সহকারী শিক্ষক
১৮ মে, ২০২৪ ০৩:২২ অপরাহ্ণ
জয় ফলকে Brain Tonic বলা হয়
আমাদের খাবার প্লেটে রোস্ট, কোরমা বিরিয়ানি পোলাও শাহী কাবাব ইত্যাদি রান্নায় যে জয়ফল বা জয়ত্রীর সুবাস ছড়িয়ে থাকে তার পেছনে রয়েছে কিন্তু অনেক রক্তপাতের ইতিহাস।
ইন্দোনেশিয়ার মালুকা দ্বীপপুঞ্জের ছোট্ট একটা দ্বীপ স্পাইস আইল্যান্ড। স্পাইস আইল্যান্ড ছিল একটা উর্বর ভূমি এই দ্বীপের চমৎকার আবহাওয়া এবং জলবায়ু ছিল জয়ফলের জন্য স্বর্গ। এখানে মানুষ ছিল খুবই শান্ত প্রিয়। দ্বীপের মানুষ সুখে শান্তিতে দিন কাটাচ্ছিল কিন্তু একসময় তাদের এই সুখ শান্তির দিন শেষ হল। তাদের এই গুপ্তধনের কথা ছড়িয়ে পড়লো গোটা পৃথিবীতে।
১৫০০ থেকে ১৬০০ শতাব্দীর দিকে আরব বনিকরা এই দ্বীপ খুঁজে বের করে প্রথমবারের মতো। আরবরা এই মসলা বিভিন্ন বন্দরে বন্দরে বিক্রি শুরু করলো এবং বলা হত সোনার ওজনে তারা জয়ফল বিক্রি করতো। তখনকার জামানায় এক কেজি জয়ফল দিয়ে লন্ডনে একটা বাড়ি কিনে ফেলা যেত। এই জয়ফল তখন এতটাই দুর্লভ জিনিস ছিল।
পর্তুগিজরা এর সন্ধানে উঠে পড়ে লাগল, একদিকে ব্রিটিশরা যেমন এই দ্বীপের দখল নিতে চায় অন্যদিকে ডাচরাও এই দ্বীপের দখল নিতে চায়। আর এই দ্বীপের আদি বাসিন্দা যারা ছিল তারা দাসত্বের জীবন বেছে নিতে বাধ্য হলো। আর তখন আরেকটা কথা প্রচলিত হয়ে পড়ে “জয়ফলে আছে প্লেগ রোগ প্রতিরোধের ক্ষমতা”। তখন প্লেগ রোগ পুরো পৃথিবী কে জেঁকে ধরেছিল তাই সবাই চাচ্ছিল এর পরিত্রাণের উপায় টাকে নিজের কব্জায় রাখতে। ১৬১৬ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ সেনাপতি নাথানিয়েল কোর্টহোপ স্পাইস আইল্যান্ড প্রথমবারের মতো দখল করে। কিন্তু মাত্র চার বছর পর ১৬২০ খ্রিস্টাব্দে নিজ দলের মধ্যেই এক ডাচ গুপ্তচরের হাতে প্রাণ যায় কোর্টহোপের। এরপর ব্রিটিশরা দাবি করতে থাকে এই দ্বীপটা তাদের অন্যদিকে ডাচরাও তাদের দখল ছাড়েনি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে প্রাণ যায় উভয় দলের অসংখ্য সৈন্যের।
বর্তমান সময়ের কথায় আসিঃ বর্তমানে স্পাইস আইল্যান্ড ঠিক আগের মতোই জয়ফলের চাষ হচ্ছে সেখানের বাসিন্দারা খুবই সুখে শান্তিতে জীবন যাপন করছে। কিন্তু তাদের পূর্বের তিক্ত অভিজ্ঞতা এখনো তাদেরকে দেয় পীড়া দেয়। স্পাইস আইল্যান্ড এখন ঘুরতে যাওয়ার জন্য একটা দারুন লোকেশন বিভিন্ন দেশের পর্যটকদের কাছে এটা যেমন একটা ঐতিহাসিক স্থান তেমনি মনোরম পরিবেশের জন্য স্থানটাকে অনেক পর্যটক বেছে নেন। তবুও কেন জানি স্পাইস আইল্যান্ডের বাতাসে জয়ফল জয়ত্রীর সুগন্ধ ছাপিয়ে একটা চাপা কান্নার আভাস পাওয়া যায়।
আসুন এবার জানি জয়ফল আসলে কি এবং কি কি হয় জয়ফল দিয়ে?
জয়ফল একটি বৃক্ষ জাতীয় চিরচহরিত গাছ। গাছে রসালো খোসাযুক্ত ফল হয়। যার খোসা ছাড়ালে দেখা যায় রক্তবর্ণ পাপড়ির মত আবরণযুক্ত গোলাকার একটি বীজ। এই পাপড়িই হচ্ছে জয়ত্রি যা ভেতরের শক্ত খোসা ভাঙলে যে জয়ফল পাওয়া যায় তার মতই সুগন্ধি। জয়ফলের বোটানিকাল নাম মাইরেস্টিকা ফ্রেগরেন্স (Myristica fragrans)। আর জয়ত্রির ইংরেজি নাম (Nutmeg)।
জয়ফলের উপরের যে আবরণ থাকে সেটা দিয়ে তৈরি করা হয় সুস্বাদু চকলেট এবং অন্যান্য অনেক কিছু তার ঠিক মাঝখানে আরেকটা লেয়ার থাকে যে লেয়ারটাকে আমরা চিনি জয়ত্রী হিসেবে। আর তার মাঝখানে যে শক্ত আবরণ সেই শক্ত আবরণটা ভাঙলে মাঝখানের যে অংশটা থাকে একটা সুপারির মতো দেখতে সেই জিনিসটাই মূলত জয়ফল যেটা বিরিয়ানি পোলাও শাহী রান্না মেজবানি এবং অন্যান্য অনেক রেসিপিতে ব্যবহার করা হয়। এছাড়া জয় ফল ব্যবহার করা হয় নানা রকম হারবাল মেডিসিন তৈরিতে।
মসলা হিসেবে ব্যবহৃত হলেও জায় বা জয়ফল এর গুণাগুণ অপরিসীম! প্রাচীন আমল থেকেই রোমান ও গ্রীকরা জয়ফলকে Brain tonic হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। কারণ, জয়ফল মস্তিষ্কে প্রভাবিত করে। ফলাফলস্বরুপ এটি অবসাদ ও মানসিক চাপ কমিয়ে দেয়। যদি কেউ বিষন্ন বা উদ্বেগ বোধ করেন তবে তার সমাধানও হল জয়ফল। এটি আপনার মনযোগ ধরে রাখতেও সাহায্য করে। চীনারা জয়ফলকে ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করছে।
Nutmeg oil পেট ব্যাথা কমায়, পেট থেকে অতিরিক্ত গ্যাস বের করে দেয়, খাবারে রুচিও বাড়ায়। এতে antibacterial properties আছে যা মুখের দুর্গন্ধ রোধ করতে সক্ষম। এটা মুখের দুর্গন্ধসৃষ্টিকারী ব্যকটেরিয়াকে ধ্বংস করে নিঃশ্বাসকে সজীব রাখে। দাতের ব্যাথা এ মাড়ির বিভিন্ন সমস্যায় ও এটি ব্যবহৃত হয়।
৩
৩ মন্তব্য