সিনিয়র শিক্ষক
০১ আগস্ট, ২০২৪ ০২:৫৫ অপরাহ্ণ
সিনিয়র শিক্ষক
সুখী ও স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবন যাপনের জন্য আল্লাহ তায়ালা মানুষকে সম্পদ ও জ্ঞান দান করেছেন। সম্পদ সবসময় এক জায়গায় স্থির থাকেনা। আর্থিক প্রয়োজন সামাল দিতে গিয়ে মানুষ কোনো কোনো সময় অন্যের কাছ থেকে ঋণ নেই বা কাউকে ঋণ দেয়। এক্ষেত্রে ইসলামী অর্থনীতির একটি পরিভাষা হলো 'কর্জে হাসানা'। কর্জে হাসানা হলো আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বিনা শর্তে মানুষকে ঋণ দেওয়া। যে ব্যক্তি প্রফুল্ল চিত্তে মানুষকে অর্থ ধার দেয় এবং ধার দেওয়ার পর গ্রহীতার প্রতি দয়া প্রদর্শন করে, কষ্ট দেয় না এবং ঋণ পরিশোধের জন্য বিনা কারণে হয়রানিও করে না, প্রকৃতপক্ষে সে যেন আল্লাহকে ঋণ দিয়েছে। আল্লাহ তায়ালা মানুষকে ঋণ গ্রহণের অনুমতি দিয়েছেন কিন্তু ঋণ কেন্দ্রিক সুদ আদান প্রদান কে কঠোর ভাষায় হারাম ঘোষণা করেছেন। রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মতকে শিক্ষা দেওয়ার জন্য নিজে ঋণ গ্রহণ করেছেন। পবিত্র কুরআনের ৬টি আয়াতে মোট ১২টি স্থানে কর্জে হাসানার কথা বর্ণনা করা হয়েছে। কর্জে হাসানা একটি কল্যাণময় আমল এবং এটি মানবতার প্রতি বিশেষ দয়া ও অনুগ্রহ। কর্জে হাসানা (উত্তম ঋণ) দ্বারা উদ্দেশ্য হলো- আল্লাহ তায়ালার রাস্তায় খরচ করা, অভাবী, এতিম-মিসকিন ও বিধবাদের ব্যয়ভার বহন করা, ঋণী ব্যক্তিদের ঋণ পরিশোধে সাহায্য করা ইত্যাদি। মোটকথা, মানবকল্যাণের জন্য গৃহীত আর্থিক খাতগুলো কর্জে হাসানার অন্তর্ভুক্ত।
১.কর্জে হাসানা কী?
আলকরজু القرض এটি আরবি শব্দ। এটি কিরাজ শব্দমূল থেকে উৎপন্ন। এর অর্থ হলো ঋণ। এটি বাংলা ভাষায় 'কর্জ’ নামে পরিচিত। আরবিতে এর সমার্থক শব্দ হলো الدين। আদ-দায়ন এর বাংলা প্রতিশব্দ হচ্ছে দেনা, ধার, হাওলাত ইত্যাদি। কর্জ শব্দটি আর্থিক বিষয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট, আদ-দায়ন শব্দটি আর্থিক এবং বস্তুগত উভয় ধরনের ঋণ কে সম্পৃক্ত করে।
'কর্জে হাসানা' হলো-
هو ما يُعطيهِ الشخصُ المُقرِضُ مِنَ المالِ ونحوِهِ قُرْبةً وإرْفَاقًا للشَّخصِ المقترِضِ دونَ اشتراطِ زيادة، لِيَرُدَّ إليْهِ مِثلهُ؛
ঋণ দাতা ব্যক্তি ঋণ গ্রহীতার সাথে সৌহার্দ্য ও ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে কোনো অতিরিক্ত গ্রহণ ব্যতীত পূনরায় ফেরতের মানষে প্রদান করে থাকে।
(ইবনে আশুর, আত তাহরীর ওয়াত তানভীর)
ইমাম কুরতুবি (রহঃ) বলেন,
القرض اسم لكلٌ ما يُلتمس عليه الجزاء
অর্থাৎ, কর্জ প্রত্যেক ঐ বস্তুর নাম যার বিপরীতে বিনিময় চাওয়া হয়। ( তাফসির কুরতুবী,৩/৩৩৯) । এ অর্থে মুমিনের ইহকালীন দানকে 'কর্জ' বলা হয়। কেননা প্রত্যেক দানশীল মুমিন দানের বিনিময় পরকালে আল্লাহর কাছে সাওয়াব প্রার্থনা করে।
আবার কেউ কেউ বলেন, ঋণ হলো-
دَفْعُ مَالٍ إِرْفَاقًا لِمَنْ يَنْتَفِعُ بِهِ وَيَرُدُّ بَدَلَهُ،
কোনো ব্যক্তি অপর ব্যক্তিকে মাল (ধার) দেওয়া, যাতে সে নিজের প্রয়োজন মেটাতে পারে এবং পরে সে তার এ (দেনা) আবার ফিরিয়ে দেয়।
(হাশিয়ায়ে ইবনে আবেদিন শামী, ৪/১৭১)
'হাসানা' শব্দটি ইহসান শব্দমূল থেকে উৎপন্ন। এর অর্থ হলো অন্যের প্রতি দয়া দেখানো, উত্তম কাজ করা। সুতরাং ইহসান হলো এমন একটি কাজ যার দ্বারা অন্যের উপকার হয় এবং কাজটির সম্পাদনে সে বাধ্য নয়। এটি আল কুরআনের একটি পরিভাষা। আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি লাভের আশায় পার্থিব কোন স্বার্থ ব্যতিরেকে ফেরত না নেওয়ার শর্তে যখন কাউকে কিছু দেয়া হয় তখন তাকে القرض الحسنة (কর্জে হাসানা) বা উত্তম ঋণ বলা হয়।
ইসলামী পরিভাষায় আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায়, সাওয়াবের নিয়তে বিনা শর্তে কাউকে কোন কিছু ঋণ দিলে তাকে 'কর্জে হাসানা’ বা উত্তম ঋণ বলা হয়। এতে মানুষ দুনিয়া ও আখেরাতে উপকৃত হয় এবং পারস্পরিক ভালোবাসা বৃদ্ধি পায় ও সামাজিক ঐক্য সুদৃঢ় হয়। আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থায় কর্জে হাসানার গুরুত্ব ও তাৎপর্য অপরিসীম। ইমাম শামসুদ্দিন আবু আব্দিল্লাহ মুহাম্মদ কুরতুবী (রহঃ) বলেন,
القرض الحسن ما قصد به وجه الله تعالى خالصا من المال الطيب
একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে সম্পদ দান করাকে কর্জে হাসানা বলে। (তাফসীরে কুরতুবী ১৯/৫৮)
মহান আল্লাহ বলেন,
مَنۡ ذَا الَّذِیۡ یُقۡرِضُ اللّٰهَ قَرۡضًا حَسَنًا فَیُضٰعِفَهٗ لَهٗۤ اَضۡعَافًا کَثِیۡرَۃً ؕ وَ اللّٰهُ یَقۡبِضُ وَ یَبۡصُۜطُ ۪ وَ اِلَیۡهِ تُرۡجَعُوۡنَ .
