সহকারী শিক্ষক
২৯ আগস্ট, ২০২৪ ০৮:৫২ অপরাহ্ণ
সহকারী শিক্ষক
শৈশবঃ
কুদরাত-এ-খুদা ১৯০০ সালের পশ্চিমবঙ্গের বীরভূমের মাড়গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত পীর পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা খোন্দকার আব্দুল মুকিদ, মাতা সৈয়দা ফাসিহা খাতুন। তাদের সাত সন্তানের মধ্যে কুদরাত-এ-খুদা ছিলেন দ্বিতীয়। কুদরাত-এ-খুদার নাম রেখেছিলেন কুদরতের পিতার পীর কলকাতার তালতলার হযরত সায়ীদ শাহ মুর্শিদ আল কাদেরী। খোন্দকার আবদুল মুকিত তৎকালীন সময়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ পাস করেছিলেন। তিনি সেসময় হাতে গোনা কয়েকজন মুসলিমের মধ্যে ছিলেন, যারা ইংরেজি ভাষা জানত।
শিক্ষা জীবনঃ
কলকাতার মাদ্রাসা থেকে ম্যাট্রিকুলেশন ১৯১৮ সালে, প্রেসিডেন্সি কলেজ ( প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের প্রিয় ছাত্র ছিলেন তিনি) থেকে এমএসসি ১৯২৫ সালে, লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিএসসি ১৯২৯ সালে। তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক বয়ঃপ্রাপ্তি বিশ শতকের প্রথম ও দ্বিতীয় দশকে। তখন পদার্থবিজ্ঞানে চলছে নতুন বিপ্লব, রসায়নশাস্ত্রেও এসে লেগেছে তার ঢেউ। কুদরাত-এ-খুদার আগাগোড়া পছন্দের বিষয় কেমিস্ট্রি, বিশেষ করে জৈব রসায়ন। ডক্টরেটের জন্য কার্বোহাইড্রেটের রিং চেইন টটোমারিজম নিয়ে কাজ করেছিলেন। পরে দেশে এসেও বিবিধ দেশীয় রাসায়নিক গবেষণা করেছেন। পাটের ওপর ক্ষারের বিক্রিয়া নিয়ে তাঁর কাজ (১৯৬৪) বিখ্যাত হয়ে আছে।
পেশা জীবনঃ
দেশে ফিরে তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজে রসায়ন বিভাগে যোগদান করেন, প্রভাষক হিসেবে ১৯৩১ সালে। ১৯৩৬ সালে হন বিভাগীয় প্রধান। পরে প্রেসিডেন্সি কলেজের প্রিন্সিপাল পদে থাকেন বেশ কয়েক বছর।
দেশভাগের পর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসেন ড. কুদরাত-এ-খুদা। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ না দিয়ে তিনি ডিপিআই বিভাগে যোগদান করলেন। হতে পারে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে তাঁর মতদ্বৈততা ছিল।
‘জনশিক্ষা দপ্তরের পরিচালকের পদে থাকার সময় সরকারের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ভালো ছিল না, কেননা স্কুলে উর্দু শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার বিরুদ্ধে তিনি মতপ্রকাশ করেন। ১৯৫০ সালে তাঁকে পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকারের বিজ্ঞান উপদেষ্টা করা হয়, কিন্তু করাচিতেও তাঁর জীবন আনন্দময় ছিল না। একসময় তাঁর গৃহে রাতে ইটপাটকেল পড়া শুরু হলো, করাচিতে বাস করা তাঁর পক্ষে অসম্ভব হয়ে উঠল।
