Loading..

ব্লগ

রিসেট

২৯ আগস্ট, ২০২৪ ০৮:২১ অপরাহ্ণ

মেহমান_ এক পরমাত্মীয়ের নাম।

মেহমান_ এক পরমাত্মীয়ের নাম।


জীবন-নদীর ঘাটে ঘাটে সঞ্চিত স্মৃতির ভান্ডার নাড়া দিলে ঝুরঝুর করে পড়তে থাকে অসংখ্য স্মৃতি। যে স্মৃতি আমায় হাসায় আবার কাঁদায়। যে স্মৃতি আমায় আবেগে উদ্বেলিত করে কিংবা বুকের গভীরে আনন্দের ঘূর্ণিস্রোত বইয়ে দেয়। অতীত যুগের পরিধি পেরিয়ে আজ আমি স্থির কিন্তু আমার স্বপ্ন- কল্পনা-চিন্তা- বাসনার বাগানে ছোটবেলার সেই সৌম্য, শান্ত,স্নিগ্ধ ও পবিত্র মুখখানি আজও ভাস্বর। বাতাসের মতো চঞ্চল মন আজও ফিরে পেতে চায় সোনালী সে সময়। যে স্মৃতিগুলো মনের গভীরে ফুলের স্তবকের ন্যায় সাজানো আছে স্তরে স্তরে। খরচ হয়ে যাওয়া সাদা-কালো সময়গুলো মনে পড়ে মনের দুকোণ ভিজে উঠে।

chotobela থেকে আমি ছিলাম একটু ডানপিটে। খাওয়ার প্রতি ছিল তীব্র আকাঙ্ক্ষা। খাদ্য গলাধঃকরণে চৌর্যবৃত্তি ছিল আমার প্রধান অস্ত্র। তবে পাপের প্রায়শ্চিত হিসাবে কপালে জুটত মায়ের বেদম প্রহার। তবুও কেন যেন আমার মনের বৃন্তে বৃন্তে বসন্তের পল্লবের মত মুকুলিত হত সুকুমার রায়ের "" খাই খাই ""

নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারে বড় হওয়ায় বাড়ির খাওয়ার বন্দোবস্ত ছিল খুব সীমিত। তিনবেলা ভাত ও সকালে রং চা সাথে মুড়ি খাওয়ার প্রচলন ছিল।বাড়তি খাওয়ার সুযোগ ছিল না। তবে বাড়িতে মেহমান আসলে একটু বেশি খুশি হতাম কেননা মেহমানের সুবাধে কিছু খাবার ভাগে জুটত তাই।তবে মেহমান আসলে প্রথমে চোখ পড়ত মেহমানের হাতের দিকে। যদি হাতে কিছু থাকত বিশেষ করে বিস্কুট, চানাচুর তাহলে সে মেহমানকে পরমাত্মীয় মনে হতো। তখন আমার মুখে স্বর্গীয় হাসির দ্যুতি খেলা করত। তাইতো মেহমান যাতে ঘন ঘন আসে সে জন্য শিশু মনের সবটুকু আবেগ একসাথে ঢেলে খোদার কাছে আবেদন পাঠাতাম-------

হে আল্লাহ! বেশি বেশি মেহমান পাঠাও।

মেহমান আসলে মা প্রথমে মেহমানের সাথে কুশল বিনিময় করতেন। পর্দার ফাঁক দিয়ে যখন দেখতাম পরমাত্মীয় কিছু এনেছেন তখন আমার মস্তিষ্কে প্লেনের প্রপেলারের মতো কি যেন একটা ভনভন বেগে ঘুরতে থাকতো।তখন মনকে প্রবোধ দিতাম এই বলে____ মানিক!! হাঁটি হাঁটি পা পা করে গিয়ে মেহমানের পাশে বসো।যেই চিন্তা সেই কাজ।যদিও বসতাম মেহমানের পাশে কিন্তু আমার বেআড়া মন আর অসভ্য চোখ বারবার আড়ি পেতে দেখতো খাবার পুটলিটিকে। চিড়িয়াখানার খাঁচায় আবদ্ধ সিংহ যেমন সম্পূর্ণ অনাত্মীয় দৃষ্টিতে নিরিখ করে ঠিক তেমনি দৃষ্টি দিয়ে আমিও খাওয়ার পুটলিটিকে নিরিখ করতাম। পরক্ষনেই আম্মার চোখে আমার চোখ পড়ত তখন আত্মশোণিতের হিমোগ্লোবিন কণা উজ্জ্বল রাখতে আমি নিজেকে ক্ল্যাসিক স্থিরতা মুডে উপস্থাপন করতাম। আমার চিন্তা চাঞ্চল্যহীন নির্বিকারত্বকেই মেহমান ক্ল্যাসিক স্থিরতা বলে মনে করতেন। পৃথিবীর সেরা নর্তকীর নাচের মুদ্রার চাইতে দৃষ্টিহারী অনুপম তুলনাবিহীন আমার ভঙ্গিমা আমার মাকে প্রীত করত।

