সহকারী শিক্ষক
২৯ আগস্ট, ২০২৪ ০৮:১৩ অপরাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
নৈতিকতা ও মূল্যবোধ বিনির্মাণে প্রাথমিকের পাঠ্যপুস্তক ও শিক্ষকের করণীয়
শঠতার সলিল সরোবরে পৃথিবীর মানুষগুলো যখন আকণ্ঠে নিমজ্জিত, তখন কূলে তরী ভিড়ানোর একমাত্র পন্থা নৈতিকতা ও মূল্যবোধ শিক্ষা। নৈতিকতা ও মূল্যবোধ শিক্ষা মানুষকে এনে দিয়েছে শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট। পৃথিবীর ইতিহাসে যে সকল মহামানব স্বমহিমায় ভাস্বর, তাঁরা তাঁদের নৈতিকতা ও মূল্যবোধকে কাজে লাগিয়ে অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন এবং মানুষের হৃদয়-মন্দিরে জায়গা করে নিয়েছেন। জীবনে সফল হওয়ার চেয়ে নৈতিকতা ও মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ হওয়া অধিকতর শ্রেয়। সম্ভবত এই কথা অন্তরে ধারণ করে নোবেলজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী আইনস্টাইন তাঁর কোন এক বক্তৃতায় বলেছিলেন- Try not to be a man of success,but rather try to become a man of value.তাই একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, মানুষের জীবনকে শুদ্ধ ও পরিশীলিতভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার বিশল্যকরণী ও প্রথম সূর্যসিঁড়ি হলো নৈতিকতা।
প্রাথমিক শিক্ষা ব্যক্তিজীবনের বুনিয়াদি শিক্ষা। শিক্ষার্থীদের নৈতিক ও মানবিক গুণাবলী আয়ত্ত করার প্রথম স্তর হল প্রাথমিক স্তর। আধুনিক মনোবিজ্ঞানীগণ গবেষণা করে দেখেছেন নৈতিকতা ও মূল্যবোধ শিক্ষার উপযুক্ত সময় শিশুর ১ বছর থেকে ১০ বছরের মধ্যে। এই স্তরে ভীত তৈরি না হলে ব্যক্তিজীবনে এর প্রভাবে জীবন হবে প্রহেলিকাপূর্ণ। এই গুণাবলীগুলো বিকাশে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকের রয়েছে সমন্বিত দায়িত্ব ও কর্তব্য। তবে এটা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই - শিক্ষক মূল্যবোধ বিনির্মাণের আদর্শ কারিগর আর বিদ্যালয় হল তা চর্চার অনন্য চারণভূমি। শিক্ষাজীবনের প্রতিটি স্তরের প্রতিটি পাঠ্যবই ও বিষয়বস্তু শিক্ষার্থীর নৈতিকতা ও মূল্যবোধ বিকাশে কার্যকরী ভূমিকা পালন করে।
প্রাথমিক শিক্ষার লক্ষ্য হলো “ শিশুর দৈহিক, মানসিক, সামাজিক, আধ্যাত্মিক, নৈতিক, মানবিক ও নান্দনিক বিকাশ সাধন করা এবং তাদের দেশাত্মবোধে, বিজ্ঞানমনস্কতায়, সৃজনশীলতায় ও উন্নত জীবনের স্বপ্নদর্শনে উদ্বুদ্ধ করা। প্রাথমিক শিক্ষার লক্ষ্যের উপরোক্ত গুণাবলীর বিকাশ সাধনের কথা বলা হলেও নিন্মোক্ত ৫টি যেমন : মানসিক, সামাজিক, আধ্যাত্মিক, নৈতিক, মানবিক গুণাবলীর উন্নয়ন ঘটানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন । যা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষা শেষে উপরোক্ত সকল গুণাবলীর বিকাশ সাধিত হবে,এটিই প্রত্যাশিত।
