সহকারী শিক্ষক
০৪ মে, ২০২৪ ০২:৪৬ অপরাহ্ণ
৪ মে ১৭৯৯।। টিপু সুলতান এর মৃত্যু/হত্যা দিবস ।।। বিনম্র স্রদ্ধা।৷
।।৪ মে ১৭৯৯।। টিপু সুলতান এর মৃত্যু/হত্যা দিবস ।।। বিনম্র স্রদ্ধা।৷।। স্বরন করছি শের ই মহিশুর টিপু সুলতান আপনাকে।।। মহান আল্লাহ এর নিকট আপনার আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি।।৷। জন্মঃ টিপু সুলতান ১৭৫০ সালের ২০ নভেম্বর বর্তমান ব্যাঙ্গালোর থেকে ৩৩ কি.মি দূরে "দিভানাহালি " নামক স্থানে জন্ম গ্রহন করেন।
টিপু সুলতানের নামকরন সম্পর্কে একটি মিথ চালু আছে। বলা হয় তার বাবা হায়দার আলী টিপু নামের এক দরবেশের দোয়ায় সন্তান লাভ করেন। এজন্য তিনি ঐ দরবেশের নামেই ছেলের নাম টিপু সুলতান রাখেন।
মহীশূর (বর্তমান কর্ণাটক) রাজ্যের স্থানীয় ভাষা1(কানাড়ী ভাষা) অনুসারে টিপু অর্থ বাঘ। টিপু সুলতানকে অন্যান্য যে নামে ডাকা হতোঃ "টিপু সাহেব", "সুল0তান ফতেহ আলী খান সাহেব", "বাহাদুর খান টিপু সুলতান", "ফতেহ আলী খান টিপু সুলতান বাহাদুর" এছাড়া তার শৌর্য-বীর্যের জন্য খোদ ইংরেজরাই তাকে "শের-ই-মহীশূর" বা "মহীশূরের বাঘ" উপাধি দেয়।
গুনাবলীঃ
Alexander Beatson এর Fourth Mysore War : View of the Origin and Conduct of the War with Tippoo Sultaun অনুসারে টিপু সুলতানের উচ্চতা ছিল প্রায় ৫'-৮" (পাচ ফুট আট ইঞ্চি), তার খাট গর্দান(ঘাড়) এবং চওড়া কাধ ছিল, তার হাত-পা খাট আকৃতির ছিল, ঈগলের ঠোটের মত বাকা নাক, চোখের উপর চিকন ভ্রু, তার গায়ের রং ফর্সা ছিল, বড় এবং পূর্ণাকৃতির চোখ ছিল। সর্বপরি তার চেহারায় আত্মমর্যাদা এবং ব্যক্তিত্বের ছাপ স্পষ্ট ছিল।
ব্যাঘ্রপ্রীতিঃ
টিপু সুলতানের রাজ্যের প্রতীক ছিলো বাঘ। এই বাঘ ছিলো তাঁর অনুপ্রেরণার মতো। তাঁর রাজ্যের পতাকায় কানাড়ী ভাষায় লেখা ছিলো "বাঘই ঈশ্বর"।
"ভেড়া বা শিয়ালের মতো দু'শ বছর বাঁচার চেয়ে বাঘের মতো দু'দিন বেঁচে থাকাও ভালো"--টিপু সুলতান।
টিপু সুলতান পরবর্তী জীবনে তার নামের প্রমান রেখেছেন তার কাজের মাধ্যমে। তিনি ছিলেন বাঘের,এক্স মতো সাহসী, ক্ষিপ্র এবং তেজী। এছাড়া বাঘের প্রতি তার ছিল অনেক ভালোবাসা। ছোটবেলায় বাবা হায়দার আলীর কাছে বাঘের গল্প শোনার জন্য টিপু বায়না করতেন। এমনকি কিশোর বয়সে টিপু একটি বাঘ পুষতে শুরু করেন। বাবার মৃত্যুর পরে টিপু নতুন সিংহাসন তৈরী করেন, যদিও সিংহাসনে সিংহ নয় বরং বাঘের প্রতিকৃতি ছিল। কাঠের ফ্রেমের উপর সোনার পাত বসিয়ে মণিমুক্তা ও রত্ন খচিত একটি সিংহাসন তৈরী করেন। এই সিংহাসনের মাঝে একটি সোনার তৈরী বাঘের মুর্তি ছিল। সিংহাসনের উচ্চতা ছিল আটফুট এবং এতে উঠার জন্য দুইধারে রুপার তৈরী সিড়ি ছিল। সিংহাসনের রেলিংয়ে নিরেট সোনার তৈরী দশটি বাঘের মাথা ছিল। আর এই সিংহাসনে বাঘের শরীরের মতো ডোরাকাটা নকশা করা ছিল। তাই অনেকে একে ব্যাঘ্রাসনও বলে থাকেন।
