Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৯ আগস্ট, ২০২৪ ০৮:০৮ অপরাহ্ণ

শুদ্ধতা, ন্যায্যতা হোক আমাদের আরাধ্য।

Let me stand far behind my ugly shadow.

_____________________________________

মানুষের একটা সহজাত প্রবৃত্তি হল নিজেকে সবসময় নির্ভুলতার আসনে দেখা।সে মনে করে তার জীবনের সব ভালো- মন্দ, ঠিক- বেঠিক বোঝার ব্যাপারে সেই যথেষ্ট।এমন প্রবৃত্তির কাছে নিজেদের সোপর্দ করে আমরা হরহামেশাই ভুল সিদ্ধান্ত তথা ভুল কার্য সম্পাদন করছি।

আমরা মানুষেরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মনে করে থাকি,মানুষের উপকার হয় এমন কাজই হচ্ছে ভালো কাজ। কিন্তু আসলে কি তাই????

না,একদমই না।ন্যায্যাতার মানদন্ডে যে কাজ উত্তীর্ণ হতে পারে না; সে কাজ কিছু লোকের উপকার সাধন করলেও তাকে ভালো কাজ বলা যায় না।

বিটিভির সেই মেগাসিরিয়াল রবিনহুডের কথা অবশ্যই আপনাদের মনে আছে।সেখানে রবিনহুড ধনীদের সম্পত্তি লুট করে গরীবদের মধ্যে বিলিয়ে দিতেন।কাজটি নিঃসন্দেহে ভালো তবে ভালো কাজটি সম্পাদন করার জন্য রবিনহুড যে পন্থা অবলম্বন করেছিল সেটি ছিল ভুল।তাই তাকে প্রবঞ্চক বললেও খুব বেশি ভুল বলা হবে না।

অনুরূপভাবে আমাদের সমাজে তথাকথিত কিছু ফেরেশতা আছেন যারা তাঁদের ক্ষমতা,প্রতিপত্তি ও পদকে ব্যবহার করে তাঁদের নিকট আত্নীয়দের সরকারি চাকুরীর ব্যবস্থা করে দেন আর মনে মনে তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলেন এই ভেবে তারা একটি ভালো কাজ করেছেন।এহেন কার্য সম্পাদনে তাঁদের চাঁদবদনে হাসির লীলাখেলা চলে।মুদ্রার যে অপর পিঠ আছে তারা বেমালুম ভুলে যায়। তারা ভুলে যায় তারা যোগ্য একটা প্রার্থীকে তার অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে। তাদের কানে পৌঁছায় না সেই যোগ্য প্রার্থীর আর্তনাদ.... "মোরা একটি চাকুরীর জন্য যুদ্ধ করি।" তখন গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে Let বলতে ইচ্ছে করে, " কার গোয়াল, কে দেয় ধুনো!!!"

একদিন আমার একজন সহকর্মী পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে আমাকে একটি টিপস দিলেন। তিনি বলেন,শিক্ষার্থীদের ফেল না করিয়ে যেভাবে হোক পাশ করিয়ে দিতে হবে বিশেষ করে মেয়েদের। কেননা তাদের বিয়ের বাজারে এই যোগ্যতাটি খুবই ফলপ্রসু। বলাবাহুল্য নারী জাতিকে ছোট করা আমার উদ্দেশ্য নয়। সাধারনত গ্রামে মেয়েদের খুব অল্প বয়সে বিয়ে হয়। সেক্ষেত্রে ৮ম শ্রেণি পাশ বা ১০ম শ্রেণি পাশ মেয়েদের একটি বড় অর্জন বলে বিবেচিত হয়। টিপসটির সারমর্ম হল, মেয়েদের বিয়ের কথা চিন্তা করে তাদেরকে যেভাবেই হোক তাদের উপরের ক্লাসে উত্তীর্ণ দেখাতে হবে। তাঁর কথা শোনে আমার চোখে মুখে অদ্ভুত বিহ্বলতা ফুটে উঠে।লাস্ট ট্রেন মিস করলে কয়েক মিনিটের জন্য মানুষ যে ভাব নিয়ে বোকার মতো প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকে,ঠিক তেমনই অবস্থা হলো আমার। পরক্ষণে এক গাল হাসির উপর আরেক পোঁচ মুচকি হাসি লেপটে দিয়ে শুধালাম....হুম,ভালোই বলছেন।

আপনি বলবেন- তাতে অন্যায় কী? উদ্দেশ্য তো ভালো। আমিও একমত উদ্দেশ্য ভালো কিন্তু পন্থা অন্যায্য। Wordsworth এর ভাষায় যাকে বলা চলে " A sorbid boon." অর্থাৎ খারাপের মধ্যে ভালো।

