সহকারী অধ্যাপক
৩০ আগস্ট, ২০২৪ ০৪:০৫ অপরাহ্ণ
বায়োফিলিক ডিজাইন (Biophilic design) কীভাবে করবেন?
বায়োফিলিয়া (Biophilia) হচ্ছে প্রকৃতি, জীবন ও পরিবেশ এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট প্রাণীর প্রতি ভালোবাসাকে বুঝায়। বায়োফিলিয়া ধারণা থেকে প্রবর্তিত হয় বায়োফিলিক ডিজাইন (Biophilic design) নামের স্থাপত্যের একটি নতুন ধারণা, যা বাসা-বাড়ি বা ভবন নির্মাণ শিল্পের মধ্যে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রকৃতির সাথে যুক্ত থাকা কিংবা আবাসস্থল বা কর্মস্থলের সাথে প্রাকৃতিক পরিবেশের আবহ তৈরি করে বসবাসের একটি নির্মাণশৈলী । স্থাপত্যশিল্পে এই ধারণাটির বাস্তবায়নের ফলে বাড়ি বা নগর নির্মাণের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়, যার স্বাস্থ্যগত, পরিবেশগত ও কিছু অর্থনৈতিক সুবিধা রয়েছে। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে বায়োফিলিক ডিজাইনের ধারণাটি নতুন মনে হলেও বহু পূর্বে ব্যাবিলনের ঝুলন্ত উদ্যানের (Hanging Gardens of Babylon) মতো স্থাপত্যে এর ব্যবহার দেখা গেছে। নাগরিক জীবনে ক্রমবর্ধমান ঘনবসতি, জমির চাহিদা ও মূল্যের উর্ধ্বগতির ফলে নতুন বা বিদ্যমান ভবন, পার্ক, রাস্তার ফুটপাত, ক্যাম্পাস প্রভৃতি নির্মাণ পরিকল্পনায় ও বাস্তবায়নে, এমনকি জীবন ও প্রাণের অস্তিত্ব ফুটিয়ে তোলার মাধ্যমে বাসা-বাড়ি কিংবা কর্মস্থল নান্দনিক ও চিত্তাকর্ষক করার ক্ষেত্রে বর্তমানে ইন্টেরিয়ার ডিজাইনে বায়োফিলিক ডিজাইনের ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বায়োফিলিক ডিজাইন (Biophilic Design) বাসা-বাড়ি বা অফিসকক্ষ ব্যবহারের ধরন কিংবা ব্যবহারকারীর বয়স, পেশা বা মানসিক অবস্থা ভেদে ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে। যেমন একটি সুউচ্চ ভবনের দেয়ালের প্রকৃতি বা অরণ্যের ডিজাইনটি, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের প্রকৃতির আবহ ফুটিয়ে তোলার ডিজাইনটির চেয়ে ভিন্ন হবে। বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে আলোর প্রখরতা বা উজ্জ্বল্যতা, একটি ফাস্টফুড বা কফিহাউজের আলোর প্রখরতার চেয়ে বেশি হবে। একই বাড়িতে শয়নকক্ষের আসবাবপত্রে উপর বিন্যস্ত ফুলগাছ বা লতাপাতা, বেলকনিতে স্থাপিত ফুল বা বাহারি গাছের মতো হবে না। একটি বিশাল কনফারেন্স রুম বা হলরুমের দেয়ালে প্রকৃতির প্যাটার্নের সাথে অডিও-ভিজ্যুয়াল সংযোজন করা, চতুর্দিকে সবুজ প্রাচীর তৈরি করা, খালি জায়গায় পাতাবাহার গাছপালা স্থাপন করা, বসার স্থানকে বাইরের দৃশ্যের অভিমুখী করা যেতে পারে। মনকে সার্বক্ষণিক প্রফুল্ল রাখা ও কাজের চাপ কমানোর জন্য হাসপাতালে নার্সস্টেশন কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্টাফরুমের দেয়ালে ল্যান্ডস্কেপ পেইন্টিয়ের সাথে বিমূর্ত শিল্প প্রতিস্থাপন করা এবং সংলগ্ন অভ্যন্তরীণ মাঠে বা বসার স্থানে একটি ছোট বাগান তৈরি করা যেতে পারে। শ্রেণিকক্ষে ছাত্রছাত্রীদের ক্লাসে উপস্থিতি বা পড়াশুনায় মনোযোগ বৃদ্ধিতে ক্লাসের ভেতর ও বাইরের দেয়ালে বিভিন্ন শিক্ষামূলক পেইন্টিং কিংবা তথ্যমূলক বিষয় চিত্রসহ টেবিল আকারে উপস্থাপন করা যেতে পারে। প্রকৃতি, প্রাণ, প্রাণী ও পানির সংমিশ্রণে তৈরি বায়োফিলিক ডিজাইনের প্যাটার্নগুলো একজন ব্যক্তির কিংবা একটি স্থানের স্বাস্থ্য সুবিধার সম্ভাবনা বৃদ্ধি করে। বায়োফিলিক ডিজাইনের কৌশলগুলো একটি পরিসরকে বৈচিত্র্যময় করে তোলো, মনোজগতকে প্রাণবন্ত করে তোলো, ব্যক্তির শারীরিক ও মানসিক বিকাশে সহায়তা প্রদান করে। গাছ, ফুল-ফল ও প্রকৃতি একজন ব্যক্তির আত্ম-সম্মান ও মেজাজকে উন্নত করতে পারে, ডিজাইনে পানির প্রবাহ বা ছোট ঝর্ণার উপস্থিতি দেহমনে শিথিলতা কোমলতার প্রভাব ফেলতে পারে।
বায়োফিলিক ইন্টেরিয়র ডিজাইন আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। বাসা-বাড়িতে বায়োফিলিক ডিজাইন করার সময় প্রকৃতিকে আমাদের কাছাকাছি নিয়ে আসার জন্য গাছপালা, প্রাকৃতিক আলো, কক্ষের উপকরণ ও আসবাবপত্রের বিন্যাসসহ কী কী বিষয় বিবেচনা করবেন তা নিচে দেয়া হলো-
১. সতেজ বাতাস:
কক্ষের জানালা-দরজা খুললে প্রকৃতির সতেজ বাতাস, পাখি, বৃষ্টি ও বাতাসের শব্দ কক্ষের ভেতর প্রবেশ করার সুযোগ রাখুন, যা আপনার মনের পথ খুঁজে দেয়। তাজা বাতাসে শ্বাস-প্রশ্বাস শরীরের ইমিউন সিস্টেমের কার্যকারিতা ও মেজাজ উন্নত করে।
২. সর্বাধিক প্রাকৃতিক আলো:
কক্ষে পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক আলো প্রবেশের সুবিধা বায়োফিলিক ডিজাইনের অন্যতম উদাহরণ।
প্রাকৃতিক আলোতে ভিটামিন ডি থাকে, যা সানশাইন ভিটামিন নামেও পরিচিত, যা ক্যালসিয়াম নিয়ন্ত্রণে, উচ্চ রক্তচাপ হ্রাসে, পেশী গঠন ও সামগ্রিক স্বাস্থ্যকে সহায়তা করে। আসবাবপত্র, পর্দা, কোন উপকরণ যেন সূর্যালোকের পূর্ণ প্রবেশে যেন বাধা না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
|
চিত্র: বায়োফিলিক ডিজাইন ছোট অফিস কিংবা বাসা বাড়িতে পড়া কিংবা কর্মক্ষেত্রকে শৈল্পিক রূপ দেয় |
৩. সবুজ উদ্ভিদের অন্তর্ভুক্তি:
কালার ফিজিওলজির ভাষায় সবুজ হলো সবচেয়ে আরামদায়ক রংগুলোর মধ্যে একটি, যা শারীরিক শক্তি পুনরুদ্ধারে ও মনকে সতেজ রাখতে সহায়তা করে। সবুজ গাছপালার দিকে তাকালে চোখের দৃষ্টি ভালো থাকে। গাছপালা বাঁচিয়ে রাখা বা পরিচর্চার করার জন্য বিশেষজ্ঞ হতে হয় না, মোটামুটি নিয়মিত যত্ন ও পরিমিত পানি দিলেই চলে।
৪. প্রাকৃতিক উপকরণ:
