল একটি প্রাচীন ও প্রসিদ্ধ জনপদ। এটি বর্তমানে পাবনা জেলার সর্ব উত্তরে অবস্থিত একটি ইউনিয়ন। চাটমোহরের হান্ডিয়ালে ছিল করতোয়া নদীর শাখা। ১৮৯৭ খ্রীষ্টাব্দে ভূমিকম্পে সব ওলট-পালট হয়ে যায় এখানে ছিল বিশাল বন্দর। মোগল সম্রাট আকবরের রাজত¦কালে এখানে একজন সুবেদারের অধীনে পাঁচ হাজার সেনা ও একজন কাজী থাকত। পরবর্তী সময়ে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর আমলে হন্ডিয়াল বাণিজ্য কেন্দ্র হিসাবে প্রসিদ্ধ ছিল। নদী তীরে উৎপন্ন হত রেশম। হান্ডিয়ালে রয়েছে প্রাচীন স্থাপত্য নিদর্শন জগন্নাথ মন্দির। জগন্নাথ মন্দির হান্ডিয়াল ইউনিয়ন পরিষদ থেকে থেকে সামান্য পুর্ব দিকে অবস্থিত। শিলালিপি অনুসারে জানা যায়, ভবানী প্রসাদ নামক জনৈক ব্যক্তি পনর শতকের মধ্যভাগে এটি নির্মাণ করেন। এ স্থাপত্য নিদর্শনটি ইটের উপর ইট গেঁথে নির্মিত। হিন্দু সম্প্রদায়ের অত্যন্ত তীর্থ স্থান হিসাবে এটি পরিচিত।
মোখলেসুর রহমান খোরাসানী (র:) এর সমাধি: হান্ডিয়ালে রয়েছে শাহ মোখলেসুর রহমান খোরাসানী (র:) (মৃ. ১৫২০ খ্রী: আ.মা.) এর সমাধি। পাবনা অঞ্চলে ইসলাম প্রচারে শাহ মোখলেসুর রহমান খোরাসানী (র:) এর অবদান উল্লে¬খযোগ্য। তিনি খ্রীষ্টীয় পঞ্চদশ শতাব্দীর প্রথম দিকে ইরানের খোরাসান থেকে পাবনা অঞ্চলে আগমন করেন। এ অঞ্চলের মানুষের কাছে তিনি বুড়া পীর নামেও পরিচিত। চাটমোহর উপজেলার হান্ডিয়াল বাজারের পশ্চিমে পাইকপাড়া মসজিদের পাশে শাহ মোখলেসূর রাহমান খোরাসানী (র:) এর সমাধি অবস্থিত। চাটমোহর উপজেলার হান্ডিয়াল বাজারের পশ্চিম দিকে পাইকপাড়া গ্রামে পাঠান আমলের একটি প্রাচীন মসজিদ বিদ্যমান। এক গম্বুজ বিশিষ্ট পাথরের পিলার সম্বলিত মসজিদটির গায়ে আরবী ভাষায় একটি শিলালিপি রয়েছে। সেনাপতি মানসিংহের অনুরোধে মুঘল সম্রাট আকবর মসজিদের নামে ১৫০ বিঘা জমি দান করেছিলেন। মসজিদের পাশেই রয়েছে পীরের মাজার। কথিত আছে, যে ১৯ জন আওলিয়া বাংলায় এসেছিলেন তাদের মধ্যে তিনিই ছিলেন বয়োজৈষ্ঠ্য। এজন্য তিনি বুড়াপীর নামে পরিচিত। বর্তমানে প্রতি বছর মাঘ মাসের ২৯ তারিখে এখানে উরস মাহফিল হয়ে থাকে। এখানে যে সকল স্থাপনা ও নিদর্শনাদি রয়েছে সেগুলো পরিদর্শন শেষে আমরা আমাদের পরবতী আকর্ষণ ভাঙ্গুরার পথে রওয়ানা হলাম।
বড়াল ব্রীজ ও ভাঙ্গুরা মসজিদ: চাটমোহর উপজেলার পূর্ব দিকে রয়েছে পাবনার বড়াল নদীর পাড়ে ভাঙ্গুরা উপজেলা। ১৯৮০ খ্রীষ্টাব্দে ভাঙ্গুরা উপজেলা গঠিত হয়। বড়াল ব্রীজ সংলগ্ন ভাঙ্গুরা এক সময় পাট উৎপাদন সমৃদ্ধ এলাকা হিসেবে পরিচিত ছিল। বড়াল নদীর শিং ও বাইম মাছ খুবই সুস্বাদু। তৎকালীন অবিভক্ত ভারতের সরকার আসাম, ত্রিপুরা, নাগপুর ও উত্তরবঙ্গের সাথে কলকাতার যোগাযোগ সহজতর করার লক্ষ্যে ব্রিটিশ সরকার বড়াল নদীর উপড় ব্রীজ নির্মাণ করে। প্রাচীন নিদর্শনাবলীর মধ্যে তিন গম্বুজ বিশিষ্ট ভাঙ্গুরা জামে মসজিদ অন্যতম। পাবনা জেলার ভাঙ্গুরা উপজেলা সদরে অবস্থিত ভাঙ্গুরা জামে মসজিদ। মসজিদটি আয়তাকার তিন গম্বুজবিশিষ্ট; এর দৈর্ঘ্য উত্তর দক্ষিণে ৫৪.৮৬ মি. (১২০ ফুট) এবং প্রস্থ পূর্ব-পশ্চিমে ৫৪.২৯ মি. (১১০ ফুট)। এ মসজিদের একমাত্র মেহরাব প্রস্তর নির্মিত এর উচ্চতা ১.৩৭ মি. (৪ ফুট ৬ ইঞ্চি) প্রস্থ ০.৬৬ মি. (২ ফুট ২ ইঞ্চি)। এ মসজিদে শিলালিপি নেই। স্থানীয় অধিবাসীদের কাছে জানা যায়, আনুমানিক ১৭৭৫ খ্রীষ্টাব্দে এ মসজিদ নির্মিত হয়। স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য অনুসারেও অষ্টাদশ শতকের শেষপাদে মসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছিল বলে প্রতীয়মান হয়। এখানে যে সকল স্থাপনা ও নিদর্শনাদি রয়েছে সেগুলো পরিদর্শন শেষে আমরা আমাদের সাথে নিয়ে যাওয়া রান্না করা খাবার উন্মুক্ত মাঠে একসাথে বসে খেলাম। এরপর ফরিদপুরের পথে আবার রওয়ানা হলাম।
যাবেন যেভাবে: পাবনা শহর থেকে চাটমোহর এর দূরুত্ব প্রায় ৩৫ কিলোমিমিটার। পাবনা কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল হতে বাস-মিনিবাস চাটমোহর ও ফরিদপুর উপজেলা শহরের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। পাবনা থেকে এক ঘন্টার মধ্যে এ উপজেলা শহর পৌঁছানো যায়। আবার পাবনা শহরের আলিয়া মাদরাসা মোড় হতে সি.এন.জি চালিত অটোরিকসায় করে মাত্র ত্রিশ থেকে চল্লিশ মিনিটের মধ্যে চাটমোহর পৌঁছানো যায়। রাত্রি যাপনের জন্য চাটমোহরে জেলা পরিষদের ডাক বাংলো রয়েছে।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, সাঁথিয়া মহিলা ডিগ্রি কলেজ, পাবনা।
৫৩
৯২ মন্তব্য