Loading..

ব্লগ

রিসেট

৩০ জুলাই, ২০২৪ ০৪:২৩ অপরাহ্ণ

শ্রী শ্রী ঠাকুর অনুকূল চন্দ্রের সংক্ষিপ্ত জীবনী

 

শ্রী শ্রী ঠাকুর অনুকূল চন্দ্রের সংক্ষিপ্ত জীবনী

বাংলার হিন্দুর ধর্মাকাশে যে সকল ধার্মিক পুরুষ তারকার ন্যায় খ্যাতি অর্জন করে গেছেন ঠাকুর অনুকূল চন্দ্র তাদের মধ্যে অন্যতম। পরমপ্রেমময় শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূলচন্দ্র আমাদের দৈনন্দিন জীবনে চলার পথে স্মরণীয় ও অনুসর্তব্য বহুবিধ অমূল্য নির্দেশ দান করেছেন। তিনি ধর্ম, অর্থ, কর্ম, পরমার্থ, অধ্যাত্ন, রাজনীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতি, বিজ্ঞান, শিক্ষা, বিবাহ, কৃষি, শিল্পকলা, বাণিজ্য, বৃত্তি, সত্তা, ব্যষ্টি, সমষ্টি, অতীত ও বর্তমান ভবিষ্যৎ সবকিছুকে এক মহা সমন্বয়-সূত্রে সংগ্রথিত করে এবং সর্বার্থ পরিপূরাণী পূর্ণাঙ্গ জীবনদর্শন তাঁর অমৃতনিষ্যন্দী বাণীনিচয়ের মধ্য দিয়ে প্রকাশ করেছেন।

 

আবির্ভাব : বাংলা ১২৯৫ সনের (১৮৮৮ খ্রি.) ৩০ ভাদ্র পাবনা শহরের অদূরে পদ্মা নদীর তীরে হিমাইতপুর গ্রামে সনাতন আধ্যাত্মিক মহাপুরুষ ঠাকুর অনুকূল চন্দ্র আবির্ভূত হন।

 

জন্ম : পিতামাতার পরিচয় ঠাকুর শ্রীঅনুকূল চন্দ্রের পিতার নাম ছিল শিবচন্দ্র চক্রবর্তী। তিনি ছিলেন নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ। শ্রীঅনুকূল চন্দ্রের জননী মনোমোহিনী দেবী ছিলেন একজন সতীসাধ্বী রমণী। পরবর্তী সময়ে মা মনোমোহিনী দেবী ঠাকুর শ্রীঅনুকূল চন্দ্রকে দীক্ষা দেন।

 

বাল্যজীবন:  পদ্মানদীর তীরে হিমাইতপুর গ্রামেই ঠাকুর শ্রীঅনুকূল চন্দ্রের বাল্যকাল অতিবাহিত হয়। বাল্যকাল থেকেই দিশাবাদীও তীরে হিমত তার ছিল গভীর শ্রদ্ধা। মা-বাবার মুখে হাসি ফোটাতে সকল কষ্টই তিনি অথাতীর পিতামাতা উভয়ের অনুকূল চন্দ্রের বাল্যকালে, একবার তাঁর পিতা না করে পড়ায় সংসারে অর্থকষ্ট দেখা দিল। বালক অনুকূল চন্দ্র আড়াই মাইল পথ হেঁটে গিয়ে শহরে মুড়ি বিক্রয় করে সেই অর্থ দিয়ে পিতার জন্য ওষুধ ও পথ্য আনতেন।

আর্থিক কষ্ট থাকলেও অনুকূল চন্দ্রের ছিল অমায়িক ব্যবহার। সহপাঠীর কাছে ঠাকুর অনুকূল চন্দ্র ছিলেন খুবই প্রিয়পাত্র। কেউ তাঁকে বলতেন 'প্রভু' আবার কেউ আরেক ধাপ এগিয়ে বলতেন অনুকূল আমাদের রাজা ভাই।