প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে ৫ বছর অধ্যয়ন শেষে শিশুরা বাংলা, ইংরেজি, প্রাথমিক গণিত, প্রাথমিক বিজ্ঞান, বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়, ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা, চারু ও কারুকলা ,শারীরিক শিক্ষা, সংগীতসহ মোট ৯ টি বিষয়ে ২৯ টি নির্ধারিত প্রান্তিক যোগ্যতা অর্জন করবে বলে আশা করা যায়। ২৯ টি প্রান্তিক যোগ্যতার মধ্যে বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বিষয়ে ১৫টি (ক্রমিক নং- ১৩ হতে ২২ এবং ২৭ হতে ২৯ ) অর্জন করতে ১ম ও ২য় শ্রেণিতে শিক্ষক সহায়িকার নির্ধারিত বিষয়বস্তু ছাড়াও ৩য় হতে ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠ্যপুস্তকে নির্বাচিত বিষয়বস্তুসমুহের মধ্যে মিলেমিশে থাকা,আমাদের অধিকার ও কর্তব্য,সমাজের বিভিন্ন পেশা, মানুষের গুণাবলী, সমাজে পরস্পরের সহযোগিতা, বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্টী, নাগরিক অধিকার, মূল্যবোধ ও আচরণ, পরমতসহিষ্ণুতা, কাজের মর্যাদা, মানবাধিকার,নারী পুরুষ সমতা, আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য, গণতান্ত্রিক মনোভাব প্রভৃতি আমাদের নৈতিকতা ও মূল্যবোধকে জাগ্রত করে। অপরপক্ষে ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষায় ২টি প্রান্তিক যোগ্যতা ( ক্রমিক নং ১ ও ২) অর্জন করার মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীরা নৈতিকতা ও মূল্যবোধের চর্চা করতে শিখবে। বাকি ৭টি বিষয়ের ১২ টি প্রান্তিক যোগ্যতা সরাসরি নৈতিকতা ও মূল্যবোধের সাথে সম্পৃক্ত না হলেও তা শিক্ষার্থীদের ইন্টার পারসোনাল স্কিল ডেভেলপমেন্টের জন্য সহায়ক। তাই অন্যান্য বিষয়সমুহে নৈতিকতার আলোকে বিষয়বস্তু সংযোজন করা এখন সময়ের দাবি।
বর্তমানে শিশুদের নৈতিকতা শিখানো জলে জল লেখার মতই কঠিন। পূর্ণিমার চাঁদের মায়াবী আকর্ষণে সাগরের নীল লোনা জল যেমন অপরূপ তরঙ্গ ভেঙ্গে আকাশ অভিমুখে ধাবিত হয়; ঠিক তেমনি আমাদের ছোট্ট সোনামনিরা চারপাশের দূষিত উপাদান ও পারসুট অফ ম্যাটেরিয়ালিজমের দুর্বার আকর্ষণে খেই হারিয়ে একজন হীন ও আত্মকেন্দ্রিক মানুষে পরিণত হচ্ছে। হারপিস কর্ডের চাবির মতো নড়বড়ে নৈতিকতা ও মূল্যবোধ সম্পন্ন প্রজন্ম দেখে তাইতো ব্যাথিত হচ্ছে আজ আমার শ্রবণযুগল।
তবে একজন আশাবাদী মানুষ হিসেবে, আমি বিশ্বাস করি বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা ও ২০৪১ সালের উন্নত বাংলাদেশের নাগরিক গড়তে হলে যে নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত জনসমাজ দরকার তা বিনির্মাণে প্রাথমিক শিক্ষা কারিকুলাম ও প্রাথমিক শিক্ষক হতে পারে একটা পরশমণি। মুক্তার মত হরফে লেখা প্রাথমিক শিক্ষার ১৩ টি উদ্দেশ্যের মধ্যে ৭টি উদ্দেশ্য সরাসরি নৈতিকতা ও মূল্যবোধ সম্পর্কিত। তাই একজন শিক্ষক হিসাবে, প্রাথমিক শিক্ষা কারিকুলাম আমাকে এক অদ্ভুত স্বপ্নালু ভাবের ঘোরে আচ্ছন্ন করে এবং হৃদয় গহীনে আশার আলো উদ্দীপ্ত করে। কিন্তু প্রচন্ড মর্মযাতনার সাথে বলতে হচ্ছে মাঠ পর্যায়ে এর বাস্তবায়ন যেন- পর্বতের মূষিক প্রসব।কাজী নজরুলের ভাষায় বলতে হয়- "এই সোজা কথা বলি যদি ভাই, হবে তাহা সিডিশন।"