কে সে, যে আল্লাহকে কর্জে হাসানা প্রদান করবে? তিনি তার জন্য তা বহুগুণ বৃদ্ধি করবেন। আর আল্লাহ সংকুচিত ও সম্প্রসারিত করেন । আর তাঁর নিকটই তোমাদেরকে ফিরে যেতে হবে। (সুরা বাকারা- ২৪৫)
এখানে কর্জ শব্দটি রূপক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। আল্লাহকে ঋণ দেওয়ার অর্থ হল আল্লাহর বান্দাদেরকে ঋণ দিয়া তাদের অভাব পূরণ করা, দুঃখ-কষ্ট লাঘব করা ইত্যাদি।
হযরত ইবনে আরাবী (রহঃ) বলেন, এ আয়াত নাজিল হওয়ার পর মানুষের মধ্যে তিন ধরণের প্রভাব দেখা দিয়েছিল।
১. কাফের মুশরিকরা প্রিয় নবীজির দিকে দৃষ্টি দিয়ে বলাবলি করছিল যে, তার প্রভু অভাবী এবং মুখাপেক্ষী হয়ে পড়েছেন আর আমরা তো অভাবমুক্ত। (নাউজুবিল্লাহ)
২. অপর একদল এই আয়াত শুনে অতিমাত্রায় কার্পণ্যতা অবলম্বন করেছিল। তারা নিজেদের ধন সম্পদগুলো এমনভাবে গচ্ছিত রেখেছিল আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করার সৌভাগ্য তাদের হয়নি।
৩. তৃতীয় একদল নিষ্ঠাবান মুমিন, যারা আয়াত নাজিল হওয়ার সাথে সাথে আল্লাহর ডাকে সাঁড়া দিয়ে নিজেদের সবচেয়ে পছন্দনীয় সম্পদ আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করেছিলেন। হযরত আবু দাহদা রাদিআল্লাহু আনহু তাদের মধ্যেই একজন। হাদীসে বর্ণিত হয়েছে,
لمانزلت : (من ذا الذي يقرض الله قرضا حسنا فيضٰعفه له ) قال أبو الدحداح الأنصاري : يا رسول الله وإن الله ليريد منا القرض ؟ قال : " نعم يا أبا الدحداح " قال : أرني يدك يا رسول الله . قال : فناوله يده قال : فإني قد أقرضت ربي حائطي . قال : وحائط له فيه ستمائة نخلة وأم الدحداح فيه وعيالها . قال : فجاء أبو الدحداح فناداها : يا أم الدحداح . قالت : لبيك قال : اخرجي فقد أقرضته ربي عز وجل
উক্ত আয়াত যখন নাযিল হলো তখন হযরত আবু দাহদা আনসারী (রাঃ) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ কি আমাদের নিকট কর্জ চান? তিনি বললেন, হ্যাঁ। তখন তিনি বললেন, হে আল্লাহর রসূল! আমাকে আপনার হাতটি দিন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাত তার দিকে এগিয়ে দিলে তিনি বলেন, আমি আমার রবকে আমার বাগানটি কর্জ দিলাম। বাগানটিতে ৬০০ টি খেজুর গাছ ছিল। এবং সেখানে তার পরিবারবর্গ ছিলেন। বর্ণনাকারী বলেন, আবু দাহদা রাদিআল্লাহু আনহু পরিবারের কাছে আসলেন। তার স্ত্রীকে বললেন,হে উম্মুদ দাহদা! ঘর ও বাগান থেকে বের হও। কেননা আমি এই বাগানটিকে পরাক্রমশালী আমার রব কে কর্জ দিয়েছি। (তাবরানী, আল মুজামুল কাবীর ২২/৩০১, সহীহ ইবনে হিব্বান- ৭১৫৯)
পৃথিবীতে সকল সম্পদই আল্লাহর দান। আসমান এবং জমিনের সমস্ত জিনিসই তিনি মানুষের অনুগত করে দিয়েছেন। সম্পদের ব্যাপারে আল্লাহর বিধান হলো,যেন তারা এমন কোন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত না করে যাতে সম্পদ গুটিকয়েক ব্যক্তির হাতে আবর্তিত হতে থাকে। তাই ইসলামে ঋণ বিতরণকে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। ঋণ দাতাকে আল্লাহ তায়ালা পুরস্কৃত করবেন এবং ঋণকে বহুগুণে বৃদ্ধি করবেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন,
اِنَّ الۡمُصَّدِّقِیۡنَ وَ الۡمُصَّدِّقٰتِ وَ اَقۡرَضُوا اللّٰهَ قَرۡضًا حَسَنًا یُّضٰعَفُ لَهُمۡ وَ لَهُمۡ اَجۡرٌ کَرِیۡمٌ
‘নিশ্চয় দানশীল পুরুষ ও দানশীল নারী এবং যারা আল্লাহকে উত্তম ঋণ দেয়, তাদেরকে দেওয়া হবে বহুগুণ বেশী। আর তাদের জন্যে রয়েছে সম্মানজনক পুরস্কার। (সূরা হাদীদ-১৮)।
এখানে আল্লাহকে ঋণ দেওয়া বা কর্জে হাসানার অর্থ আল্লাহর পথে দান করা, আল্লাহর বান্দাকে সাহায্য করা এবং কর্জ দেওয়ার অর্থ হতে পারে। হাদীসে কুদসীতে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তায়ালা বলেন,
اسْتَقْرَضْتُ عَبْدِي فَلَمْ يُقْرِضْنِي
‘আমি আমার বান্দার কাছে ঋণ চেয়েছিলাম, কিন্তু সে আমাকে ঋণ দেয়নি’। (মুসনাদ আহমদ -১০৫৭৮)
