Loading..

ব্লগ

রিসেট

১৪ জুলাই, ২০২৪ ০৬:৪৯ অপরাহ্ণ

মাদরাসা শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য

শিক্ষাই আলো। সুশিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। সুশিক্ষিত জাতি আগামীর ভবিষ্যৎ। এ উপদেশবাণীগুলোর চেয়েও শিক্ষার ইতিহাস অনেক পুরনো। কারণ শিক্ষার ভালো ফল পাওয়ার পরই সম্ভবত এই উপদেশবাক্যগুলোর জন্ম। মানবসভ্যতার বয়স যতদিন, শিক্ষার বয়সও ততদিন। কারণ মানুষকে সৃষ্টিকর্তা একজন জ্ঞানী ও খলিফা হিসেবে প্রেরণ করেছেন। উম্মতে মুহাম্মদির শিক্ষাব্যবস্থার সূচনা হয় সৃষ্টিকর্তার বাণী- পড় তোমার প্রভুর নামে যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন (সূরা: আলাক, আয়াত-১)। মসজিদে নববীতে অবস্থিত ‘সুফফা’ হলো ইসলামের প্রথম শিক্ষাকেন্দ্র বা বিশ্ববিদ্যালয়। রাসূল সা: ছিলেন প্রথম শিক্ষক এবং সাহাবিগণ প্রথম ছাত্র। এখান থেকে ইসলামী শিক্ষার ইতিহাস শুরু হয়। খোলাফায়ে রাশেদিন, উমাইয়া ও আব্বাসীয় খলিফাদের যুগে ইসলামী শিক্ষার ব্যাপক উন্নতি ঘটে এবং শিক্ষাব্যবস্থা একটি পরিপূর্ণতা লাভ করে। মুসলিম শাসিত ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম শাসকগণ শিক্ষাব্যবস্থার ব্যাপক অবদান রাখেন। তারা ইসলামী শিক্ষার একটি বুনিয়াদি কাঠামো দাঁড় করিয়ে ছিলেন। শুধু রাজধানী দিল্লিতেই এক হাজার মাদরাসা ছিল। প্রফেসর ম্যাক্স মুলারের মতে ব্রিটিশ শাসনের আগে শুধু বাংলাতেই ৮০ হাজার মাদরাসা ছিল। ক্যাপ্টেন হেমিলটনের মতে, সিন্ধুর প্রসিদ্ধ ঠাট্টানগরীতে জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং শিল্পকলার ৪০০ প্রতিষ্ঠান ছিল। ১৭৫৭ সালে পলাশির যুদ্ধের পরাজয়ের পর উপমহাদেশের মুসলিম শাসনের ইতি ঘটে। সূচনা হয় ইংরেজ শাসন। ইংরেজরা তাদের শাসনব্যবস্থা দীর্ঘদিন টিকিয়ে রাখার জন্য উরারফব ধহফ ৎঁষব নীতি প্রয়োগ করে। মূল লক্ষ্য ছিল দ্বিমুখী শিক্ষাব্যবস্থা চালু করে মুসলমানদের মধ্যে জাতিগত বিভেদ সৃষ্টি করা।