তার সমস্ত পোষাক ছিলো হলুদ-কালো রঙের আর বাঘের শরীরের মতো ডোরাকাটা।
তার তলোয়ারে বাঘের গায়ের ডোরাকাটা নকশা এবং হাতলে বাঘের প্রতিকৃতি খোদাই করা ছিল।
তিনি হলুদ-কালো ডোরাকাটা নকশার রুমাল ব্যবহার করতেন।তার সৈন্যদের পোষাক এবং ব্যবহার্য তলোয়ার, বল্লম, বন্দুকগুলোর নল, কুদো, হ্যামারেও আঁকা থাকতো বিভিন্ন আকারের বাঘের প্রতিরূপ কিংবা মূর্তি। এমনকি তিনি তাঁর রাজ্যের প্রধান প্রধান সড়কের পাশে, বাড়ির মালিকদেরকে বাড়ির দেয়ালে বাঘের ছবি আঁকার নির্দেশ জারি করেছিলেন। তখনও তাঁর বাঘ পোষার বাতিক যায়নি এবং রাজবাড়িতে বেশ কয়েকটি পোষা বাঘ ছিলো। তার কয়েকটি আবার তাঁর ঘরের দরজার সামনে বাঁধা থাকতো।
টিপু সুলতান বাঘ নিয়ে একটি মিউজিক্যাল খেলনা বানিয়েছিলেন, যা তখন পৃথিবী জোড়া খ্যাতি পায়। এই খেলনাকে "টিপুর বাঘ " (Tipus Tiger) বলা হত।
টিপুর বাঘঃ
১৭৮১ সালে ব্রিটিশ সেনাপতি হেক্টর মুনরো ২য় মহীশূরের যুদ্ধে টিপু সুলতান ও তার বাবা হায়দার আলীকে এবং তাদের রাজ্যকে চরমভাবে বিপর্যস্ত করেন। এই যুদ্ধে টিপু বাহিনীর বহু সৈন্য নিহত হয়, মহীশূড়ের অপূরনীয় ক্ষয়ক্ষতি হয়।
এদিকে এই মুনরোরই একমাত্র ছেলে সুন্দরবনে বাঘ শিকার করতে গিয়ে বাঘের হাতে মারা যায়। এই ঘটনা শুনেই টিপু সুলতান এর মাথায় দারুন বুদ্ধি খেলে যায়। তিনি ফরাসী প্রকৌশলীদের মাধ্যমে একটি খেলনা নির্মান করেন। যা "টিপু'স টাইগার" নামে দুনিয়াজোড়া খ্যাতি পায়।
খেলনাতে একজন ইংরেজ সেনার উপর বাঘের আক্রমনের দৃশ্য দেখা যায়। দম দিয়ে ছেড়ে দিলে বাঘটি মাথা নাড়তো এবং ইংরেজটি দুহাত দিয়ে বাঘের মাথাকে সরিয়ে দেবার চেষ্টা করত। খেলনাতে অর্গান ব্যবহৃত হয়েছিল। যার ভেতর থেকে বাঘের গর্জন এবং ইংরেজের কান্নার শব্দ এবং ব্যকগ্রাউন্ডে টিপুর প্রিয় গজলের শব্দ ভেসে আসত।
ব্রিটিশদের ব্যাখ্যা অনুসারে, টিপু সুলতান একবার তার ফরাসি বন্ধুর সাথে সুন্দরবনে শিকারে যান, একটি বাঘের সামনে পড়েন এবং তার বন্দুক কাজ করছিল না। তখন তিনি একটি ছোট্ট ছোড়া দিয়েই বাঘের উপর ঝাপিয়ে পড়েন এবং বাঘটিকে হত্যা করেন।
