Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৯ আগস্ট, ২০২৪ ০৮:১৯ অপরাহ্ণ

শিক্ষকতা_ পূর্ণতার আরেক নাম

 শিক্ষকতা_ পূর্ণতার আরেক নাম

 

“ শিক্ষকতা” পেশা হিসাবে বেছে নিবো এমন অনুভূতি আমার স্বপ্ন-কল্পনা-চিন্তা বাসনার বাগানে কোন দিনই ঠাঁই পায়নি। খলিফা হারুনুর রশীদের ছেলে ও তার শিক্ষককে নিয়ে রচিত “শিক্ষাগুরুর মর্যাদা” নামক কবিতা ছোটবেলায় গদগদ করে মুখস্ত করেছি, এমন কি বহুবার “আমার জীবনের লক্ষ্য” নামক রচনা লিখতে গিয়ে “শিক্ষকতা”কেই বেছে নিয়েছি। তাছাড়া আমার প্রিয় শিক্ষকদের কথার ফানুস আমাকে বিমোহিত করতো। তাঁরা ক্লাসে এসে তাদের জিহবা দিয়ে যখন কথার তুবড়ি ছোটাতেন তখন আমি অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতাম তাদের মুখপানে আর তখন আমার অন্দরমহল বিড়বিড় করে বলতো-

 

“ তুমি কেমন করে গান করো, হে গুণী।

আমি শুনি,শুধু অবাক হয়ে শুনি।’’

 

কিন্তু হায় ! এত কিছুর পরও আমার লৌহকঠিন অন্তঃকরন শিক্ষকতাকে পেশা হিসাবে নিতে সায় দেয়নি।

সময়ের পরিক্রমায় জীবনের চিত্রনাট্যে যখন আমার ভাগ্য ইউ-টার্ন নিয়ে খাদের কিনারায় তখন জীবন ও জীবিকার তাগিদে বেছে নিতে হয় একটি সম্মানজনক পেশা।অথচ শিক্ষকতা কোনো পেশা নয়।এর পরিসর অনেক বড়।

প্রত্যেক মানুষের জন্যই নির্দিষ্ট একটা নিয়তি আছে। কখনো কখনো ভুল পথ ধরেই মানুষ তার নিয়তির কাছে পৌঁছায়। গডফাদার বইয়ের লেখকের এই কথাটি যেন আমার শিক্ষকতা পেশায় নিজেকে স্থির করার পিছনে একটি অনুপ্রেরনা।

আমি বিশ্বাস করি ,আমি কি হতে চেয়েছি আর বর্তমানে কি হয়েছি তার উপর আমার পেশাগত উতকর্ষতা নির্ভর করবে না।কারন আমি অন্তরে-বাহিরে নিজেকে বদলে চলেছি নিরন্তর।আমি বিশ্বাস করি যারা বদলায় না, বদলাতে জানে না তারা স্থবির।আমি সে দলের নয়। বদ্ধ জলাশয় হওয়াটা আমার জীবনের লক্ষ্য নয়।“আমি একজন শিক্ষক” এই বোধ যখন আমার ভিতরের সত্ত্বাকে নাড়া দিতে থাকে, তখন আরো বহু পেশার মধ্যেও এই পেশার একজন হতে পেরে মন গর্বিত হয়ে ওঠে। আজ আমি বুকে ধারন করি- Teaching is a passion not a profession.

বলাবাহুল্য , আমার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষকতা জীবন শুরু হয় ৮ই ডিসেম্বর,২০১৩। যদিও বললে অত্যুক্তি হবে না, আমার সত্যিকার শিক্ষকতা জীবন শুরু হয় ২০০৪ সাল থেকে। বিজ্ঞান গ্রুপ নিয়ে এস.এস.সি পরীক্ষা শেষ করার পর থেকে এ যাত্রা শুরু। যদিও সেটা প্রাতিষ্ঠানিক ছিলনা। প্রথম যে ছেলেটা ও মেয়েটাকে পড়িয়েছিলাম তারা এখন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট। ছেলেটা ইঞ্জিনিয়ার আর মেয়েটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা বিদুষী। এছাড়া ও অনেক শিক্ষার্থী দেশের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অধ্যয়নরত। কিন্তু আমি আদম ভাগ্যের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের দরজায় পা রাখতে পারিনি। এ যেন চাপা কান্না। নসীবমে ভগবান পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় নেহি রাখা, হাম কেয়া করে গা…..বিষয়টি হৃদয়ের অন্দরমহলে হতাশার ঝড় তোলে আর বুকের ভিতরের আর্তনাদ নিজেকে বাক্যবানে জর্জরিত করে এই বলে- “ প্রভাতের সুর্য উঠে, তবু কেন আমার কারাকক্ষ বিষাদে ভরা।’’ পরক্ষনেই মনকে প্রবোধ দিই এই বলে-“ আমি শিক্ষক, কঠিনকে করছি সহজ, অজানাকে জানার পথে সদা অগ্রজ।’’

