প্রভাষক
১৫ জুলাই, ২০২৪ ১১:৪৬ পূর্বাহ্ণ
প্রভাষক
ইমাম বুখারী নিশাপুরে ঠাঁই পেলেন না। তাঁর আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা দেখে চারদিকে কিছু হিংসুক তৈরি হল। হিংসুকের হিংসা এবং ভ্রষ্ট শাসকের জুলুমি সিদ্ধান্ত তাঁকে আর থাকতেই দিল না নিশাপুরে। রাষ্ট্রীয় ফরমান জারি হল, "ঠিক এখনই নিশাপুর ত্যাগ করুন।"
শাসকের ক্ষোভের পিছনে সবচেয়ে বড় কারণ ছিল, রাজদরবারে গিয়ে তার ছেলেকে পড়ানোর প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে দেওয়া। রাষ্ট্রীয় এই প্রস্তাবের জবাবে তিনি দৃঢ়কণ্ঠে বলেছিলেন, "জ্ঞান মজলিসে বসেই নিত হয়, ঘরের দরজায় গিয়ে বিলি করা হয় না।"
ইমাম বুখারী রাহি. কিতাবাদি গুছিয়ে যাত্রা শুরু করলেন নতুন গন্তব্যের দিকে। যাবেন নিজ এলাকা বুখারাতে। তিনি বুখারাতে যখন পৌঁছলেন সর্বস্তরের মানুষ তাঁকে শহরের মূল প্রবেশদ্বারে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানালেন। মানুষের ঢল নেমেছিল সেদিন। সেই কি উচ্ছ্বাস, আনন্দ! বহুদিন পর যেন হারানো ধন খুঁজে পেলেম তারা। হঠাৎ যেন কী একটা হয়ে গেল বুখারায়। মানুষের দৃষ্টি একদিকেই। জনগণের এই পরিবর্তিত আচরণ নীতিনির্ধারকদের অনেকেই সইতে পারল না। হিংসায় জ্বলে উঠল। হিংসার সেই তাপ লাগল দরবারেও।
এদিকে নিশাপুরের গভর্নর আরো বেসামাল। তার ক্ষোভ যেন কিছুতেই কমছে না। বুখারাতে ইমাম আশ্রয় নিয়েছেন—এই সংবাদ পেয়ে বুখারার গভর্নরের কাছে পত্র লিখল। পত্রের সারমর্ম ছিল এমন, "লোকটাকে নিশাপুর থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। আপনার রাজ্যের কল্যাণের জন্য ওকে বুখারা থেকেও বহিষ্কার করুন।"
বুখারার গভর্নরের রাগে যেন ঘি পড়ল। জ্বলে উঠল ছ্যাঁৎ করে। সঙ্গেসঙ্গে রাজকীয় পিয়নের মাধ্যমে বহিষ্কারাদেশ পাঠানো হল। সেখানে লেখা ছিল, "ঠিক এই মুহূর্তে বুখারা ছাড়ুন।"
বাধ্য হয়ে ইমাম বুখারী রাহি. বুখারা ত্যাগ করলেন। কোথায় যাবেন তখন, তাঁর জানা ছিল না। যেখানেই যাচ্ছিলেন সেখান থেকেই বের করে দেওয়া হচ্ছিল। তিনি বুখারা থেকে বের হয়ে নির্জন প্রান্তরে তাঁবু টানিয়ে তিনদিন অবস্থান করেছিলেন, যাতে সব কিতাবাদি সংগ্রহ করে সাথে করে নেওয়া যায়। কারণ, এই জন্মস্থানে তো আর আসা হবে না। তাঁর একান্ত সঙ্গী হিসেবে ছিলেন ইবরাহীম বিন মাকীল।
হঠাৎ ইমামের মনে হল, সমরকন্দের খারাতনাক গ্রামে তাঁর এক আত্মীয়ের বসবাস। সেখানে চলে গেলে মন্দ হবে না। জীবনের বাকিটা সময় অপরিচিত সেই গ্রামের নির্জনতায় কাটিয়ে দেওয়া ছাড়া আর কিইবা করার আছে!