২. ইসলামে কর্জে হাসানার বিধান: ইসলামের দৃষ্টিতে মানব জীবনের ঋণ আদান প্রদান করা একটি বৈধ বিষয় এবং রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাদীস দ্বারাও প্রমাণিত। ইসলাম মানবতার ধর্ম। ইসলামের মধ্যে দারিদ্র্য- পীড়িত মানবতাকে সাহায্য সহায়তা করার জন্য সামর্থ্যবানদেরকে বিভিন্নভাবে উৎসাহিত করা হয়েছে। ইসলামে ঋণ দেওয়ার উদ্দেশ্য হচ্ছে দুটি । প্রথমত শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা। দ্বিতীয়ত মানুষকে সাহায্য সহযোগিতা করা। এটির বিধান বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে। যেমন, ক্ষেত্রবিশেষে ঋণ দেওয়া কখনো কখনো ওয়াজিব, কখনো হারাম, কখনো মাকরূহ আবার কখনো মুবাহ। উসুলে ফিকহ এর একটি নিয়ম হলো,
ان من اُبيح له اخذ شيء ابيخ له طلبه ومن لا فلا
অর্থাৎ, কোন জিনিস বৈধ হলে সেটি চাওয়া বৈধ, আবার কোন জিনিস অবৈধ হলে, সেটি চাওয়াও অবৈধ হবে। (আল মাওসুআতুল ফিকহিয়াহ,৪/১৫)
ঋণের বিষয়টিও তেমন। মানুষ যখন জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে পৌঁছে যায় তখন তাকে জীবন বাঁচানোর জন্য ঋণ দেওয়া ওয়াজিব। ঋণগ্রহীতা যখন ঋণের টাকা দিয়ে প্রকাশ্যে পাপ কাজে জড়িত হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে অথবা প্রভাব প্রতিপত্তি বিস্তারের লক্ষ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে বা হত্যাকান্ড চালাতে অবৈধ অস্ত্র কেনার সম্ভাবনা হলে তখন তাকে ঋণ দেওয়া হারাম। ঋণদাতা খোঁটা দেওয়ার আশঙ্কা থাকলে বা এমন প্রয়োজন যা পূরণ করার বিকল্প রয়েছে তখন ঋণ দেওয়া নেওয়াটা মাকরুহ । জ্ঞান বৃদ্ধির জন্য লাইব্রেরী থেকে বই ধার নিয়ে পড়াশুনা চালিয়ে যাওয়া মুস্তাহাব। (ইবনে কুদামা, আল মুগনী- ৬/৪২৯)
৩. ঋণ দেওয়ার ফজিলত: কোন মুমিন বান্দা যখন অপর বান্দাকে সাহায্য এবং সহযোগিতার জন্য এগিয়ে আসে তখন স্বয়ং আল্লাহ তায়ালা ওই বান্দার সাহায্যকারী হয়ে যায়। কর্জে হাসানা এক প্রকারের সহযোগিতা। এর মাধ্যমে ঋণগ্রহীতা বিপদাপদ থেকে সাময়িক মুক্তি পায়। হাদীস শরীফে এসেছে, রাসুলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের দুনিয়াবি সমস্যাগুলোর একটি সমাধান করে দেয়, আল্লাহ তায়ালা তার আখিরাতের সংকটগুলোর একটি মোচন করবেন। যে ব্যক্তি কোনো অভাবগ্রস্তের অভাব মোচনে সাহায্য করবে, আল্লাহ তায়ালাও তাকে দুনিয়া ও আখিরাতে স্বাচ্ছন্দ্য দান করবেন। যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমের দোষ-গুণ গোপন করবে, আল্লাহ তায়ালা দুনিয়া ও আখিরাতে তার দোষ গোপন করবেন। আল্লাহ বান্দার সাহায্যে থাকেন, যতক্ষণ বান্দা তার ভাইয়ের সাহায্যে নিয়োজিত থাকে।’ (সহীহ মুসলিম: হাদিস নং: ২৬৯৯)।
ধনীরা অপেক্ষাকৃত অসহায় ও দুর্বলদেরকে ঋণ প্রদান করলে তা সাদাকাহ হিসেবে আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত হাদিসে রয়েছে, রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
كل قرض صدقة
প্রত্যেক কর্জই সাদাকা। (বায়হাকি, শুয়াবুল ঈমান-৩২৮৫: আল মুজামুস সাগীর-৪০২)।
অপর হাদীসে রয়েছে, কায়েস ইবনে রূমী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, সুলায়মান ইবনে উযনান (রাঃ) হযরত আলকামা (রাঃ) কে তার ভাতা প্রাপ্তির সাপেক্ষ এক হাজার দিরহাম কর্জ দিয়েছিলেন। মেয়াদোত্তীর্ণ হলে সুলায়মান তাকে কঠোরভাবে কর্জ পরিশোধের তাগাদা দিলেন। আলকামা (রাঃ) তার কর্জ ফেরত দিলেন এবং তার প্রতি অসন্তুষ্ট হলেন। কয়েক মাস পর তিনি সুলায়মানের নিকট এসে বলেন, আমাকে নির্দিষ্ট মেয়াদের একহাজার দিরহাম ঋণ প্রদান করুন। তিনি বলেন, হ্যাঁ দিব। সম্মানের সাথে দিব। হে উন্মু উতবাহ! (সোলায়মান ইবনে উজনান এর স্ত্রী) তোমার নিকট রক্ষিত মোহারাঙ্কৃত চামড়ার থলেটি নিয়ে এসো। তিনি তা নিয়ে আসলেন। তিনি বললেন- আল্লাহর কসম! এই দিরহাম গুলো ঐগুলোই, যেগুলো আপনি পরিশোধ করেছিলেন । আমি তা থেকে একটি দিরহামও সরাইনি। আলকামা (রাঃ) বলেন, আল্লাহর জন্য আপনার পিতা উৎসর্গিত হোক! আপনি এ আচরণটি কেন করলেন? তিনি বললেন, আমি আপনার নিকট যা শুনেছি তার কারণেই। তিনি বললেন ,আপনি আমার নিকট কী শুনেছেন? তিনি বললেন, আমি আপনার নিকট শুনেছি আপনি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন, রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
ما من مسلم يقرض مسلما قرضا مرتين الا كان كصدقتها مرة.