প্রফেশনাল ডিগ্রী - ডিপ্লোমা ইন এডুকেশন করার সময় অনুরূপ একটি অভিজ্ঞতা অর্জন করি। আমার আগের রোলধারী শিক্ষার্থী- শিক্ষক ফাইনাল পরীক্ষার আগে আমাকে অনুরোধ করলো- তাকে যেন আমি পরীক্ষায় সহযোগিতা করি যাতে সে টপ টেন এ থাকতে পারে।বলাবাহুল্য , যারা টপ টেনে থাকবে তারা বিদেশ সফরের সুযোগ পাবে। কিন্তু সেদিন আমি, "অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে জাতির জনকের লেখা এবং ১৩৪৫ সালে ইবনে বতুতার বলা কথা --- চরম সত্যি হল বাঙালি পরশ্রীকাতর জাতি।" এই স্টিগমাটি নিজের গায়ে লাগিয়ে ভদ্র মহিলাকে সাহায্য করবো না বলে জানায়। আমার এহেন আচরনে, আমার প্রতি ভদ্রমহিলার সকল অনুরাগ নিমিষেই উবে গেল। আপাততদৃষ্টিতে আমাকে পরশ্রীকাতর মনে হলেও আমি কিন্তু ন্যায্যতার দৃষ্টিতে উর্ত্তীণ। ভদ্রমহিলার প্রস্তাবশুনে দৈবাগত ব্রহ্মাস্ত্রের ন্যায় আমার মনে উদয় হতে লাগলো - আমি একজন যোগ্য প্রার্থীকে টপ টেন থেকে বের করে একজন অযোগ্যকে টপ টেনে আনার জন্য কাজ করবো।এটা আমার ন্যায়সঙ্গত হবে না।

পূর্বোক্ত আলোচনাগুলো সামারাইজ করলে যে অর্থ দাঁড়ায় তা হলো-- কোন কাজ কিছু লোকের উপকারে আসলেই তাকে ভালো কাজ বলা যাবে না যতক্ষন না তা ন্যায্যতার মানদন্ডে উর্ত্তীণ হয়।

আপনি আমার যুক্তির সাথে দ্বিমত পোষণ করতেই পারেন। তবে মনে রাখবেন- সত্যকে অস্বীকার করলে সত্য কিন্তু মিথ্যা হয়ে যায় না, সত্য সত্যই থাকে বরং মিটিমিটি করে অন্তরের ভিতর জ্বলে যদিও বাহিরে অপ্রকাশিত।

ইতিহাসের একটি রেফারেন্স দিয়ে আমি আমার যুক্তিকে আরো একটু শক্তিশালী করতে চাই। খৃষ্টধর্মের একজন প্রচারক ছিলেন সাধু পল।তিনি ঐশী বাণী তথা বাইবেলের কথা প্রচার করতেন।সাধু পল খ্রিষ্টধর্মের প্রচার ও মানুষের মধ্যে ভক্তি বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে ঐশী বাণীর সাথে তার মানবীয় কথাগুলোকে একসাথ করে প্রচার করতে থাকেন।প্রচলিত ইঞ্জিল শরীফের বিভিন্ন স্থানে তিনি দ্ব্যর্থহীনভাবে স্বীকার করেছেন যে, আমি প্রত্যেক জাতির কাছে তাদের পছন্দ মত মিথ্যা বলি, যেন ঈশ্বরের মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। একস্থানে তিনি লিখেছেন -- For if the truth of God hath more abounded through my lie unto his glory; why yet am I also judged as a sinner???

তাহলে দেখুন সাধু পলের উদ্দেশ্য কিন্তু ভালো ছিল,স্রষ্টার মর্যাদা বৃদ্ধি করা কিন্তু কাজটা করার পন্থা ছিল অবৈধ ও শঠতা নির্ভর। যার ফলশ্রুতিতে,আজ মূল বাইবেল বিলীনের পথে আর স্রষ্টার চোখে তাহার অবস্থান শয়তানের কাতারে।

আর আপনি নিজেকে ফেরেশতা ভাবেন কাউকে চাকুরী পাইয়ে দিয়ে, পরীক্ষার খাতায় কাউকে পাশ করিয়ে দিয়ে, অযোগ্য কাউকে যোগ্যদের কাতারে নিয়ে এসে।

Shame on !!!!!

আমরা হরহামেশাই শুনে থাকি,"" টাকা খাইলেও, লোকটা কাজ করে।" এই কথা দিয়ে আপনি কী বোঝাতে চাচ্ছেন? এসব কথা একটা অন্যায়কে আইনসঙ্গত করার একটা পাঁয়তারা মাত্র।

এটা সত্যি কোন দেশই সততা ও ন্যায়পরায়ণতার বিশুদ্ধতায় ২৪ ক্যারেট পৌঁছাতে পারে না। তাই বলে ৮ ক্যারেট ও মেনে নেওয়া যায় না।

আমাদের মনে রাখা উচিত, একটা ময়লার গাড়িকে "Trash Can" বললেই দুগন্ধ পাল্টে যেমন সুগন্ধ হয়ে যায় না। ঠিক তেমনি একটি অন্যায্য কাজকে ভালোত্বের ঢোলা জামা পড়ালেই তা ভালো কাজ হয়ে যায় না।

Burtrand Russel একবার বলেছিলেন - নৈতিক মানদন্ড রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়ে বড় বড় সভ্যতা ধ্বংসের বীজ বপন করেছিল। এদের মধ্যে প্রধান দৃষ্টান্ত গ্রীক ও ইতালীয় সভ্যতা।

তাই আসুন দুর্নীতির সিলসিলা রুখে দিয়ে আলোর ফোয়ারার দিকে। সুবিধার জন্য নীতি বিসর্জন নয়; শুদ্ধতা, ন্যায্যতা ও সততা হোক আমাদের আরাধ্য।

 

লেখক_

মোঃ মানিক হোসেন

সহকারী শিক্ষক

খলিশাটোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।

নোয়াখালী সদর, নোয়াখালী।

 

মন্তব্য করুন

ব্লগ