Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৯ আগস্ট, ২০২৪ ০৮:১৫ অপরাহ্ণ

আমার ক্যালিডোস্কোপে জনাব শরীফউল্ল্যাহ বাহার

আমার ক্যালিডোস্কোপে জনাব শরীফউল্ল্যাহ বাহার

 

বয়সের ভারে ভারানত মানুষ একদা হয়ে পড়ে অফলা বৃক্ষের মতোই পত্রপুষ্পহীন, তিন পায়ে হাঁটা বৃদ্ধদের সকল আশা উবে যায় নিশীথ স্বপনের মতো দিনের আলোয়। আমার মাধ্যমিক স্কুলের প্রধান শিক্ষক জনাব শরীফউল্ল্যাহ বাহার আজ বয়সের ভারে ভারানত।কর্মজীবন থেকে ছুটি নিয়েছেন অনেক আগেই কিন্তু রেখে গেছেন কত মুগ্ধতা, সন্তাপ , উল্লাস, দ্রবণ! ভোলা যায় না।আমার অগ্রজ, সহপাঠী ও অনুজরা হয়ত কেউ তার জীবনকে দেখেছেন দূরবীনে, কেউবা অনুবীক্ষণের লেন্সের তলায় কিন্তু আমি আল্লাহর বান্দা স্যারের জীবন দেখেছি বহুরুপদর্শন যন্ত্রে যাকে ইংরেজিতে বলে ক্যালিডোস্কোপ।

[ ] আমি আদমের মানস সরোবরে ফুটে থাকা এক পদ্মফুলের নাম ওবায়েদ উল্ল্যাহ মেমোরিয়াল উচ্চ বিদ্যালয়। আমি ছিলাম ২০০৪ সালের এস. এস.সি পরিক্ষার্থী। স্যার ছিলেন অত্র প্রতিষ্ঠানের প্রধান । এত দিনে তলে তলে পার হয়েছে অজস্র সময়। ফ্রান্সের সীন ও টেকনাফের নাফ নদী দিয়ে পার হয়েছে কয়েক হাজার, অযুত, লক্ষ, নিযুত, কোটি সিসি ( কিউবিক সেন্টিমিটার) পানি। কিন্তু তাই বলে আমার অনুভূতি পানির স্রোতে ভেসে যায়নি বরং স্মৃতিগুলো আরো সতেজ ও নবীন হয়েছে।

[ ] The pen is the tongue of the mind. তাইতো আজ আমার মস্তিষ্কের হিপোক্যাম্পাস অংশের স্মৃতিসমূহ ব্যাটিলিয়নসহ আমার কলমের আগায় অনশনরত। মানিক মানসে এরা যেন স্বর্ণতুল্য।

[ ] মনুষ্যত্বের অতন্দ্র প্রহরী ও মানবতার মরমিয়া সাধক হিসেবে আমার চোখে বিবেচিত এই গুণী লোকটির দৈহিক গড়ন ছিল মাঝামাঝি। বেশি লম্বাও না, আবার খুব বেশি খাটোও না। তবে ড্যানিয়েল ক্রেইগের মতো তার সিক্স প্যাক বডি ছিল না বরং ভুড়ি স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশিই ছিল। তবে তার পোশাক ছিল খুবই মার্জিত। খুব কমই ইন করতেন। ফরমাল শার্ট পরিধান করতেন। কিন্তু তার পরিধান করার শার্ট প্যান্টে ইস্ত্রী করার ভাব দৃশ্যমান থাকতো। প্রায় সময় সমাবেশে উপস্থিত থাকতেন আর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখতেন গেইটের দিকে। কে পর আসতেছে। যে পরে আসতো তাকে সমাবেশ শেষে সামনে আনা হতো এবং এক্সপ্লেইন চাওয়া হতো অথবা অফিস রুমে তলব করা হতো। সত্যি কথা বলতে আমার যেদিন দেরি হতো সেদিন স্কুলের গেইট এর কাছে আসলে বুকে ধরপড়ানি বেড়ে যেত। স্কুলের ক্লাসের ঘন্টা পড়ার সাথে সাথে সবাই ক্লাসে থাকতো বারান্দা ফাঁকা থাকতো। ক্লাস শেষে টিচার বের হওয়ার সাথে সাথে গুনগুন শব্দ শুরু হতো কিন্তু ক্লাস থেকে কেউ দল বেঁধে বের হতো না। ক্যাপ্টেনের অনুমতি সাপেক্ষে ১-২ জন বের হতে পারতো। আলহামদুলিল্লাহ পাঁচ বছরই আমার সহপাঠীরা আমাকে ভোট দিয়ে নির্বাচন করেছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি এমন ডিসিপ্লিন এখন বহু বিদ্যালয়ে অনপুস্থিত।

[ ] বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনাকে যে একটা শিল্পের পর্যায়ে নেওয়া যেতে পারে তা আমি স্যারের জীবন থেকে অনুধাবন করি। উনার বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা এতটা উন্নত ও সৃজনশীল ছিল তা বর্ণনা করতে কলমের কালি তো নয় বরং শিল্পীর তুলিও অপ্রতুল হবে। সভ্যতার নানা কাল পর্বে এমন ভিন্ন চিন্তার মানুষ থাকেন বলেই আমাদের রক্ষা।

[ ] স্যারের জীবন থেকে শিক্ষক হিসাবে আমিসহ আপনাদের কিছু শিক্ষণীয় আছে। আমাদের কিছু শিক্ষক আছেন যারা সস্তা জনপ্রিয়তার জন্য শিক্ষার্থীদের ডিসিপ্লিন শেখান না। কিন্তু আপনি ডিসিপ্লিনের ব্যাপারে কঠোর হলে হয়ত শিক্ষার্থীদের কাছে আপনার জনপ্রিয়তা সাময়িক কম হবে কিন্তু যদি আপনি আপনার সৃজনশীল কাজ আর ভালো পাঠ উপস্থাপন করতে পারেন তাহলেও জনপ্রিয়তা কমবে না। ধরুন, আপনার জনপ্রিয়তা কিছুটা কম কারন আপনি ডিসিপ্লিনের ব্যাপারে খুব কঠোর। বিশ্বাস করুন, সময়ের পরিক্রমায় সস্তা জনপ্রিয়তার দ্যুতি হ্রাস পাবে, আর আপনার গৌরবের দ্যুতি বৃদ্ধি পাবে। বিশ্বাস করুন, ছাত্রজীবনে স্যার আমার পছন্দের শিক্ষক ছিল না, বরং অপছন্দের কাছাকাছি। কিন্তু আজ উনি আমার মণি-কোঠায়। স্কুল- ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে উনি আমার মডেল।

[ ] স্যার সম্পর্কে কঠিন কঠিন কথাগুলো আগে বলাতে পাঠকদের মনে হয়তো একটা বিরূপ ধারণা জাগতে পারে। স্যারের হৃদয়ের কোমলতা নিয়ে প্রশ্ন জাগতে পারে। কিন্তু না, স্যার প্রতিটি শিক্ষার্থীর প্রতি সদয় আচরণ করতেন কিন্তু সোহাগ করতেন না। কারণ উনি বিশ্বাস করতেন আগুনে পুড়ে ইস্পাত খাঁটি হয়। আমি যদি এক কথায় স্যারের শাসন করার থিম বলতে চাই, তাহলে বলতে হয়_" ভালোবাসবো কবিতার মত আর শাসন করবো গদ্যে।"

[ ] বিশ্ব বিধাতার এক স্বতন্ত্র ছাঁচে তৈরি অনুপম ব্যক্তিত্বের এই মানুষটির অর্জনের খাতায় ১৯৯৭ সালে যোগ হয়েছিল জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হওয়ার গৌরব। তৎকালীন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত থেকে গ্রহণ করেছেন তাঁর স্বপ্নের স্বর্ণপদক। এমনকি ২০১৬ সালেও তিনি জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। তাঁর অনুপম ব্যক্তিত্ব, মার্জিত ব্যবহার ও চিন্তাকুলভাবে বারান্দায় পায়চারি আজও আমাকে বিমোহিত করে। তাই বলতে হয় কেউ চাঁদ দেখে, কেউ দেখেনা ; আমি দেখি চাঁদের মুগ্ধতা।