কোন মুসলিম অপর মুসলিমকে দুবার কর্জ দিলে সে সেই পরিমাণ মাল একবার দান-খয়রাত করার সমান সাওয়াব পায়। (ইবনে মাজাহ-২৪৩০)
৪.ঋণ থেকে বেঁচে থাকার দোয়া:
অনেক সময় ঋণ গ্রহণের কারণে মানুষ নিঃস্ব হয়ে যায়। পারিবারিক ও সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়। তাই যতটা সম্ভব ঋণ গ্রহণ থেকে বিরত থাকা উচিত। হাদীসে এসেছে,
ক।। উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুয়াতে বলতেন-
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ عَذَابِ القَبْرِ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ فِتْنَةِ المَسِيحِ الدَّجَّالِ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ فِتْنَةِالمَحْيَا وَفِتْنَةِ المَمَاتِ، اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ المَأْثَمِ وَالمَغْرَمِ .
অর্থাৎ, হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে কবরের আযাব থেকে আশ্রয় চাই। মাসীহ দাজ্জালের ফেতনা থেকে আশ্রয় চাই। জীবনের ফেতনা ও মৃত্যুর ফেতনা থেকে আশ্রয় চাই। ইয়া আল্লাহ! আমি আপনার কাছে গোনাহ ও ঋণ থেকে আশ্রয় চাই। কেউ একজন (অন্য বর্ণনায় আছে বর্ণনাকারী নিজেই) জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি ঋণ থেকে এত বেশি আশ্রয় চান! তিনি বললেন, মানুষ যখন ঋণগ্রস্ত হয় তখন কথা বললে মিথ্যা বলে, ওয়াদা করলে ভঙ্গ করে। (সহীহ বুখারী, হাদীস: ৮৩২)
খ।। হযরত আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুয়াতে বলতেন-
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الهَمِّ وَالحَزَنِ، وَالعَجْزِ وَالكَسَلِ، وَالجُبْنِ وَالبُخْلِ، وَضَلَعِ الدَّيْنِ، وَغَلَبَةِ الرِّجَالِ.
অর্থাৎ, হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই দুঃখ-দুশ্চিন্তা থেকে, অক্ষমতা ও অলসতা থেকে, ভীরুতা ও কার্পণ্য থেকে, ঋণের বোঝা ও মানুষের প্রাবল্য (শিকার হওয়া) থেকে। (সহীহ বুখারী, হাদীস- ৬৩৬৯)
৫.ঋণ দেওয়ার সাদকার চাইতেও উত্তম:
কাউকে সাওয়াব লাভের আশায় বন্ধুত্বের মমতায় সহযোগিতার লক্ষ্যে কর্জে হাসানা প্রদান করা আল্লাহর কাছে দান-সাদকার সমতুল্য সাওয়াব। এমনকি এধরনের ঋণ দানকে দান-সাদাকার চেয়েও বেশী মর্যাদাপূর্ণ বলা হয়েছে। হাদীসে এসেছে,
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم رَأَيْتُ لَيْلَةَ أُسْرِيَ بِي عَلَى بَابِ الْجَنَّةِ مَكْتُوبًا الصَّدَقَةُ بِعَشْرِ أَمْثَالِهَا وَالْقَرْضُ بِثَمَانِيَةَ عَشَرَ . فَقُلْتُ يَا جِبْرِيلُ مَا بَالُ الْقَرْضِ أَفْضَلُ مِنَ الصَّدَقَةِ . قَالَ لأَنَّ السَّائِلَ يَسْأَلُ وَعِنْدَهُ وَالْمُسْتَقْرِضُ لاَ يَسْتَقْرِضُ إِلاَّ مِنْ حَاجَةٍ .
হযরত আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে রাতে আমাকে নিয়ে উর্ধাকাশে গমন করা হয় (মেরাজের রাত্রে) সে রাতে দেখি জান্নাতের দরজায় লেখা আছে- সাদাকার সাওয়াব ১০ গুন আর ঋণ প্রদানের সাওয়াব ১৮ গুণ। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি জিবরাঈল (আঃ) কে বললাম, সাদকার চেয়ে ঋণ বেশি উত্তম ব্যাপারটি কেমন? তিনি বললেন, প্রার্থী চায় ,কিন্তু হয়তোবা তার কাছে কিছু আছে। অপরপক্ষে ঋণপ্রার্থী মুখাপেক্ষী হয়েই ঋণ চেয়েছে। (ইবনে মাজাহ, হাদীস-২৪৩১)
হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
كُلُّ قَرْضٍ صَدَقَةٌ
প্রত্যেক ঋণই সাদকাহ। (বায়হাকী, হাদীস -৩২৮৫)
৬. ঋণ হতে হবে শর্তহীন: ঋণদানকারী ব্যক্তি ঋণের টাকা গ্রহণ করার ক্ষেত্রে কোন প্রকার শর্তারোপ করতে পারবেনা। বিশ্ববিখ্যাত তাবেঈ হযরত মুহাম্মদ ইবনে সিরিন (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ব্যক্তি একজনকে পাঁচশত দিরহাম ঋণ দিয়েছে এবং তার ঘোড়ায় চড়ার শর্তারোপ করেছে। একথা শুনে বিখ্যাত সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) বলেন, সে তার ঘোড়ায় চড়ে যে উপকৃত হয়েছে তা রিবা বা সুদ হিসেবে গণ্য হবে। (মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবা, কিতাবুল বুয়ু -২১০৮০)
ইবনে কুদামা বলেন,
وَكُلُّ قَرْضٍ شَرَطَ فِيهِ أَنْ يَزِيدَهُ، فَهُوَ حَرَامٌ، بِغَيْرِ خِلَافٍ. قَالَ ابْنُ الْمُنْذِرِ: أَجْمَعُوا عَلَى أَنَّ الْمُسَلِّفَ إذَا شَرَطَ عَلَى الْمُسْتَسْلِفِ زِيَادَةً أَوْ هَدِيَّةً، فَأَسْلَفَ عَلَى ذَلِكَ، أَنَّ أَخْذَ الزِّيَادَةِ عَلَى ذَلِكَ رَبًّا. وَقَدْ رُوِيَ عَنْ أُبَيِّ بْنِ كَعْبٍ، وَابْنِ عَبَّاسٍ، وَابْنِ مَسْعُودٍ، أَنَّهُمْ نَهَوْا عَنْ قَرْضٍ جَرَّ مَنْفَعَةً.
