সহকারী শিক্ষক
৩০ জুলাই, ২০২৪ ০৪:৪৬ অপরাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
মা আনন্দময়ীর সংক্ষিপ্ত জীবনী
মা আনন্দময়ী মানুষকে আধ্যাত্মিক ভাবে উদ্বুদ্ধ করার জন্য উপমহাদেশের বিভিন্ন স্থান পরিভ্রমণ করেন। তার একটি বিশেষ কীর্তি হলো প্রাচীন ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ তীর্থস্থান নৈমিষারণ্যের পুনর্জাগরণ ঘটানো। সেখানে গিয়ে তিনি নতুন করে মন্দির স্থাপন এবং যজ্ঞ, কীর্তন, নাচ-গান ইত্যাদির মাধ্যমে ভগবৎসাধনার ক্ষেত্র তৈরি করেন।
জন্ম ও বাসস্থান: সেই দিনটা ছিল মধ্য বৈশাখ মাসের শেষ রাত্রি। ১৮৯৬ সালের ৩০ এপ্রিল। অনন্ত প্রকৃতির অপার লীলাভূমি ত্রিপুরা জেলার খেওড়া গ্রামের আকাশ সেদিন সেই কৃষ্ণপক্ষের চতুর্থী তিথিতে সন্ধ্যা থেকেই ঘোর মেঘাচ্ছন্ন। রাত যতই বাড়তে থাকে মেঘও ধীরে ধীরে সরে যেতে থাকে। তারপর একসময় আকাশ জুড়ে দেখা দিল আলোর ছ’টা। সেই আলোর বন্যায় ভেসে গেল খেওড়া গ্রাম। জ্যোতির্ময় হয়ে উঠল দরিদ্র ব্রাহ্মণ, বিপিনবিহারী ভট্টাচার্যের কুটির। আর সেই স্বর্গীয় আলোতেই বিপিনবিহারীর পত্নী মোক্ষদা সুন্দরীর কোল আলো করে যে শিশুকন্যা আবির্ভূতা হলেন—সেই শিশু কন্যা কিন্তু অন্যান্য নবজাতকের মতো জন্মের পর কাঁদেনি—বরং এক বিস্ময়কর ব্যতিক্রম ঘটিয়ে মহানন্দে হেসেছিল।
জন্মসিদ্ধা নির্মলার অলৌকিক লীলার শুরু সেই জন্মলগ্ন থেকেই—পরবর্তীকালে যিনি মা আনন্দময়ী রূপে তাঁর অপার যোগবিভূতির মহিমায় বিশ্বজনকে মোহিত করেছেন।
শৈশবকাল: একদিন শিশু নির্মলা তাঁর বাবা বিপিনবিহারীকে প্রশ্ন করেন, ‘আচ্ছা বাবা, হরি নাম করলে কী হয়?’ শিশুকন্যার মুখে এই প্রশ্ন শুনে পরম ভক্ত বিপিনবিহারী জবাব দেন, ‘হরির নাম গান করলে যে হরিকে দেখা যায় মা।’ এবার মেয়ের দ্বিতীয় প্রশ্ন, ‘হরি কি খুব বড় নাকি বাবা?’ সরল শিশুর মুখে এই প্রশ্ন শুনে আনন্দ পান বিপিনবিহারী, বলেন, ‘হ্যাঁ গো, হরি যে খুব বড়।’ কিন্তু কত বড়? পাঁচ বছরের শিশুকন্যা ভেবেই পায় না। শেষ পর্যন্ত সামনের মাঠটা দেখিয়ে পিতাকে প্রশ্ন করেন, ‘এই মাঠের মতো বড়?’