১৯৫৩ সালে পাকিস্তান বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ গঠিত হওয়ার পর সিদ্ধান্ত হলো দেশীয় সম্পদের বিকাশে পশ্চিম ও পূর্বে কয়েকটি গবেষণাগার গড়ে তোলা হবে। ১৯৫৫ সালে পূর্বাঞ্চলীয় গবেষণাগার গড়ে তোলার দায়িত্ব পান ড. খুদা। এই প্রতিষ্ঠানটিরই উত্তরসূরি আজকের বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর)। ড. খুদা একদম শূন্য থেকে তিল তিল করে এটি গড়ে তোলেন। বিদেশে অর্জিত অভিজ্ঞতার অনেকখানিই তিনি সদ্ব্যবহার করতে পেরেছিলেন এই প্রতিষ্ঠানে। ১৯৬৬ সালে অবসরের আগপর্যন্ত তিনি এখানেই কর্মরত ছিলেন। এই প্রতিষ্ঠানে প্রথম থেকেই বৈজ্ঞানিক গবেষণায় স্বাধীনতা ছিল। কাজ করার মুক্ত পরিবেশ ছিল।
পাটকাঠি থেকে মণ্ড তৈরী করে সেই মণ্ড থেকে অতি উন্নতমানের দৃঢ় তক্তা করার পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন। পারটেক্স কাঠ কুদরাত-এ-খুদার বিশেষ অবদান। সমুদ্রের পানি থেকে লবণ চাষিরা যে পদ্ধতিতে লবণ সংগ্রহ করেন তা থেকে শুধুমাত্র খাবার লবণ (NaCl) সংগ্রহ করা সম্ভব। কিন্তু সমুদ্রের পানিতে NaCl ছাড়াও প্রচুর পরিমাণে ম্যাগনেশিয়াম সালফেট ও ম্যাগনেশিয়াম ক্লোরাইড ও স্বল্পমাত্রায় ব্রোমিন থাকে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এসব রাসায়নিক প্রচুর পরিমাণে ব্যবহৃত হয় এবং প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা খরচ করে এসব বাংলাদেশে আমদানী করা হত। কুদরাত-এ-খুদাই প্রথম হিসাব করে দেখান, বড় কোনো কারখানায় বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে লবণ আহরণ করা হলে, সে কারখানা যদি ১ লাখ টন লবণ উৎপাদন করে, তবে সেখানে তার পাশাপাশি বাই-প্রোডাক্ট হিসেবে ১০ হাজার টন ম্যাগনেশিয়াম ক্লোরাইড, ১০ হাজার টন ম্যাগনেশিয়াম সালফেট ও সেই অনুপাতে পটাশিয়াম ক্লোরাইড উৎপন্ন হবে।[৩]
কুদরাত-এ-খুদা স্টেরিও রসায়ন নিয়ে গবেষণা শুরু করেন। পরবর্তীতে তার গবেষণার বিষয়বস্তু ছিল বনৌষধি, গাছগাছড়ার গুণাগুণ, পাট, লবণ, কাঠকয়লা, মৃত্তিকা ও অন্যান্য খনিজ পদার্থ। বিজ্ঞানী হিসাবে তার ও তার সহকর্মীদের ১৮টি আবিষ্কারের পেটেন্ট রয়েছে, যার মধ্যে ৯টি পাটসংক্রান্ত। এর মধ্যে পাট ও পাটকাঠি থেকে রেয়ন, পাটকাঠি থেকে কাগজ এবং রস ও গুড় থেকে মল্ট ভিনেগার আবিষ্কার উল্লেখযোগ্য।
ড. কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশনঃ
যে অবদানটির জন্য আজও তিনি স্মরণীয়, সেটি হলো ড. কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশন। ১৯৭২ সালের ২৬ জুলাই ড. কুদরাত-এ-খুদার নেতৃত্বে একটি শিক্ষা কমিশন গঠন করে সরকার। প্রায় এক মাস ভারত ঘুরে সেখানকার শিক্ষা নিয়ে সরেজমিনে জেনেশুনে আসে কমিশন। জনশিক্ষা নিয়ে খুদার অভিজ্ঞতা, অন্যান্য বহু মতামত ও ব্যাপকভিত্তিক অভিজ্ঞতার সংমিশ্রণ, সংযোজন এবং সংশ্লেষণের পর ১৯৭৩ সালের ৮ জুন প্রায় ৪৫০ পাতার রিপোর্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে পেশ করে শিক্ষা কমিশন।
রচনাবলী ও প্রকাশনাঃ
১৯৩৬ সালে তিনি লিখেছিলেন বাংলার মাধ্যমে বিজ্ঞান। এরপর তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত বই বিজ্ঞানের বিচিত্র কাহিনী। এছাড়াও আরো যে সব বই লিখেন তিনি।
|
|
১৭
২৭ মন্তব্য