Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৩ মার্চ, ২০২৪ ১১:৫২ অপরাহ্ণ

চুনিবালা দেবী....... অজানা আশঙ্কা যেন গ্রাস করছে!

শট শেষ,খাটশুদ্ধু মাটিতে নামানো হয়েছে,দড়ির বাঁধন খুলে দেওয়া হয়েছে ৷ ওদিকে চুনিবালা দেবী আর নড়েন না৷ শুটিং স্পটে এ ওর মুখ চাওয়া চাওয়ি করছেন৷ 

সত্যজিৎ রায় নিজেও বেশ ভয় পেয়ে গেলেন,তাঁর বুকের ভিতরটা যেন ছ্যাঁৎ করে উঠল৷

তবে কী... চুনিবালা দেবী....... অজানা আশঙ্কা যেন গ্রাস করছে!

 


প্রবাদপ্রতিম চিত্র পরিচালক সত্যজিৎ রায় নিজে দৃঢ় ভাবে বিশ্বাস করতেন চুনিবালা দেবীর সন্ধান যদি তিনি না পেতেন তাহলে কোনওদিন তাঁর পক্ষে 'পথের পাঁচালী' সিনেমা করা সম্ভব হত না৷

" পঁচাত্তর বৎসরের বৃদ্ধা,গাল তোবড়াইয়া গিয়াছে,মাজা ঈষৎ ভাঙিয়া শরীর সামনের দিকে ঝুঁকিয়া পড়িয়াছে৷ দূরের জিনিস আগের মত ঠাওর হয় না",প্রথম দর্শনে চুনিবালা দেবীকে ঠিক এমন লেগেছিল পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের চোখে৷ তিনি চুনিবালা দেবীর খোঁজ পেয়েছিলেন রেবা দেবীর কাছে (পথের পাঁচালীর সেজোঠাকুরুণ)৷


চুনিবালা ,নিভাননী দেবীর মা,দুটো নির্বাক ছবিতে তাঁর কাজের অভিজ্ঞতা আছে এবং তারও আগে অর্থাৎ তারাসুন্দরী নগেন্দ্রবালার যুগে মঞ্চে অভিনয় করেছেন৷

'পথের পাঁচালী' ছবিতে চুনিবালার আশ্চর্য অভিনয়ে মুগ্ধ হয়েছিলেন ছবির পরিচালক সত্যজিৎ রায়৷ শিল্পী ও পরিচালকের প্রথম আলাপচারিতায় চুনিবালার কণ্ঠে 'ঘুম পাড়ানি মাসিপিসি'ছড়া শুনে সত্যজিৎ রায়ের তাঁর প্রতি মুগ্ধতা এক লহমায় বেশ বেড়ে গিয়েছিল সেকথা তিনি গোপন করেন নি৷ 

পরের প্রশ্নটি ছিল—এখান থেকে ভোর ছ'টায় রওনা হয়ে সেই পনের মাইল পথ মোটরে গিয়ে ফিরে আসতে পারবেন?

—খু-উ-ব ৷৷

গানের গলাও বেশ ভাল চুনিবালা দেবীর, সে গল্প অন্য পরিসরে নিশ্চয় আলোচনা করা যাবে৷

'পথের পাঁচালী'ছবির শুটিংয়ে চুনিবালা দেবীকে কেন্দ্র করে বেশ মজার কিন্তু সামান্য কিছু সময়ের জন্য হলেও সকলের কাছে শিহরিত হয়ে ওঠার মত একটি ঘটনা ঘটেছিল ইন্দিরের শবযাত্রার দৃশ্য ক্যামেরা বন্দির সময়৷

'পথের পাঁচালী'র চিত্রনাট্যে অবশ্য এটি ছিল না,কিন্তু পরিচালক সত্যজিৎ রায় মনে করেছিলেন ইন্দিরের মৃত্যু আরো মর্মস্পর্শী হওয়া উচিৎ সেইজন্য দৃশ্যটি তিনি যোগ করেছিলেন৷

 ট্যাক্সিতে করে চুনিবালা যখন এলেন তখনও তিনি জানেন না কোন দৃশ্যের জন্য তাঁকে আনা হয়েছে৷

সত্যজিৎ রায় বেশ সাহস সঞ্চার করে চুনিবালাকে বললেন- 'আজ আপনাকে খাটে চড়াবো'৷চুনিবালা কিছুমাত্র বিস্মিত বা বিচলিত না হয়ে বললেন: 'বেশ ত, এ অভিজ্ঞতা আর কজনের হয়? আমার আপত্তি নেই৷'

বাঁশের খাটে মাদুর বিছিয়ে ইন্দির ঠাকুরুণকে শুইয়ে রাজুর কাছ থেকে ভিক্ষে করে পাওয়া  চাদরখানা দিয়ে তাঁকে আষ্টেপৃষ্ঠে মুড়ে দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলা হলো৷ তারপর ক্যামেরার জন্য রিহার্সেল করে শবযাত্রা শুরু হল৷ শট শেষ,খাটশুদ্ধু মাটিতে নামানো হয়েছে,দড়ির বাঁধন খুলে দেওয়া হয়েছে ৷

ওইদিকে  চুনিবালা দেবী আর নড়েন না৷ শুটিং স্পটে এ ওর মুখ চাওয়া চাওয়ি করছেন৷

তবে কী!!

সত্যজিৎ রায় নিজেও বেশ ভয় পেয়ে গেলেন,তাঁর বুকের ভিতরটা যেন ছ্যাঁৎ করে উঠল৷

হঠাৎ পরিচালক শুনতে পেলেন চুনিবালা দেবী বলছেন 'শট হয়ে গেছে'?কই আমাকে ত কেউ বলেনি!আমি তাই মড়া হয়ে পড়ে আছি'৷ সবাই যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন৷

আশ্চর্য অভিনয় বোধহয় একেই বলে৷

 ছবি শেষ করতে তিন বছর সময় লেগেছিল। তবে সত্যজিৎ রায়ের উদ্যোগে ছবিটি তিনি নিজের বাড়িতে প্রজেক্টারের মাধ্যমে দেখে যেতে পেরেছিলেন কি অসাধারণ আর আশ্চর্য অভিনয় তিনি করে গিয়েছেন৷


মন্তব্য করুন