মেয়ের প্রশ্ন শুনে হেসে ফেলেন বিপিনবিহারী, বলেন, ‘এর চেয়ে অনেক অনেক বড়। তুই তাঁকে ডাক না, তবেই জানতে পারবি, দেখতে পাবি তিনি কত বড়।’ সেদিন পিতার কথা মেয়ের মনে এক বিরাট প্রভাব বিস্তার করেছিল। বিপিনবিহারীর কথাকেই সত্য বলে ধরে নিয়ে পাঁচ বছরের সুধাকণ্ঠী মেয়ে প্রাণমন দিয়ে হরিকে ডাকতে থাকেন। হরিনামের সাগরে তিনি পরমানন্দে ভাসতে শুরু করেন এবং পৌঁছে যান এক অলৌকিক জগতে।
বিবাহিত জীবন: বাংলা ১৩১৫ সনের ২৫ মাঘ বিক্রমপুরের আটপাড়া গ্রাম নিবাসী রমণীমোহন চক্রবর্তীর সঙ্গে নির্মলার বিয়ে হয়। বিয়ের পর স্বামী রমণীমোহন চক্রবর্তীকে নির্মলা ভোলানাথ নাম দেন।
বিবাহিত জীবনের পরিচয় চৌদ্দ বছরের শুরুতে নির্মলা সুন্দরীর গার্হস্থ্য জীবনের কুলবধূর ভূমিকা, স্নেহ, সেবা, লজ্জা কোনো কিছুতে ত্রুটি নেই। ভাসুর রেবতীমোহন ও বড়ো জায়ের কাছে সংসারের কাজকর্ম শিখে নিলেন নির্মলা। ১৩২৪ সনে নির্মলা স্বামীর কর্মস্থল বাজিতপুরে এলেন। ভোলানাথ সেটেলমেন্ট বিভাগে চাকরি করেন। এ সময় কৃষ্ণপ্রেমে আকুল হয় নির্মলার মন। একবার ভূদেবচন্দ্র বসুর বাড়িতে কীর্তনের আয়োজন করা হয়েছে। নির্মলা সুন্দরী সেখানে উপস্থিত হয়েছেন। কীর্তন শুরু হলো:
"হরি হরয়ে নমঃ কৃষ্ণ যাদবায় নমঃ
যাদবায় মাধবায় কেশবায় নমঃ।"
কীর্তন শুনতে শুনতে নির্মলার মধ্যে দেবভাবের উদয় হলো। তিনি চৈতন্য হারিয়ে ফেলেন। কীর্তন চলছে সুমধুর কণ্ঠ নিঃসৃত নাম ধ্বনি শুনতে শুনতে নির্মলা সুস্থ হলেন। তার জন্য ওঝা ও ডাক্তার আনা হলে তারা নির্মলা সুন্দরীর দেহে অলৌকিক ক্রিয়াকলাপের চিহ্ন দেখতে পেলেন। রমণীমোহন চক্রবর্তীর গৃহবধূ নির্মলা ধীরে ধীরে প্রকাশিত হয়ে উঠতে লাগলেন সচ্চিনানন্দময়ীরূপে। ১৩২৯ সালের ১৫ অগ্রহায়ণ ভোলানাথ স্ত্রীর নিকট দীক্ষা গ্রহণ করলেন। ভোলানাথের জ্ঞানচক্ষু উন্মীলিত হলো। জানলেন, চিনলেন, তারপর বিদ্যারূপিণী নির্মলাকে গ্রহণ করলেন দেবীরূপে। নির্মলাও স্বামীকে দেখলেন বালগোপালরূপে। এভাবে ভোলানাথ ও নির্মলার দাম্পত্য জীবন দেবভাবে বিকশিত হলো।
অলৌকিকতা: ইংরেজি ১৯২৭ সাল। মা আনন্দময়ী এসেছেন কলকাতায়। ঢাকা শাহবাগের নবাবজাদী পরীবানু তাঁকে খুব ভক্তিশ্রদ্ধা করেন। তাঁরই পুত্র ও কন্যার বিয়ে—তাই মা আনন্দময়ীকে বিশেষ আমন্ত্রণ জানিয়ে নিয়ে এসেছেন। এই শাহবাগেই রমনীমোহন অর্থাৎ ভোলানাথ চাকরি করতেন। কিন্তু পরীবানু মা-কে তাঁর বাগানের বেতনভোগী কর্মচারীর পত্নীরূপে দেখেন না। বরং ঢাকার নবাব দুহিতা তাঁর নিজস্ব নানারকম পারিবারিক অশান্তির কবল থেকে মুক্তিলাভের জন্য মা-র কাছেই আত্মসমর্পণ করেছিলেন।