যে সকল ঋণে অতিরিক্ত কোন কিছু গ্রহণ করার শর্তারোপ করা হয়, তা হারাম হওয়ার ব্যাপারে কোন মতভেদ নেই। ইবনুল মুনযির বলেন, জ্ঞানীগণ এ ব্যাপারে একমত যে, যদি ঋণ দাতা ঋণ গ্রহীতার উপর কোন অতিরিক্ত লাভ বা উপঢৌকনের শর্তারোপ করে এবং ঋণী ব্যক্তি যদি সেটা তাকে প্রদান করে, তাহলে সেই অতিরিক্ত কিছু সুদ হিসাবে গণ্য হবে। হযরত উবাই ইবনে কা‘ব (রাঃ), হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) ও ইবনে মাসউদ (রাঃ) প্রমুখ সাহাবী থেকে এমনটাই বর্ণিত হয়েছে যে, তারা ঋণে লাভ গ্রহণ করতে নিষেধ করেছেন।(ইবনে কুদামা, আল মুগনী, ৪/২৪০)
আমাদের সমাজে অনেক ক্ষেত্রে সুদভিত্তিক ঋণের ভেড়াজালে প্রবেশ করে মানুষ সর্বস্বান্ত হয়ে যাচ্ছে।
আর ইসলামী অর্থব্যবস্থায় মানুষকে অর্থনৈতিক চাপ এবং দারিদ্র মুক্তির জন্য কর্জে হাসানা এর ব্যবস্থা করা হয়েছে। যা অর্থ কষ্টে জর্জরিত ব্যক্তির জন্য অনেক বড় একটি ইহসান। হযরত আবু বুরদাহ ইবনে আবু মুসা (রহঃ) বলেন, একবার আমি মদীনায় এসে হযরত আব্দুল্লাহ বিন সালাম রাদিআল্লাহু আনহুর সাথে সাক্ষাৎ করলাম। তিনি আমাকে বললেন,
إِنَّك بِأَرْض فِيْهَا الرِّبَا فَاش إِذا كَانَ لَكَ عَلَى رَجُلٍ حَقٌّ فَأَهْدَى إِلَيْكَ حِمْلَ تَبْنٍ أَو حِملَ شعيرِ أَو حَبْلَ قَتٍّ فَلَا تَأْخُذْهُ فَإِنَّهُ رِبًا.
তুমি এমন এলাকায় বসবাস করছ, যেখানে সুদের প্রচলন অত্যধিক। অতএব কারো কাছে যদি তোমার কোন পাওনা থাকে, আর সে যদি তোমাকে হাদিয়া বা উপহার হিসাবে এক বোঝা খড় অথবা এক বোঝা যব অথবা এক আঁটি ঘাসও দেয়; তুমি তা গ্রহণ করবে না। কারণ এটা সুদ হিসাবে গণ্য হবে। (সহীহ বুখারী, হাদীস -৩৮১৪)
৭. ইসলামী অর্থ ব্যবস্থায় কর্জে হাসানার ভূমিকা:
পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্ম ইসলামের মূল কথা হলো শান্তির পথে চলা, আত্মসমর্পণ করা ইত্যাদি। সর্বাবস্থায় ইসলামিক বিধি-বিধান মেনে চললে একজন মানুষ দুনিয়া ও আখেরাতে পরিপূর্ণ শান্তিময় জীবন লাভ করতে পারে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তোমরাই শ্রেষ্ঠ জাতি। মানবজাতির কল্যাণের (পরোপকারের) জন্যই তোমাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে। তোমরা ভালো কাজের নির্দেশ দেবে এবং মন্দ কাজে বাধা দেবে।’ (সুরা আলে-ইমরান: আয়াত: ১১০)। ইসলামের প্রাথমিক যুগ থেকে কল্যাণমূলক অর্থব্যবস্থা বাস্তবায়নের জন্য কর্জে হাসানা ছিল উল্লেখযোগ্য একটি হাতিয়ার। কর্জে হাসানাকে তখনকার সময়ে রাষ্ট্রীয় কোষাগার বা বাইতুল মালে আয়ের উৎস হিসেবে বিবেচিত হতো। যেমন, মক্কা বিজয়ের পরে জরুরী রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে প্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্জ গ্রহণ করেছেন।
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আবু রবিয়া আল-মাখযুমি (রাঃ) বর্ণনা করেন, রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুনাইন যুদ্ধের সময় তাঁর কাছ থেকে ৩০ বা ৪০ হাজার দিরহাম ঋণ নিয়েছিলেন। নবীজি যুদ্ধ থেকে ফিরে এসে তাঁর পাওনা পরিশোধ করেন। এরপর নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে দোয়া করে বললেন, ‘আল্লাহ তায়ালা তোমাকে তোমার পরিবার ও সম্পদে বরকত দান করুন। নিশ্চয়ই ঋণের প্রতিদান হলো, তা পরিশোধ করা ও প্রশংসা করা।’ (ইবনে মাজাহ, মুসনাদে আহমদ)
অপর হাদীসে রয়েছে, হযরত আবদুল ওয়াহিদ আ‘মাশ (রহঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, আমরা ইবরাহীম নাখ‘ঈর কাছ ধারে (বাকীতে) ক্রয় করা সম্পর্কে আলোচনা করলাম। তখন তিনি বললেন, আসওয়াদ (রাঃ) হযরত আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ইয়াহুদীর নিকট হতে এক নির্দিষ্ট মেয়াদে (বাকীতে) খাদ্য ক্রয় করেন এবং তার নিকট নিজের লোহার বর্মটি বন্ধক রাখেন। (সহীহ বুখারী, হাদীস-২২৮৬)
পরবর্তীতে খোলাফায়ে রাশেদার মধ্যে হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু এর সময়ে বাইতুল মাল থেকে ব্যাপকভাবে কর্জে হাসানা দেওয়ার প্রথা চালু করেন।
৮.ঋণ গ্রহণের নিয়ম:
ক. ঋণের আদান-প্রদান লিখিত চুক্তির মাধ্যমে হতে হবে। উভয়ের ধার্যকৃত একজন লেখক এ চুক্তিপত্রটি ন্যায়সঙ্গতভাবে লিখে দিবে। চার মাযহাবের সকল ইমামগণ ঐক্যমত পোষণ করে বলেছেন, ঋণ চুক্তিটি ঋণ দাতা ও গ্রহীতার কাছে পরিষ্কার হতে হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন,