কিছু সময়ের জন্য মা মেহমানের জন্য নাস্তা তৈরি করতেন; সে সময়টুকু অতিশয় ভদ্র সুবোধ বালকের ন্যায় মেহমানের সাথে আমি ও আমার বড় বোন কথা বলতাম।বিশেষ করে মেহমানরা আমাদের পড়াশোনা নিয়ে কথা বলতো। কিছু সময় পরে,আম্মা ট্রেতে করে নাস্তা পরিবেশন করতেন। নাস্তার প্লেটের খাবার দেখা মাত্র আমার মনে ঢেউ খেলতে থাকতো যেমন করে পুকুরে ঢিল ছুঁড়লে লহরী খেলে।নানা আনন্দ বেদনার ধ্বনি আমার জিভের ডগায় পুঁটিমাছের মত নাচলেও একটুকুর জন্যে ঝড়ে পড়তে পারে না।

আমার চোখের সে বিধ্বংসী চাহনি ও জিভের লকলকানি আমার মা ভালোই জানতো। তাইতো মেহমান কিছু সাধবার আগে মা বলতেন___ ওরা আপনি আসার আগেই নাস্তা করছে, ব্লা ব্লা ব্লা বলে মেহমানকে প্ররোচিত করতেন আমাদেরকে বেশি না সাধার জন্য। ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলে ২/১ পিস বিস্কুট জুটতো। বাকী টুকু মেহমান সাবাড় করতেন।

চুম্বক যেমন সঠিক রেখা বরাবর না সন্নিবেশ হওয়া পর্যন্ত তিরতির করে কাঁপতে থাকে,ঠিক তেমনি আমার মন না খাওয়া পর্যন্ত তিরতির করতে থাকতো। আর যখন মেহমান মায়ের কথার তোয়াক্কা না করে আমাদের খেতে দিতো; পাঁজরের সীমা ছাড়িয়ে বুকের ভিতরটা এক হাত চওড়া হয়ে যেত। মনে হতো হৃদপিন্ডমশাই কয়েক সেকেন্ডের জন্য সাইলেন্ট মুডে চলে গেছে। তখন প্রতি নিঃশ্বাসে মিন্ট ফ্লেভার পেতাম।

আবার কখনো কখনো মায়ের প্ররোচনায় মেহমান আমাদেরকে খাওয়ার জন্য সাধতেন না।তখন খাওয়ার দিকে চেয়ে থাকতাম আর একটি সুর ঢেউ দিয়ে মনের মধ্যে জেগে উঠত_____

ও সেই চোখের দেখা,প্রাণের কথা,সে কি ভোলা যায়????

না খেতে পারার আঘাতটা বুকে বজ্রশেলের মত লাগতো।

অচেতন রোগী সংজ্ঞা ফিরে পাওয়ার পর একটা হাত কিংবা একটা পা কাটা দেখে যে রকম রিক্ততা অনুভব করে,তেমনি এক রিক্ততার ভিতর ডুবে যতো আমার মন,না খেতে পারার বেদনায়।

খাওয়ার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে নিঃশব্দে বলতাম __

হে খাদ্য! তুমি আমার গন্তব্য ; আমার মঞ্জিলে মকসুদ!!!!

পরিশেষে মেহমান বিদায় নিতেন।আম্মা আগ বাড়িয়ে দিতে যেতেন।কিন্তু আমরা দুই ভাইবোন যেতাম না অপেক্ষায় থাকতাম কখন মেহমান ঘরের দরজা পার হবেন আর আমরা বাকী খাবার গুলো সাবাড় করবো আর যদি খাবার বাকী না থাকতো মনে মনে মেহমানকে অভিশাপ দিতাম।রাক্ষস বলে মনে মনে গালি দিতাম

অবশেষে মেহমান দরজা পার হতেন আর আমরা বিশেষ করে আমি অধিকাংশ খাবার সাবাড় করতাম সানন্দে আর আমার আউলা ঝাউলা বাউলা মন গাইতে থাকতো_____

মন মাঝিরে, বল না কোথায়??

মন মাঝিরে, আয় ফিরে আয়

মেহমান নিয়ে আয়, খানা নিয়ে আয়

পুটলি নিয়ে আয়...মন মাঝিরে......

আজ যৌবনের প্রয়াণকালে,আমি যখন বাতাসে কানপাতি, বুকের ভিতর থেকে খিলখিল হাসির ধ্বনি শুনতে পাই।

আপনি পান তো???????

মোঃ মানিক হোসেন

সহকারী শিক্ষক

খলিশাটোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।

সদর,নোয়াখালী।

 

মন্তব্য করুন

ব্লগ