Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৮ এপ্রিল, ২০২৪ ০১:৪৭ পূর্বাহ্ণ

জেনে নিই ঢাকার মসলিন কাপড়ের কিছু ইতিহাস।

মসলিনের রকমফের: সূক্ষ্মতা, বুনন আর নকশার পার্থক্যে মসলিনের আলাদা আলাদা যে নাম-


মসলিন শব্দটি এসেছে 'মসুল' থেকে। ইরাকের এক বিখ্যাত ব্যবসাকেন্দ্র মসুল। মসুলেও অতি সূক্ষ্ম কাপড় প্রস্তুত হতো। 'মসুল' ও 'সূক্ষ কাপড়' এ দুয়ের যোগসূত্র মিলিয়ে ইংরেজরা অতিসূক্ষ্ম কাপড়ের নাম দেয় 'মসলিন'। বাংলার ইতিহাসে 'মসলিন' বলতে বোঝানো হয় তৎকালীন ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে উৎপাদিত অতি সূক্ষ্ম এক প্রকার কাপড়কে। 


মসলিন প্রস্তুত করা হত ঢাকা ও সোনারগাঁ অঞ্চলে। কথিত আছে, মসলিন এত সূক্ষ্ম ছিল যে ৫০মিটার দীর্ঘ মসলিনকে একটি দিয়াশলাই বাক্সে ভরে রাখা যেত। সেইসময়ে এক গজ ঢাকাই মসলিনের দাম ছিল ৫০ থেকে ৪০০ পাউণ্ড, যা আজকের মূল্যমানে বিশাল অঙ্কের। তখনকার সবচেয়ে ভাল সিল্কের চাইতেও এই মসলিন ছিল ২৬ গুণ বেশি দামী।  সূক্ষ্মতা, বুননশৈলী আর নকশার পার্থক্যে বিভিন্ন মসলিনের আলাদা আলাদা নাম হয়ে যায় তার কিছু বর্ণনা-


মলবুস খাস: 

'মলবুস খাস' মানেই খাস বস্ত্র বা আসল কাপড়। এ জাতীয় মসলিন সবচেয়ে সেরা আর এগুলো তৈরি হতো সম্রাটদের জন্য। আঠারো শতকের শেষদিকে মলবুস খাসের মতো আরেক প্রকারের উঁচুমানের মসলিন তৈরি হত, যার নাম 'মলমল খাস'। এগুলো লম্বায় ১০ গজ, প্রস্থে ১ গজ, আর ওজন হত ৬-৭ তোলা। একটা আংটির মধ্যে দিয়ে এ কাপড় নাড়াচাড়া করা যেত। এগুলো সাধারণত রপ্তানি করা হতো।


সরকার-ই-আলা:

এ মসলিনও মলবুস খাসের মতো উঁচুমানের ছিল। বাংলার নবাব বা সুবাদারদের জন্য তৈরি হতো এ মসলিন। সরকার-ই-আলা নামের জায়গা থেকে পাওয়া খাজনা দিয়ে এর দাম শোধ করা হত বলে এর এরকম নামকরণ। লম্বায় হত ১০গজ, চওড়ায় ১গজ আর ওজন হত প্রায় ১০তোলা।


ঝুনা:

ঝুনা শব্দটি এসেছে হিন্দি ঝিনা থেকে, যার অর্থ সূক্ষ। ঝুনা মসলিনও সূক্ষ্ম সুতা দিয়ে তৈরি হতো, তবে সুতার পরিমাণ থাকতো কম। এ জাতীয় মসলিন হালকা জালের মতো দেখতে। একেক টুকরা ঝুনা মসলিন লম্বায় ২০ গজ, প্রস্থে ১ গজ হলেও ওজন হতো মাত্র ২০ তোলা। এই মসলিন বিদেশে রপ্তানি করা হতো না, পাঠানো হতো মুঘল রাজদরবারে। সেখানে দরবারের বা হেরেমের মহিলারা গরমকালে এ মসলিনের তৈরি জামা গায়ে দিতেন।


আব-ই-রওয়ান:

আব-ই-রওয়ান ফার্সি শব্দ, অর্থ প্রবাহিত পানি। মসলিনের সূক্ষ্মতা বোঝাতে প্রবাহিত পানির মতো উপমা থেকে এর নাম 'আব-রওয়ান' হয়ে যায়। লম্বায় ২০ গজ, চওড়ায় ১ গজ ও ওজন হতো ২০ তোলা। জানা যায়, আলীবর্দী খা বাংলার সুবাদার থাকাকালীন তাঁর জন্য তৈরী এক টুকরো আব-ই-রওয়ান ঘাসের উপর শুকাতে দিলে একটি গরু ঘাস আর কাপড়ের পার্থক্য করতে না পেরে কাপড় খেয়ে ফেলে।