যদিও টিপুস টাইগারে কেন ইংরেজ সেনা ব্যবহার করা হয়েছে, তার কোন সদুত্তর ব্রিটিশরা দিতে পারেননি।
এই খেলনাটি বর্তমানে লন্ডনের ভিক্টোরিয়া এ্যান্ড আলবার্ট মিউজিয়ামে সংরক্ষিত আছে।
পরিবারঃ
টিপু সুলতানের বাবা হায়দার আলী ছিলেন মহীশূরের সেনা কর্মকর্তা। হায়দার আলী এবং তার ২য় স্ত্রী ফাতিমা (ফকির-উন-নিসা) এর পুত্র টিপু সুলতান।
টিপু সুলতান এর চার স্ত্রী, ১৬ পুত্র এবং ৮ কন্যা ছিল। (কন্যাদের সঠিক সংখ্যা এবং নাম অজানা)।
টিপু সুলতানের পুত্রঃ
১। শাহজাদা হায়দার আলী সুলতান সাহেব (১৭৭১ - ৩০ জুলাই, ১৮১৫)
২। শাহজাদা আব্দুল খালিক সুলতান সাহেব (১৭৮২ - ১২ সেপ্টেম্বর, ১৮০৬)
৩। শাহজাদা মুহি-উদ-দীন সুলতান সাহেব (১৭৮২ - ৩০ সেপ্টেম্বর, ১৮১১)
৪। শাহজাদা মু'ইজ-উদ-দীন সুলতান সাহেব (১৭৮৩ - ৩০ মার্চ, ১৮১৮)
৫। শাহজাদা মি'রাজ-উদ-দীন সুলতান সাহেব (১৭৮৪ - ?)
৬। শাহজাদা মু'ইন-উদ-দীন সুলতান সাহেব (১৭৮৪ - ?)
৭। শাহজাদা মুহাম্মদ ইয়াসিন সুলতান সাহেব (১৭৮৪-১৫ মার্চ ১৮৪৯)
৮। শাহজাদা মুহাম্মদ সুবহান সুলতান সাহেব (১৭৮৫ - ২৭ সেপ্টেম্বর,
১৮৪৫)
৯। শাহজাদা মুহাম্মদ শুকরুল্লাহ সুলতান সাহেব (১৭৮৫ - ২৫ সেপ্টেম্বর, ১৮৩৭)
১০। শাহজাদা সারওয়ার-উদ-দীন সুলতান সাহেব (১৭৯০ - ১৮৩৩)
১১। শাহজাদা মুহাম্মদ নিজাম-উদ-দীন সুলতান সাহেব (১৭৯১ - ২০ অক্টোবর, ১৭৯১)
১২। শাহজাদা মুহাম্মদ জামাল-উদ-দীন সুলতান সাহেব (১৭৯৫ - ১৩ নভেম্বর, ১৮৪২)
১৩। শাহজাদা মুনির-উদ-দীন সুলতান সাহেব (১৭৯৫ - ১ ডিসেম্বর, ১৮৭৩)
১৪। মহামান্য শাহজাদা স্যার গুলাম মুহাম্মদ সুলতান সাহেব, কেসিএসআই (মার্চ, ১৭৯৫ - ১১ আগস্ট, ১৮৭২)
১৫। শাহজাদা গুলাম আহমদ সুলতান সাহেব ১৭৯৬ - ১১ এপ্রিল, ১৮২৪
১৬। শাহজাদা ______ সুলতান সাহেব (১৭৯৭ - ১৭৯৭)
টিপু সুলতানের মৃত্যুর পর তার পরিবারকে ব্রিটিশ শাসকেরা মহীশূর হতে কলকাতায় বিতারিত করে।
টিপু সুলতানের এক চাচার বংশধর "নূর এনায়েত খান " দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ Special Operations Executive Agent হিসেবে দায়িত্ব পালন কালে জার্মানির Dachau concentration camp এ জার্মানদের হাতে নিহত হন (১৯৪৪)।
সিংহাসনে আরোহনঃ
টিপুর কিশোর বয়সে তার বাবা হায়দার আলী মহীশূরের ক্ষমতা দখল করেন। হায়দার আলীর মৃত্যুর পর টিপু ৩২ বছর বয়সে (১৭৮২খ্রিঃ) সিংহাসনে বসেন এবং মহীশূরের শাসক হিসেবে নিজেকে নিয়োজিত করেন।
কুটনৈতিক সম্পর্কঃ