প্রকৃতিকে আলিঙ্গন করার প্রচেষ্টা হিসেবে বাড়িতে আসবাবপত্র, বাড়ির সাজসজ্জা, রান্নাঘরের ওয়ার্কটপ, মেঝে প্রভৃতি স্থানে যতটা সম্ভব প্রাকৃতিক উপকরণ যেমন বাঁশ, কর্ক, টেকসই কাঠ, পাথর ও বেত ব্যবহার করা যেতে পারে। অফিস বা বাসার ক্ষেত্রে পরিবেশ বান্ধব উপকরণ নির্বাচন করার কক্ষের পরিসর, অবস্থান, ব্যবহারের সময় প্রভৃতি বিবেচনায় আনা উচিত।
৫. প্রকৃতির আকার আলিঙ্গন:
প্রকৃতিতে বিদ্যমান সবকিছু বক্ররেখা ও নরম প্রান্তবিশিষ্ট, ছোট ও অপূর্ণতা। বিপরীতক্রমে ইন্টেরিয়রে ব্যবহৃত অধিকাংশ উপকরণ সরলরৈখিক ও সমকোণবিশিষ্ট হয়ে থাকে। বাঁকানো বা বৃত্তাকার আকৃতির আসবাবপত্র, জৈব টেক্সাইলের তৈরি পর্দা, খিলান আকৃতির দরজা-জানালা, বিভিন্ন প্যাটার্নের কুশন প্রভৃতি বাড়ির সাজসজ্জার মাধ্যমে প্রাকৃতিক অনুভূতি ও স্বাচ্ছন্দ্য লাভে সহায়তা করে।
৬. পানির প্রবাহ ও ঝর্ণার শব্দ:
একটি বায়োফিলিক অলংকারিক উপকরণ হিসেবে ইন্টেরিয়র ডিজাইনে পানির প্রবাহ বা ঝর্ণার ব্যবহার অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও কার্যকর ভূমিকা রাখে, যা আমাদের মনের জন্য একটি প্রশান্ত পরিবেশ তৈরি করে। তরঙ্গের শব্দ চিন্তা প্রক্রিয়াকরণের একটি শান্তিপূর্ণ গতিকে উত্সাহিত করে। প্রবাহিত পানির শব্দ শরীর ও মনের গভীর শিথিলতায় সাহায্য করে মনকে সুখের সুউচ্চ স্থানে নিয়ে যায়। বিস্তৃত পরিসরবিশিষ্ট ইন্ড্রাস্টিয়াল বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে প্রবাহমান পানি বা ঝর্ণাবিশিষ্ট পাড়বাধানো কিংবা চতুর্পাশে গাছপালাবিশিষ্ট ছোট পুকুর, পুকুরে নান্দনিক স্থাপত্যের সেতু বা নৌকা নিঃসন্দেহে বায়োফিলিক ডিজাইনের একটি চমৎকার উদাহরণ।
৭. প্রকৃতির রং
প্রকৃতি রঙে ভরপুর প্রতিটি ঋতু একেক রকম বৈশিষ্ট্য নিয়ে আমাদের সামনে আবির্ভুত হয়। প্রতিটি রঙ মন-মেজাজকে আলাদাভাবে প্রভাবিত করে এবং বৈশিষ্ট্যের মতো আবেগের পরিবর্তনগুলো অনুসরণে সহায়তা করে। বাড়িতে গাঢ় রঙের ব্যবহার, বিস্তৃত দেয়ালে কারুকাজ বা বিমূর্ত পেইন্টিং আপনার সামগ্রিক মেজাজে একটি উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলবে। বিকল্প হিসেবে প্রাকৃতি পরিবেশ কিংবা ফুল-পাতাবিশিষ্ট ওয়ালপেপার ব্যবহার করা যেতে পারে। বাচ্চাদের শয়নকক্ষ বা পড়ার কক্ষের দেয়ালে খেলনা সামগ্রি, খেলার উপকরণ কিংবা বিভিন্ন প্রাণীর সমন্বয়ে প্রকৃতির রঙে আকর্ষণীয় পেন্টিং করা যেতে পারে।
৮. চিত্রকর্ম সংযোজন
কথায় আছে ‘ছবি কথা বলে- যেখানে শব্দ ব্যাখ্যা করতে অক্ষম’। প্রিয় ফুল, দেখা অরণ্য, উদীয়মান বা অস্তমিত সূর্যের ছবি, উড়ন্ত পাখি, ফ্রেমবাধা পারিবারিক স্মৃতিযুক্ত বা দূর্লভ কোনো ছবি, যা আপনাকে অতীতে নিয়ে যায়, প্রকৃতিতে কাটানো আপনার মূল্যবান মুহুর্ত, যা আপনাকে মনে করিয়ে দেয় এমন কিছু দিয়ে ওয়াল গ্যালারি তৈরি করা যেতে পারে।
[লেখক: মনির আহমেদ, সহকারী অধ্যাপক, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, বিএএফ শাহীন কলেজ ঢাকা]
৭১
১০৭ মন্তব্য