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا تَدَايَنتُم بِدَيْنٍ إِلَىٰ أَجَلٍ مُّسَمًّى فَاكْتُبُوهُ
হে মুমিনগণ! যখন তোমরা কোন নির্দিষ্ট সময়ের জন্যে ঋণের আদান-প্রদান কর, তখন তা লিপিবদ্ধ করে নাও। (সূরা বাকারা-২৮২)
খ. ঋণদাতা ও ঋণগ্রহীতার পছন্দমত দুইজন পুরুষ অথবা একজন পুরুষ ও দুইজন মহিলাকে সাক্ষী করতে হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَ اسۡتَشۡهِدُوۡا شَهِیۡدَیۡنِ مِنۡ رِّجَالِکُمۡ ۚ فَاِنۡ لَّمۡ یَکُوۡنَا رَجُلَیۡنِ فَرَجُلٌ وَّ امۡرَاَتٰنِ مِمَّنۡ تَرۡضَوۡنَ مِنَ الشُّهَدَآءِ اَنۡ تَضِلَّ اِحۡدٰىهُمَا فَتُذَکِّرَ اِحۡدٰىهُمَا الۡاُخۡرٰی ؕ
তারপর তোমাদের পুরুষদের মধ্যে থেকে দুজন সাক্ষী কর, যদি দুজন পুরুষ না হয়, তবে একজন পুরুষ ও দুজন মহিলা। ঐ সাক্ষীদের মধ্য থেকে যাদেরকে তোমরা পছন্দ কর যাতে একজন যদি ভুলে যায়, তবে একজন অন্যজনকে স্মরণ করিয়ে দেয়।
(সূরা বাকারার-২৮২)
গ. ঋণ পরিশোধের পদ্ধতি ও সময় উল্লেখ করা:
চুক্তির মধ্যে ঋণ পরিশোধের পদ্ধতি ও সময় উল্লেখ থাকতে হবে। কেননা ঋণ পরিশোধের সময়সীমার মধ্যে ঋণগ্রহীতা ঋণ আদায় করতে না পারলে অনেক সময় উভয়ের মধ্যে ভুল বুঝাবুঝি তৈরি হয়। প্রিয় নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মক্কা থেকে মদিনা হিজরত করেন তখন তিনি জানতে পারলেন যে, অগ্রিম করই চুক্তি হয়েছে সেখানে সময় ও পরিমান সুনির্দিষ্ট করা হয়নি। তখন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ওই চুক্তিতে যারা অংশ নিবে তাদের উচিত সময় ও পরিমান সঠিকভাবে উল্লেখ করা।
৯. ইসলামে ঋণ পরিশোধের গুরুত্বারোপ:
কর্জে হাসানা দেওয়া ঋণদাতার বদান্যতার বহিঃপ্রকাশ। তাই ঋণগ্রহীতার অন্যতম কর্তব্য হলো যথাসময়ে এবং উত্তম ভাবে ঋণ পরিশোধ করা। একবার প্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ব্যক্তির কাছ থেকে একটি উটের বাচ্চা ধার নেন। এরপর তার নিকট বাইতুল মালের উট আসলে তিনি ওই ব্যক্তির উটের ধার পরিশোধের নির্দেশ দেন।
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ رَجُلاً أَتَى النَّبِيَّ صلى الله علي
ه وسلم يَتَقَاضَاهُ بَعِيرًا فَقَالَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم أَعْطُوهُ فَقَالُوا مَا نَجِدُ إِلاَّ سِنًّا أَفْضَلَ مِنْ سِنِّهِ فَقَالَ الرَّجُلُ أَوْفَيْتَنِي أَوْفَاكَ اللهُ فَقَالَ رَسُولُ اللهِ صلى الله عليه وسلم أَعْطُوهُ فَإِنَّ مِنْ خِيَارِ النَّاسِ أَحْسَنَهُمْ قَضَاءً
হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত যে, একজন লোক নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট তার (প্রাপ্য) উটের তাগাদা দিতে আসে। আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদের বললেন, তাকে একটি উট দিয়ে দাও। তাঁরা বললেন, তার চেয়ে উত্তম বয়সের উটই পাচ্ছি। লোকটি বলল, আপনি আমাকে পূর্ণ হক দিয়েছেন, আল্লাহ আপনাকে যেন পূর্ণ হক দেন। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাকে সেটি দিয়ে দাও। কেননা, মানুষের মধ্যে সেই উত্তম, যে উত্তমরূপে ঋণ পরিশোধ করে।(সহীহ বুখারী-২৩৯২)
ঋণ পরিশোধ করাকে প্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সওয়াবের কাজ বলে আখ্যায়িত করেছেন।
তিনি বলেছেন, যে ব্যক্তি ঋণদাতার নিকট গমন করবে তার পাওনা পরিশোধের নিমিত্তে জমিনের চতুষ্পদ জন্তু এবং পানির মাছ তার জন্য দোয়া করতে থাকবে। আল্লাহর রাব্বুল আলামীন তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ এর জন্য জান্নাতে একটি করে গাছ রোপণ করবেন এবং একটি করে গুনাহ মাফ করে দেবেন। (বায়হাকি, শুয়াবুল ঈমান -১১২৩৩, মুসনাদুল বাযযার-৪৬৯৬)
১০.ঋণ পরিশোধে সময় দেওয়া:
ঋণ নেওয়ার পর কিছু মানুষ পরিশোধের ক্ষেত্রে উদাসীন হয়ে যায়। এ ধরনের আচরণ কখনো কাম্য নয়। তাদের ক্ষেত্রে কঠোর হওয়ার যেমন বৈধতা রয়েছে, তেমনি যারা অসচ্ছলতার দরুন ঋণ পরিশোধে সক্ষম হচ্ছে না তাদেরকে সময় দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন,
وَ اِنۡ کَانَ ذُوۡ عُسۡرَۃٍ فَنَظِرَۃٌ اِلٰی مَیۡسَرَۃٍ ؕ وَ اَنۡ تَصَدَّقُوۡا خَیۡرٌ لَّکُمۡ اِنۡ کُنۡتُمۡ تَعۡلَمُوۡنَ