টিপু সুলতান মহীশূড়ের স্বাধন শাসক ছিলেন, তবে মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের প্রতি তার আনুগত্য ছিল। তবে হায়দ্রাবাদের নিজামের সাথে মনোমালিন্যের জের ধরে দিল্লির সাথে তার দূরত্ব সৃষ্টি হয়, এবং তিনি তৎকালীন মুসলিম শাসকদের সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার দিকে জোড় দেন।
টিপু সুলতান ওমান, পারস্য, অটোমান এবং ফ্রান্সে নতুন দূতাবাস খোলেন এবং কুটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেন। তিনি অটোমানের সুলতান প্রথম আব্দুল হামিদ এর কাছে ব্রিটিশদের পরাজিত করতে সামরিক সাহায্য চান, কিন্তু অটোমান সম্রাজ্য তখন অস্ট্রো-অটোমান যুদ্ধে ব্যস্ত এবং নতুন করে রাশিয়ার সঙ্গেও তখন যুদ্ধাবস্থার সম্মুখিন হয়। তাই অটোমানরা টিপু সুলতানকে কোন সাহায্য দিতে পারেনি।
টিপু সুলতান ফরাসি বনিকদের সাথে সখ্যতা গড়ে তোলেন এবং ফ্রান্সের নেপোলিয়ন এর সাথে ব্রিটিশবিরোধী বাহিনী গড়ার প্রস্তাব দেন। নেপোলিয়ন তখন ইজিপ্ট অভিযানে এবং তিনি কথা দেন ইজিপ্ট অভিযানের পর তার ১৫০০০ সেনা টিপু সুলতানের বাহিনীর সাথে মিলে ব্রিটিশদের উৎখাত করবে। যদিও শেষ পর্যন্ত সেটা সম্ভব হয়নি।
সেনা বাহিনীঃ
টিপু সুলতানের বন্দুক (ফরাসি প্রযুক্তির)
রকেটঃ
টিপু সুলতানের সু-প্রশিক্ষিত সেনা বাহিনী ছিল। তবে মহীশূড়ের রকেট সাইন্স এর জন্য এই সেনা বাহিনী অনেক এগিয়ে ছিল। টিপু সুলতানের বাবা হায়দার আলীর ১২০০ প্রশিক্ষিত রকেট সেনা ছিল, এরা গাণিতিক হিসাবের মাধ্যমে অত্যন্ত সুক্ষভাবে লক্ষ্যে আঘাত করতে পারত।
লর্ড কর্ণওয়ালিসের পরাজয় নিয়ে জেমস গিলরে এর পলিটিক্যাল কার্টুন
টিপু সিংহাসনে বসার পর এই রকেট বাহিনীকে আরও আধুনিক করে গড়ে তুলেন। তিনি রকেট ট্রুপস এর সংখ্যা ৫০০০+ এ উন্নীত করেন। তিনি রকেট লঞ্চারের টিউবে (থ্রাষ্টার) লোহা ব্যবহার করেন এবং রকেটের মাথায় ধারাল ধাতুর ফলক লাগিয়ে দেন। ফলে এই রকেট এর রেঞ্জ বেড়ে যায় এবং তা শত্রু বাহিনীর অনেক বেশী ক্ষতি করতে সক্ষম হয়।
ব্রিটিশদের সাথে চতুর্থ যুদ্ধে টিপুর কিছু রকেট ব্রিটিশরা কব্জা করতে সমর্থ হয়, এবং এই রকেটই পরবর্তীতে কনগ্রিভ রকেট আবিস্কারে ভুমিকা রাখে।
নৌবাহিনীঃ
১৭৮৬ সালে টিপু সুলতান ৭২ কামানের ২০ টি যুদ্ধ জাহাজ এবং ৬২ কামানের ২০টি রণতরী (frigates) দিয়ে তার নৌবাহীনিকে সুসজ্জিত করেন। ১৭৮৯ সালের ভেতরই টিপু সুলতানের প্রায় সকল জাহাজেই তামার পাটাতনে উন্নীত করা হয়। ১৭৯০ সালে তিনি কামালুদ্দিনকে তার "মীর বাহার" পদে নিযুক্ত করেন এবং জামালাবাদ এবং মাজিদাবাদে সুবিশাল ডকইয়ার্ড নির্মান করেন। কিছুদিন পরে টিপুর নৌবাহিনীতে ১১ জন কমান্ডার "মীর ইয়াম" (Mir Yam) এর দায়িত্ব গ্রহন করে। প্রত্যেক "মীর ইয়াম" ৩০ জন অ্যাডমিরালকে এবং প্রত্যেক অ্যাডমিরাল ২টি করে জাহাজকে পরিচালনা করতেন।
