Loading..

ব্লগ

রিসেট

০৪ জুন, ২০২৪ ০৫:৪১ অপরাহ্ণ

গোলপাতা বা ওম গাছের রস - যেন প্রাকৃতিক কেরু;?? আগে মনে করতাম এর পাতা মনে হয় গোল, এ জন্য গোল পাতার

গোলপাতা বা ওম গাছের রস - যেন প্রাকৃতিক কেরু;??

আগে মনে করতাম এর  পাতা মনে হয় গোল, এ জন্য  গোল পাতার গাছ,আসলে ফলটার নামই " গোল"♥️♥️

বহুবছর আগের কথা। দীপক মামার একহাতে সিলভারের কলসিভরা গোলপাতার রস, অন্যহাতে একজোড়া দেশী মোরগ নিয়ে আমাদের মেসে বেড়াতে আসেন। গোলপাতার রসের সাথে সেদিন সন্ধ্যাবেলা আমার প্রথম পরিচয়। 


দীপক মামার বাড়ী কক্সবাজার যাওয়ার পথে রামু রাবার বাগানের মাইলখানেক দুরে বড়ুয়া পাড়ায়। তাদের স্থানীয় ভাষায় গোলপাতার রসকে বলে ওম গাছের রস। বাকখালি নদীর পাড় ঘেঁষে অজস্র ওমগাছ। এ গাছের রস একধরণের বলবর্ধক ও স্নায়ুতাড়ুয়া পানীয়। 


অনেকে বলেন এটি প্রাকৃতিক কেরু। আমরা অনেকক্ষণ ধরে খাওয়ার পর বুঝলাম এটি নেশাধরা পানীয়, তবে খুবই মোলায়েম। শুনা যায় দিল্লীর সুলতানেরা পর্যন্ত উপকুলীয় এলাকা থেকে গোলপাতার রস সংগ্রহ করে খেতেন। দীপক মামা জানালেন, বাদশারা তাদের পেটের রোগ সারাতে এবং বার্ধক্য ঠেকাতেই এই রস খেতেন।??


বাংলায় গোলপাতা, ইংরেজিতে নিপা পাম আর বিজ্ঞানীরা যত্ন করে এর নাম রেখেছেন নিপা ফ্রুটিক্যানস (Nypa fruticans) । গোলপাতার নাম গোলপাতা কে রেখেছিলো!! কি দেখে সে নাম রেখেছিলো!! নারকেলের পাতার মতো লম্বা লম্বা যার পাতা, তার নাম গোলপাতা হয় কিভাবে!! পাম্প জাতীয় উদ্ভিদ প্রজাতী, ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ।  অজস্র শিকড়যুক্ত খাটো কান্ডের এই গাছ। ফলটি গোল। উদ্ভিদপ্রেমী জিনিয়া সুমন ভাইজান লিখেন, এর কচিপাতা লম্বা গোলাকার সিলিন্ডারের মতো বের হয়। তারমধ্যে থেকে পরে গুচ্ছাকারে পাতা বের হয়-তাই নাম "গোলপাতা"।♦️♦️♦️


বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে গোলপাতার গাছ বহু ব্যবহার্য সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। বাংলাদেশের মানুষের কোনরূপ প্রচেষ্টা ছাড়াই সুন্দরবনে প্রকৃতিকভাবেই গোলপাতা গাছের জন্ম হয়। এছাড়া দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের সমুদ্র উপকূলে বসবাসকারী লোকেরা গৃহস্থালির কাজের জন্য ক্ষেত জমিতেও কিছুটা গোলপাতা চাষ করেন। তবে অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশে আজ পর্যন্ত এগাছের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা হচ্ছে না। শুধু ঘরের ছাউনি এবং জ্বালানি হিসেবে গোল পাতা ব্যবহার করে এবং স্থানীয় কিছু লোক এর রস সংগ্রহ করে পান করে এবং গুড় তৈরি করছে।  

গোল একটি বহুবিধ উপকারী উদ্ভিদ। গোলপাতা ব্যবহার হয় উপকূলবর্তী এলাকার প্রায় সর্বত্র। একসময়ে গ্রাম বাংলার নিম্নবিত্ত পরিবারের মানুষ ঘরের ছাউনি হিসেবে গোলপাতা ব্যবহার করতো। গ্রামীন জনপদের উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক অগ্রগতি হওয়ার সাথে সাথে এ পাতার ব্যবহার অনেক কমে গেছে এবং ভবিষ্যতে আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ ফসলটির বিকল্প ব্যবহার, চাষাবাদ, টিকিয়ে রাখা, তরল জ্বালানি, গুড় ও চিনি উৎপাদনসহ অন্যান্য কাজে এর ব্যবহার উপযোগিতার উপর বর্তমানে সীমিত আকারে গবেষনা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এ ধরনের গবেষণা কার্যক্রম আরও জোরদার করা আবশ্যক। বর্তমা‌নে আমাদের দেশে গোলপাতা থেকে গুড় উৎপাদন করা হয়। সুস্বাদু এ গুড়কে গোলের গুড় বলে।