পরীবানুর ভবনেই একদিন কীর্তনের বন্দোবস্ত করা হয়েছে। মা আনন্দময়ীর স্বর্গীয় কণ্ঠের কীর্তন শুনতে নিমন্ত্রিত হয়ে এসেছেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের স্ত্রী বাসন্তীদেবী ও কন্যা অপর্ণাদেবী। কীর্তনের আসরে আনন্দময়ী মা বসে আছেন। পরনে তাঁর চওড়া লালপাড়ের শাড়ি। কপালে সিঁদুরের বড় ফোঁটা। এক দিব্য-ভাব তাঁর সর্বাঙ্গে, এক স্বর্গীয় সুষমা তাঁর মুখমণ্ডলে।
সকলের অলক্ষে বিস্ময়ে বিহ্বল হয়ে বাসন্তীদেবী স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন মা আনন্দময়ীর দিকে। অপলক নয়নে তাকিয়ে আছেন—কিছুতেই দৃষ্টি ফেরাতে পারছেন না। সকলেই বাসন্তীদেবীর ওই ভাব বিহ্বল মূর্তি দেখে অবাক। কী এমন হল—কেনই বা তিনি মা আনন্দময়ীর দিকে ওভাবে অপলক নয়নে তাকিয়ে আছেন? তাঁর ঘনিষ্ঠ একজন মহিলা এগিয়ে গিয়ে বাসন্তীদেবীর সম্বিৎ ফেরালেন—কী এমন হয়েছে প্রশ্ন করায় বাসন্তীদেবী ধীর অথচ শান্ত কণ্ঠে বললেন—অনেক দিন আগেকার কথা—আমার ঠিক মনে নেই। তবে এই মূর্তিকেই (মা আনন্দময়ী) যেন আমি স্বপ্নে দেখেছিলাম। স্বপ্নে দেখেছিলাম, তিনি আমাকে বলছেন—‘তুমি সাবধান হও। তোমার ভয়ানক বিপদ আসছে।’ এই স্বপ্ন দর্শনের কয়েকদিন পরই চিত্তরঞ্জন দাশ দেহত্যাগ করেন। বাসন্তীদেবী বিধবা হলেন। তাই সেদিন কীর্তনের আসরে স্বপ্নে-দেখা সেই দেবীমূর্তিকে সামনাসামনি দেখে বাসন্তীদেবী নিজের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না, হয়ে পড়েছিলেন ভাব-বিহ্বলা।
গঙ্গাতীরেই ডাঃ পন্থের বাড়ি—সেই বাড়িটাকেই তিনি ‘আনন্দময়ী সেবাশ্রম’ করে গড়ে তুলেছেন। এখানে আসার দু-একদিন পরেই মায়ের শরীর হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ল। পরীক্ষায় ধরা পড়ল ভয়ঙ্কর রক্তশূন্যতা। সেইসঙ্গে সঙ্কটজনক হৃদরোগও দেখা দিল। ডাঃ পন্থ নিজের উপর ভরসা না করে কয়েকজন বিশিষ্ট চিকিৎসক নিয়ে এলেন মায়ের উপযুক্ত চিকিৎসা করতে। সেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা যাবতীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর মায়ের ক্যান্সার হয়েছে বলে সন্দেহ প্রকাশ করলেন। ফলে ডাঃ পন্থ হয়ে পড়লেন দিশেহারা—কী করবেন, ভেবেই পেলেন না। ভোলানাথ হলেন উদ্বিগ্ন। ভক্তবৃন্দ হলেন খুবই চিন্তিত। মুখে না বললেও মনে মনে সবাই ধরে নিলেন, মা-কে এবার আর বাঁচানো যাবে না।
মা ডাঃ পন্থকে বললেন,—’ওষুধ যখন খেয়েছি, তখন রোগীর সব লক্ষণই প্রকাশ পাওয়া চাই তো? তাই ওষুধ খাওয়ার পরই শয্যা নিতে হয়েছে। এটা তো হবেই। যা হবে, তা পূর্ণভাবেই হওয়া চাইতো !’
