Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৭ আগস্ট, ২০২৪ ১০:৩৯ পূর্বাহ্ণ

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের চ্যালেঞ্জ ও জনগণের প্রত্যাশা
এটি আমাদের জন্য আশার কথা যে, একটি পদত্যাগের সাথে সাথে বাংলাদেশে আমরা নতুন করে বিজয়ী হয়েছি। ছাত্র আন্দোলনের সাথে গণ আন্দোলনও হয়ে গেল। একটি চমৎকার সময়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হলো। দীর্ঘ ১৬ বছরের শাসনকালের শেষের দিকে কতগুলো ভুল সিদ্ধান্ত নেয়া ও ছাত্র সমাজের ভাষা বুঝতে না পারার ব্যর্থতা্র কারণে একজন প্রধানমন্ত্রীকে পদত্যাগ করে পালিয়ে যেতে হলো। এটা কোনদিনই কাম্য ছিল না। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শপথ নেয়ার সময় পর্যন্ত বাংলাদেশ এক নাশকতায় আক্রান্ত হয়। এর মধ্যে আক্রান্ত অনেকেই আওয়ামীলীগ নেতা বা সমর্থক। আবার কেউ রাজনীতির সাথে জড়িত না হয়েও আক্রান্ত হয়েছেন এমন সংখ্যাও কম নয়। ছাত্র-জনতার আন্দোলনকে নস্যাৎ করতে দেশে চরম নৈরাজ্য চালানো একটি দল সরকারি/বেসরকারি/ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অগ্নি সংযোগ, লুট-পাট চালিয়েছে। ক্ষতি হয়েছে আমাদের জনগণের, দেশের। দেশকে সংস্কার করতে বাড়ি ছেড়েছে শিক্ষার্থীরা। তারা নেমেছে রাস্তায়। কী চমৎকারভাবে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে কাজ করে! ওরা জানে দেশপ্রেমিক কীভাবে হতে হয়। কীভাবে দেশকে ভালবাসতে হয়। কীভাবে বাইকার থেকে শুরু করে সাধারণ জনগণকে সচেতন করতে হয়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে জনগণের প্রত্যাশা অনেক। স্বৈরাচারী সরকারের পতনের পর আমাদের আস্থার স্থল হচ্ছে এই সরকার। এর মধ্যে কিছু রাজনৈতিক দল ধ্বংসস্তুপের উপর দাঁড়িয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠান করার জন্য উম্মাদ হয়ে গেছে। দেশ যেখানে ভালো নেই- সেখানে তারা বার বার দেশের কথা না ভেবে ভাবছে ক্ষমতার কথা। ক্ষমতা ছাড়া আর কিছুই না পাওয়া যেন কঠিন পাপ। এ সরকারকে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেয়া অতীব জরুরী বিষয় আর এ সরকারের দায়িত্ব পালন হতে হবে সঠিক এবং যুগোপযোগী। ইতোমধ্যে, আমরা দেখেছি দেশের জনগণের মধ্যে এক ধরণের শান্তিময় পরিস্থিতি বিরাজমান। তারপরও অপেক্ষা একটি স্বাভাবিক জীবন-যাপনের। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে বিজ্ঞ, দক্ষ, মেধাবী ব্যক্তি যেমন আছে-তেমনি আছে তরুণদের আইকনরাও। সব মিলিয়ে ভালো একটি সরকার হয়েছে একথা নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে। কিন্তু একতাই এ দেশের বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তাই, যে যার অবস্থান থেকে দেশের জন্য কাজ করতে হবে। দেশকে নিয়ে ভাবতে হবে। হয়তো এখনি ভাবতে হবে, কি করব? ফ্যাসীবাদী সরকার থেকে অন্য আরেকটি সরকারকে দায়িত্ব দেব- যারা হবে আরও বেশি ফ্যাসীবাদী, নাকি বিকল্প কোন রাজনৈতিক দলকে দায়িত্ব দেব? ১৮ কোটি মানুষের এ দেশে আমরা ভিন্ন ভিন্ন ধর্মের, ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতির, ভিন্ন চিন্তা-ভাবনার এটা ঠিক কিন্তু বাংলাদেশ সবার। আমাদের জাতীয় সংগীত হিন্দুদের জন্য যেমন, খ্রিষ্টানদের জন্য যেমন, বৌদ্ধদের জন্য কিংবা মুসলিমদের জন্য তেমনি। তাহলে দেশ নিয়ে কোথায় বিভেদ? আমরা সবাই বাঙালি। আমরা সবাই মিলে-মিশে থাকব। ১৯৭১ সালে আমরা একতাবদ্ধ ছিলাম। ২০২৪ সালের দ্বিতীয় স্বাধীনতার দিনেও আমরা একতাবদ্ধ ছিলাম। এই একতাবদ্ধ থাকাটা বড় প্রয়োজন। মনে রাখতে হবে, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে জাতিগত দিক থেকে আমরা সবাই এক। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীরা আমাদের দেশের অহংকার। তারা তাদের সংস্কৃতি দিয়ে আমাদেরকে সমৃদ্ধ করেছে। আমাদের একতা ভাঙার জন্য দেশে-বিদেশে কোন গোষ্ঠী বা দল কাজ করবেই। তারা চায় এ সরকার ব্যর্থ হোক। তাদের এই হীন উদ্দেশ্যকে রোধ করতে হবে আমাদেরই। যদি না পারি তাহলে আমরা হয়তো চিরস্থায়ী গোলামীর জিঞ্জিরে বাধা পড়বো। আমরা আশা করি, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার স্বীয় বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জল থেকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দেশকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিতে পারবে।
বর্তমানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অসামান্য অবদান রাখতে চলছে। পুলিশ কাজে ফিরছে, আনসার দাবী পূরণের আশা নিয়ে ঘরে ফিরেছে। সাবেক সরকার পুলিশকে জনগণের সামনে প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। পুলিশ ও তো মানুষ- তাদেরও সহ্যের সীমা আছে। নিজেকে বাঁচাতে পুলিশ একশন নিয়েছে। কিন্তু আবু সাইদকে হত্যা করে এজাহার পাল্টে দিয়ে পুলিশ জনগণের বন্ধু হিসেবে নয় বরং প্রতিপক্ষ হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছে। ছাত্র-জনতারও সহ্যের সীমা আছে। এর ফলাফলে অনেক পুলিশ হতাহত হয়েছে। শহীদ হয়েছেন আবু সাইদ, মীর মুগ্ধসহ আরো অনেকে। তাদের হত্যার বিচার চায় সাধারণ জনগণ। আশাকরি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এ ব্যপারে যথাযথ পদক্ষেপ নিবে।
বর্তমান সরকার চেষ্টা করছে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব নয়। এমন এক কঠিন সময়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়েছে, যখন আইন-শৃংখলা পরিস্থিতির অবস্থা ভালো নয়। একটি বৈষম্যহীন বাংলাদেশের জন্য শহীদ হয়েছেন যারা-তাদের পরিবারগুলো শোকাচ্ছন্ন। এই পরিবারগুলো তাকিয়ে আছে সরকারের দিকে। যারা আহত হয়েছেন তারা হাসপাতালের বেডে কিন্তু তাদের ভেতর শান্তি “আমার যা হয়েছে হোক, আমি দেশের জন্য কিছু করতে পেরেছি”। যদিও কত স্বপ্ন ভেঙ্গে গেছে। আহতরা অনিশ্চয়তার মধ্যে আছে। কারণ, তারা জানে না আদৌ সুস্থ জীবনে ফিরে যেতে পারবে কি না। নিত্য পণ্যের বাজারমূল্য সিন্ডিকেট এর কবলে। এই সিন্ডিকেট এর দৌরাত্ম্য দূর করে বাজারমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। নিম্ন আয়ের মানুষেরা সিন্ডিকেট বোঝে না- আর তাদের ক্ষুধা বেশি। তাদের চাওয়া একটাই। কাজ করব, ভাত খাব। দিন এনে দিন খাওয়া মানুষগুলোর ভালো থাকা নিশ্চিত করা এ সরকারের একটি চ্যালেঞ্জ। মিডিয়ার বদৌলতে আমরা জানতে পেরেছি আমাদের ছাত্র আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্যকে ব্যর্থ করতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সাথে মুসলিম সম্প্রদায়ের দাঙ্গা লাগানোর জন্য উঠে পড়ে লেগেছে কিছু গোষ্ঠী, দল বা রাষ্ট্র। তাদের ষড়যন্ত্রকে রুখে দিতে হবে। এ দায়িত্ব শুধু সরকারের একার নয়, আমাদের সবার।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আরেকটি চ্যালেঞ্জ মুদ্রাস্ফীতি মোকাবেলায় পদক্ষেপ গ্রহণ করা। ছোট, বড় ও মাঝারি সব ধরণের ব্যবসা নির্বিঘ্নে যাতে চলতে পারে এমন একটি পরিবেশের নিশ্চিত করতে হবে। যদি ব্যবসার পরিবেশ ও বিনিয়োগের পরিবেশ নিশ্চিত করা যায় তাহলে দেশে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সাথে কর্মসংস্থানের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। কর্মসংস্থানের জন্য মানবসম্পদ উন্নয়ন করতে হতে হবে। দক্ষ মানব সম্পদ দেশে-বিদেশে কাজ করে তাদের নিজেদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করার সাথে সাথে দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারবে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আরেকটি চ্যালেঞ্জ সামাজিক বন্ধন যেন দৃঢ় থাকে সে বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরি করা। এ সরকারের সৃষ্টি হয়েছে বৈষম্য বিরোধ থেকে। সামাজিক বৈষম্য নয় বরং সাম্যতা নিশ্চিত করতে হবে।