হৃদয়ের অলিন্দে জমে থাকা ক্ষোভকে প্রশমিত করে মন মহাশয় স্মরন করিয়ে দিল John Keats-এর সেই কথাটি- Heard melodies are sweet but those unheard are sweeter.অর্থাৎ যে গান কান দিয়ে শোনা হয় সেটার চেয়ে যে গান আত্মা দিয়ে শোনা হয় সেটা বেশি মধুর। পরক্ষনেই আবিষ্কার করি- সত্যিই তো তাই। যে পেশাকে কখনোই আমি মনে পোষন করিনি, আজ সে পেশাকে আমি আত্মা দিয়ে উপলব্ধি করি। সে পেশার প্রতি ভালোবাসা আমার আলভী লতার মতো বৃদ্ধি পাচ্ছে। সে পেশা আজ আমার আত্মশুদ্ধি, ভালোবাসা ও ভালো লাগার স্থান। আজ সে পেশা আমাকে তাড়িত করে এই বলে- “ চলো কিছু করি, মানুষের পাশে চলি।’’ তাই আজ “Pushing to the Front” বইটির সাথে তাল মিলিয়ে আমার বলতে ইচ্ছে করে, ‘ যা হয় ভালোর জন্য হয়।’’

শিক্ষকতা সৃষ্টিকর্তার দেয়া মহান দায়িত্ব। আমি গর্বিত পৃথিবীর সকল পেশার মধ্যে সেরা পেশার একজন হতে পেরে। আমি আরো গর্বিত বোধ করি এই জন্য , আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ)একজন শিক্ষক।শিক্ষকদের কল্যাণার্থে তাঁর অন্যতম একটি দোয়া ছিল – “ হে আল্লাহ! সকল শিক্ষককে ক্ষমা করো।তাঁদের দীর্ঘজীবী নেক হায়াত দান করো।’’ পবিত্র ইসলাম ধর্মও শিক্ষকদের উচ্চ আসনে আসীন করেছে। হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত রাসূল (সাঃ) এরশাদ করেন- “ তোমরা জ্ঞান অর্জন কর এবং জ্ঞান অর্জনের জন্য আদব-শিষ্টাচার শিখো। তাকে সম্মান কর যার থেকে তোমরা জ্ঞান অর্জন কর ।’’ (আল-মুজামুল আউসাত :৬১৮৪)

শিক্ষক নামটি বেশ ওজনদার। second mother খ্যাত শিক্ষক, প্রাণিত্বকে মনুষ্যত্বে কনভার্ট করার মহান দায়িত্বে ব্রত। শিক্ষকের কাজ সম্পর্কে বলতে গেলে Burtrand Russell –এর কথাটি না বললেই নয়। তিনি বলেন- শিক্ষকের কাজ দুটি। (১) শিক্ষার্থীদের পাঠের প্রতি আগ্রহী করে তোলা। (২) সেই আগ্রহকে নিবৃত করা । কিতাবে- কলমে কাজ দুটোকে সহজ মনে হলেও প্রাক্টিকালি কাজ দুটো খুবই কঠিন। যারা এ দুটো কাজ সুচারুরূপে করতে পারেন তারাই শিক্ষক। তাদের পদতলে শিক্ষার্থীরা মাথা ঝুঁকাতে বাধ্য। শিক্ষকদের ও মনে রাখা উচিৎ , “ সবাই যদি পারদকে স্বর্ণ করতে জানে তাহলে স্বর্ণের দামটা থাকবে কোথায় ?” অর্থাৎ প্রকৃত শিক্ষক হয়ে উঠা বহু সাধনার বিষয়।

অসম্ভব সুন্দর যাদু দেখায় জুয়েলাইট । হাতের যাদুর কাঠি হয়ে উঠে ফুলের তোড়া, ডিম থেকে ফুটে হয় ছানা-বাচ্চা,একটি রশিকে ১০ টুকরো করে নিমিষেই জোড়া লেগে দেয়। আর আমরা শিক্ষকরা জুয়েলাইটের চেয়েও বড় যাদুকর।চুম্বুকের মত আকর্ষন করার ক্ষমতা আছে আমাদের। আমরা শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষে কথার তুবড়ি ছুটিয়ে শিক্ষার্থীদের বিমোহিত করি। একশ আকাশ, একশ নদী, অযুত স্বপ্ন বুকে পুষতে বাধ্য করি । শিক্ষার্থীদেরকে স্বপ্নের পথে হাঁটিয়ে নিজ লক্ষ্যে পৌঁছে দিই। তাই আমরা শিক্ষকরা গর্ব করে বলতেই পারি- we can make a difference.