ওষুধ খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মা’র শরীরে অস্বাভাবিক যৌগিক ক্রিয়া আরম্ভ হয়ে গেল। ওষুধে একটা ছাড়ে তো অন্যটা বাড়ে। জ্বর যদি বা কমলো, হৃদরোগ হয়ে উঠল প্রবল। ফলে দুশ্চিন্তায় কারোর মুখে কোনও কথা নেই। এই ঘোর সঙ্কটের মধ্যেও মায়ের পরিহাসপ্রিয়তা রয়েছে অক্ষুণ্ণ। মৃদু হেসে রহস্য করে তিনি বললেন, ‘নিভিতে গিয়াও বাতি জ্বলিয়া উঠিল। ভালই তো হয়েছে। এই শরীরটা (নিজেকে দেখিয়ে) সকলকেই বলে, বাহির ছেড়ে অন্তরে যেতে চেষ্টা করো। তাই ওষুধ অন্তরকে (হৃদয়কে) ধরেছে। এ তো ঠিকই হয়েছে। এ শরীর বলে বাহির ভিতর এক কর। তাই বাহির ভিতর এখন এক হয়েছে।’ কথা শেষ করে তিনি সরল শিশুর মতই হাসতে লাগলেন।
ডাঃ পন্থ এবার হাত জোড় করে বললেন, ‘মা আমি আর ওষুধ দেব না। আপনি নিজে নিজেই আরোগ্য লাভ করুন।’ ডাঃ পন্থের দিকে একবার তাকিয়ে মা তাঁর স্নেহধন্য ভক্ত অভয়কে নামকীর্তন করতে নির্দেশ দিলেন। কীর্তনানন্দে সবাই ভেসে গেলেন—ভেসে গেল মায়ের রোগ-ব্যাধিও, নাম গানের প্রভাবেই মা ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠলেন। ডাঃ পন্থ ও অন্যান্য চিকিৎসকরা এই সুস্থতা লাভের কোনও কারণ খুঁজে পেলেন না। কারণ, বিজ্ঞানের যুক্তিতে বিনা ওষুধে কোন হৃদরোগী আরোগ্য লাভ করতে পারেন না। অথচ মা পেরেছেন। আধ্যত্মিক শক্তির প্রভাবে বিজ্ঞানের সীমাবদ্ধতা হল প্রমাণিত।
মা আনন্দময়ীর নৃত্য শিল্পের ব্যাখ্যা: মা আনন্দময়ী বললেন, "দেখ, পৃথিবীতে সবই নাচছে। এই যে কথাবার্তা হচ্ছে এও নাচেরই একটা তরঙ্গ ছাড়া আর কি? যেমন-বীজ বুনলে তার মধ্যে একটা স্পন্দন বা তরঙ্গ না থাকলে বীজ থেকে গাছ হতে পারে না। যেমন- জলাশয়ের জলে বাতাস না লাগলে ঢেউ হয় না। সেই রকম সৃষ্টি, স্থিতি ও লয় সবটাতে আছে তরঙ্গ। এ তরঙ্গ হলো নাচ। আবার দেখ, এই নাচের সঙ্গে আধ্যাত্মিকতার সম্বন্ধও আছে। যদি এই ভাবটা নিয়ে কাজ করা যায় তবে সহায়তা হবেই। এই নাচের তরঙ্গ তারপর নিস্তরঙ্গে গিয়ে শেষ তরঙ্গ নিস্তরঙ্গের উপর চলে যাওয়া। যা হতে এ সবই আসছে সেই মূলে যাওয়া চাই, কি বল?"
