Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৬ মে, ২০২৪ ০৭:২৩ অপরাহ্ণ

জাপান-বাংলাদেশ : অভিজ্ঞতার ভাগাভাগি

জাপান আগের শতাব্দী থেকে সংস্কার শুরু করে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে। ১৮৬৮ সালে জাপানে মেইজি সম্রাটের আমলে ব্যাপক সংস্কার শুরু হয়। ১৮৬৮ সালে মেইজি যুগ। প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর জাপান সরকার চিন্তা করে বাইরেও দুনিয়া আছে। এর আগে জাপান মনে করত তারাই সব। বাইরের দুনিয়ার কোনো খোঁজখবর রাখার প্রয়োজন নেই। কিন্তু নতুন সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর নিজেদের চিন্তার জগতে এক ধরনের পরিবর্তন হয়। তারা ভাবতে থাকে, টেকসই উন্নয়ন অর্জন করতে হলে বাইরের দুনিয়ার সাথে যোগাযোগ বাড়াতে হবে। তারা ভাবতে থাকল- বাইরের দুনিয়ার সাথে যোগাযোগ এবং তাদের উন্নয়ন অভিজ্ঞতা জানতে না পারলে টেকসই উন্নয়ন ও স্বয়ম্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলা সত্যিই কঠিন। দেশের বিশ^বিদ্যালয়ের সবচেয়ে মেধাবী শিক্ষার্থীদের সরকারি বৃত্তি দিয়ে জাপান বিভিন্ন দেশে শিক্ষা সফরে পাঠায়। তাদের নির্দেশনা দেয়া হলো- তোমাদের যাবতীয় ব্যয় রাষ্ট্র নির্বাহ করবে। তোমরা শুধু সংশ্লিষ্ট দেশের যত ভালো গুণ এবং মন্দ গুণ আছে তা লিস্ট করে আনবে, জেনে আসবে তাদের সাফল্যের কাহিনী আর বিফল হওয়ার কারণগুলো।

নির্দেশ মোতাবেক ছাত্ররা পাঁচ বছর সংশ্লিষ্ট দেশে অবস্থান করে সে দেশের ইতিহাস, মানব চরিত্র, সভ্যতা-সংস্কৃতি, রাজনৈতিক অর্থনীতি এবং তাদের ভালো-মন্দ গুণগুলো তালিকা করে নিয়ে আসে। পরবর্তী পাঁচ বছর ধরে এসব তথ্য তারা পৃথক পৃথকভাবে চিহ্নিত করে একটি সমন্বিত তালিকা প্রস্তুত করে। এরপর দুই বছরের জন্য একটি স্বতন্ত্র কমিশন গঠন করে কমিশনকে দায়িত্ব দেয়া হলো জাপানের শিল্পায়ন তথা বিষয়-ভিত্তিক উন্নয়নে প্রযোজ্য নীতিমালার, গাইড লাইন ইত্যাদি প্রস্তুত করার। এ ছাড়াও ধর্মনীতি, আইননীতি এবং অন্যান্য খাতের জন্য কী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে ভালো হবে তার আলাদা আলাদা ব্যবস্থাপত্র বা সুপারিশমালা তৈরি করতে নির্দেশনা দেয়া হয়। অর্থাৎ বাইরের দেশের অভিজ্ঞতা নিয়ে তারা তাদের দেশের জন্য বিভিন্ন ক্ষেত্রে আইন বা নীতিমালা প্রণয়ন উদ্যোগ গ্রহণ করে। কি করা যাবে, কি করা যাবে না- এসব বিষয় নিয়ে পৃথক গাইডবই প্রস্তুত করা হয়।