গোলপাতা গাছের উপরে নির্ভর করে সুন্দরবন সংলগ্ন এর আশপাশ এলাকার যেকোন স্থানে চিনি কল স্থাপন করলে দক্ষিণাঞ্চলের হাজার হাজার বেকার লোকের চাকরির সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে আশা করা যায়। 


এছাড়া কানাডায় এর ফুল থেকে বিজ্ঞানীরা তরল জ্বালানি তৈরি করে পেট্রোলের সঙ্গে শতকরা ২৫ ভাগ হারে মিশিয়ে গাড়িতে ব্যবহার করেন। এতে গাড়ির কার্বোরেটরে সহজে কোন পরিবর্তন করতে হয় না এবং ইঞ্জিনের কোন ক্ষতি হয় না। বাংলাদেশে এর প্রয়োগ করা সম্ভব হলে বিশ্বব্যাপি তেল ঘাটতি মোকাবেলায় গোলগাছ এক অমূল্য সম্পদ হিসেবে স্বীকৃতি পাবে।


 বহুবিধ উপকারী গোলপাতার কিছু ব্যবহার ও উপকারিতা নিম্নে তুলে ধরা হলো।????


- শুকানো গোলপাতা সাধারণত বসতবাড়ি, রান্নাঘর, গোয়ালঘর, মৎস্য ঘেরের ঘর, বৈঠকখানাসহ বিভিন্ন ঘরের ছাউনিতে ব্যবহার করা হয় । 

- গোলপাতা ঘরের ছাউনি ছাড়াও রান্নার জ্বালানি হিসাবে ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়।

- গোলপাতা গাছের ফল গুচ্ছাকারের এবং বেশ বড়, অনেকটা তালের শাঁষের মতো।  কচি তালের শাঁষের মতোই এ ফল কচি অবস্থায় কেটে খাওয়া হয়। 

- ফলটি পরিপক্ক হলে ফলের ভিতরের  অংশ কেটে খাওয়া যায়, এর স্বাদ অনেকটা কাঠবাদামের মত।

- ফলের ডগা কেটে পাত্র বেধে রেখে গোলের রস সংগ্রহ করা হয়। এই রস আখ, তাল কিংবা খেজুর গাছের রসের ন্যায় মিষ্টি এবং সুস্বাদু। যা সরাসরি পান করা যায়। 

- গোলের রসের গুড়ের তৈরি পাটালি, মিষ্টি, পিঠে ও পায়েস খুব সুস্বাদু। এই রস গরম লুচি, রুটি দিয়ে বা মুড়ি দিয়ে খেতে খুব ভালো লাগে। 

- আয়ুর্বেদ শাস্ত্র মতে, গোল গাছের মিষ্টি রস খেলে কৃমি নাশ হয়। ডিহাইড্রেশন দূর করে এবং গোল রস অসুস্থ্য শরীরে দ্রুত শক্তি আনতে সহায়তা করে।

- গোলের রস থেকে উন্নত মানের গুড় এবং চিনি তৈরি করা যায়। 

- গোলের রস থেকে উন্নত ভিনেগার প্রস্তুত করা যায়। 

- গোল গাছের ফল প্রচুর ভিটামিন ও মিনারেল যুক্ত। বিশেষত চর্মরোগের সকল পর্যায় নিরাময়ে সাহায্য করে এই গোলপাতার ফল। 

- এছাড়া গোল গাছের রস দিয়েও চর্মরোগের ঔষধ তৈরি করা হয়। 

- গোল গাছের শিকর পুঁড়িয়ে দাঁতের মাজন ও কচিপাতা থেকে দাঁতের বিভিন্ন রোগের প্রতিষেধক তৈরি করা হয়। 

- এর ফুল থেকে বিজ্ঞানীরা তরল জ্বালানি তৈরি করে পেট্রোলের সঙ্গে ২৫ ভাগ হারে মিশিয়ে গাড়িতে ব্যবহার করছেন ।

- গোল গাছ উপকূলবর্তী  এলাকার প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় বিরাট ভূমিকা পালন করে। 

- ভ্রমণ পিয়াসী মানুষেরা বেড়াতে যেতে পারেন গোলপাতা বনে। গোলপাতা গাছের সৌন্দর্য্য মুগ্ধ করে সকলকে। মন চাইলে আপনিও বেড়াতে গিয়ে প্রকৃতিক অপরূপ সৌন্দর্য্য উপভোগ করতে পারবেন এই সুন্দরবনে।


তথ্যসূত্র: মো. আলী আশরাফ খান লিখিত প্রবন্ধ। মহাব্যবস্থাপক (অবসরপ্রাপ্ত), বিসিক।

মন্তব্য করুন

ব্লগ