টিপু সুলতান ফরাসিদের সহায়তায় তার সেনাবাহিনীকে উচ্চতর প্রশিক্ষন দেন এবং আধুনিক প্রযুক্তি গ্রহন করেন। টিপু সুলতান তার সেনাবাহিনীকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সমন্বয়ে শক্তিশালী এবং অত্যন্ত কার্যকরী হিসেবে গড়ে তোলেন।
অত্যাচারঃ
টিপু সুলতান মুসলমান ধর্মাবলম্বী ছিলেন। তার প্রজাদের ভেতর হিন্দু ধর্মাবলম্বীই বেশি ছিল। তিনি ইসলাম প্রচারের জন্য জোর করে হিন্দুদের ধর্মান্তরিত করেন। তিনি ফার্সি এবং উর্দু ভাষা প্রনয়নে জোড় দেন। ইসলামী আদলে বিভিন্ন স্থানের পুনঃ নামকরন করেন।
১৭৮০ সালে টিপু সুলতান নিজেকে মহীশূড়ের বাদশাহ হিসেবে ঘোষনা করেন এবং মোঘল সম্রাটের মূদ্রা বাতিল করে নিজের নামে মূদ্রা প্রচলন করেন।
এইচ ডি শর্মার মতে, টিপু সুলতান ভারতকে ইসলামী সাম্রাজ্যে রুপান্তরের জন্য আফগান সম্রাট জামান শাহ এর সহায়তা চান এবং তাকে ভারত আক্রমনের আমন্ত্রন জানান।
ধর্মান্তরঃ
টিপু সুলতান হিন্দু এবং খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীদের জোর করে মুসলমান ধর্মে ধর্মান্তর করেন।
১৭৮৮ সালে কালিকট (বর্তমান ইসলামাবাদ) এর গভর্নর শের খানকে চিঠি দিয়ে হিন্দুদের মুসলমানে ধর্মান্তর করার নির্দেশ দেন।এবং সেই বছরের জুলাই মাসে ২০০ (+/-) ব্রাহ্মন কে জোর করে মুসলমান ধর্মে ধর্মান্তর করা হয় এবং গরুর মাংশ খাওয়ানো হয়।
১৭৯০ সালের ১৯ জানুয়ারি বেকাল (Bekal) এর গভর্নর "বুদরুজ জুমান খান" কে লেখা তার চিঠিতে তার মালাবার বিজয়ের এবং ৪ লক্ষ হিন্দুকে মুসলিম ধর্মে ধর্মান্তর করার সংবাদ দেন।
গির্জা ধ্বংসঃ
টিপু সুলতান ২৭টি ক্যাথলিক চার্চ ধ্বংস করার নির্দেশ দেন। এর ভেতর উল্লেখযোগ্য হচ্ছেঃ
ম্যাঙ্গালোরের Church of Nossa Senhora de Rosario Milagres, Fr Miranda's Seminary at Monte Mariano, ওমজুড় এর Church of Jesu Marie Jose, বোলার এর Chapel, উল্লাল এর Church of Merces, মুলকি'র Imaculata Conceiciao, পেরার এর San Jose, কিরেম এর Nossa Senhora dos Remedios, কর্কাল এর Sao Lawrence, বার্কুর Rosario, বাইর্নুর এর Immaculata Conceciao, হষ্পেট এর The Church of Holy Cross
.