ঋণী নৃত্যশিল্পী উদয় শঙ্কর: নৃত্য শিল্পের অপরূপ ব্যাখ্যা শুনে বিস্মিত হলেন, নৃত্যশিল্পী উদয় শঙ্কর। তিনি অন্যান্য শিল্পীদের বললেন, "দেখ, মা তো আর নৃত্যকলা বিদ্যায় শিক্ষাপ্রাপ্ত নন, কিন্তু কি সুন্দর ব্যাখ্যা করলেন। নৃত্যকলার এমন সুন্দর প্রাঞ্জল ব্যাখ্যা পূর্বে শুনিনি। আমি মায়ের কাছে চিরঋণী হয়ে রইলাম। নৃত্যশিল্পী উদয় শঙ্কর যে মায়ের কাছে চিরঋণী হয়ে রইলেন তিনিই মা আনন্দময়ী জগজ্জননী।
আনন্দময়ীর আশ্রম নির্মাণের কাহিনি: ১৯২৪ সালে ভোলানাথ নবাবের বাগানের তত্ত্বাবধায়কের চাকরি নিয়ে চলে এলেন ঢাকার শাহবাগে। শাহবাগে অবস্থানকালে মায়ের অলৌকিক শক্তির প্রকাশ ঘটতে থাকে। এই শাহবাগে সিদ্ধেশ্বরী মা কালীর পীঠস্থানে নির্মলার মধ্যে মাতৃমূর্তি প্রকটিত হয়। নির্মলা হলেন শাহবাগের মা, ঢাকার মা।
প্রবাদ আছে যে, সিদ্ধেশ্বরী গাছ বা ঐ স্থানের অশ্বথ বৃক্ষ থেকে এক সময় একটি জ্যোতি বেরিয়ে কালীমূর্তির সঙ্গে মিলিয়ে গিয়েছিল। শোনা যায়, সুমেরুবন নামে এক সন্ন্যাসী এখানে কালীমন্দির স্থাপন করেন। এরই পাশে ছিল অশ্বত্থ বৃক্ষ।
প্রথম দিন রাতে মা ভোলানাথ লণ্ঠন নিয়ে মন্দির দেখে চলে এলেন। কালীমন্দিরের সাথে ছিল একটি পঞ্চমুণ্ডীর আসন। ভাইজী শ্রীমা ও ভোলানাথ এসেছে সিদ্ধেশ্বরীতে। মন্দিরের উত্তর পার্শে মা একটি কুণ্ডস্থল আবিষ্কার করেন। দক্ষিণ দিকে মুখ করে, ওখানে মা বসে পড়েন এবং তার মুখ থেকে স্তোত্রাদি বের হতে থাকে। দিব্যভাব উন্মাদনায় মা ধারণ করলেন আনন্দময়ীর মূর্তি। ভাইজীর কণ্ঠ থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে উচ্চারিত হলো' 'আনন্দময়ী মা'। ভাইজি তখন ভোলানাথকে বললেন, "আজ থেকে আমরা শুধু মা বলে ডাকব না, বলব আনন্দময়ী মা।"
১৯২৬ সালের মার্চ মাসে সিদ্ধেশ্বরীতে প্রথম মায়ের ঘর নির্মাণ করা হয়। এখানে মা আনন্দময়ীর আশ্রমের সূত্রপাত। এটিই মায়ের আদি আশ্রম। এ আশ্রম সিদ্ধেশ্বরীর মন্দিরের পিছনের দিকে অবস্থিত। এ বছরই সিদ্ধেশ্বরীতে প্রথম বাসন্তী পূজা অনুষ্ঠিত হয়।