 

শিক্ষাজীবন: ঠাকুর শ্রীঅনুকূল চন্দ্রের শিক্ষাজীবন শুরু হয় তাদের গ্রাম হিমাইতপুরের পাঠশালায়। পাঠশালায় পাঠ সমাপ্ত হলে অনুকূল চন্দ্র পাবনা ইনস্টিটিউটে ভর্তি হন। অতঃপর পাবনা দেওয়া নৈহাটী উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখান থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষার জন্য মনোনীত হন। কিন্তু সে পরীক্ষা দেওয়া আর তাঁর ভাগ্যে জোটেনি। একজন দরিদ্র সহপাঠী পরীক্ষার ফিসের টাকা যোগাড় করতে পারেনি দেখে ব্যথিত অনুকৃষ্ণ চন্দ্র নিজের টাকাটা তাকে দিয়ে দেন। পরবর্তীতে মায়ের ইচ্ছা পূরণের জন্য তিনি কলকাতার ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। কলকাতার শিক্ষাজীবন ছিল অনুকূল চন্দ্রের সংগ্রামী জীবন। টাকার অভাবে ঠিকমতো খাওয়াটা পর্যন্ত জুটত না। কখনো রাস্তার ধারের কল থেকে ভরপেট জল খেয়ে ক্ষুধানিবৃত্ত করতেন।

 

কর্মজীবন: আথিক কষ্ট থাকলেও ঠাকুর শ্রীঅনুকূল চন্দ্রের ছিল মধুর ব্যবহার। তার ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে প্রতিবেশী ডাক্তার হেমন্তকুমার চাটুজে ওষুধসহ একটি ডাক্তারি বাক্স তাকে উপহার দেন।

 

অনুকূল চন্দ্র প্রতিবেশী হেমন্তকুমারের দেওয়া ওষুধসহ বাক্স নিয়েই কলকাতায় তার ডাক্তারি জীবন শুরু করেন। তিনি কুলি-মজুরদের সেবা আরম্ভ করলেন। সেবার আনন্দের সাথে সাথে যে সামান্য কিছু অর্থ আয় হতো তাতেই ক্রমে তার অর্থকষ্টের অবসান হলো। কলকাতা থাকা অবস্থায় অনুকূল মাঝে মাঝে গঙ্গার ধারে বসে ধ্যানমগ্ন হয়ে থাকতেন। পরে তিনি হিমাইতপুরে এসে চিকিৎসক হিসেবে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন।

 

চিকিৎসক জীবনে ঠাকুর শ্রীঅনুকূল চন্দ্রের অভূতপূর্ব সাফল্য আসে। চিকিৎসার সাথে সাথে তাঁর এ অভিজ্ঞতা হয় যে, মানুষের দুঃখের স্থায়ী নিবারণ করতে হলে শারীরিক, মানসিক ও আত্মিক -এ তিন রকম রোগেরই চিকিৎসার দরকার। তাই তিনি শুধু দেহের চিকিৎসাই করতেন না, মনের চিকিৎসাও করতেন। অসহায় যারা, অবহেলিত যারা, অনুকূল ছিলেন তাদের প্রাণের বন্ধু। তাদের ফিসি নামমাহাত্ম্য শুনিয়ে কীর্তনের দল গড়ে, তুললেন। কিছু কিছু শিক্ষিত তরুণও এ সময়ে তাঁর প্রতি আকৃষ্ট সায় পড়েন। এদের নিয়ে কীর্তন আনন্দে মেতে উঠলেন অনুকূল চন্দ্র। এসময় থেকে সমাগত ব্যক্তিগণ তাকে ডাক্তার না বলে ঠাকুর বলে সম্বোধন করতে থাকেন। ঠাকুর অনুকূলের এই মহিমার কথা ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ে।

 

 

 

 