পুনঃ নামকরনঃ
টিপু সুলতান ইসলামী আদলে রাজ্যগুলোর পুনঃ নামকরন করেন।
যেমনঃ দিভানহলি থেকে ইউসুফাবাদ, মহীশূর থেকে নাসারবাদ, চিত্রদূর্গা থেকে ফারুখিয়া হিসার, গট্টি থেকে ফয়েজ হিসার, ম্যাঙ্গালোর থেকে জালালাবাদ, কন্নড় থেকে কাশানাবাদ, বেপুর (ভৈপুরা) থেকে সুলতানপত্তম/ফারুকি, ধরওয়াদ/ধার্বাদ থেকে কার্শেদ সওয়ার, রত্নাগিরি থেকে মুস্তফাবাদ, ডিন্দিগুল থেকে খালিকাবাদ, এবং কালিকট থেকে ইসলামাবাদ।
ভাষা প্রচলনঃ
টিপু সুলতান তার রাজত্বে শিক্ষা ও সরকারি-ব্যবসায়িক কাজকর্মের জন্য ফার্সি এবং উর্দূ ভাষার প্রচলন করেন। যার ফলে এখনও দক্ষিন ভারতের কেরালা, তামিলনাড়ু এবং কর্ণাটকের মুসলমানেরা উর্দূ ভাষার চর্চা করে।
বিতর্কঃ
অনেক ইতিহাসবিদদের মতে টিপু সুলতান মোটেই স্বেরাচারী বা অত্যাচারী ছিলেন না। মুহিবুল হাসান, প্রফেসর শেখ আলি এর মত ইতিহাসবিদরা মনে করেন টিপু সুলতান হিন্দুদের এবং অন্য ধর্মাবলম্বীদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। ১৭৯১ সালে মারাঠার রঘুনাথ রাও পটবর্ধণ এর ঘোর সওয়ারেরা কন্নড় এর মন্দির গুলো ধ্বংস করে এবং অনেক পুরোহিতকে হত্যা ও আহত করে। তখন টিপু সুলতান মন্দিরসমূহ পুণঃ নির্মান এর জন্য যাবতীয় সহায়তা দেন এবং পুরোহিতদের ভরনপোষনের দায়িত্ব নেন।
তিনি ফরাসিদের সাথে বন্ধুত্বের নিদর্শন স্বরুপ বেশ কিছু গির্জাও নির্মান করেন।
হিন্দুদের কর্মসংস্থানঃ
বেশ কিছু ইতিহাসবিদরা মনে করেন টিপু সুলতান হিন্দুদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। তিনি তার প্রশাসনেও হিন্দু কর্মকর্তা নিয়োগ করেছিলেন।
যেমনঃ হিসাবরক্ষক ছিলেন কৃষ্ণা রাও, ডাক এবং নিরাপত্তা মন্ত্রী স্বামী আইয়েঙ্গার , "মীর আসাফ" ছিলেন পূর্ণায়া, মোঘল সাম্রাজ্যে সুজন রায় এবং মুলচান্দ ছিলেন তার প্রধান প্রতিনিধি এবং তার পেশকার ছিলেন সুবা রাও।
১৭৯৩ সালে টিপু সুলতানের আত্নসমর্পণ, দুই পুত্রকে গ্রহন করছেন লর্ড কর্ণওয়ালিস
চতুর্থ অ্যাংলো-মহীশূর যুদ্ধ ছিল 1798-99 সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এবং হায়দ্রাবাদ ডেকানের বিরুদ্ধে মহীশূর রাজ্যের মধ্যে দক্ষিণ ভারতে একটি সংঘাত।
এটি ছিল চারটি অ্যাংলো-মহীশূর যুদ্ধের চূড়ান্ত সংঘাত । ব্রিটিশরা মহীশূর রাজধানী দখল করে। শাসক টিপু সুলতান যুদ্ধে নিহত হন। ব্রিটেন মহীশূরের পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল, ওয়াদিয়ার রাজবংশকে মহীশূর সিংহাসনে পুনরুদ্ধার করে (একজন ব্রিটিশ কমিশনার তাকে সমস্ত বিষয়ে পরামর্শ দেওয়ার জন্য)। টিপু সুলতানের তরুণ উত্তরাধিকারী ফতেহ আলীকে নির্বাসনে পাঠানো হয়। মহীশূর রাজ্য বর্তমান কেরালা - কর্ণাটকের কিছু অংশ জুড়ে ব্রিটিশ ভারতের সাথে একটি সহযোগী জোটে একটি রাজকীয় রাজ্যে পরিণত হয় এবং কোয়েম্বাটোর , দক্ষিণ কন্নড় এবং উত্তর কন্নড় ব্রিটিশদের হাতে তুলে দেয়।
