সহকারী শিক্ষক
২৬ আগস্ট, ২০২৪ ০২:২০ অপরাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০২৪,
দৈনিক প্রথম আলো
দেশকে সমৃদ্ধ করতে বিজ্ঞান শেখার বিকল্প নেই—মোহাম্মদ কায়কোবাদ
অধ্যাপক মোহাম্মদ কায়কোবাদ কম্পিউটারবিজ্ঞানী। বুয়েটের কম্পিউটারবিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের সাবেক অধ্যাপক, বর্তমানে শিক্ষকতা করছেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে। একসময় তাঁর প্রচেষ্টায় বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো শুরু হয় গণিত অলিম্পিয়াড। ভূমিকা রেখেছেন স্কুল পর্যায়ের পাঠ্যবই সম্পাদনায়ও।
সম্প্রতি তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বিজ্ঞানবিষয়ক মাসিক ম্যাগাজিন বিজ্ঞানচিন্তার নির্বাহী সম্পাদক আবুল বাসার ও সহসম্পাদক উচ্ছ্বাস তৌসিফ। ছবি তুলেছেন আশরাফুল আলম।
বিজ্ঞানচিন্তা: বিজ্ঞানচিন্তায় আপনাকে স্বাগত। কেমন আছেন?
মোহাম্মদ কায়কোবাদ: আমি ভালো আছি। ধন্যবাদ।
বিজ্ঞানচিন্তা: দীর্ঘদিন বাংলাদেশে গণিত অলিম্পিয়াড করছেন। আইডিয়াটা কীভাবে মাথায় এল? কেন চাইলেন যে বাংলাদেশে এমন একটা অলিম্পিয়াড হওয়া উচিত?
মোহাম্মদ কায়কোবাদ: কীভাবে মাথায় এসেছে, তা আসলে গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমার বিশ্বাস, আমাদের অনেকেই এগুলো নিয়ে চিন্তা করেছেন। বাংলাদেশে ইতিবাচক সংস্কৃতির খুব অভাব। পড়ালেখায় উৎকর্ষ অর্জনের জন্য তেমন ব্যবস্থাও নেই।
আজ থেকে ১২৫ বছর আগে স্যার জগদীশচন্দ্র বসু রেডিও আবিষ্কার করেছিলেন। সারা পৃথিবীর অন্তত তিনজন আবিষ্কারকের একজন ছিলেন তিনি। কত বড় মাপের আবিষ্কার ছিল সেটা! মুন্সিগঞ্জের একজন বাঙালি সেটা করেছিলেন। জ্ঞান-বিজ্ঞানে, এমনকি মহাপরাধীন ভারতবর্ষে আমাদের যে শ্রেষ্ঠত্ব ছিল, তা আমরা ভুলতে বসেছি। আরেকটা অনুপ্রেরণার কথা বলি। দুই বন্ধু সত্যেন্দ্রনাথ বসু ও মেঘনাদ সাহা। সদ্য স্নাতক এই দুজন সেই সময় যথেষ্ট দুর্বোধ্য আইনস্টাইনের ‘আপেক্ষিকতা তত্ত্ব’ জার্মান ভাষা থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ করেন। প্রশান্ত মহলানবিশের ঐতিহাসিক অবতারণিকাসহ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ২০২০ সালে সেটা আবার প্রকাশ করেছে। ওটাই ছিল প্রথম ইংরেজি অনুবাদ। মজার বিষয় হলো, ইংরেজিতে অনুবাদের জন্য তো জার্মান ভাষা জানতে হবে। আবার আপেক্ষিকতা তত্ত্বও বুঝতে হবে ভালোভাবে। এটা মোটেও সহজ কাজ ছিল না। আর কোনো ইংরেজও তখন সে কাজ করেননি। এটাই ছিল বাঙালির শ্রেষ্ঠত্ব।
এখন আমাদের দেশে প্রকৃত পড়ালেখার আগ্রহ কমে আসছে। আগ্রহ বৃদ্ধির কোনো প্রণোদনাও নেই। তাই আমরা ভাবলাম, কিছু একটা করতে হবে, করা উচিত। তখন আমরা অনেকে গণিত অলিম্পিয়াডের কথা ভাবলাম। আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াড হয় প্রতিবছর। আমি যখন রাশিয়ায় পড়তাম, তখন বিভিন্ন বিষয়ে অলিম্পিয়াড হতো। গণিত অলিম্পিয়াড, পদার্থবিজ্ঞান অলিম্পিয়াড, রসায়ন অলিম্পিয়াড ইত্যাদি। এমনকি গণিতের শিক্ষার্থীদের জন্য নয়, এমন অনেক অলিম্পিয়াডও আয়োজিত হতো। অন্যান্য বিষয়ের জন্যও এমন অলিম্পিয়াড হতো। সেটা আমাকে দারুণভাবে অনুপ্রেরণা দিয়েছিল।
একসময় গণিতের বইগুলো অনেক জটিল ছিল। পাতাগুলো ছিল নিম্নমানের। এখন গণিত বই রঙিন হওয়ার পাশাপাশি অনেক সহজ হয়েছে। এ পরিস্থিতিকে আপনি কীভাবে দেখেন? কিংবা এখানে আমাদের করার মতো আরও কিছু আছে কি না?