খাসসা:

খাসসা ফার্সি শব্দ। এই মসলিন ছিল মিহি আর সূক্ষ্ম, অবশ্য বুনন ছিল ঘন। ১৭ শতকে সোনারগাঁ বিখ্যাত ছিল খাসসার জন্য। ১৮-১৯ শতকে আবার জঙ্গলবাড়ি বিখ্যাত ছিল এ মসলিনের জন্য। তখন একে 'জঙ্গল খাসসা' বলা হতো। অবশ্য ইংরেজরা একে ডাকত 'কুষা' বলতো।


শবনম:

'শবনম' কথাটার অর্থ হলো ভোরের শিশির। ভোরে শবনম মসলিন শিশিরভেজা ঘাসে শুকোতে দেয়া হলে শবনম দেখাই যেত না, এতটাই মিহি আর সূক্ষ্ম ছিল এই মসলিন। ২০ গজ লম্বা আর ১ গজ প্রস্থের শবনমের ওজন হত ২০ থেকে ২২ তোলা।


নয়ন সুখ:

মসলিনের একমাত্র এই নামটিই বাংলায়। সাধারণত গলাবন্ধ রুমাল হিসেবে এর ব্যবহার হত। এ জাতীয় মসলিনও ২০ গজ লম্বা আর ১ গজ চওড়া হত।


বদন খাস:

এ জাতীয় মসলিনের নাম থেকে ধারণা করা হয় সম্ভবত শুধু জামা তৈরিতে এ মসলিন ব্যবহৃত হতো কারণ 'বদন' মানে শরীর। এর বুনন ঘন হত না। এগুলো ২৪ গজ লম্বা আর দেড় গজ চওড়া হতো, ওজন হতো ৩০ তোলা।


সার-বন্ধ:

ফার্সি শব্দ সর-বন্ধ মানে হল মাথা বাঁধা। প্রাচীন বাংলা উচ্চপদস্থ কর্মচারীরা মাথায় পাগড়ি বাঁধতেন, যাতে ব্যবহৃত হতো সার-বন্ধ। লম্বায় ২০-২৪ গজ আর চওড়ায় আধা থেকে এক গজ হতো; ওজন হতো ৩০ তোলা।


ডোরিয়া:

ডোরা কাটা মসলিন 'ডোরিয়া' বলে পরিচিত ছিল। লম্বায় ১০-১২ গজ আর চওড়ায় ১ গজ হতো। শিশুদের জামা তৈরি করে দেয়া হতো ডোরিয়া দিয়ে।


জামদানী:

জামদানি কার্পাস তুলা দিয়ে প্রস্তুত একধরনের পরিধেয় বস্ত্র। প্রাচীনকালের মিহি মসলিনের উত্তরাধিকারী হিসেবে জামদানি বাঙ্গালি নারীদের অতি পরিচিত। মসলিনে নকশা করে জামদানি তৈরি করা হয়। জামদানি বলতে মূলত শাড়িকেই বুঝায়। তবে জামদানি দিয়ে নকশি ওড়না, কুর্তা, পাগড়ি, রুমাল, পর্দাও তৈরি হতো। ১৭শতকে জামদানির নকশাওয়ালা শেরওয়ানির প্রচলন ছিল। তবে আগেকার যুগে জামদানী বলতে বুঝানো হতো নকশা করা মসলিনকে।


কামিস:

আরবিতে কামিস অর্থ পোশাক। কুর্তা তৈরির জন্য এ জাতীয় মসলিন ব্যবহার করা হতো। কুর্তা এত দীর্ঘ ছিল যে, তা পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত ঢেকে দিতো। এর জন্য দরকার হতো লম্বা ও সমান কাপড়ের, যাতে সুতার সংখ্যা ছিল ১,৪০০ এর মতো।


অন্যান্য মসলিন:

এছাড়াও অন্যান্য মসলিন ছিল- মলমল (সূক্ষ্মতম বস্ত্র), রঙ্গ (স্বচ্ছ ও জালিজাতীয় বস্ত্র), তরাদ্দাম, তনজেব (দেহের অলঙ্কার সদৃশ), আলাবালি (অতিমিহি), সরবুটি, চারকোনা (ছক কাটা বস্ত্র) ইত্যাদি।


ছবি: ফ্রান্সিস রেনাল্ডি অঙ্কিত বিখ্যাত চিত্রকর্ম 'লেডি ইন মসলিন' এর একটি ছবি, ঢাকা, ১৭৮৯।


তথ্যসূত্র: 

ক। বাংলাপিডিয়া, এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ। 

খ। ঢাকা: স্মৃতি-বিস্মৃতির নগরী, মুনতাসীর মামুন। 

গ। Cultural survey of Bangladesh series, Asiatic Society of Bangladesh.

মন্তব্য করুন