1798 সালে উসমানীয় মিশরে নেপোলিয়ন বোনাপার্টের অবতরণ ভারতে ব্রিটিশ সম্পত্তির দখলকে আরও এগিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে ছিল , এবং মহীশূরের শাসক টিপু সুলতান ফ্রান্সকে মিত্র হিসাবে চাওয়ায় মহীশূর রাজ্য সেই পরবর্তী পদক্ষেপের একটি চাবিকাঠি ছিল। এবং নেপোলিয়নের কাছে তার চিঠির ফলে নিম্নলিখিত উত্তর ছিল, "আপনাকে ইতিমধ্যেই লোহিত সাগরের সীমানায় আমার আগমনের খবর দেওয়া হয়েছে, একটি অগণিত এবং অজেয় সেনাবাহিনী নিয়ে, আপনাকে ইংল্যান্ডের লোহার জোয়াল থেকে মুক্তি ও মুক্তি দেওয়ার আকাঙ্ক্ষায় পরিপূর্ণ। " উপরন্তু, জেনারেল ম্যালার্টিক , মরিশাসের ফরাসি গভর্নর , টিপুকে সহায়তা করার জন্য স্বেচ্ছাসেবকদের চেয়ে ম্যালার্টিক ঘোষণা জারি করেছিলেন। হোরাটিও নেলসন নীল নদের যুদ্ধের পর নেপোলিয়নের সাহায্যের যে কোনো সম্ভাবনার অবসান ঘটান । যাইহোক, লর্ড ওয়েলেসলি টিপু সুলতান এবং ফ্রান্সের মধ্যে কোনো মৈত্রী ঠেকাতে ইতিমধ্যেই একটি প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছিলেন।
আক্রমণ এবং ব্রিটিশ বিজয
তিনটি সৈন্য, একটি বোম্বে থেকে এবং দুটি ব্রিটিশ (যার মধ্যে একটি ডিভিশন ছিল যা কর্নেল আর্থার ওয়েলেসলি , ওয়েলিংটনের ভবিষ্যত ১ম ডিউক দ্বারা পরিচালিত হয়েছিল ), 1799 সালে মহীশুরে যাত্রা করে এবং টিপুর সাথে কিছু ব্যস্ততার পরে রাজধানী শ্রীরঙ্গপত্তনম অবরোধ করে। 8 মার্চ, একটি অগ্রগামী বাহিনী সীদাসীরের যুদ্ধে টিপুর একটি অগ্রিম রোধ করতে সক্ষম হয় ।
টিপু সুলতানের একটি উল্লেখযোগ্য সামরিক অগ্রগতি ছিল সেনাবাহিনীতে লোহার রকেট ব্রিগেড দিয়ে ব্যাপক আক্রমণের ব্যবহার । তৃতীয় এবং চতুর্থ মহীশূর যুদ্ধের সময় ব্রিটিশদের উপর মাইসোরীয় রকেটের প্রভাব ছিল যথেষ্ট চিত্তাকর্ষক যা উইলিয়াম কংগ্রেভকে নেপোলিয়নিক যুদ্ধের জন্য কংগ্রিভ রকেট তৈরি করতে অনুপ্রাণিত করেছিল ।
যুদ্ধের সময় বিভিন্ন সময়ে রকেট ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে একজন কর্নেল আর্থার ওয়েলেসলি জড়িত । সুলতানপেট টোপের যুদ্ধে , প্রথম দিনে ওয়েলেসলির আক্রমণ টিপুর দেওয়ান, পূর্ণাইয়া দ্বারা প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল । ফরেস্টের উদ্ধৃতি,
এই মুহুর্তে (সুলতানপেট গ্রামের কাছে, চিত্র 5) সেখানে একটি বড় টপ বা গ্রোভ ছিল, যা টিপুর রকেটম্যানদের আশ্রয় দিয়েছিল এবং শ্রীরঙ্গপট্টনা দ্বীপের কাছাকাছি অবরোধ করার আগে স্পষ্টতই পরিষ্কার করা হয়েছিল। এই অপারেশনের জন্য নির্বাচিত কমান্ডার ছিলেন কর্নেল ওয়েলেসলি, কিন্তু 1799 সালের 5 এপ্রিল অন্ধকারের পরে শীর্ষের দিকে অগ্রসর হওয়ার সময়, তাকে রকেট এবং মাস্কেট-ফায়ার দ্বারা আক্রমণ করা হয়েছিল, তিনি তার পথ হারিয়ে ফেলেছিলেন এবং বিটসন বিনয়ের সাথে এটিকে স্থগিত করতে হয়েছিল। আক্রমণ" যতক্ষণ না আরও অনুকূল সুযোগ দেওয়া উচিত।