এই পশ্চাদগামীতা থেকে উত্তরণের জন্য দুটি করণীয় আছে বলে আমার বিশ্বাস। প্রথমতঃ শিক্ষকদের "নৈতিকতা ও মূল্যবোধ শিক্ষা" নামক প্রশিক্ষনের আওতায় আনতে হবে। দ্বিতীয়তঃ নৈতিকতা ও মূল্যবোধ শিক্ষাকে একটি পূর্ণাঙ্গ বিষয় হিসেবে কারিকুলামে অন্তর্ভুক্ত করার জরুরী। জাপানের স্কুলগুলোতে সপ্তাহে কমপক্ষে এক ঘন্টা নৈতিকতা শিক্ষার জন্য বরাদ্দ রাখা হয় এবং ২০১৮ সালে তাঁরা নৈতিকতা শিক্ষাকে একটি পূর্ণাঙ্গ বিষয় হিসেবে কারিকুলামে অন্তর্ভুক্ত করেছে।অনুরূপ পথে হেঁটেছে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও নরওয়েসহ পৃথিবীর অন্যান্য দেশ।
একজন শিক্ষক বিভিন্নভাবে তাঁর শিক্ষার্থীদের "নৈতিকতা ও মূল্যবোধ" শিক্ষা দিতে ও অনুশীলন করাতে পারেন।
১) "চাইল্ড ইনটেগ্রিটি ও শিশু বঙ্গবন্ধু ফোরাম" প্রতিষ্ঠা করে শিশুদেরকে সৃজনশীল উপায়ে নৈতিকতা, মূল্যবোধ, মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধুর চেতনায় উদ্বুদ্ধ করতে পারেন।
২) পৃথিবীর উল্লেখযোগ্য মহামানবদের সম্পর্কে জানাতে পারেন।
৩) নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে পারেন।
৪) তাত্ত্বিক জ্ঞান ও উদাহরণ উপস্থাপনের মাধ্যমে মূল্যবোধ ও নৈতিকতা শেখাতে পারেন।
৫) স্টুডেন্ট কাউন্সিলিং, খুদে ডাক্তার দল, কাব স্কাউট দল, সমাবেশ দল, আইসিটি দল, পরিচ্ছন্নতা দল ও সহ-পাঠ্যক্রমিক কার্যাবলী দলের মাধ্যমে শিক্ষক শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা ও মূল্যবোধ শেখাতে পারেন।
৬) সমাবেশ চলাকালীন সময়ে শিক্ষক নৈতিকতা সম্পর্কিত সংক্ষিপ্ত আলোচনা করার মাধ্যমে শিখাতে পারেন।
৭)বিভিন্ন ভিডিও ক্লিপ অথবা এনিমেটেড কার্টুন শিক্ষা উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করে নৈতিকতা ও মূল্যবোধ শেখাতে পারেন।
৮) স্কুল নর্মস ও বিভিন্ন সামাজিক কার্যাবলী- যেমনঃ বাগান করা, অসহায়কে সাহায্য করা ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার কাজে শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার মাধ্যমে নৈতিকতা ও মূল্যবোধ চর্চা করতে পারেন।
৯) "সততার দোকান ও মহানুভবতার দেয়াল" কার্যক্রমে শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার মাধ্যমে নৈতিকতা ও মূল্যবোধ শিখানো যেতে পারে।
১০) দলীয় কাজ, সমস্যা সমাধান ও পারস্পরিক ভাব বিনিময় ইত্যাদি শ্রেণী কার্যক্রমে শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে বিভিন্ন মূল্যবোধ চর্চা করা যেতে পারে।
পরিশেষে, ইতিহাসের একটি সুখকর স্মৃতির রোমন্থন করার মধ্য দিয়ে আমি আপনাদের মার্জিত মুখাবয়বে হাসি ও মননে আশার বাতি জ্বালাতে চাই। " ফরাসী বিপ্লবের সময় প্রত্যেক মানুষ অতি মানুষে পরিণত হয়েছিল। আমার বিশ্বাস আমরা শিক্ষকরা যদি কোমলমতি শিক্ষার্থীদের অন্তরে নৈতিকতা ও মূল্যবোধের বীজ বপন করতে পারি, অদূর ভবিষ্যতে আমাদের ভাবী বংশধরেরা এক একটি অতি মানুষের পরিণত হবে।" আসুন, সুন্দর মানবিক জীবন গড়তে আমরা শিক্ষকরা কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পাশে ছিলাম, আছি এবং থাকব।
মোহাম্মদ মানিক হোসেন
সহকারী শিক্ষক
খলিশাটোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়( ৮ম শ্রেণি চলমান)
নোয়াখালী সদর, নোয়াখালী।
ই-মেইলঃ [email protected]
৭১
১৪৫ মন্তব্য