Loading..

ব্লগ

রিসেট

৩০ আগস্ট, ২০২৪ ০৭:৫৮ অপরাহ্ণ

আবু সাঈদ : বৈষম্যবিরোধী বীরশ্রেষ্ঠ

বাংলাদেশের তরুণরা গত ৫ আগস্ট একটি সফল গণ-অভ্যুত্থান সম্পন্ন করেছে। পৃথিবীর ইতিহাসে এত অল্প সময়ে এমন গণ-অভ্যুত্থান বিরল। অবশ্যই এর সাথে আরো বেশ কিছু অনুঘটক যুক্ত রয়েছে, যেগুলো অভ্যুত্থানের ভূমি প্রস্তুত করেছিল। কিন্তু এই ঘূর্ণিঝড়ের নিউক্লিয়াস ছিল তারুণ্য। ২০১৮ সালে কোটা সংস্কার আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাগের বশে পুরো কোটা পদ্ধতি বাতিল করে দেন। গত ৫ জুন সংক্ষুব্ধ দুই ছাত্রের রিটের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট কোটা বাতিলের সেই আদেশ বাতিল করে দিলে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রতিবাদ করেন। তারা কোটা পদ্ধতি সংস্কারের দাবি জানান। এ বিষয়ে সরকার আইনের মারপ্যাঁচে কথা বলতে থাকে। ফলে শিক্ষার্থীরা ‘বৈষম্যবিরোধী’ ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে কোটা সংস্কারের জন্য আন্দোলনে নামে। গত পয়লা জুলাই থেকে তারা মিছিল-মিটিংয়ের মাধ্যমে আন্দোলন চালাতে থাকে। তারা শাহবাগে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন শুরু করে। এ সময় আন্দোলন দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ছড়িয়ে পড়ে। দেশব্যাপী মহাসড়কগুলোতে অবরোধ পালিত হয়। এতে দেশবাসী বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের উত্তাপ বুঝতে পারে। এমতাবস্থায় হঠাৎ করেই ১৪ জুলাই এক সংবাদ সম্মেলনে একজন মুখচেনা সাংবাদিক তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীকে কোটা সম্পর্কে এমন একটি প্রশ্ন করেন, যেটি ছিল স্পষ্টতই উদ্দেশ্যমূলক। প্রশ্নের উত্তরে প্রধানমন্ত্রী মেজাজ কঠিন করে বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধার নাতিরা সরকারি চাকরি পাবে না তো রাজাকারের নাতিরা পাবে?’ রাজাকারের নাতি উচ্চারণ করায় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা অপমান বোধ করে।

রাতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলে ব্যাপক প্রতিবাদ মিছিল হয়। ক্ষমতাসীন সরকার এবং দল এতে প্রচণ্ড প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে ওঠে। তারা আন্দোলনকারীদের প্রতিহত করতে ছাত্রলীগকে লেলিয়ে দেয়। ১৫ জুলাই ছাত্রলীগ যথারীতি ভয়ঙ্করভাবে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলে পড়ে। এমনকি ঢাকা মেডিক্যালের জরুরি বিভাগে হামলায় আহত চিকিৎসারত ছাত্রদেরও হামলা করে। বেধড়ক প্রহার করে নারী শিক্ষার্থীদেরও। এসব হামলার ছবি মুহূর্তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। সারা দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া ক্ষোভ এতে বিক্ষোভে রূপ নেয়। শুরু হয় দেশব্যাপী ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি। আন্দোলনে যুক্ত হয়ে পড়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরাও।

১৬ জুলাই ‘শাটডাউন’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রাজপথে নামে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্ক মোড়ে অকুতোভয় ছাত্রনেতা অন্যতম সমন্বয়ক আবু সাঈদ একাই পুলিশের সামনে বুক চিতিয়ে দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়ান। তার হাতে ছিল সাধারণ লাঠি। কিন্তু পুলিশ এই নিরস্ত্র ছেলেটির বুকে কাছ থেকে গুলি চালায়। প্রথম দফা গুলিতে আবু সাঈদ শরীরের ভারসাম্য হারিয়ে ফেললেও সাহস নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকার চেষ্টা করছিলেন। এমন সময় পুলিশ আবার তার বুকে গুলি চালায়। অসংখ্য বুলেটের আঘাত সইতে না পেরে আবু সাঈদ বসে পড়েন। বন্ধুরা তাকে হাসপাতালে নেয়ার পথে এই বীরশ্রেষ্ঠ শাহাদতবরণ করেন।

আবু সাঈদের মৃত্যুর ভিডিওচিত্র সাথে সাথেই বাংলাদেশসহ সারা বিশ্ব ছড়িয়ে পড়ে। আবু সাঈদ শহীদ হন ঠিকই কিন্তু আন্দোলনের স্তূপিকৃত বারুদে আগুন জ্বালিয়ে দেন। তার এভাবে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার দৃশ্য দেখে দেশের শত শত ছাত্র রাস্তায় নেমে আসে। নিজেদের জীবন দিয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে থাকে। আবু সাঈদের হত্যাকাণ্ড হাজারো অভিভাবক জনতাকে ব্যথিত করে। তারাও রাজপথে নেমে আসেন এই নৃশংস হত্যার প্রতিবাদ করতে।
আবু সাঈদের অপরাধ ছিল, তিনি ‘বৈষম্যের’ বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। তার হাতে কোনো মারণাস্ত্র ছিল না। তিনি যুদ্ধ করতে বা কাউকে আঘাত করতে যাননি। তিনি শুধু বুঝাতে চাচ্ছিলেন ভয় দেখিয়ে ছাত্রসমাজের আন্দোলন স্তব্ধ করা যাবে না। অন্যায়ের বিরুদ্ধে পুলিশের অস্ত্রের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়ানো আবু সাঈদের ছবি সেদিনই বাংলাদেশের ইতিহাসে সুগভীরভাবে প্রোথিত হয়ে গেছে।

যুগে যুগে জালিম-স্বৈরাচারীর কবল থেকে জাতিকে মুক্ত করার জন্য এই ছবি অনাদিকাল পর্যন্ত নিষ্পেষিত নির্যাতিত মানুষকে উৎসাহ জোগাবে। ছাত্রদের জন্য এই ছবিটি হবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়ার আদর্শের প্রতীক। বিশ্বের যেখানেই মানুষ শোষিত হবে, নিষ্পেষিত হবে, বৈষম্যের শিকার হবে সেখানেই আবু সাঈদের ছবি তাদের জাগিয়ে তুলবে, মুক্তি পাওয়ার স্বপ্ন দেখাবে।


মন্তব্য করুন