মানুষের মনকে ভগবৎমুখী হওয়ার জন্য তিনি দিয়ে গেছেন অশেষ প্রেরণা। বাংলাদেশের রমনা ও খেওড়ার দুটি আশ্রমসহ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে তার প্রতিষ্ঠিত ২৫টি আশ্রমের কথা জানা যায়।
ঢাকা ত্যাগ: ঢাকায় দীর্ঘদিন অতিবাহিত করার পর একদিন মা ভক্তদের বললেন, আজই ঢাকা ছেড়ে চলে যাবেন। "তোমরা এ শরীরটাকে ছেড়ে দাও। এ শরীর আজই ঢাকা ছেড়ে চলে যাবে।" যেমন কথা তেমন কাজ। মা একটিমাত্র পরিধেয় বস্ত্র সম্বল করেই ঢাকা ত্যাগ করলেন। ১৯৩২ সালের জুন মাসে মা আনন্দময়ী ভোলানাথ ও ভাইজিসহ বহুপথ অতিক্রম করে দেরাদুনে পৌঁছেন। সেখানকার কয়েকটি ধর্মপ্রাণ পরিবার মায়ের সান্নিধ্যে এসে মায়ের দিব্যভাবের পরিচয় জানলো।
এখানে কমলা নেহেরু, পণ্ডিত জওহরলাল, মহাত্মা গান্ধী, রাজেন্দ্রপ্রসাদ, বল্লভ ভাই প্যাটেল, মদনমোহন মালব্য প্রভৃতি সে যুগের জাতীয় নেতারা সকলেই মা আনন্দময়ীর আধ্যাত্মিক জীবন লীলা উপলব্ধি করেন এবং তা প্রচার করেন।
মা আনন্দময়ী মানুষকে আধ্যাত্মিকভাবে উদ্বুদ্ধ করার জন্য উপমহাদেশের পূর্ব, পশ্চিম, উত্তর, দক্ষিণ সর্বত্র পরিভ্রমণ করেছিলেন। তিনি নৈমিষ্যারণ্যে উপস্থিত হয়ে এ তীর্থস্থানের পুনরুজ্জীবন ঘটান।
মা আনন্দময়ীর বাণী :
১. যে যে অবস্থায় আছ, সেই অবস্থায় থেকেই কর্তব্য কর্ম করে যাও। এই সংসারটা ভগবানের, আমি সেবক মাত্র।
২. নাম, নাম কর। শুধু নাম, নামেই সব হয়। শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে সঙ্গে সহজ ও সমভাবে নাম ও মন্ত্র জপ কর।
৩. হরি ভজন কর ভাই
হরি ভজন কর
হরি ভজন বিনা অন্য গতি নাই।
৪. এ সবই তার লীলা। নিজেকে নিয়েই নিজে খেলা করছেন।
৫. কর্ম করে কে? কর্মও তিনি করছেন, ফলভোগও তিনি করছেন।
৬. উপদেশ সকল স্থানেই ছড়িয়ে আছে। কেবল কুড়িয়ে নিতে পারলেই হয়।
মহাপ্রয়াণ: মায়ের জীবন জুড়ে এরকম অলৌকিক ঘটনার নিত্য আনাগোনা। মা নিজেই নিজের বিদায়-ক্ষণ হিসেবে রাধা অষ্টমী তিথিকে সূচিত করেছিলেন। ১৯৮২ সালের ২৭ আগস্ট দিনটি ছিল ‘রাধা অষ্টমী।’ মা তাঁর নির্দিষ্ট দিনেই দেরাদুনে মহাসমাধিতে নিমগ্ন হন। এ এক পরম অলৌকিক ঘটনা।
তথ্যসূত্র: বিভিন্ন লেখকের লেখা মা আনন্দময়ীর জীবনী ও অন্তর্জাল।
০
০ মন্তব্য