চললেন আত্মীয়ের বাসার দিকে। চলতে চলতে পৌঁছে গেলেন সমরকন্দের অন্তর্ভুক্ত খারাতনাক গ্রামে অবস্থিত আত্মীয়ের বাসায়। তাঁরা ইমামকে খুশিতে বুকে টেনে নিলেন। গ্রামের মানুষ বেজায় খুশি।
এদিকে হিংসুকদের দৃষ্টিও ইমামের পিছনে পিছনে চলতে লাগল। সংঘবদ্ধ চক্র খবর রাখছিল, ইমাম বুখারী কোথায় গিয়ে আশ্রয় নেয়৷ যেখানেই আশ্রয় নেবে সেখান থেকেই তাড়িয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
তারা তাদের উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য সমরকন্দের শাসকের কাছে রাষ্ট্রীয় চিঠি চালাচালি করে ইমামের অবস্থান শনাক্ত করে সেখান থেকে বহিষ্কার করার অনুরোধ জানাল। সমরকন্দের শাসক চিঠির হুকুম তামিল করল। রাষ্ট্রীয় বার্তাবাহক বহিষ্কারাদেশ ফরমান নিয়ে হাজির হল অজপাড়া সেই গ্রামে।
তখন ঈদের রাত। রাত পোহালেই ঈদুল ফিতর। চিঠিটাও লিখছিল সেভাবেই। "এখনই বের হোন, ঈদের পরে নয়।" এটা পড়ে ইমাম একমুহূর্ত অবস্থান করার চিন্তা করলেন না। তিনি নিজের জীবনের চেয়ে আশ্রয়দাতা আত্মীয়ের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত ছিলেন বেশি। ভাবলেন, যদি এখনই অর্থাৎ ঈদের রাতেই ত্যাগ না করি তাহলে বাড়ির কর্তাদের ওপর জুলুম করা হতে পারে।
আবার চললেন ইমাম বুখারী। বের হয়ে বিশ কদম এগুতে পারলেন না। ক্লান্ত হয়ে গেলেন খুব। এতটাই ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছিলেন যে, তাঁর স্বাভাবিক নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছিল। ইবরাহীম বিন মাকীলকে বললেন, যাতে সে তাঁকে একটু বিশ্রাম নেওয়ার সুযোগ দেয়। ইবরাহীম বিন মাকীল তড়িঘড়ি করে তাঁর শায়খকে রাস্তার পাশেই বসিয়ে দিলেন। ইমাম বুখারী বসা থেকে শুইয়ে চোখদুটো বন্ধ করে দিলেন। বিন মাকীল মনে করলেন শায়খ আমার ঘুমুচ্ছেন। তিনি যাত্রা শুরু করার জন্য কিছুক্ষণ পর ইমামের মাথায় আলতো করে হাত রেখে ডাকতে থাকলেন। না, কিছুতেই কিছু হচ্ছে না। এবার আরেকটু নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে দেখলেন, ইমাম আর এই দুনিয়াতে নেই। তিনি তাঁর রবের সাক্ষাতে বের হয়ে গেছেন।
ইমাম বুখারী রাস্তার পাশে মারা গিয়েছিলেন।
ঈদের রাতে ঘর থেকে বিতাড়িত হয়েছিলেন।
২৫৬ হিজরীর পহেলা শাওয়ালে মারা গিয়েছিলেন।
তিনি যেসময় ছন্নছাড়া হয়ে এই শহর থেকে ওই শহরে ঘুরছিলেন তখন তাঁর বয়স ছিল ৬২ বছর।
১২০০ বছর পর আজ ইমাম বুখারীর নাম সবার মুখেমুখে। কিন্তু যেই শাসক এবং হিংসুকরা তাঁর পিছনে লেগেছিল তাদের নাম পর্যন্ত আজ অবশিষ্ট নেই। ইমাম বুখারীকে পড়বে, জানবে এবং রিসার্চ করবে কিয়ামত পর্যন্ত। বিলিয়ন বিলিয়ন মানুষ ইমামের জ্ঞান থেকে ইস্তেফাদা নেবেন। তিনি উলুমুল হাদীসের রাজ্যে রাজাই থাকবেন। আর যারা তাঁর পিছনে লেগে তাঁকে চরম কষ্ট দিয়েছিল তারা কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে সেই কবে!
শিক্ষা:
চরম ত্যাগ ছাড়া পরবর্তী প্রজন্মের কাছে অনুসরণীয় অনুকরণীয় আদর্শ হওয়ার তেমন কোনো সুযোগ নেই।
৭১
১৪৫ মন্তব্য