১৮৯০ সালের মধ্যে জাপান সরকার নিজেদের জন্য প্রযোজ্য ও অনুসরণীয় একটি সুন্দর দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করতে সক্ষম হয়। এ দীক্ষিত দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে তারা নতুন পথচলা শুরু করে। নতুন দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে তাদের শিল্পায়ন, কৃষি, বাণিজ্য তথা অর্থনীতির দিকগুলো পরিকল্পিতভাবে সাজিয়ে তোলে। জাপান নতুন এক উদ্দীপনা নিয়ে জাতীয় উন্নয়ন কার্যক্রম ঢেলে সাজায়। এরপর শুরু হয় পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ। তারা খুব অল্প দিনের মধ্যে চমৎকার অগ্রগতি অর্জন করতে সক্ষম হয়। ওই সময় জাপানের জিডিপি প্রবৃদ্ধি উচ্চ মাত্রায় চলে যায়। শিক্ষার হার এবং মান বৃদ্ধি পায়। দারিদ্র্যবিমোচনে অগ্রগতি হয়। জাপানের পণ্য ও সেবা রফতানি বেড়ে যায়। বাইরের দেশগুলোর সাথে জাপানের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিস্ময়কর উন্নতি হয়। অর্থাৎ এমন কোনো ক্ষেত্র ছিল না যেখানে জাপান পিছিয়ে থাকল। বাইরের দেশগুলোও জাপানের সাথে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নে আগ্রহ প্রকাশ করতে থাকে। বিদেশ থেকে প্রচুর বিনিয়োগ জাপানে আসতে শুরু করে।

সব কিছু ভালোভাবে চলছিল। কিন্তু একসময় জাপানে সামরিকীকরণ হতে শুরু করে। সেনাবাহিনী প্রশাসনে কিংবা ক্ষমতার সম্মুুখ সারিতে চলে আসে। জাপানিরা মূলত সামুরাই জাতি বিধায় সবসময় এক ধরনের যুদ্ধংদেহি মনোভাব পোষণ করতে শুরু করে। এক সময় দেখা গেল, রাজা নিরীহ রাজার মতো আছে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক ক্ষমতা সেনাবাহিনীর হাতে চলে গেছে। একপর্যায়ে সেনাবাহিনীর মধ্যে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হতে থাকে। দুই-তিন বছর পরপর জাপানে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটতে থাকল। ফলে জাপানের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়ে যায়। বেসামরিক মন্ত্রীদের সামরিক বাহিনী নানাভাবে পর্যুদস্ত করতে থাকে। সেনাবাহিনী ঘিরে গড়ে ওঠা উগ্র জাতীয়তাবাদ জাপানের উন্নয়ন-অগ্রযাত্রা ব্যাহত করে।

১৯১৩ থেকে ১৯১৯ সাল পর্যন্ত যে দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধকালে জাপানি সেনাকর্মকর্তারা ততটা সামনে না এলেও ১৯৩১ সাল পর্যন্ত জাপানে অন্তত ১৩-১৪টি সামরিক অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। জাপানের একজন প্রধানমন্ত্রী মঞ্চে উঠে বক্তৃতা দেয়ার সময় তাকে ছুরিকাঘাত করে মেরে ফেলা হয়। জাপানের অর্থনীতি এ সময় অনেকটা ঝিমিয়ে পড়ে। কারণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সাথে অর্থনৈতিক উন্নয়নের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। উগ্র সামরিক জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ হয়ে ১৯৩৯ সালে শুরু হওয়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানি সেনাবাহিনী সম্মুখ সারিতে চলে আসে। সেই সময় জাপানের সেনাবাহিনী নিজেদের মনে করতে লাগল, তারা বিশে^র অন্যতম শক্তিশালী সেনাবাহিনী। জার্মানির উগ্র জাতীয়তাবাদী হিটলারের সাথে জাপানি সেনাবাহিনীর যোগসূত্র তৈরি হয়। ১৯৪২ সালে জাপানি সেনাবাহিনীর একটি দল পার্ল হারবারে মার্কিন জাহাজের ওপর আক্রমণ পরিচালনা করে। ওই আক্রমণ করা হয়েছিল আন্তর্জাতিক রীতি লঙ্ঘন করে। এ আক্রমণ ছিল অতর্কিত আক্রমণ। যুক্তরাষ্ট্র জাপানের ওপর ভীষণ ক্ষেপে যায়। জাপানের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনসহ যুদ্ধনীতি ভঙ্গের অভিযোগ উত্থাপন করে। ওই আক্রমণের ফলে মিত্রবাহিনী আরো বেশি ঐক্যবদ্ধ হয়।

মন্তব্য করুন