‘এবং কোনো (দেনাদার) ব্যক্তি যদি অসচ্ছল হয়, তবে সচ্ছলতা লাভ পর্যন্ত (তাকে) অবকাশ দেওয়া উচিত। আর যদি সাদকা করে দাও, তবে তোমাদের পক্ষে সেটা অধিকতর শ্রেয়, যদি তোমরা উপলব্ধি করো’ (সুরা বাকারা : ২৮০)। হাদিস শরিফে এসেছে, অসচ্ছল ব্যক্তিদের ঋণ পরিশোধে যতদিন সময় দেবে সে ততদিন সাদকার সাওয়াব পেতে থাকবে।
عَنْ بُرَيْدَةَ الأَسْلَمِيِّ، عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ مَنْ أَنْظَرَ مُعْسِرًا كَانَ لَهُ بِكُلِّ يَوْمٍ صَدَقَةٌ وَمَنْ أَنْظَرَهُ بَعْدَ حِلِّهِ كَانَ لَهُ مِثْلُهُ فِي كُلِّ يَوْمٍ صَدَقَةٌ
হযরত বুরাইদা আল-আসলামী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে গরিবকে (তার ঋণ আদায়ে) সময় দেবে, সে প্রতিদিন সাদকা দেওয়ার মতো সাওয়াব পাবে। আর যে ব্যক্তি তার মেয়াদ চলে যাওয়ার পরও তাকে সময় দেবে, সে প্রতিদিন সেই ঋণের সমপরিমাণ সাদকা করার সওয়াব পাবে’ (ইবনে মাজাহ : ২৪১৮)। প্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অসচ্ছল ব্যক্তিদেরকে ঋণ পরিশোধের অবকাশ দিতে উদ্বুদ্ধ করে আরো বলেন, যে ব্যক্তি কোন ঋণগ্রস্থকে ঋণ প্রদানে অবকাশ প্রদান করবে অথবা মাফ করে দিবে আল্লাহ তায়ালা তাকে কিয়ামতের দিন স্বীয় আরশের ছায়াতে আশ্রয় প্রদান করবেন। সেই দিন, যেদিন তার ছায়া ছাড়া আর কোন ছায়া থাকবেনা। (আল মুজামুল কাবীর, হাদীস-৩৭২, সুনান দারেমী, হাদীস: ২৫৮৮)
১১. ঋণ পরিশোধ না করার পরিণতি: ঋণ গ্রহীতার দায়িত্ব হলো যথাসময়ে ঋণ পরিশোধ করা। যথাসময়ে ঋণ পরিশোধ না করা বান্দার হক নষ্ট করার শামিল। হাদীসের ভাষ্য অনুযায়ী ঋণগ্রস্থ ব্যক্তি শহীদ হওয়া সত্ত্বেও ঋণের গুনাহ মাফ হবে না। রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
" الْقَتْلُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ يُكَفِّرُ كُلَّ شَىْءٍ إِلاَّ الدَّيْنَ
আল্লাহর পথে শহীদ হওয়া ঋণ ব্যতীত সকল বিষয়ে ক্ষমা করিয়ে দেয়। (সহীহ মুসলিম, হাদীস-৪৭৭৮)
অপর হাদিসের রাসুলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,তোমাদের অমুক সাথী ঋণগ্রস্ত হওয়ার কারণে জান্নাতের দরজায় আটকে আছে।তুমি চাইলে তাকে মুক্ত করতে পারো চাইলে তাকে আল্লাহর শাস্তি গ্রহণের জন্য সমর্পণ করতে পারে অথবা লোকটি তা পরিশোধ করলো। (হাকেম, মুস্তাদরাক,২২১৩: বায়হাকি, সুনানুল কুবরা -১১৫১৯)
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ عَنْ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ مَنْ أَخَذَ أَمْوَالَ النَّاسِ يُرِيدُ أَدَاءَهَا أَدَّى اللهُ عَنْهُ وَمَنْ أَخَذَ يُرِيدُ إِتْلاَفَهَا أَتْلَفَهُ اللهُ
হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি মানুষের মাল (ধার) নেয় পরিশোধ করার উদ্দেশ্যে, আল্লাহ তায়ালা তা আদায়ের ব্যবস্থা করে দেন। আর যে তা গ্রহণ করে বিনষ্ট করার নিয়তে আল্লাহ তায়ালা তাকে ধ্বংস করেন।(সহীহ বুখারী, হাদীস -২৩৮৭)
১২. ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির জানাযায় নবীজি যা প্রশ্ন করতেন:
ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির আত্মা কবরে ঝুলে যাবে, আসমানের দিকে যাবে না যতক্ষণ না তার ঋণ পরিশোধ করা হবে। তাই বিশেষ প্রয়োজন না হলে বা একান্ত বাধ্য না হলে ঋণ গ্রহণ করা ঠিক নয়। প্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,তোমরা ঋণ থেকে বেঁচে থাকো। কারণ এটি রাতে দুশ্চিন্তা এবং দিনের বেলায় লাঞ্ছনার কারণ। (বায়হাকি, শুয়াবুল ঈমান, হাদীস- ৫৫৫৪)
ইসলামের প্রাথমিক অবস্থায় প্রিয় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি মারা গেলে তার জানাজার নামাজ আদায় করতেন না।
হযরত আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক জানাজায় আসলেন নামাজ আদায়ের জন্য। তিনি বললেন, তার ওপর কি ঋণ আছে? তারা বললেন, হ্যাঁ। অতঃপর নবীজি বললেন, জিবরাঈল (আঃ) তার জানাজার নামাজ আদায় করতে আমাকে নিষেধ করেছেন এবং বলেছেন নিশ্চয় (ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি) কবরে বন্ধক থাকবে যতক্ষণ না তার ঋণ পরিশোধ করা হবে। অতঃপর নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার জানাজা আদায় করা থেকে বিরত থাকেন। (মুসনাদু আবু ইয়ালা -৩৪৭৭)
অপর হাদীসে বর্ণিত হয়েছে,