[ ] ছাত্রজীবনে স্যারের কোন ক্লাস আমাদের ব্যাচ পায়নি। তবে স্যারের সাথে ঘটে যাওয়া দুটি স্মৃতি আমার স্মৃতিপটে এখনো ভাস্বর। একদিন টিফিন ব্রেকের সময় শেষ হওয়ার ৫-৭ মিনিট দেরিতে স্কুল কম্পাউন্ডে ঢুকতেছি দেখে পিয়ন দিয়ে অফিস রুমে তলব করলেন। অবশ্য তিনি তখন তার নিজস্ব অফিসে ছিলেন না। তিনি ছিলেন সহকারী শিক্ষকদের বসার রুমে। সেখানেও উনার হাতলওয়ালা বসার চেয়ার ছিল। জিজ্ঞেস করলেন_ "মানিক হোসেন, তোমার ক্লাস কয়টায় শুরু? এখন কয়টা বাজে? " বললাম,"স্যার, আমার খালাম্মার বাসা স্কুলের পাশে। ঐখানে আমি দুপুরের খাবার খায়। উনার আজকে রান্না করতে দেরি হওয়ায় আমার আসতে দেরি হয়েছে। স্যার বললেন- নিয়ম সবার জন্য সমান। তোমাকে ২টার মধ্যে স্কুল কম্পাউন্ডে ঢুকতে হবে। নিয়মের যেহেতু ব্যতয় হয়েছে পানিশমেন্ট পেতে হবে। প্রথমে পিয়নকে বেত দিতে বললেন। পরে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করলেন। আর বললেন ১০ বার কান ধরে উঠ-বস করতে। আমিও মহাখুশিতে উঠ-বস করে চলে আসলাম। অফিসে কোন স্যার ছিলনা আমিও মনে মনে ভাবতে লাগলাম যাক কেউ দেখে নাই। যাকে বলে পাগলের সুখ মনে মনে। বিশ্বাস করুন, এ ঘটনা আজ আমাকে ব্যথিত করেনা বরং আমার শিক্ষকতা জীবনের পাথেয় হিসাবে কাজ করে। কারন আমি এখন বুঝতে শিখেছি যেখানে রূঢ়তার স্ফূলিঙ্গ নেই, সেখানে নিশ্চয়ই প্রেমাগ্নির অভাব আছে।

[ ] ষষ্ঠ শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষায় আমার সিট যে হলরুমে পড়েছিল সেটা ছিল বড় হলরুম। আমরা শিক্ষার্থীরা যেদিকে মুখ করে বসেছিলাম, স্যার তার পিছনের দরজা দিয়ে ঢুকলেন নিঃশব্দে। হঠাৎ পিঠের উপর কারো হাত অনুভব করলাম। পিছনে তাকাতে দেখি হেডস্যার। মানিক হোসেন, পরীক্ষা কেমন হচ্ছে? এ কথা বলার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে উনার হাতটা আমার নাকের কাছে নিয়ে বললেন, "ঘ্রাণটা কেমন বলো তো? মিষ্টি না?" ঘ্রানটা ছিল কোন সেন্ট বা আতরের। সত্যি কথা বলতে আমি একটা কথাও সেদিন বলতে পারি নাই। পরীক্ষা শেষে বাড়ি যাওয়ার পথে সারাটা পথ আফসোস করেছি। কেন কথা বলি নাই। স্যার কি মনে করবে! সেদিন স্যারের নীরব হাসির গোপন সৌন্দর্য আমি প্রত্যক্ষ করেছিলাম।

[ ] মানুষ প্রজ্ঞাবান হয়ে জন্মালে ব্যাপারটা দারুন হতো কিন্তু সাধারণত তা ঘটে না। তাই সর্বশ্রেষ্ঠ উপায় হল প্রজ্ঞাবানদের জীবন থেকে শিক্ষা নেওয়া। তাই আমি অধম এসব প্রজ্ঞাবান লোকদের স্মৃতি আউড়িয়ে বেড়ায়।

[ ] ছাত্র জীবনে স্যারের সাথে আমার সম্পর্ক ছিল যোজন যোজন দূরে কিন্তু আজ পরিণত বয়সকালে এসে আমার এই মূল্যায়ন একটি কথায় জানান দেয় স্যার আমার অনেক কাছের। পরিশেষে তাই বলতে হয়," অমৃতের কোথায় শুরু, আর গরলের কোথায় শেষ, তা বলা মুশকিল।"

 

মোহাম্মদ মানিক হোসেন

সহকারী শিক্ষক

খলিশাটোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।

সদর, নোয়াখালী।

 

মন্তব্য করুন

ব্লগ