১৮৩৫ সালে লর্ড মেকেলের সুপারিশকৃত শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে দুই বিপরীতমুখী শিক্ষাব্যবস্থা প্রচলনের উদ্দেশ্য সুস্পষ্টভাবে লক্ষণীয়। তাদের এ নীতি সফলতার সাথে বাস্তবায়ন হয়েছে। ব্রিটিশ আমাদের এ দেশ থেকে চলে গেছে সেই ১৯৪৭ সালে ঠিকই কিন্তু তাদের সৃষ্ট শিক্ষাব্যবস্থা আজো অক্ষুণœ আছে। এ দীর্ঘ সময়ে পাঠ্যসূচিতে কিছুটা পরিবর্তন এলেও শিক্ষানীতির মূল কাঠামো আজো অপরিবর্তিত। কিন্তু আদর্শ জাতি গঠনে মাদরাসা শিক্ষার গুরুত্ব ব্যাপক।
আল্লামা ইকবাল বলেন, খুদি বা রূহের উন্নয়ন ঘটানোর প্রক্রিয়ার নামই শিক্ষা। শিক্ষার ক্ষেত্রে ইসলামী আদর্শের কাজ হলো পরিপূর্ণ মানবসত্তার লালন করে এমনভাবে গড়ে তোলা। যার এমন একটি পূর্ণাঙ্গ কর্মসূচি যে, মানুষ তার দেহ, বুদ্ধিবৃত্তি এবং আত্মা তার বস্তুগত ও আত্মিক জীবন এবং পার্থিব জীবনের প্রতিটি কার্যকলাপের কোনোটিই পরিত্যাগ করে না। আর কোনো একটির প্রতি অবহেলা বা মাত্রাতিরিক্ত ঝুঁকেও পড়ে না। মিল্টনের মতে, শিক্ষা হচ্ছে শারীরিক ও মানসিক দিক দিয়ে বিকশিত মুক্ত সচেতন মানবসত্তাকে সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে উন্নত যোগসূত্র রচনা করার একটি চিরন্তন প্রক্রিয়া যেমনটি প্রকাশিত হয়েছে মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক, আবেগগত এবং ইচ্ছাশক্তিসম্বন্ধীয় পরিবেশে।ইসলামী যুগের শুরুতে, মধ্যযুগে এবং অতি সাম্প্রতিক কালেও ঔপনিবেশিক যুগের আগ পর্যন্ত মুসলিম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব ছিল কুরআন, হাদিস, সিরাত ও ফিকাহর ওপর। এর সাথে সাথে সমাজবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, যাবতীয় সায়েন্স এসবের গুরুত্ব ছিল। ইসলামে শিক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে যা বলা হয়েছে তা পৃথিবীর কোনো ধর্মগ্রন্থ বা মনীষীর বাণীতে পাওয়া যাবে না। কুরআনের প্রথম শব্দই ছিল শিক্ষাসংক্রান্ত। যেমন সৃষ্টিকর্তা বলেন পড়েন আপনার রবের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে ঝুলে থাকা বস্তু থেকে। পড়ুন আর আপনার রব মহামহিমান্বিত। যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন। শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানত না (সূরা: আলাক, আয়াত ১-৫)। রাসূল সা: হেরা গুহায় অহি প্রাপ্ত হয়ে ভীতসন্ত্রস্ত অবস্থায় ফিরে এসে তাঁর সহধর্মিণী খাদিজা রা:-এর কাছে সব ঘটনা খুলে বলেন। রাসূল সা: আল্লাহর পক্ষ থেকে শিক্ষা লাভ করে ঘোষণা করেনÑ আমি শিক্ষক হিসেবে প্রেরিত হয়েছি (ইবনে মাজাহ)। অন্যত্র ইরশাদ হচ্ছে- জ্ঞানার্জন প্রত্যেক মুসলিমের ওপর ফরজ (ইবনে মাজাহ )। নিরক্ষরতা দূরীকরণের লক্ষ্যে রাসূল সা: ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধে যুদ্ধবন্দী ৭০ জনের মুক্তিপণ হিসেবে ঘোষণা করেন, যারা লেখাপড়া জানেন তারা ১০ জন নিরক্ষর ব্যক্তিকে অক্ষরজ্ঞান দান করে মুক্তি পাবেন। ইসলামের ইতিহাসে প্রথম আনুষ্ঠানিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিতি সেটা হলো দারুল আরকাম। বিশিষ্ট সাহাবি হজরত আরকাম রা: ছিলেন এই ঘরের মালিক। মুসলমান হওয়ার পর তিনি ইসলামের জন্য এই ঘরটি ওয়াকফ করে দেন।

মদিনার মুসলমানদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে রাসূল সা: হজরত মুসাব ইবনে উমায়ের (রা:)কে শিক্ষক হিসেবে মদিনায় শিক্ষার উদ্দেশ্যই নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ তৈরি করা। সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে মানবজাতিকে সঠিক জীবন যাপনের জন্য যেসব নবী-রাসূলকে পৃথিবীতে পাঠানো হয়েছিল তাদের কাজ সম্পর্কে সৃষ্টিকর্তা বলেন, তারা আল্লাহর আয়াত বা নিদর্শন বা সত্য-মিথ্যার পার্থক্যের মানদণ্ড সম্পর্কে মানুষকে পড়ে শুনান। আত্মাকে পরিশুদ্ধ করেন আর শিক্ষা দেন জীবন যাপনের কৌশল। অথচ এর আগে তারা ছিল সুস্পষ্ট গুমরাহিতে নিমজ্জিত। (সূরা: জুমা, আয়াত ২)।



মন্তব্য করুন