আমাদের শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ করাটা খুব জরুরি।—মোহাম্মদ কায়কোবাদ
আমাদের শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ করাটা খুব জরুরি।—মোহাম্মদ কায়কোবাদ
মোহাম্মদ কায়কোবাদ: আমাদের পাঠ্যবইগুলোয় অনেক সমস্যা আছে। কারণ, খুব কম সময়ের মধ্যে বইগুলো তৈরি করা হয়েছে। বিশেষ করে শুরুর পর্যায়ের পাঠ্যবইগুলোয় অহরহ পরিবর্তন করার কোনো মানে নেই। অনেক পরিবর্তন করার মানে হচ্ছে, আমরা খুব বেশি সময় নিয়ে চিন্তাভাবনা করে বইটা তৈরি করিনি।
আমার মনে হয়, পাঠ্যবই রচনার জন্য গবেষণার সময় আরও বাড়ানো উচিত। এটা টেন্ডার দিয়ে করে লাভ নেই। আমাদের এটা বুঝতে হবে যে সম্পূর্ণ জাতির জন্য একটাই পাঠ্যবই। এ বইটা পড়ে জাতি শিক্ষিত হবে। কাজেই তাড়াহুড়া করে লাভ হবে না। ৫০ বছরে যেহেতু আমরা স্ট্যান্ডার্ড একটা পাঠ্যবই রচনা করতে পারিনি, সেহেতু আরও ১০ বছর লাগুক। এতেও কোনো সমস্যা নেই; বরং অনেকগুলো সুবিধা আছে। একটা ভালো পাঠ্যবই পাওয়া যাবে। সেটার আকার নিয়ে আমরা উচ্চবাচ্য করব না। আমাদের লক্ষ রাখতে হবে, পাঠ্যবই পড়ে যেন প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের একজন শিক্ষার্থীও বুঝতে পারে এবং আনন্দ পায়। পড়ালেখার প্রতি যেন উৎসাহী হয়। কোনো স্কুলের শিক্ষক তেমন ভালো না হলেও যেন শিক্ষার্থীরা পাঠ্যবই পড়ে বুঝতে পারে, পড়ার প্রতি তাদের আগ্রহ জাগে। এটা বাস্তবায়ন হলে গোটা জাতির জন্য অসাধারণ একটা ব্যাপার হবে। এর জন্য বিনিয়োগ খুব বেশি বাড়াতে হবে না। প্রতি বইতে লেখকের জন্য আমরা ১ কোটি টাকা সম্মানী দিতে পারি। প্রতিবছর ২০ লাখ শিক্ষার্থী বইটি পড়লে, আর বইটি যদি ৩০ বছর ধরে পড়ানো হয়, তবে ৬ কোটি শিক্ষার্থী পড়তে পারবে। সে তুলনায় বারবার পাঠ্যপুস্তক নতুন করে ছাপালে বিনিয়োগও বেশি লাগে।
একটি চৈনিক প্রবাদ আছে, ‘এক বছরের জন্য বিনিয়োগ করতে চাইলে ফসল ফলাও, দশ বছরের জন্য বিনিয়োগ করতে চাইলে বৃক্ষরোপণ করো, কিন্তু শত বছরের কথা ভাবলে শিক্ষায় বিনিয়োগ করো।’ আমাদের শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ করাটা খুব জরুরি। এটা এখনো পর্যাপ্ত গুরুত্ব পাচ্ছে না। এখন শিক্ষা খাতে বরাদ্দ হলো জিডিপির ১ দশমিক ৭৫ শতাংশ, যেখানে সুপারিশ হয় ৬ শতাংশ। শুধু যুদ্ধ-বিদ্ধস্ত বাংলাদেশে ১৯৭৪ সালে ৪ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। আমাদের শিক্ষার্থীদের বিশ্ব পর্যায়ে উন্নীত করতে হলে তাদের বিশ্ব মাপের শিক্ষাব্যবস্থা দিতে হবে।
১৮
২৯ মন্তব্য