পরের দিন, ওয়েলেসলি একটি বৃহত্তর বাহিনী নিয়ে একটি নতুন আক্রমণ শুরু করেন এবং একজন মানুষকে না হারিয়ে পুরো অবস্থান গ্রহণ করেন। এপ্রিল 1799-এ, মূল যুদ্ধের বারো দিন আগে, রকেটেররা ব্রিটিশ ছাউনির পিছনের দিকে তাদের পথ ধরে কাজ করে, তারপর 6,000 দ্বারা আক্রমণ শুরুর সংকেত দিতে "একই মুহূর্তে প্রচুর সংখ্যক রকেট নিক্ষেপ করে"। ভারতীয় পদাতিক বাহিনী এবং ফরাসিদের একটি কর্পস, সবগুলোই মীর গোলাম হুসেন এবং মহম্মদ হুলেন মীর মিরান দ্বারা পরিচালিত। রকেটগুলোর রেঞ্জ ছিল প্রায় এক হাজার গজ। কেউ কেউ খোলের মতো বাতাসে ফেটে পড়ে। অন্যরা, যাদেরকে গ্রাউন্ড রকেট বলা হয়, তারা আবার মাটিতে আঘাত করার সাথে সাথে উঠবে এবং তাদের শক্তি ব্যয় না হওয়া পর্যন্ত একটি সর্প গতিতে আবদ্ধ থাকবে। একজন ব্রিটিশ পর্যবেক্ষকের মতে, বেলি নামে একজন তরুণ ইংরেজ অফিসার: "আমরা রকেটের ছেলেদের সাথে এতটাই বিচলিত ছিলাম যে ধ্বংসাত্মক ক্ষেপণাস্ত্র থেকে বিপদ ছাড়া কোনো নড়াচড়া ছিল না ..."। সে অবিরত রেখেছিল:
20,000 শত্রুর রকেট এবং মাস্কেটরি অবিরাম ছিল। কোন শিলাবৃষ্টি ঘন হতে পারে না. নীল আলোর প্রতিটি আলোকসজ্জার সাথে রকেটের ঝরনা ছিল, যার মধ্যে কিছু কলামের মাথায় প্রবেশ করেছিল, পিছনের দিকে চলে গিয়েছিল, যার ফলে মৃত্যু, ক্ষত এবং বিশ বা ত্রিশ ফুট লম্বা বাঁশ থেকে ভয়ঙ্কর ক্ষত সৃষ্টি হয়েছিল যা অবিচ্ছিন্নভাবে সংযুক্ত থাকে। তাদেরকে.
1799 সালের 2 মে সেরিঙ্গাপটমে নির্ণায়ক ব্রিটিশ আক্রমণের সময় , মারাঠা এবং নিজামের সহায়তায়, একটি ব্রিটিশ গুলি টিপু সুলতানের দুর্গের মধ্যে রকেটের একটি ম্যাগাজিনে আঘাত করেছিল, যার ফলে এটি বিস্ফোরিত হয় এবং কালো ধোঁয়ার বিশাল মেঘ ছড়িয়ে পড়ে। রণাঙ্গন থেকে আলো উঠছে। 4 মে বিকেলে, যখন বেয়ার্ডের নেতৃত্বে দুর্গে চূড়ান্ত আক্রমণ করা হয়, তখন তিনি "ফুরিয়াস মাস্কেট এবং রকেট ফায়ার" এর মুখোমুখি হন, কিন্তু এটি খুব একটা সাহায্য করেনি; প্রায় এক ঘন্টার মধ্যে দুর্গ দখল করা হয়; সম্ভবত আরও এক ঘন্টার মধ্যে টিপুকে গুলি করা হয়েছিল (তার মৃত্যুর সঠিক সময় জানা যায়নি), এবং যুদ্ধ কার্যকরভাবে শেষ হয়েছিল। ব্রিটিশরা যখন বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে ছিল তখন ফরাসী মিত্ররা টিপুকে পালিয়ে যেতে বলেছিল, কিন্তু টিপু প্রত্যাখ্যান করেছিলেন এবং বিখ্যাতভাবে বলেছিলেন "ভেড়ার মতো হাজার বছরের চেয়ে বাঘের মতো একদিন বেঁচে থাকা ভাল"। টিপু সুলতানের মৃত্যু ব্রিটিশ জেনারেল জর্জ হ্যারিসকে "এখন ভারত আমাদের" বলে চিৎকার করতে পরিচালিত করছে।
১৭৯৯ সালের ৪ই মে ৪৮ বছর বয়সে টিপু সুলতান ব্রিটিশদের হাতে নিহত হন। মুলতঃ টিপু সুলতানের এক সেনাপতি "মীর সাদিক" বিশ্বাসঘাতকতা করেন, যার ফলে টিপু সুলতান নিহত হন।ব
৫
৫ মন্তব্য