সিনিয়র শিক্ষক
২৬ আগস্ট, ২০২৪ ০৯:১৪ অপরাহ্ণ
দুর্বল বলের বাহক ডব্লিউ ও জেড
স্ট্যান্ডার্ড মডেলে কাজকারবার করে প্রাকৃতিক তিনটি মৌলিক বল নিয়ে (মহাকর্ষ বাদে)। সেগুলো হল বিদ্যুৎচুম্বকীয় বল, শক্তিশালী পারমাণবিক বল এবং দুর্বল পারমাণবিক বল। এদের মধ্যে বিদ্যুৎচুম্বকীয় বলটাই আমরা সরাসরি প্রতিদিন ব্যবহার করছি নানা কাজে। ঘরের লাইট বাল্ব থেকে শুরু করে আপনার হাতের মোবাইল ফোনে এ বলের কারণেই ব্যবহার করতে পারছেন। আবার আলোর কণা—ফোটন দিয়ে আমরা চোখে সবকিছু দেখতে পাই। এই বোসন কণাই আসলে বহন করে বিদ্যুৎচুম্বকীয় বল। ঘটনাগুলো ঘটছে হয়তো আপনার অজান্তেই।
ওদিকে সবল বা শক্তিশালী পারমাণবিক বল আমরা চোখে না দেখলেও এর প্রভাব না বুঝে উপায় নেই। কারণ, পরমাণুর নিউক্লিয়াসে কোয়ার্ক কণাদের একত্রিত করে পরমাণু গঠন করে এই বল। নিউট্রন ও প্রোটন কণাদেরও একত্রে বেধে রাখে। কাজেই এ বলের অস্তিত্ব না থাকলে পরমাণু গঠিতই হতে পারত না। তাহলে আপনি, আমি, চারপাশের বস্তুজগৎ, পৃথিবী, সূর্য, গ্যালাক্সি কিছুই থাকত না।
কিন্তু এই তিন বলের মধ্যে দুর্বল বলটাই একটু যেনো আলাদা—দৈনন্দিন জীবনে এর কোনো প্রভাব আমাদের চোখে দৃশ্যমান নয়। তাই এই বলের অনিবার্য ভূমিকা বোঝানোও তাই কিছুটা কঠিন। এর কাজকারবার এতই ক্ষুদ্র পরিসরের যে তার প্রভাব সরাসরি বোঝাও যায় না। তবে স্ট্যান্ডার্ড মডেলে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে আছে এই দুর্বল বল বা উইক নিউক্লিয়ার ফোর্স। নামে দুর্বল হলেও প্রকৃতির সবচেয়ে দুর্বল বল আসলে মহাকর্ষ। মহাকর্ষের চেয়ে দুর্বল পারমাণবিক বল প্রায় ১০২৯ গুণ শক্তিশালী। এ বলের এরকম নামের কারণ হল, একটি নির্দিষ্ট পরিসরে শক্তিশালী বল ও বিদ্যুৎচুম্বকীয় বলের চেয়ে এর ক্ষেত্রের শক্তি কম বা বেশ দুর্বল।
এই বলটি ছাড়া কোয়ার্ক কণা ফ্লেভার বা স্বাদ (খাবারের স্বাদ নয়) পরিবর্তন করতে পারে না। তার মানে হল, দুর্বল বল ছাড়া নিউট্রন কণা প্রোটন কণায় রূপান্তরিত হতে পারত না। তাই সূর্য আলো দিতে পারত না। কারণ, সেজন্য সূর্যের ভেতর চলছে ফিউশন বিক্রিয়া। এতে হাইড্রোজেনের চারটি প্রোটন হিলিয়ামে পরিণত হয়। এ সময় দুটি প্রোটন রূপান্তরিত হয় নিউট্রন কণায়। কাজেই নামে দুর্বল হলেও এই বলটি আমাদের জগতের জন্য অতি জরুরী।
শক্তিশালী বল যেমন কোয়ার্ক কণাদের একত্রে বেধে রাখে, দুর্বল তেমন কিছু বেধে রাখে না। এই বল বহন করে ডব্লিউ ও জেড কণা। ডব্লিউ কণার বৈদ্যুতিক চার্জ থাকে। তাই এটি দুই ধরনের হতে পারে ধনাত্মক (W+) বা ঋণাত্মক (W-)। অন্যদিকে জেড কণা বৈদ্যুতিকভাবে চার্জ নিরপেক্ষ (Z0)। একসঙ্গে বললে দুর্বল বলের বাহক তিনটি কণা হলো—ডব্লিউ প্লাস, ডব্লিউ মাইনাস ও জেড জিরো (W+, W- ও Z0)। এরা বোসন কণা। দুটি মৌলিক কণা যখন এই দুর্বল বলের মাধ্যমে মিথস্ক্রিয়া করে তখন সেখানে একটি ডব্লিউ বা একটি জেড কণা বিনিময় হয়। অন্য কণাদের তুলনায় ডব্লিউ ও জেড কণার ভর অনেক বেশি। সে হিসেবে এদের হেভিওয়েট কণা বলা চলে।
দুর্বল বল যে বিভিন্ন কণার বিনিময়ের কারণ, সে ধারণা গড়ে উঠেছিল ১৯৩০-এর দশকে। বিটা ক্ষয় নামে পরিচিত এক ধরনের তেজস্ক্রিয় ক্ষয় ব্যাখ্যা করতে ধারণাটি ব্যবহার করা হয়েছিল। ১৯৩৩ সালে পদার্থবিদ এনরিকো ফার্মি বললেন, এ প্রক্রিয়ায় চারটি ফার্মিয়ন মিথস্ক্রিয়া দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়। তবে সেটা পরে ভুল বলে প্রমাণিত হয়।
এর প্রায় তিন দশক পর, ১৯৬৮ সালে পদার্থবিদ শেলডন গ্ল্যাসো, আবদুস সালাম এবং স্টিভেন ওয়াইনবার্গ দুর্বল বল ও বিদ্যুৎচুম্বকীয় বলকে একীভূত করেন। তাঁদের নতুন তত্ত্বটা ফোটনের অস্তিত্ব অনুমান করতে পারল। শুধু তাই নয়, ডব্লিউ ও জেড কণার অস্তিত্বের ভবিষ্যদ্বাণীও করতে পারল সফলভাবে। এ অবদানের জন্য ১৯৭৯ সালে পদার্থবিজ্ঞানে যৌথভাবে নোবেল পুরস্কার পান এই তিন বিজ্ঞানী।
৮
৮ মন্তব্য