বিগত সরকারের শেষ সময়ের শিক্ষা ব্যবস্থা ছিল ফিনল্যান্ড, কানাডা, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকে ধার করা। যে ব্যবস্থায় কোন প্রতিযোগিতা ছিল না। শুধু ছিল প্রকল্প ভিত্তিক কাজ আর কাজ। মূল্যায়নের আগের দিন ইউটিউবে প্রশ্নোত্তর পাওয়া যেত। শিক্ষার্থীরা সেই প্রশ্নোত্তর লিখে দিত। শিক্ষক হিসেবে মার্কিং করার কোন পদ্ধতি ছিল না। এমন কিছু বিষয় অন্তর্ভূক্ত ছিল- যা ক্লাসে পড়ানোর মত ছিল না। সুখের বিষয়, ইতোমধ্যে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড এই শিক্ষা ব্যবস্থার কার্যক্রম তাদের এখতিয়ারের মধ্যে যা ছিল তা করেছে। কিন্তু এ শিক্ষা ব্যবস্থা অনতিবিলম্বে বাতিল করে যুগোপযোগী শিক্ষাব্যবস্থার দাবী এ সরকারের কাছে শিক্ষক, অভিভাবকসহ আপামর জনসাধারণের। স্বাস্থ্যসেবার দিক থেকে বাংলাদেশে বিগত সরকার উল্লেখযোগ্য ভূমিকার রাখতে পারেনি। স্বাস্থ্য খাতে উন্নয়ন হলে বাংলাদেশী রোগীদের উন্নত চিকিৎসার জন্য ভারত কিংবা সিংগাপুর যেতে হতো না।
একটি দেশের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ নির্ভর করে সেদেশের আইন বিভাগ, বিচার বিভাগ ও শাসন বিভাগের স্বাধীনতার উপর। বর্তমান সরকার আইন বিভাগ, বিচার বিভাগ ও শাসন বিভাগের সংস্কারে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে- যা আমাদের দেশকে সত্যিকারের গণতান্ত্রিক দেশে রূপান্তর করবে ইনশা আল্লাহ। আমরা ফিরে পাব বলার স্বাধীনতা, লেখার স্বাধীনতা, মনের ভাব প্রকাশের স্বাধীনতা। সংবাদ মাধ্যমগুলো পাবে তাদের কাজ করার স্বাধীনতা। সত্য কথা বলা ও লেখার জন্য আইসিটি এ্যক্ট এ কেউ আসামী হবে না। ১৭ বছরের কিশোরকে রিমান্ডে যেতে হবে না এমন স্বাধীনতা চাই।
বাংলাদেশের সংবিধানের ধারাকে সমুন্নত রাখতে এ সরকার কাজ করবে এটা নিশ্চিত। আমাদের পররাষ্ট্র নীতি “সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়”। এ সরকারের আরেকটি চ্যালেঞ্জ বিদেশী রাষ্ট্রগুলোর সাথে সুন্দর সম্পর্ক বজায় রাখা। বৈদেশিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়াতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলায় আন্তর্জাতিক সমর্থন প্রয়োজন। ইতোমধ্যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাথে কাজ করতে বিশ্বের অনেক দেশ সম্মতি দিয়েছে- যা আমাদের দেশকে বৈষম্যহীন সম্ভাবনাময় সোনার দেশে রুপান্তর করবে।
যে সময়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কাজ করতে শুরু করেছে সে সময়ে দেশের প্রতিটি সেক্টরে কাজ করতে হবে। আগে দেশ সংস্কার, তারপর নির্বাচন, তারপর ক্ষমতার রদবদল বা জনগণ সমর্থিত সরকার। এর জন্য অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে এ সরকারের। তা হতে পারে সরকারের ইচ্ছেমত। দেশ সংস্কার যেখানে বড় চ্যালেঞ্জ সেখানে অন্য কিছু অনেক পরের কথা। আমরা তাকিয়ে আছি এ সরকারের সফলতার দিকে। সরকারের সফলতা আমাদের দেবে প্রকৃত স্বাধীনতার স্বাদ- যে স্বাদ আমরা মুসলিম-হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান-নৃ গোষ্ঠীর সবাই মিলে নিব। আমরা সবাই একসাথে বলতে চাই, “আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি”।

লেখক: গাজী সালাউদ্দিন, কম্পিউটার শিক্ষক, চারিতালুক হুদা আলিম মাদরাসা, রূপগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ।
মন্তব্য করুন