শিক্ষকতা জীবনের মিষ্টি মধুর কিছু স্মৃতি আজো ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি এনে দেয়। ঘটনাগুলো শ্বাসরুদ্ধকর থ্রিলিং সিনেমার চিত্রনাট্য অথবা গা শিউরে ওঠা কিশোর উপন্যাসের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। কাঁদায় আটকানো হাতি যেমন ডাঙায় উঠার জন্য সমস্ত শক্তি দিয়ে চেষ্টা করে,আমিও সে রকম স্মৃতির জলাভূমি থেকে ছুটে বেরিয়ে আসার প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছি প্রাণপ্রণ।কিন্তু আমার চেষ্টা কখনো সফলতার মুখ দেখে না কেননা Truth is stranger than fiction.

আসুন একটি গল্প শুনি। তখন ২০০৬ সাল। আমি I.Sc পড়ি। বাবার অনুরোধে ও সহযোগিতায় একটা ডেকোরেটর দোকানের পিছনে বাঁধের হাট হাই স্কুলের নবম শ্রেণির কিছু শিক্ষার্থী পড়াতাম। সেই ব্যাচের একজন ছাত্র ছিল যার বয়স ছিল আমার চেয়েও বেশি এবং তার দাঁড়ি গোঁফের গ্রোথটা ছিল উল্লেখ করার মত। কিন্তু আমি শিক্ষককে দেখিলে তখন মনে হইত, “ আমি অন্নপূর্ণার কোলে গজাননের ছোট ভাইটি।’’ অর্থাৎ আমাকে তখনো অষ্টম/নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী বলে চালানো যেত। একদিন আমি সাইকেল যোগে বাঁধের হাট থেকে মাইজদীর অভিমুখে রওনা দিলাম কাকতালীয় ভাবে ঐ সময়ে উল্লেখিত ছাত্র মাইজদী থেকে বাঁধের অভিমুখে সাইকেলযোগে যাচ্ছিল ।তার পিছনের সিটে ছিল তার চেয়ে ৪/৫ বছরের বড় পরিচিত কোনো একজন। ছাত্রটি দূর থেকে দেখা মাত্র সাইকেল থেকে নেমে গেল এবং কাছাকাছি আসা মাত্র সালাম দিল আর এক গাল হাসির উপর আরেক পোচ মুসকি হাসি লেপটে দিয়ে বলল, “ স্যার, কোথায় যাচ্ছেন ?’’ আমি উত্তর দেওয়ার আগেই শুনতে পেলাম পেছনের ছেলেটি আমার ছাত্রকে বলছে – “ এরে, বাচ্চা হোলার লগে ইয়ার্কি নি করছ।’’

জীবনে ঘটে যাওয়া এরকম অনেক ঘটনা আজ আমার দুনয়ন হতে ছড়াচ্ছে প্রদীপ্ত নক্ষত্রের বিভা।

দুটি ব্যাটনকে শূন্যে ছুড়ে দিয়ে আবার ধরা সহজ,কিন্তু তিনটি নিয়ে যিনি দক্ষতা দেখাতে পারেন,তাকে বলা হয় জাগলার। আর এটি একটি আর্ট।আর আমরা আর্টে বিশ্বাস করি না, বিশ্বাস করি বেঁচে বর্তে দিন পার করার, আর সেতো ৩০০ বছর আয়ুষ্কাল পাওয়া কচ্ছপ ও করে। তাই পরিশেষে একটি কথায় বলতে চাই, আসুন আর্টে বিশ্বাস করতে শিখি। আর এই অমোঘ সত্য যে দিন বিশ্বাস করবো আর অন্তরে ধারন করবো শিক্ষকতা সকল আর্টের সেরা আর্ট ,সেদিন মুখে স্বর্গীয় হাসির দ্যুতির ঝলকানি দেখিয়ে বলতে পারবো – “ আমি আছি, আমি থাকবো তোমাদের মাঝে।’’

 

বিনীত নিবেদক

মোঃ মানিক হোসেন

সহকারী শিক্ষক

খলিশাটোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।

নোয়াখালী সদর, নোয়াখালী।

 

 

মন্তব্য করুন