'সৎসঙ্গ' আশ্রম: ঠাকুর শ্রীঅনুকূল চন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হিমাইতপুর 'সৎসঙ্গ আশ্রম' পাবনা সৎসঙ্গ আশ্রম নামে উপমহাদেশে সুপরিচিত হয়ে উঠেছিল। সৎ ও সংযুক্তির সাথে তদগতিসম্পন্ন যারা তারাই সৎসঙ্গী, আর তাদের মিলন ক্ষেত্র হলো 'সৎসঙ্গ'। এই সৎসঙ্গে শুরু হলো মানুষ তৈরির আবাদ। কর্মের মাধ্যমে যোগ্যতর মানুষ গড়াই এর লক্ষ্য।

 

সৎসঙ্গের কার্যকারিতা : হিমাইতপুরে গড়ে উঠলো ধর্মকর্মের অপূর্ব সমন্বয়ে সৎসঙ্গ আশ্রম। শিক্ষা, কৃষি, শিল্প, সুবিবাহ অস্তিত্বের এ চার স্তম্ভের অভিব্যক্তি। এ আশ্রমে বিভিন্নমুখী কর্মপ্রতিষ্ঠানের বিদ্যাতায়তন গড়ে উঠলো, প্রাচীন ঋষিদের তপোবনের নবতর সংস্করণ যেন এ আশ্রম। ব্রহ্মচর্য, গার্হস্থ্য, বানপ্রস্থ ও সন্ন্যাস সনাতন আর্য জীবনের এ চারটি স্তরই সৎসঙ্গ আশ্রম ভূমিতে এক সামঞ্জস্যপূর্ণ যুগোপযোগী রূপ লাভ করে।

 

ঠাকুর শ্রীঅনুকূল চন্দ্রের আধ্যাত্মিক প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে দলে দলে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ এসে তার শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। একবার মহাত্মা গান্ধী এ সৎসঙ্গ আশ্রমে আসেন। তিনি সৎসঙ্গ আশ্রমের কর্মকান্ড দর্শন করে ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন।

 

ঠাকুর অনুকূল চন্দ্রের রচিত পুস্তক: ঠাকুর তাঁর আদর্শ ধরে রাখার জন্য বহু পুস্তক রচনা করেছেন। নিচে দেওয়া হলো:

 

১. পুণ্যপুথি,

২. সত্যানুসরণ,

৩. সমাজ সন্দীপনা,

৪. চলার সাথী

 

শ্রী শ্রী ঠাকুর অনুকূল চন্দ্রের বাণী:

 

১. তোমরা যে সম্প্রদায়েরই হও না কেন, মনে রেখ, ঈশ্বর এক, ধর্মও এক।

২. থাকবি সংসারে, মন রাখবি ভগবানে। ভগবানের পিছনে ছোট, শান্তি তোর পিছনে ছুটবে।

৩. লেখাপড়ায় বড়ো হলেই, শিক্ষা তারে কয় না। অভ্যাস, ব্যবহার, সহজ জ্ঞান না হলে শিক্ষা হয় না।

৪. আচার্যে নাই অনুরতি শিখতে যাচ্ছ কি? শ্রদ্ধা, প্রশ্ন, সঙ্গ, সেবায় শিক্ষা ছাড়া সব মেকি।

৫. কাউকে যদি বলিস কিছু সংশোধনের তরে, গোপনে তা বুঝিয়ে বলিস সমবেদনা ভরে।

 

 

মহাপ্রয়াণ: ১৯৬৯ সালের ২৭ জানুয়ারি তারিখে ৮১ বছর বয়সে তাঁরই প্রতিষ্ঠিত আশ্রম ভারতের বিহারে দেওঘরে ঠাকুর দেহ ত্যাগ করেন।

 

তথ্যসূত্র: বিভিন্ন লেখকের লেখা শ্রী শ্রী ঠাকুর অনুকূল চন্দ্রের জীবনী ও অন্তর্জাল।

 

মন্তব্য করুন

ব্লগ