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم كَانَ يُؤْتَى بِالرَّجُلِ الْمُتَوَفَّى عَلَيْهِ الدَّيْنُ فَيَسْأَلُ هَلْ تَرَكَ لِدَيْنِهِ فَضْلاً فَإِنْ حُدِّثَ أَنَّهُ تَرَكَ لِدَيْنِهِ وَفَاءً صَلَّى وَإِلاَّ قَالَ لِلْمُسْلِمِينَ صَلُّوا عَلَى صَاحِبِكُمْ فَلَمَّا فَتَحَ اللهُ عَلَيْهِ الْفُتُوحَ قَالَ أَنَا أَوْلَى بِالْمُؤْمِنِينَ مِنْ أَنْفُسِهِمْ فَمَنْ تُوُفِّيَ مِنْ الْمُؤْمِنِينَ فَتَرَكَ دَيْنًا فَعَلَيَّ قَضَاؤُهُ وَمَنْ تَرَكَ مَالاً فَلِوَرَثَتِهِ
হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত , আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট যখন কোন ঋণী ব্যক্তির জানাযা উপস্থিত করা হতো তখন তিনি জিজ্ঞেস করতেন, সে তার ঋণ পরিশোধের জন্য অতিরিক্ত মাল রেখে গেছে কি? যদি তাকে বলা হত যে, সে তার ঋণ পরিশোধের মতো মাল রেখে গেছে তখন তার জানাযার সালাত আদায় করতেন। নতুবা বলতেন, তোমাদের সাথীর জানাজা আদায় করে নাও। পরবর্তীতে যখন আল্লাহ তাঁর বিজয়ের দ্বার উন্মুক্ত করে দেন, তখন তিনি বললেন, আমি মুমিনদের জন্য তাদের নিজের চেয়েও অধিক নিকটবর্তী। তাই কোন মুমিন ঋণ রেখে মারা গেলে সে ঋণ পরিশোধ করার দায়িত্ব আমার। আর যে ব্যক্তি সম্পদ রেখে যায়, সে সম্পদ তার উত্তরাধিকারীদের জন্য। (সহীহ বুখারী, হাদীস:২২৯৮)
এমনকি ঋণ গ্রহণ করে সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কেউ যদি তা পরিশোধ না করে তাহলে সে চোর হিসেবে সাব্যস্ত হবে। রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি ঋণ গ্রহণ করলো তার দৃঢ় ইচ্ছা যে সে উহা তাকে পরিশোধ করবে না, তবে কিয়ামতের দিন সে চোর হিসেবে আল্লাহর সাথে সাক্ষাত করবে। (ইবনে মাজাহ, হাদীস :২৪১০)
১৩. ঋণ পরিশোধে সময় দেওয়া জান্নাতে যাওয়ার উপায়:
عَنْ أَبِي مَسْعُودٍ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم حُوسِبَ رَجُلٌ مِمَّنْ كَانَ قَبْلَكُمْ فَلَمْ يُوجَدْ لَهُ مِنَ الْخَيْرِ شَيْءٌ إِلاَّ أَنَّهُ كَانَ رَجُلاً مُوسِرًا وَكَانَ يُخَالِطُ النَّاسَ وَكَانَ يَأْمُرُ غِلْمَانَهُ أَنْ يَتَجَاوَزُوا عَنِ الْمُعْسِرِ فَقَالَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ نَحْنُ أَحَقُّ بِذَلِكَ مِنْهُ تَجَاوَزُوا عَنْهُ
হযরত আবু মাসউদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, তিনি বলেন, রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের পূর্ববর্তী যুগের জনৈক ব্যক্তির ব্যক্তির হিসাব নেওয়া হয়। কিন্তু তার কোন ভাল আমল পাওয়া গেল না। তবে সে ছিল একজন স্বচ্ছল ব্যক্তি। সে মানুষের সঙ্গে লেন-দেন করত। আর সে অভাবীদের মাফ করে দিতে তার গোলামদের নির্দেশ দিত। তখন আল্লাহ তায়ালা বললেন, মাফ করার বিষয়ে তার চাইতে আমিই অধিক হকদার। সুতরাং একে মাফ করে দাও। ( তিরমিজি, হাদীস-১৩১০)
পূর্ববর্তী মনীষীগণ কারো কাছ থেকে কিছু ধার নিলে সেটি যথাযথভাবে ফেরত দিতে তৎপর থাকতেন। একদা হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মোবারক (রহঃ) সিরিয়ায় গিয়ে এক লোকের কাছ থেকে একটি কলম ধার নিয়েছিলেন। ভুলে সেটি ফেরত না দিয়ে তিনি তুর্কেমিনিস্তান পৌঁছে যান । সেখানে পৌঁছে যখন কলমটির কথা মনে হলো। অবশেষে সেটি ফেরত দেওয়ার জন্য তিনি পুনরায় সিরিয়ার পথ ধরলেন।
দারিদ্র বিমোচন ও অসহায়ত্ব নিরসনের জন্য কর্জে হাসানা অতীব পরিচিত ও গুরুত্বপূর্ণ একটি পরিভাষা। বর্তমান আধুনিক বিশ্বেও এই কাজটাকে বিভিন্ন নাম দিয়ে ব্যবহার করা হচ্ছে। ইসলামের ঋণ গ্রহণ করা জায়েজ হলেও পরিশোধ করা ওয়াজিব। কর্জে হাসানার সাওয়াব লাভের প্রধান শর্ত হলো, ঋণ দেয়া হবে শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এবং ব্যক্তির উপকার করার নিয়তে। এ ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্য থাকলে বর্ণিত সওয়াব হাসিল হবে না। তাই ঋণগ্রহীতাকে কোনো ধরনের খোঁটা দেওয়া বা অন্য কোনোভাবে কষ্ট দেওয়া থেকে দূরে থাকতে হবে। কেননা খোঁটা দেওয়ার মাধ্যমে আমলের সাওয়াব নষ্ট হয়ে যায়। প্রত্যেক সামর্থ্যবান বৃত্তশালীদের উচিত অসচ্ছল ও অসহায় মানুষদেরকে ঋণ সহায়তা প্রদান করা। ধনীরা যদি এই কাজে এগিয়ে আসে তাহলে সমাজে অর্থনৈতিক ভারসাম্যতা রক্ষা হবে, সমাজে দারিদ্রতা দূরীভূত হবে এবং দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরে আসবে।
---------------
মাওলানা মুহাম্মদ মুনিরুল হাছান
সিনিয়র শিক্ষক (ইসলাম শিক্ষা)
চট্টগ্রাম কলেজিয়েট স্কুল এন্ড কলেজ।
৫৩
৯২ মন্তব্য